টাকা-কড়ি

“ভাবছি রোবটিক্স টা ছেড়ে দিব…”

“ভাবছি রোবটিক্স টা ছেড়ে দিব…”

এইভাবে শুরু হয়েছিল ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী এ এস ফারদিন আহমেদের ফেসবুক স্ট্যাটাস, যেটা অল্প সময়ের মধ্যে ভার্চুয়াল জগতে ভাইরাল হয়ে পড়ে। ৪৪ হাজার লাইক, কয়েক হাজার কমেন্ট, ১৩ হাজারের বেশি শেয়ার। স্ট্যাটাসের বিষয়বস্তু এমন- ফান্ডিংয়ের অভাবে তার তৈরী “Farbot” নামের বেশ উন্নত পর্যায়ের একটি রোবটের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সরকারী এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি উভয়ের থেকে ফান্ডিংয়ের জন্য চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কেউই এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় নি।

এ এস ফারদিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী রোবটটি যথেষ্ট “এডভান্স লেভেলের” কি না, সেটা বিশেষজ্ঞগণ ভালো বলতে পারবেন। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকর্মের প্রতি দেশের সরকারী ও বেসরকারী প্রশাসনের অনাগ্রহের কথা আমাদের অজানা নয়। উপযুক্ত অর্থায়নের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে- এমন ঘটনা আমাদের দেশে নতুন কিছু কি?

সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলো একেবারেই যে অর্থায়িত হয় না তা বললে অবশ্য ভুল হবে। এ এস ফারদিন আহমেদের স্ট্যাটাসেই উল্লেখ করা হয়েছে, কিছুদিন আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী কর্তৃক তৈরী রোবট “রিবো”র জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। তবে এমন উদাহরণ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

গত বছরের জুন মাসে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়। তার মধ্যে গবেষণা খাত আমাদের দেশে সব সময়ই অবহেলিত, সমগ্র বাজেটের অতি অল্প অংশই বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বরাদ্দ হয়। সেই অতি অল্প অংশেরও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই দৃশ্য অহরহ দেখা যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে সরকারী অর্থায়ন অত্যন্ত কম। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে গবেষণা প্রকল্পের কাজ চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না, অনেক সম্ভাবনাময় শুরুর পরেও মুখ থুবড়ে পড়তে হয়।

অথচ, বাজেট দূর্বলতার পরেও এই সমস্যার সহজ সমাধান অসম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অহরহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বিনিয়োগ করে থাকে। উদ্দেশ্য, গবেষণার ফলাফলকে নিজেদের পণ্য বা সার্ভিসকে উন্নত করার কাজে ব্যবহার করা। এমআইটি এবং “স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউজার্সি” এর সম্মিলিত একটি রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্রচেষ্টার মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম পরিশোধন প্রক্রিয়ার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন হয়। বেল ল্যাব, আইবিএম ইত্যাদি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বিনিয়োগ করবে আর এতে শিক্ষার্থীদেরই বা কী লাভ? গ্রাহকদের চাহিদা খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল, একই ধরনের পণ্য দিয়ে তাদের বেশিদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া যেকোন পণ্য বা সেবার বাজারে এখন প্রতিযোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সুতরাং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পণ্য ও সেবার মান উন্নত না হলে তাকে বাজারে পিছিয়ে পড়তে হবে। তবে পণ্য ও সেবা উন্নত করার উপায় কী? এর একটা উত্তর হতে পারে – রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট। এই রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্টই হতে পারে ইন্ডাস্ট্রি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন। এর মাধ্যমে উভয় পক্ষই উপকৃত হতে পারে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণার ফলাফলকে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে থাকে। এর ফলে, কর্পোরেট হাউজগুলো যেমন উপকৃত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাদের আগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছন্দে কাজ করার সুযোগ পায়।

ধরি, ইস্পাহানী মির্জাপুর চা কোম্পানী শাবিপ্রবির ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টি টেকনলজি বিভাগে গবেষণার জন্য কিছু টাকা বিনিয়োগ করল। সেই বিভাগ গবেষণার মাধ্যমে স্বল্প খরচে চা সংরক্ষণ করার উপায় আবিষ্কার করল। এই আবিষ্কার যেমন ইস্পাহানী নিজেদের ব্যবসায় কাজে লাগাতে পারে, তেমনি সেই একাডেমিক বিভাগও নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ পেল।

দুঃখের বিষয় এই যে, আমাদের দেশে বেসরকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের এমন কোন ঐতিহ্য সৃষ্টি হয় নি। এর কারণ হল- এর উপকারীতা সম্পর্কে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো ধারণা নেই। অথবা জাতিগতভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আমাদের তেমন আগ্রহ গড়ে উঠেনি।

তবে বাস্তবতা এর থেকেও সাদা-কালো। সরকারী ভাবে স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশের বাকি প্রশাসনিক অনিয়ম আর অনৈতিক আচরণের উর্ধে সেটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। বেসরকারি ফান্ডিং একেবারেই কোনদিন কোন বিশ্ববিদ্যালয় পায়নি তা নয়। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর বাংলার মাটির চিরাচরিত সঙ্গী দূর্নীতি সেই প্রচেষ্টা অংকুরেই বিনষ্ট করেছে।

সহজ ভাষায় বললে, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসার পুঁজি থেকে নগদ টাকা নিশ্চয়ই প্রশাসনিক আমলাদের পকেটে যাওয়ার জন্য দেবেন না। কারণ অর্থটা গবেষণা খাতেই সম্পূর্ণ ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সে সাথে ফলাফলও আসছে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষমতা এই দেশের রাষ্ট্র পরিচালকদের কোনদিন ছিল না।

কর্পোরেট ফান্ডিং এর কিছু নেতিবাচক দিকও আলোচিত হয়ে থাকে। যেমন, এর ফলে বিজ্ঞানচর্চা ক্যাপিটালিজমের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, বিজ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা ব্যাহত হবে। এক্ষেত্রে আমার সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, অর্থায়নের অভাবে ব্যাহত হওয়ার চাইতে কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ক্যাপিটালিজমের আনুকূল্যে বিজ্ঞানচর্চা চালিয়ে যাওয়া খারাপ কিছু না। অত্যন্ত একটা স্ট্যান্ডার্ড পর্যায়ে এসে তারপর এ নিয়ে বিস্তারিত চিন্তা-ভাবনা করা ভালো।

জুজুর ভয়ে ভীত হওয়ার মত অবস্থাতে আমরা এখন নেই! শিক্ষা আর গবেষণাখাতের মূলহোতাদের ক্লাসরুমে আদর্শ কপচানো যেদিন বাইরে সত্যিকার কর্মক্ষেত্রে চর্চা শুরু হবে সেদিন থেকে বিনিয়োগ আর বাধা থাকবেনা দেশের শিক্ষার্থীদের।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top