বিশেষ

ওয়েভসঃ যাদের হাত ধরে বাংলাদেশে এসেছে হেভীমেটাল!

ওয়েভস নিয়ন আলোয় neonaloy

আমরা তো অনেক হেভী মেটাল গান শুনি, তাইনা? বিদেশী ব্যান্ড বললে আয়রন মেইডেন, ব্ল্যাক স্যাবাথ, জুডাস প্রিস্টসহ কতো কি! আবার দেশী ব্যান্ড বললে ক্রিপটিক ফেইট, রকস্ট্রাটা সহ আরো কতো ব্যান্ডের গান শুনি।

কিন্তু, কখনো মনে প্রশ্ন জেগেছে বাংলাদেশে এই হেভী মেটালের যাত্রা কিভাবে শুরু হয়? কাদের হাত ধরেই বা যাত্রা শুরু হয় এই হেভী মেটালের?

ওয়েভস’র হাত ধরে বাংলাদেশে হেভী মেটাল মিউজিকের যাত্রা শুরু হয়, তারাই প্রথম ব্যান্ড যারা বাংলাদেশে হেভী মেটাল মিউজিক শুরু করে। তাই ওয়েভসকেই বলা হয় বাংলাদেশের প্রথম হেভী মেটাল ব্যান্ড।

ওয়েভসের পথচলা শুরু হয়েছিলো ২৫শে ডিসেম্বর, ১৯৮১ সালে জার্মানীর ফ্র‍্যাংকফুর্টে;  ইফতেখার শিকদার, মাহমুদ এবং মিঠুর হাত ধরে। মাহমুদ এবং ইফতেখার জার্মানির জারোসলোকি মিউজিক স্কুলে একসাথে মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তারা প্রায়ই সেখানের লোকাল ব্যান্ডগুলোর সাথে জ্যাম করতেন এবং এভাবেই একসময় নিজেদের একটা ব্যান্ড খোলার কথা তাদের মাথায় আসলো।

ড্রামার বন্ধু মিঠুকে জানালেন তাদের নতুন ব্যান্ডের কথা এবং মিঠু তাতে রাজি হয়ে গেলেন। ভোকাল এবং গিটারে ইফতেখার, মাহমুদ গিটারে এবং ড্রামসে মিঠুকে নিয়ে শুরু হলো ওয়েভসের যাত্রা। প্রসঙ্গত যে, ইফতেখারের বড় ভাই একরাম ব্যান্ডের নাম “ওয়েভস” দিয়েছিলেন।

ব্যান্ডের কাজকর্ম শুরু হলেও একজন বেজিস্টের জায়গা তখনো খালি রয়ে গিয়েছিলো। ক্যান্ডিডেট হিসেবে ভালো কিছু বেজিস্টও ছিলো কিন্তু ইফতেখার, মাহমুদরা ঠিক করলেন বাংলাদেশে ফেরত যাবেন এবং সেখানে গিয়ে মিউজিক করবেন। তাই বেজিস্ট হিসেবে এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছিলো না যিনি বাংলাদেশে ফেরত এসে তাদের ব্যান্ডে বাজাবে। তাই মাহমুদকে গিটারের সব দায়িত্ব দিয়ে ইফতেখার নিজের কাঁধে বেজ গিটার তুলে নিলেন।

তারপর ভালোভাবেই শুরু হলো ব্যান্ডের যাত্রা। পরবর্তীতে সুইডেন থেকে মিনু এবং জার্মানী থেকে কামাল এসে যোগদান করেন।

ওয়েভস ব্যান্ড নিয়ন আলোয় neonaloy

ওয়েভস তাদের সব ইন্সট্রুমেন্ট, গিয়ার এবং স্টুডিওর সকল সরঞ্জামাদি নিয়ে ১৯৮৩ সালে ঢাকায় চলে আসে এবং প্র‍্যাকটিসও শুরু করে। তারাই প্রথম এই দেশে ক্রীম, ব্ল্যাক স্যাবাথ, লেড জ্যাপলিন, মোটরহেডসহ আরো অনেক নামীদামী ইন্টারন্যাশনাল সব ব্যান্ডের বিভিন্ন গান কভার করে প্র‍্যাকটিস করতো।

