লাইফস্টাইল

কীভাবে জানবেন আপনি সুখী?

কিভাবে বুঝবেন সুখী নিয়ন আলোয় neonaloy

সুখ নিয়ে আমাদের কথোপকথনটা তিন হাজার বছর আগের রোমান বা গ্রীকদের সময়ের তুলনায় খুব একটা বদলায়নি। তাই এখনও প্লেটো বা সক্রেটিসের কথাগুলো প্রাসঙ্গিক। রোমান সেনেকা বা মার্কাস অরেলিয়াসের ভাবনা আমাদেরকেও ভাবানোর ক্ষমতা রাখে।

এরপরেও আজকাল মানুষ বলছে যে সবকিছু বদলে গেছে। এখনকার আমরা নাকি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অসুখী মানুষের ঝাঁক। কিন্তু মানুষ যখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি একে অপরের সাথে সংযুক্ত, তখন এই অসুখ কি আসলেই ব্যক্তিগত অসুখ?

আপনি সবখানেই পড়ছেন, “প্রযুক্তি মানুষকে একাকী এবং হতাশ বানিয়ে ফেলছে!” হ্যাঁ, প্রযুক্তিতে আজ মানবজীবন ছেয়ে গেছে সত্য, কিন্তু আমি বলব- মানুষের মৌলিক প্রকৃতিটা একসময়ই বদলায়নি। আধুনিক সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ অসুখী, একাকী, নিরুপায়। সেই গ্রীক দর্শনের শুরুতে অ্যান্টিস্থেনিস সুখ সম্পর্কিত যেসব প্রশ্নকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, আমরা এখনো সেসব প্রশ্নই নিজেদের জিজ্ঞেস করে যাচ্ছি-

আমার কি আমার পেশাটা পছন্দ?
আমার থাকার জায়গাটা?
আমার সঙ্গী কি আমাকে সুখী করে?
আমার উপার্জন কি আমাকে সুখী করে?

এভাবে আমরা ভেবে যাচ্ছি শতাব্দীর পর শতাব্দী। এবং আপনিও যদি এভাবেই ভেবে থাকেন, আমি বলব আপনার এই চিন্তার প্রক্রিয়াটা ভুল। সুখ নিয়ে গতানুগতিক চিন্তাধারায় আমরা সবসময় সুখের পেছনের একটা কারণ খোঁজার চেষ্টা করি, সেখানে সবসময় কোনো বস্তু বা মানুষ আমাদের সুখী করে, এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন?
কেন আমরা সবসময় সুখের পেছনের একটা বাহ্যিক কারণ থাকবে তা বিশ্বাস করি?

আমার মনে হয় সুখের ধারণা নিয়ে আমাদের চিন্তাধারার সবচেয়ে বড় সমস্যাটা এখানেই। কেন আমরা আমাদের সুখের সাথে ক্যারিয়ার, অর্থ এসব সংশ্লিষ্ট করবার চেষ্টা করবো? আপনি কখন সুখী হন? যখন আপনি আপনার পছন্দের একটা চাকরি করেন? যখন আপনার হাতে টাকাপয়সা আসে? যখন আপনার জীবনে ভালোবাসা আসে?

কিন্তু সত্য হচ্ছে আপনার পছন্দের চাকরিতেও আপনি একসময় বোরড হয়ে যাবেন। আপনার ভালোবাসাও একসময় মলিন হয়ে যাবে। কোনো টাকাপয়সাই আপনার জন্য কখনো যথেষ্ট হবে না। এখনকার সেলফ-হেল্প লেখকরা সুখের সাথে অন্য আরেকটি শব্দকে মিলিয়ে থাকেন। শব্দটি কার্যকারিতা। একজন মানুষ যখন কোন একটি পরিস্থিতিতে, অনুভব করে যে সে কাজে এসেছে, সে তখন সুখী অনুভব করে।

এই উত্তরটি আমাদের অনেকের চিন্তার জগতে একটু নাড়া হয়তো দিবে। কিন্তু তারপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়, এবং এই প্রশ্নটাই আমার প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য আজ।

“আমি কীভাবে জানব আমি সুখী?”

