বিশেষ

ফ্রেডী মারকিউরী আর কুইনঃ গ্র্যামী থেকে গোল্ডেন গ্লোব

Queen নিয়ন আলোয় neon aloy

We will, We will, Rock you”

যে ফোর বাই ফোর (৪/৪) বিটের গানটি সারা বিশ্বের মানুষের মাথায় এক নেশা ধরানো ট্রমার সৃষ্টি করেছে, যে বিটের মাধ্যমে আজ আমরা গানটির লিরিক্স শুরু হওয়ার আগেই বুঝে পারি গানটির পরিচয়- সেই গানটির উৎস কি?

আমাদের খুব কমের কাছেই তা অজানা। এই গানটি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একটি ব্রিটিশ ব্যান্ডের গান। ব্যান্ডটির জন্ম হয় ১৯৭০ সালের দিকে। অনেক সমালোচনার মধ্যে ব্যান্ডটি টিকে ছিল প্রায় দুই দশক। তাদের চমৎকার লাইভ পারফর্মেন্সের মাধ্যমে যেভাবে দর্শক মাতাতে পারতো তা ইতিহাসে খুব কম ব্যান্ডই আজ পর্যন্ত পেরেছে।

হ্যাঁ, ব্যান্ডটির নাম আপনারা সবাই অনেক আগেই অনুমান করে ফেলেছেন, ব্যান্ডটি হল “ফ্রেডী মারকিউরি” এর “কুইন”।

লাইভ পারফরমেন্সে তাদের সাথে কারো তুলনাই হয়না। ব্যান্ড লাইন আপটাও ছিল একদম অন্যরকম। লিড ভোকাল ও পিয়ানোতে ছিলেন “ফ্রেডী মারকিউরি”, যিনি ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান বলে শ্রোতা এবং ভক্তদের কাছে বেশি পরিচিত। লিড গিটার ও ভোকালে ছিলেন “ব্রায়ান মে”। রজার টেইলর ছিলেন ড্রামার ও ভোকাল এবং জন ডেকন ছিলেন বেজিস্ট। প্রগ্রেসিভ রক, হার্ড রক এবং হেভী মেটাল জনরাগুলো ছিল ব্যান্ড ক্যারিয়ারের প্রথম দিকের অনুপ্রেরণা।

কুইন শুরু হওয়ার আগে ব্রায়ান মে এবং রজার টেইলর একসাথে কাজ করেছিলেন “স্মাইল” নামক ব্যান্ডে। স্মাইলের ভোকাল “টিম স্টাফেল” এর সাথে ফ্রেডীর খুব বন্ধুত্ব ছিল। টিম এবং ফ্রেডী একই সাথে ইয়েলিং আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলেন। ইয়েলিং আর্ট কলেজের সময়টাতে মারকিউরিকে সবাই “ফাররুখ ফ্রেডী” নামে চিনতো। টিমের ব্যান্ডের সাথে চলাচল করতে করতে ফ্রেডী উপলব্ধি করেন যে তাদের সাথে তার মিউজিক টেস্টে বেশ মিল আছে। তখন ফ্রেডীই ঐ সময় ব্যান্ড “স্মাইল” কে উৎসহিত করতেন বিভিন্ন রকম লাইভ রেকর্ডিং কৌশল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে।

Queen নিয়ন আলোয় neon aloy

চিত্রঃ- ফ্রেডী মারকিউরী

টিম স্টাফেল পরে “হাম্পি বং” ব্যান্ডে যোগদানের জন্য “স্মাইল” থেকে বিদায় নেন। বাকি সদস্যদের নিয়ে ফ্রেডী ব্যান্ড করার প্রস্তাব দেন যার নাম হবে “কুইন”। সবাই রাজি হন ফ্রেডীর প্রস্তাবে। সেখানেই শুরু কুইনের যাত্রা। “কুইন” প্রথম লাইভ পারফর্ম করে ১৯৭০ এর ১৮ই জুলাই। পরিচিত অনেকগুলো মানানসই বেজিস্ট থাকায় তাদের সবার সাথেই ট্রায়াল প্র্যাক্টিস চলতে থাকে। কারো সাথেই বাকি ব্যান্ড মেম্বারদের কেমিস্ট্রি মিল ছিলনা। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খোঁজ পাওয়া যায় জন ডেকন এর। ডেকনকে পেয়ে বেশ আনন্দের সাথে শুরু হয় প্রথম অ্যালবামের কাজ।

Queen নিয়ন আলোয় neon aloy

চিত্রঃ- “কুইন”

“কুইন” যাত্রা শুরু করে নিজেদের চারটি গানের মাধ্যমেঃ

  • লায়ার (Liar)
  • কিপ ইউরসেলফ এলাইভ (Keep Yourself Alive)
  • দ্যা নাইট কামজ ডাউন (The Night Comes Down)
  • জিসাস (ডেমো) (Jesus- Demo)

তাদের একটি গান “মাই ফেইরি কিং” এর লাইন

“মাদার মারকিউরি, লুক হোয়াট দে হ্যাভ ডান টু মি”