এটা তখনকার সময়ে অনেকের কাছে হাই ভোল্টেজ শকের মতো লাগে যেহেতু তখনো মানুষ অ্যাবা (ABBA) এবং বোনি এম (Boney M)র মতো পপ শিল্পীদের গান শুনতো। লেড জ্যাপলিন, ব্ল্যাক স্যাবাথ এবং এসিডিসি’র মতো ব্যান্ড একদমই নতুন ছিলো তাদের কাছে।

এসব কারণে অনেক পত্রিকায় বা ম্যাগাজিনে ওয়েভসের নাম উঠতে থাকে। তখনকার সাপ্তাহিক “রোববার” পত্রিকায় “রক, রক এন্ড রোল” এর কভারে তাদের নাম উঠে যা অনেক সঙ্গীতভক্তকে উৎসাহী করে তোলে।

ইফতেখাররা হেভীমেটাল গানই করবেন ঠিক করেছিলেন এবং এভাবেই তাদের হাত ধরে বাংলাদেশে হেভীমেটাল মিউজিকের সূচনা হলো ‘বাংলা মেটাল’ নামে।

লাইভ পারফরমেন্সের ক্ষেত্রে তারা এমনভাবে পারফর্ম করতেন যা আগে কেউ কখনো করেনি। বত্রিশ চ্যানেলের পাবলিক এড্রেস সিস্টেম, মারশাল অ্যাম্প, গিবসন গিটারস এবং ডজনখানেক মাইক নিয়ে স্টেজ কাঁপাতেন তারা।

ওয়েভসের প্রথম কনসার্ট হয় ১৯৮৪  সালের ১১ জুলাই ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীতে এবং তারপর তারা অনেকটা রাতারাতিই নাম কামিয়ে ফেলে ভিন্ন ধাঁচের মিউজিক করার কারণে।

এরপরে শিশু একাডেমী, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট, গাইড হাইজ এবং বিটিভিসহ আরো অনেক জায়গায় নিয়মিত শো বা পারফর্ম করতে থাকে ওয়েভস।

ওই বছরেই বন্যাদুর্গতদের ত্রান যোগাড়ের জন্য একটা কনসার্ট আয়োজন করেছিল ওল্ড ফৌজিয়ান এসোসিয়েশন। সেই কনসার্টে ওয়েভসের সাথে আরো পারফর্ম করেছিলো মাইলস এবং বিগত “সাবা তানি”।

উল্লেখ্য, বাম্বা (বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ড এসোসিয়েশন) গঠন হবার আগে থেকেই ওয়েভস চ্যারিটি যোগাড় বা এওয়ারনেসের জন্য কনসার্ট আয়োজন করা শুরু করে। পরবর্তীতে বাম্বা সেই ধারা আজ পর্যন্ত বজায় রেখে চলছে ।

সেই ১৯৮৪ সালেই বিটিভির আয়োজিত ঈদ শো উপলক্ষে ওয়েভস ভোকালে ইফতেখারকে নিয়ে তিনটি ডেমো গান রেকর্ড করে। ততোদিনে ওয়েভসকে সবাই চিনে ফেলেছিলো তাদের ভিন্নরুপী পারফরমেন্সের জন্য। ওয়েভসকে আরো চেনার কারন ছিলো ব্যান্ড সদস্যদের পোশাকপরিচ্ছদও। ইফতেখারের জোরালো গলা ছাড়াও ছিলো কোমড় পযন্ত লম্বা চুল। ওয়েভসেকে আরো চেনার কারন ছিলো ওয়েভসের ফিমেল ভোকালিস্ট মিনুর ভোকালের কাজ এবং কিবোর্ডের স্কিলস।