এই প্রশ্নটি আপনি একমাত্র তখনই নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন যখন আপনি সুখ সম্পর্কে সাধারণের তুলনায় একটু গভীরভাবে চিন্তা করবেন। দেখুন, আমরা কেউই সুখের স্বরূপকে বোঝার চেষ্টা করি না, কিংবা আমরা ধরেই নেই যে আমরা জানি সুখ কি। হ্যাঁ, আমরা আমাদের ক্যারিয়ার, টাকাপয়সা, স্বাস্থ্য- সবকিছুকেই খুব ভালোভাবে চিনি, তার স্বরূপ বুঝি। অথচ যে ব্যাপারটি এইসব জিনিসগুলোকে অর্থবহ করবে, যেই জিনিসটা পাওয়ার আশাতেই আমরা এসবের পেছনে ছুটছি, সেই সুখকেই আমরা কখনও চেনার বা সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করি না।

আপনি কতটুকু সুখী বা আদৌ সুখী কিনা তা জানতে হলে আপনার প্রথমেই নিজেকে যে প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করতে হবে, তা হল আপনি কোন বাহ্যিক ব্যাপার আপনাকে সুখী করবে সে আশায় বসে আছেন ?

উত্তরটা অবশ্যই হতে হবে, “না।”

খুলে বলিঃ
ধরুন আমি একজন সুখী মানুষ।
তখন আমি আমার পেশাকে ভালোবাসি, কিন্তু তা আমাকে সুখী করে না।
আমি আমার পরিবারকে ভালোবাসি, কিন্তু তাও আমাকে সুখী করে না।
আমি আমার জীবনসঙ্গীকে ভালোবাসি, কিন্তু তাও আমাকে সুখী করে না।
আমি-ই আমার নিজেকে সুখী করি, করার ক্ষমতা রাখি।

জীবন খুবই ছোট। নিজের সুখের জন্য অন্যের উপর নির্ভর করার সুযোগ সেখানে নেই। সুখ শুধুই একটি মানসিক অবস্থা। একটি অনুভূতি। এর নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই আপনার হাতে। ঠিক যেভাবে আপনি আপনার সময়কে কীভাবে কাজে লাগাবেন সে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, আপনি ঠিক সেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সুখী হবার।

“কিন্তু আমার জীবনের কিছুই তো আমাকে সুখী করে না।”

আবার! আবার কিন্তু আপনি সেই প্রচলিত সুখের ধারণার মাঝে আটকে গেলেন। নিজের সুখের অভাবের জন্য পেশা, পরিবার, এমনকি পুরো দুনিয়াকে দোষা, সে তো খুবই সহজ কাজ! দুনিয়া ভালো না, মানুষ ভালো না- এসব জপতে থাকা মানুষ দিয়ে আমাদের চারপাশ পরিপূর্ণ। হ্যাঁ, খারাপ জিনিস তো ঘটেই, মানুষও খারাপ হয়। সবকিছুই ভালো সে ভান আমি করব না।

কিন্তু সেই খারাপগুলোর কারণ কি আপনি? না। সুতরাং সেসব জিনিসকে পাত্তা দেয়া বন্ধ করুন, অন্যকে নিজের সুখের নিয়ন্ত্রণ দেয়া বন্ধ করুন। মনে রাখবেন, আপনার সুখী থাকার জন্য কোন কারণের দরকার নেই। এটাই এক বাক্যে এই পুরো প্রবন্ধের আইডিয়া। তবে শুধু বললেই হবে না, এই বাক্যটিকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে।

তাহলে বলুন তো, “আপনি কীভাবে জানবেন আপনি সুখী?”
যখন আপনার প্রেম, ক্যারিয়ার, পরিবার, যেটা যেই অবস্থাতেই থাকুক না কেন, সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে নিজেকে বলতে পারবেন আপনি সুখী, তখনই আসলে আপনি প্রকৃত অর্থে সুখী।

আরো পড়ুনঃ
আইনস্টাইনের থিওরি অফ হ্যাপিনেস: দেড় মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া “সুখের মূলমন্ত্র”

Most Popular

To Top