থেকে অনুপ্রানিত হয়ে ফ্রেডী নিজের নাম পরিবর্তন করেন। দর্শক শ্রোতাদের সামনে উঠে আসেন “ফ্রেডী মারকিউরী”। ১৯৭৩ সালে কুইনের সেলফ টাইটেল্ড প্রথম অ্যালবামের কাজ শেষ হয় । ইউ.কে চার্টে প্রথমবারের মত নাম ওঠে দ্বিতীয় অ্যালবাম, “কুইন ২” এর জন্য। একই বছর নভেম্বর মাসে মুক্তি পায় তাদের তৃতীয় অ্যালবাম “সিয়ার হার্ট অ্যাটাক”। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পায় “এ নাইট এট দি অপেরা”। অনেকে বিশ্বাস করেন এটি রকের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অ্যালবাম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আধিপত্য শুরু হয় কুইনের। নয় সপ্তাহের জন্য ইউকে চার্টের এক নম্বর স্থান দখলে করে থাকে “বোহেমিয়ান র‌্যাপ্সডি”। অ্যালবামটির সফলতা কুইনের টিকে থাকার পথ সুগম করে।

এছাড়াও ১৯৭৭ সালে  বের হয় “নিউজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড” যে অ্যালবামটিতে ছিল বর্তমান সময়ের খুব বিখ্যাত দুটি গান । বিশ্ব জুড়ে সকল প্রকার ক্রীড়া ইভেন্টের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে উঠে দুটো গান “উই উইল রক ইউ” এবং “উইয়ি আর দ্যা চ্যাম্পিয়নস”। অসাধারণ স্টেজ পারফরমেন্সের জোরে এক দশকেরও কম সময়ে “কুইন” হয়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম সেরা ব্যান্ড। ১৯৮৫ সালের “লাইভ এইড” শিরোনামে তাদের কনসার্টটি বিশ্বের সেরা কিছু কনসার্টের মধ্যে একটি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে শ্রোতাদের বাকরুদ্ধ করে।

১৯৯১ সালে মারকিউরি এইডস সংক্রান্ত নিউমোব্রংকাইটিসে মৃত্যুবরণ করেন। বেজিস্ট ডেকন ১৯৯৭ সালে অবসর নেন। ব্রায়ান মে এবং রজার টেইলর নতুন ভোকাল এবং বেজিস্ট হিসেবে “পল রজারস” এবং “অ্যাডাম লাম্বারড” কে ব্যান্ডে নিয়ে বর্তমানে কুইন ব্যান্ড চালাচ্ছেন। তবে মার্কারি ও ডেকন ছাড়া ব্যান্ডটি আর “কুইন” নেই ভক্তদের কাছে।

কুইন এতই নাম করে নিয়েছিল সে সময়ে আর এখনও তাদের এত জনপ্রিয়তা আছে যে এপর্যন্ত কুইনের রেকর্ড বিক্রি হয়েছে আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন। কুইন কে বর্তমান সময়ের মানুষদের কাছে আরও বাস্তবরুপে উপস্থাপনের জন্য “ব্রায়ান সিংগার” ও “ডেক্সটার ফ্লিচার” তাদের প্রযোজনায় ফ্রেডী মারকিউরীর জীবনী আর কুইনের যাত্রা শুরুর গল্পটা নিয়ে একটি বায়োগ্রাফিক্যাল চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। নাম দিয়েছেন “বোহেমিয়ান র‌্যাপসডি”, যা গান এবং মুভিপাগল প্রায় সবাই দেখে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই। ২০১৮ সালের ২ই নভেম্বর মুক্তি পেয়েছে অধীর ভাবে প্রতিক্ষীত চলচ্চিত্রটি। গোল্ডেন গ্লোবের একাধিক ক্যাটাগরিতে বর্ষসেরা চলচ্চিত্রের পুরষ্কার অর্জন করেছে ইতোমধ্যেই।

Queen নিয়ন আলোয় neon aloy

চিত্রঃ- “বোহেমিয়ান র‌্যাপসডি” সিনেমার পোষ্টার।

ডিস্কোগ্রাফীঃ-

“কুইন” এই পর্যন্ত ১৫ টি স্টুডিও, ১০টি লাইভ , ১৪টি সংকলিত ও ১০টি বক্স সেটস অ্যালবাম মুক্তি পেয়েছে।

স্টুডিও অ্যালবামঃ-

  • কুইন (১৯৭৩)
  • কুইন-II (১৯৭৪)
  • সিয়ার হার্ট অ্যাটাক (১৯৭৪)
  • এ নাইট অ্যাট দ্যা অপেরা (১৯৭৫)
  • এ ডে অ্যাট দ্যা রেইসেস (১৯৭৬)
  • নিউজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড (১৯৭৭ )
  • জ্যাজ (১৯৭৮)
  • দ্যা গেম (১৯৮৪)
  • ফ্ল্যাশ গর্ডন (১৯৮০)
  • হট স্পেস (১৯৮২)
  • দ্যা ওয়ার্কস (১৯৮৪)
  • এ কাইনড অফ মাজিক (১৯৮৬)
  • দ্যা মিরাক্যাল (১৯৮৯)
  • ইনুয়েনডো (১৯৯১)
  • মেড ইন হেভেন (১৯৯৫)
Queen নিয়ন আলোয় neon aloy