বিটিভির শো করার সময় বিটিভির জিএম ওয়েভসের পুরো শো-কে “অপসংস্কৃতি” হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং ওয়েভসের শো বাতিল করে দেয়। তখন বিটিভি’র পর সব জায়গায় ওয়েভসের পারফর্ম বাতিল হয়ে গেলো সেই আশির দশকে। সেসময় বিটিভিই একমাত্র “অন এয়ার এন্টারটেইনমেন্ট” ছিলো, তাই বিটিভি’র নিজস্ব কাঠামোর নির্দেশনা মান্য অথবা সেখানের এক্সিকিউটিভদের ঘুষ দেয়া ছাড়া অনএয়ার পারফর্ম করা আর সম্ভব ছিলো না। ওয়েভস সেই নিয়ম বা কার্যপ্রণালী মানতে দ্বিমত পোষণ করলো এবং জিএমকে “কালচারাল অ্যানথ্রাক্স” বলে আখ্যায়িত করলো। অনেকে আবার ওয়েভসকে অপসংস্কৃতির আমদানীকারক হিসেবে আখ্যায়িত করলো। এইভাবে, ওয়েভস অনিচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের তৎকালীন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির দূর্নীতির ফাঁদে পড়ে তখনকার মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির উপরের দিকের মানুষজনের চক্ষুশূল হয়ে গেলো।

হতাশ হয়ে যায় ব্যান্ডের সবাই। মিনু সুইডেনের উদ্দেশ্যে ব্যান্ড থেকে বিদায় নেয় এবং মিঠুও চলে যায়। সবাই হাল ছেড়ে দিলেও ইফতেখার হাল ছাড়েনি এবং ব্যান্ডটিকে আবার পুনর্গঠন করেন নিজের তিন ভাইকে নিয়ে। ফিডব্যাকের মাকসুদ হক ভোকালিস্ট হিসেবে যোগ দেন এবং মিল্টন ড্রামসের দায়িত্ব নেন এবং নুতু ব্যান্ডে নতুন যোগ দেয় ভোকাল এবং গিটারে। ১৯৯৫ সালে ভোকালে যোগদান করে ইফতেখারের বন্ধু এবং রকস্ট্রাটার ভোকালিস্ট “মুশফিক”। তখন নতুন লাইন-আপ হয়, ভোকালে মুশফিক, গিটার/কিবোর্ড/ভোকালে ইফতেখার, গিটারে ইমতিয়াজ,  বেজ গিটারে এহতেসাম এবং ড্রামসে ইফতেখাব।

এই লাইন-আপ নিয়ে ওয়েভস তাদের প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম রেকর্ডের কাজে লেগে যায়। মাত্র চার ঘন্টার সেশনে তারা পুরো অ্যালবাম রেকর্ড করে ফেলে অডিও আর্ট স্টুডিওতে। অবশেষে সেই বছরই ওয়েভস তাদের প্রথম অ্যালবাম “পুরোনো স্মৃতি” বের করে।

তাদের প্রথম অ্যালবাম “পুরোনো স্মৃতি” তখনকার রক এবং মেটাল শ্রোতামহলে বেশ সাড়া পায়। বিশেষ করে মনিষা, ভোরে, স্মৃতি গানগুলোর জন্য।

অ্যালবাম বের করার পর ভোকাল থেকে মুশফিক বিদায় নিলে পুরো ব্যান্ড সেই “পুরোনো স্মৃতি” অ্যালবাম আবার রি-রেকর্ড করতে লেগে যায় এবং ১৯৯৬ সালে তারা তাদের ফাইনাল লাইনআপ নিয়ে শেষবারের মতো বিটিভিতে লাইভ পারফর্ম করে। সেখানে ফাইনাল লাইনআপটা ছিলো, গিটার/ভোকালে ইফতেখার, গিটারে ইমতিয়াজ, বেজ গিটারে এহতেসাম, ড্রামসে ইফতেখাব।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, ওয়েভসের শেষ কনসার্টটি হয় ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাইডহাউজে, এবং সেটাই ছিলো শ্রোতা এবং ভক্তদের ওয়েভসের শেষ দর্শন। এরপর থেকে ওয়েভসকে আর কখনো স্টেজে দেখা যায়নি।

ডিস্কোগ্রাফী:

  • পুরোনো স্মৃতি(১৯৯৫)

