ইতিহাস

অ্যানি জাম্প ক্যানন: নারীদের বিজ্ঞানচর্চায় নাক সিটকানির জবাব

অ্যানি জাম্প ক্যানন: নারীদের বিজ্ঞানচর্চায় নাক সিটকানির জবাব

‘’নারীর বিজ্ঞানের পথে চলতে চাওয়া মানেই, নারী হিসেবে তার ভেতরের সমস্ত সৌন্দর্য বাতিল করে দেয়া নয়।‘’

উক্তিটি যার, তাকে দেখলেই বোঝা যায় কথাটি কতটা সত্য। কিন্তু অ্যানি জাম্প ক্যানন নামের এই নারীর সৌন্দর্য দেখে যত মুগ্ধ হতে হয় তার চেয়েও বেশি অবাক হতে হয় সে সময় বিজ্ঞানে তার অবদান অবদান দেখে। নক্ষত্র শ্রেনীবিন্যাসের যে ধারা তিনি সেই উনিশ শতকের শেষের দিকে করে গেছেন সেটা এখন পর্যন্ত ব্যবহার হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞানে।

অ্যানি জাম্প ক্যানন নিয়ন আলোয় neonaloy

অ্যানি জাম্প ক্যানন; সৌন্দর্য্য আর বুদ্ধিমত্তার সহাবস্থান ছিল যার মাঝে

তবে অ্যানি ক্যাননের জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আগে আসলে এটা জানা দরকার জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার অবদান কতখানি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। জীববিজ্ঞান সম্পর্কে যাদের ধারনা আছে তারা এটা জানবেন যে শ্রেনীবিন্যাসের সুবিধা কতখনি। একইভাবে নক্ষত্র শ্রেণিবিন্যাসের এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন অ্যানি ক্যানন। তার এই পদ্ধতিতে নক্ষত্রের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার ভিত্তিতে নক্ষত্রগুলোকে ইংরেজি O, B, A, F, G, K আর M এই অক্ষরগুলোকে দিয়ে বিন্যাস করা হয়। সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রার নক্ষত্রগুলো O গ্রুপে আর সবচেয়ে কম তাপমাত্রারগুলো M গ্রুপে।

এখন কথা হল সেই সময়, যখন কি না আজকের মতন তেমন কোন প্রযুক্তিই ছিল না, তখন কি করে নক্ষত্রের এই তাপমাত্রা মাপা হত? আসলে নক্ষত্রের তাপমাত্রার সাথে নক্ষত্রের রঙের একটা সম্পর্ক আছে। সব থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো মূলত নীলচে রঙের হয়। আর তাপ যত কমতে থাকে রঙ তত নীল থেকে সাদা তারপর লালের দিকে যেতে থাকে। এই রঙগুলো দিয়েই মূলত বিন্যাসটা করা হত। অ্যানি ক্যাননের আবিষ্কার করা এই হাভার্ড সিস্টেম (HARVARD SYSTEM) পদ্ধতি এখন পর্যন্ত ব্যবহার হয়ে আসছে। 

অ্যানি জাম্প ক্যানন নিয়ন আলোয় neonaloy

হাভার্ডের মানমন্দিরে অ্যানি ক্যানন

তবে অ্যানি ক্যানন এই পদ্ধতির আবিষ্কারের সূচনা এত সহজ ছিল না। অ্যানি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৩ সালে আমেরিকার ডোভার শহরে। ছোটবেলায় রাতের আকাশে তাকিয়ে বিভিন্ন প্যাটার্ন বের করতে শিখেছিল মায়ের কাছ থেকে। মূলত মায়ের আগ্রহেই অ্যানির আগ্রহ জন্মে নক্ষত্রের প্রতি। আর সে আগ্রহ সাথে নিয়ে তিনি ম্যাসাচুসেটের ওয়েলসলি কলেজ থেকে শেষ করে গনিত, রসায়ন আর জীববিজ্ঞানের পাঠ।

১৮৮৪ সালে বাড়ি থেকে বের হবার এক দশক পরে পদার্থবিজ্ঞানে গ্রাজুয়েশন শেষ করেন। ১৮৯৩ সালের দিকে স্কারলেট ফিভার নামের এক অসুখে কানের সমস্যা দেখা দেয় এবং এর পর পরই তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে থাকে। আর ঠিক এর পরের বছরই মায়ের মৃত্যুর পর তার ভবিষ্যৎ মোটামুটি অনিশ্চিত হয়ে যায়। এই সময় কিছুদিনের জন্য তিনি পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকতাও করেন।