চিত্রঃ- কুইনের কিছু অ্যালবামের প্রচ্ছদ

লাইভ অ্যালবামঃ

● লাইভ কিলারস (১৯৭৯)
● লাইভ ম্যাজিক (১৯৮৬)
● অ্যাট দ্যা বীব (১৯৮৯)
● লাইভ অ্যাট ওয়েম্বলি ‘৮৬ (১৯৯২)
● কুইন অন ফাইয়ার- লাইভ অ্যাট দ্যা বোওল (২০০৪)
● কুইন রক মন্ট্রেয়াল (২০০৭)
● হাঙ্গারিয়ান র‌্যাপ্সডিঃ কুইন লাইভ ইন বুডাপেস্ট (২০১২)
● লাইভ অ্যাট দ্যা রেইনবো ‘৭৪ (২০১৪)
● এ নাইট অ্যাট দ্যা অডেন – হ্যামারস্মিথ ১৯৭৫ (২০১৫)
● অন এয়ার (২০১৬)

সংকলিত অ্যালবামঃ

● গ্রেটেস্ট হিটস (১৯৮১)
● গ্রেটেস্ট হিটস II (১৯৯৮)
● ক্লাসিক কুইন (১৯৯২)
● দ্যা ১২” কালেকশন (১৯৯২)
● কুইন রকস (১৯৯৭)
● গ্রেটেস্ট হিটস III (১৯৯৯)
● স্টোন কোল্ড ক্লাসিকস (২০০৬)
● দ্যা এ টু জেড ওফ কুইন,ভলিউম-১ (২০০৭)
● অ্যাবসুলুট গ্রেটেস্ট(২০০৯)
● ডিপ কাটস, ভলিউম-১(২০১১)
● ডিপ কাটস, ভলিউম-২(২০১১)
● ডিপ কাটস, ভলিউম-৩(২০১১)
● আইকন(২০১৩)
● কুইন ফরএভার(২০১৪)

বক্স সেটসঃ

● দ্যা কমপ্লিট ওয়ারকস(১৯৮৫)
● সিডি সিঙ্গেল বক্স(১৯৯১)
● বক্স অফ ট্রিক্স(১৯৯২)
● আল্টিমেট কুইন(১৯৯৫)
● দ্যা ক্রাউন জুয়েলস(১৯৯৮)
● দ্যা প্লাটিনাম কালেকশনঃ গ্রেটেস্ট হিটস ১,২,৩(২০০৩)
● দ্যা সিঙ্গেলস,কালেকশন ভলিউম – ১(২০০৮)
● দ্যা সিঙ্গেলস ,কালেকশন ভলিউম – ২(২০০৯)
● দ্যা সিঙ্গেলস ,কালেকশন ভলিউম – ৩(২০১০)
● দ্যা সিঙ্গেলস ,কালেকশন ভলিউম – ৪(২০১০)

জন্মলগ্ন হতে আজ পর্যন্ত কুইন ব্যান্ড বিভিন্ন সময়ে যে পুরষ্কার আর সম্ভাবষণগুলো পেয়েছেঃ

ব্রিট পুরষ্কারঃ

● ব্রিটিশ সিংগেল(১৯৭৭)
● আউটস্ট্যান্ডিং কনট্রিবিউশন টু মিউজিক(১৯৯০)
● ব্রিটিশ সিংগেল(১১৯২)
● আউটস্ট্যান্ডিং কনট্রিবিউশন টু মিউজিক(১৯৯২)

আইভোর নভেলোঃ

● বেস্ট সেলিং ব্রিটিশ রেকর্ড(১৯৭৬)
● আউটস্ট্যান্ডিং কনট্রিবিউশন টু মিউজিক(১৯৮৭)
● বেস্ট সেলিং এ-সাইড(১৯৯২)
● আউটস্ট্যান্ডিং সং কালেকশন(২০০৫)

গ্র্যামিঃ

● হল অফ ফেইম(২০০৪)
● হল অফ ফেইম(২০০৯)
● গ্রামি লাইফ টাইম এচিভমেনট এওয়ার্ডস(২০১৮)

এ ছাড়াও তারা ২০১১ সালে এমটিভি মিউজিক এওয়ার্ডস এ কুইন গ্লোবাল আইকন পুরষ্কার পায়। কুইন আর হয়ত কখনই  ‘৮৫ সালের টগবগে যৌবনে ফিরে যেতে পারবে না, কিন্তু তারা সেই সময়ে যেভাবে সারা পৃথিবীর মনকে জয় করে পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছে, তা কখনই ভুলে যাওয়া বা মুছে ফেলা সম্ভব না। ভোলা যাবে না মারকিউরিকে। ফ্রেডী, তার ব্যান্ড এবং তাদের কাজ ভক্তদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে কালান্তরে।

তথ্যসূত্রঃ-

উইকিপিডিয়া

আরও পড়ুনঃ যাদের হাত ধরে বাংলাদেশে এসেছে হেভীমেটাল!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top