ওয়েভস এই একটিমাত্রই অ্যালবাম বের করেছে। ব্যান্ডের কাজগুলো দেখতে হলে নিচের লিংকে ক্লিক করে ওয়েভসের ফাউন্ডিং মেম্বার ইফতেখার শিকদারের ইউটিউব চ্যানেলে গেলেই তাদের সব কাজ (নিজেদের গান এবং কভার) পাওয়া যাবে।

ওয়েভস নিয়ন আলোয় neonaloy

“পুরনো স্মৃতি” অ্যালবামের ক্যাসেট কভার।

লাইন-আপঃ

ব্যান্ডের জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে অনেকেই ব্যান্ডের সাথে কাজ করে গিয়েছে বা সংযুক্ত হয়েছিলো। সেসব সব নিচে দেয়া হলো।

১৯৮১-১৯৮৩ঃ

ভোকাল/গিটার/বেজ ~ ইফতেখার
গিটার ~ মাহমুদ
ড্রামস ~ মিঠু

১৯৮৩-৮৪ঃ

ভোকাল/কিবোর্ড ~ কামাল
ভোকাল /বেজ ~ ইফতেখার
গিটার ~ মাহমুদ
ড্রামস ~ মিঠু
ভোকাল/কিবোর্ড ~ মিনু
সাউন্ড ~ শফিক

১৯৮৪-৮৫ঃ

ভোকাল/কিবোর্ড ~ কামাল
ভোকাল/বেজ ~ ইফতেখার
গিটার ~ মাহমুদ
ড্রামস ~ মিল্টন
ভোকাল/গিটার ~ নুতু
ভোকাল ~ মাকসুদ
শেষ লাইন-আপ,

১৯৯৫-৯৬ঃ

ব্যাক ভোকাল/বেজ ~ এহতেসাম
ভোকাল /গিটার ~ ইফতেখার
গিটার ~ ইমতিয়াজ
ড্রামস ~ ইফতেখাব
ভোকাল ~ মুশফিক

ফেসবুকের বিভিন্ন মিউজিক গ্রুপে অনেক ফ্যানই ওয়েভসকে নিয়ে অনেককিছু জানতে চেয়েছেন, সেসব থেকে বাছাইকৃত কিছু প্রশ্ন আমরা ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইফতেখার শিকদারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। নিচে সেগুলো দেয়া হলো।

ইফতেখার শিকদার ওয়েভস নিয়ন আলোয় neonaloy

ইফতেখার শিকদার

“বাংলা ভাষা” ও “হেভি মেটাল”, এই দুটির মধ্যে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করলেন? লিরিক্স লিখতে এবং সুর করতে গিয়ে কি কি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হয়েছিল?

ইফতেখার শিকদারঃ প্রথমত, ওয়েভসের আগে আরো ব্যান্ড ছিলো যারা ওয়েস্টার্ন মিউজিক এবং বাংলা ভাষা এক করায় অনেক বেশী সফল ছিলো তাই আমাদের কখনো মনে হয়নি যে ভাষা কোন বাধা হবে। কিন্তু এটা সত্যি যে বাংলা ভাষায় এমন কিছু শব্দ আছে যেসব গান আকারে গাইতে গেলে ডেনটিস্টের কাছে যাওয়া লাগতে পারে।

যেমন, একটা গান লিখো যার নাম “You be my Typewriter”,  যেটা খুব সুন্দরভাবে যাবে কিছু কর্ড এবং ড্রাম বিটের সাথে যেই জনরাতেই তুমি গাও না। এখন এটা বাংলায় অনুবাদ করো এবং গাইতে চেষ্টা করো। বুঝেছো কি বলতে চাচ্ছি? তোমার শ্রুতিমধুর এবং অর্থবহ বাংলা নিয়ে ধারণা থাকতে হবে। কিন্তু রবিঠাকুরের সময়ের গুরুগম্ভীর শব্দও যাতে ব্যবহার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আমরা কিছু ভালো বাংলা মেটাল করেছি যা শ্রোতাসমাজে অনেক সাড়া পেয়েছিলো এবং শ্রোতাসমাজ পছন্দ করেছে। সেই সময় কোন মিউজিক প্রডিউসার আমাদের ‘শব্দদূষণ’ মার্কা (তাদের মতে) অ্যালবাম বের করবে না তাই আমরা ১৯৯৫ এর আগে কোন অ্যালবাম করতে পারিনি।

শুধুমাত্র মিউজিক করার উদ্দেশ্য জার্মানির  থেকে বাংলাদেশে কেন আসলেন? বাংলাদেশের চেয়ে তো সেখানে “হেভী মেটাল” মিউজিক করা সহজ ছিলো, তবুও কেন এই দেশে আসা?