কিন্তু অ্যানির মাথায় তখন নক্ষত্রের চিন্তা। ছোটবেলা থেকে আগ্রহ তো ছিলই আর এরপর বিভিন্ন সময় সে আগ্রহ বেড়েছে বৈ কমেনি। একটা ভাল দূরবীক্ষণ যন্ত্রের জন্যই তিনি আবার র‍্যাডক্লিফ কলেজে স্পেশাল ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। র‍্যাডক্লিফ কলেজ হাভার্ডের পাশে হওয়ায় সে সময় হাভার্ডের প্রফেসরেরা সেখানে এসে মাঝে মাঝে লেকচার দিতেন। সে সময়ই তিনি এডওয়ার্ড সি. পিকারিং নামের এক প্রফেসরের নজরে আসেন। এডওয়ার্ডই অ্যানিকে হাভার্ডের মানমন্দিরে তার অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। মূলত সেখান থেকেই অ্যানির এই শ্রেণিবিন্যাসের চিন্তা আসে।

অ্যানি জাম্প ক্যানন নিয়ন আলোয় neonaloy

এভাবেই ফটোপ্লেট থেকে একের পর এক নক্ষত্রের শ্রেণিবিন্যাস করা হত সে সময়

অ্যানি ক্যানন তার কর্মজীবনে যে পরিমাণ নক্ষত্রের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন সেটা পৃথিবীর যে কারো চেয়ে বেশি। তিনি একাই প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ নক্ষত্রের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন, নতুন প্রায় ৩০০ নক্ষত্র, ৫ টা নোভা আর একটা বাইনারি আবিষ্কার করেন। প্রথম তিন বছরে তিনি প্রায় ৩০০০ নক্ষত্রের বিন্যাস করেন, কিন্তু কাজ করতে করতে শেষে এতই দক্ষ হয়ে ওঠেন যে একসময় প্রতি ঘন্টায় ২০০ নক্ষত্র নিয়ে কাজ করতে পারতেন, পুরোপুরি নির্ভুলভাবে। সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ১৬ গুন দ্রুততার সাথে তার চোখ কাজ করত। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, শেষের দিকে অ্যানি শুধুমাত্র একটা আতস কাঁচ দিয়েই একবার মাত্র নক্ষত্রের স্পেশাল প্যাটার্ন দেখে মিনিটে প্রায় তিনটা করে নক্ষত্র বিন্যাস করতে পারতেন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার এই অবিশ্বাস্য এবং অসামান্য অবদানের জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্বের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী যিনি অক্সফোর্ড থেকে এই সম্মান পান। এছাড়া আরো অনেক এওয়ার্ড পেয়েছেন। তার মাঝে সবথেকে উল্লখযোগ্য হেনরি ড্রাপার মেডেল। গবেষণা ছাড়াও তিনি ছিলেন আমেরিকার ন্যাশনাল উইমেন্স পার্টির সদস্য এবং একজন সাফ্রেজিস্ট (suffragist) যাদের কাজ ছিল জাতীয় নির্বাচনে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা।

অ্যানি জাম্প ক্যানন নিয়ন আলোয় neonaloy

হাভার্ডের মানমন্দিরে নক্ষত্র গননাকারীর দল, প্রথমদিকে যাদের টিটকারি দিতে ছাড়েনি কেউ। তাদের নেত্রী অ্যানি ক্যাননকে দেখা যাচ্ছে মাঝে

কিন্তু অ্যানি জাম্প ক্যাননের সবচেয়ে বড় সাফল্য জ্যোতির্বিজ্ঞানে না। তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সম্মাননা এবং পুরষ্কার রেখে গেছেন পরবর্তী দিনের বিজ্ঞানমনষ্ক নারীদের অনুপ্রেরণার জন্য। হাভার্ডের ঐ প্রফেসরের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে আরো অনেক নারীই কাজ করেছেন, মানমন্দিরের সকলে তাদের ‘আউট অফ দেয়ার প্লেস’ (Out of their place) বলে টিটকারি মেরেছে অনেক। তাই আজ হয়ত আরো অনেকের অবদানের সাথে বিজ্ঞানে ক্যাননের এই অবদানই, আজকের দিনের নারীদের বিজ্ঞানচর্চায় নাক সিটকানির জবাব দিচ্ছে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top