ইফতেখার শিকদার: জার্মানিতে হেভী মেটাল মিউজিক করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ ছিলো কিন্তু বাংলাতে তো সম্ভব ছিল না। শুরুতে আমাদের মাথাতেও ছিলো না যে বাংলা মেটাল করবো। আমরা জার্মান মিউজিসিয়ানদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম যারা ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট এবং খ্যাতিকে একপাশে সরিয়ে জার্মান ভাষায় মিউজিক করতো। হ্যাঁ, স্কোরপিয়ন, ক্রোকাস, এম-এস-জি, ইউ-এফ-ও ব্যান্ডগুলো ছিলো কিন্তু সেগুলো মোট জার্মান ব্যান্ডের সংখ্যার তুলনায় অতি নগণ্য পরিমাণের ছিলো। তাই আমরা ভাবলাম নিজেদের দেশে গিয়ে আমাদের নিজেদের কিছু করার চেষ্টা করলে কেমন হয়? এবং আমরা করেছিলামও। হয়তো আমাদের বড় কোন হিট, জনপ্রিয় কোন গান, অনেক বেশী ভিউয়ার বা ভক্ত নেই। কিন্তু এটা সত্য যে আমরা মিউজিসিয়ানদের মিউজিসিয়ান ছিলাম। আমরা হিউজ মিক্সিং কন্সোল, পিএ সিস্টেম, মার্শাল এবং আরো অনেক কিছুর সাথে ঢাকার পরিচয় করিয়ে দিয়েছি যেসব এখনকার ব্যান্ডগুলো ব্যবহার করছে। ভেন্যুর মাঝখানে সাউন্ড মিক্স করার জন্য কোন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলো না ওয়েভসের আগে। আমাদের আগে কেউ স্টেজ মনিটর ব্যবহার করেনি। ব্র্যাগ করছি না, কিন্তু ফ্যাক্টস তো ফ্যাক্টসই এবং ভালোভাবেই বলা উচিৎ।

হেভি মেটাল মিউজিকে আসার পেছনে কারা বা কোন ব্যান্ড অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে?

ইফতেখার শিকদার: আমাদের মিউজিক করার পিছনে অনেক ব্যান্ডই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, রক মিউজিক এবং বিশেষ করে হেভী মেটাল মিউজিক। আমরা সেই দিনগুলোতে লাইভ কনসার্ট দেখতে যেতাম। “ভ্যান হেলেন” থেকে শুরু করে “কিস”, “এসি/ডিসি” থেকে “মোটরহেড” এবং সেখানের থেকে “ব্ল্যাক স্যাবাথ”। আমরা “ক্ল্যাপটন”, “গ্রেটফুল ডেড”, “জি জি টপ” এর শোতেও যেতাম। তাই এটা আসলে অনেক কঠিন কাজ যদি একটি ব্যান্ডের নাম নিতে বলা হয় আমাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কিন্তু আমাদের মেজর ইম্প্যাক্ট ছিলো “ব্ল্যাক স্যাবাথ”। স্যাবাথ বাজানোর পর আমরা, বিশেষ করে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা মেটাল মিউজিক করবো। আমি ৮০’র দশকেই একজন স্যাবাথ পাগল ছিলাম এবং এখনও আছি।

এই দেশে হেভী মেটাল মিউজিক করার সময় কি কি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

ইফতেখার শিকদার: বাধাবিপত্তি কিংবা ষড়যন্ত্র যাই বলো না কেন, এদের পিছনের মানুষগুলো সবই কাপুরুষ। এই কাপুরুষরা লম্বা চুল বা আউটফিট পছন্দ করেনি। তারা একটা মেয়ের জিন্স পরা, গিটার বাজানো বা কিবোর্ড বাজাতে বাজাতে ওয়েস্টার্ন গান গাওয়া পছন্দ করেনি। তারা পুরানো রীতিতে বড় হয়েছে এবং তারা তাদের বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ রকারদের উপর ছেড়ে দিতে ভরসা পায়নি। আমরা ঢাকার সব ভেন্যুতে কেবল একবার বাজিয়েছি এবং দ্বিতীয়বার বাজানোর সুযোগ পায়নি। শিল্পকলা অডিটোরিয়াম আমাদের প্রথম স্টেজ শো ছিলো। তারা আমাদের সিকিউরিটি মানি ফেরত দেয়নি পরে। আমরা সেকেন্ড শো’র জন্য পেমেন্ট করি এবং পরেরদিনই আমাদের শো বাদ হয় এবং টাকা ফেরত পাইনি। ঢাকার তথাকথিত মিউজিক প্রডিউসাররা আমাদের অ্যালবাম বের করেনি যা পুরোটা আমাদের নিজেদের স্টুডিওতে আমরা রেকর্ড করি। বিটিভি আমাদের গানগুলো ঈদের জন্য রেকর্ড করে কিন্তু প্রচার করেনি। আমার চুল ছোট করে কাটতে বলে, মিনুকে (ভোকালিস্ট) শোভনীয় জামাকাপড় পড়ে এসে পুনরায় পুরো শো রেকর্ড করতে বলা হয়েছিলো। আমরা তাদের কথায় পাত্তা দেইনি এবং জনপ্রিয় হওয়ার জন্যও মাথা ঘামাইনি।

বাংলা মেটাল সম্পর্কে জানতে চাই। বাংলা গান ভক্তরা এটাকে কি ভাবে এবং কতটুকু গ্রহণ করেছিলো ঐ সময়? সেটার সম্পর্কে জানতে চাই।

ইফতেখার শিকদার: সত্য বলতে গেলে, আমাদের ফ্যানবেজ সীমিত ছিলো কিন্তু তারা জানতো আমরা কি করছিলাম। যেহেতু আমাদের কোন অ্যালবাম ছিলো না, আমাদের লাইভ শোগুলোতে আমাদের মিউজিকও সীমিত ছিলো। এসব ইউটিউব, ফেসবুকের অনেক আগের যুগের কথা। তারা আমাদের রিহার্সাল দেখতেও আসত এবং আমরা সুপারস্টার ছিলাম না। আমাদের নিজেদের একটা প্র্যাকটিস রুম ছিলো এবং একটা পূর্ণ রেকর্ডিং স্টুডিও। যেই “হাই-হ্যালো” বলতে আসতো, আমরা তাকে ভিতরে আসতে দিতাম আমাদের প্র্যাকটিস রুম দেখতে এবং আমাদের সাথে কথা বলতে। আমাদের লিজেন্ড ভাবসাব কিছু ছিলো না। কে আসেনি আমাদের গিয়ার দেখতে? মাইলসের থেকে ফিডব্যাক, আজাদ রহমান, শাহিদুল ইসলাম, আবু হেনা, নাসিম আলী, জেমস। এমন একজনের নামও বলতে পারবে না যে তখন ব্যান্ড মিউজিক করতো এবং আমাদের গিটার ছোঁয়নি বা ড্রামসে বিট বাজায়নি।

মাকসুদ ভাইও নাকি এই ব্যান্ডে ছিলেন। তখন উনার অবদান কি ছিলো?

ইফতেখার শিকদার: মাকসুদের সাথে আমার পরিচয় হয় বিটিভিতে আমাদের গান রেকর্ড করার সময়, তখন সে ফিডব্যাকের সাথে ছিলো। আমরা কিছুক্ষন কথা বলেছিলাম। সে অনেক বন্ধুসুলভ ছিলো, যাকে বলে ‘পিপলস পার্সন’। এরপর আমার মনে আছে আমি একদিন রোলার স্কেটিং করছিলাম এবং সে এসে জিজ্ঞেস করলো ‘দোস্তো কি খবর?’। আমি তাকে আমাদের স্টুডিওতে নিয়ে এলাম এবং এভাবেই শুরু হল। সে প্রায়ই তার স্ত্রী এবং তার বোনের সাথে নিয়ে আসতো। আমরা যখন প্র্যাকটিস করতাম, সে জিজ্ঞেস করতো “দোস্তো, তুমি কি এই গানটা বাজাতে পারো?”।  আমরা বলতাম, ‘চলো, ট্রাই করে দেখি। তুমি কি সেই গানের কর্ডস জানো?’  “হ্যাঁ, আমার কাছে টেপ আছে” বলে টেপ বের করতো। তখন আমরা গানটি শুনতাম এবং কর্ডসগুলো বুঝতাম, তারপর ও (মাকসুদ) গাইতে শুরু করতো।

এভাবেই মাকসুদ ওয়েভসের সাথে জড়িয়ে পড়ে, ফিডব্যাক ছেড়ে আমাদের সাথে যোগ দেয়। সে একজন অসাধারণ লিরিক্স লেখক, গায়ক, পারফর্মার ছিলো কিন্তু মেটাল ধাঁচের ছিলো না। আমরা একসাথে “চিঠি” এবং “মাঝি” গান দুটো লিখেছি  এবং আমাদের কনসার্টে পারফর্ম করেছি। দুর্ভাগ্যবশত, সেগুলো রেকর্ডিং করা নেই আমাদের এবং পরে সেগুলো ফিডব্যাকের গান হিসেবে বের হয়ে আসে।

প্রচুর সম্ভাবনা ও অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও তারা ১টা এলবাম করে হারিয়ে গেলো কেন এই প্রশ্নটা রাখলাম।

ইফতেখার শিকদার: একদম সহজকথায়, “হতাশা”।

মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নোংরা রাজনীতি যার সাথে আমরা বোঝাপড়ার জন্য  অভ্যস্ত ছিলাম না। তুমি যদি একজন মিউজিসিয়ান হও, যার একটা ব্যান্ড আছে এবং যা আছে তার সব যদি সেই জিনিসটার পিছনে বিলিয়ে দাও কিন্তু কেউ তোমাকে ভেন্যু ভাড়া না দেয়, কোন গান সম্প্রচার না করে, কেউ তোমার মিউজিক বের না করে সেটাকে “নয়েজ” বলে আখ্যায়িত করে, তাহলে তুমি কি করবে? বাকিজীবনের জন্য তোমার নিজের ঘরে বসে বাজানো ছাড়া উপায় থাকে না। তাই সেটা এখানে ইউএসে করাই ভালো, কিছু বুদ্ধিজীবীরূপি বোকার দেশে করার চেয়ে।

সবশেষে এ কথা বলাই যায় যে, ওয়েভস যেভাবে প্রথম বাংলাদেশে হেভী মেটাল বা বাংলা মেটালের আবির্ভাব ঘটিয়েছে, সেভাবেই তারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে অনেক ব্যান্ডের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাদের মিউজিক একদম শুরুর থেকেই অন্যরকম ছিলো এবং তারা সবসময় নিজেদের সময়ের চেয়ে বেশ এগিয়ে ছিলো। তাদের লাইভ পারফর্মেন্স এবং একটিমাত্র অ্যালবামের কাজ দেখলেই সেটি টের পাওয়া যায়। হয়তো একসময় তাদের পথচলা থেমে গিয়েছে কিন্তু সেখানের থেকে আরো অনেকের পথচলার শুরুটা ধরিয়ে দিয়েছে ওয়েভস। তাদের অ্যালবামের কাজগুলো এবং তাদের পথচলার গল্পগুলোই সামনের দিনের তরুণদের অনুপ্রেরনা হবে এবং ওয়েভস শ্রোতাসমাজের হৃদয়ে সারাজীবন বেচে থাকবে এটাই আমরা মিউজিক ফ্যান হিসেবে করি কামনা।

তথ্যসুত্রঃ

ওয়েভস ব্যান্ডের ফেসবুক পেইজ

[এই ফিচারটির জন্য রাসেল চৌধুরী ভাইয়ের কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞতা]

Most Popular

To Top