ইতিহাস

বিখ্যাত মানুষদের অদ্ভুত যত স্বপ্ন সত্যি হয়ে গিয়েছিল!

স্বপ্ন নিয়ন আলোয় neonaloy

সজ্ঞানে হোক আর অজ্ঞানে হোক, ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখা মানুষ হিসাবে একরকম নৈতিক দায়িত্ব আমাদের। প্রায়ই স্বপ্ন দেখি আমরা, তার হয়তো বেশির ভাগই ভুলে যাই। বিজ্ঞানীদের মতে, স্বপ্ন দেখার ৫ মিনিটের মাথায় মানুষ স্বপ্নের ৮০% ভুলে যায়, পরবর্তীতে সে তার দেখা স্বপ্নের সর্বোচ্চ ২০% বর্ণনা করতে পারে।

আচ্ছা, আমরা তো অনেক স্বপ্ন দেখি কিন্তু কখনও কি তা সত্যি হয় কিংবা স্বপ্ন থেকেই কি জন্ম নিতে পারে সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কোন উদ্ভাবন? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের অবচেতন মনে অনেক সময়ই সঞ্চিত থাকে ভবিষ্যৎ স্মৃতি, এবং তা প্রতীকী বেশে স্বপ্ন হয়ে দেখা দিতেই পারে। কাজেই স্বপ্ন যদি সুদূর ভবিষ্যতের কোন দৃশ্যপট আপনার চোখের সামনে তুলে ধরে কিংবা, সমাধান করে দেয় কোন অজানা রহস্যের তাহলে অবাক হওয়ার কোন অবকাশ নেই। এমন রহস্যময় কিছু স্বপ্ন নিয়েই আজকের লেখা।

১) আব্রাহাম লিঙ্কনের মৃত্যু

মৃত্যুর ঠিক দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন, হোয়াইট হাউজে একটি কফিনকে ঘিরে বহু মানুষ একত্র হয়েছে। তিনি ভিতরে প্রবেশ করে একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন কার মৃতদেহ এখানে? সেই ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, আমাদের প্রেসিডেন্টের মৃতদেহ। সামনে এগিয়ে উঁকি দিলেন আব্রাহাম। চমকে উঠলেন মৃতদেহের মুখ দেখে। কারণ কফিনে শুয়ে থাকা মানুষটা আর কেউ নয়, স্বয়ং আব্রাহাম লিঙ্কনই।

অদ্ভূত স্বপ্ন নিয়ন আলোয় neonaloy

আব্রাহাম লিঙ্কনের অন্তিম স্বপ্ন

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা স্ত্রীকে বলেন তিনি। এই স্বপ্নের দুই সপ্তাহ পরেই ১৪ই এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টায় ফোর্ড থিয়েটারে জন উইলকস বুথ নামে এক বন্দুকধারীর গুলিতে তিনি আহত হন এবং পরদিন সকালে মৃত্যুবরণ করেন।

২) মার্ক টোয়েনের ভাইয়ের মৃত্যু

জীবনের একটা সময়ে মিসিসিপি নদীতে চালিত নৌকায় কাজ করতেন বিখ্যাত মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েন এবং তার ভাই হেনরি টোয়েন। এক রাতে মার্ক স্বপ্নে দেখলেন, তার বোনের বাড়িতে হেনরির মৃতদেহ একটি ধাতব কফিনে শোয়ানো। পুরো কফিন সাদা ফুল দিয়ে সাজানো। এই স্বপ্ন দেখার এক সপ্তাহ পরেই এক মোটর বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় হেনরির। মৃত ভাইকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে চমকে উঠলেন মার্ক।

অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ন আলোয় neonaloy

মার্ক টোয়েন

স্বপ্নে যেভাবে দেখেছিলেন ঠিক ওভাবেই ধাতব কফিনে সাদা ফুল দিয়ে সজ্জিত হেনরির কফিন। পরে দুর্ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানতে পারেন দুর্ঘটনায় হেনরির মৃতদেহের এমন শোচনীয় অবস্থা হয় যে বাকি মৃতদেহ কাঠের কফিনে রাখা হলেও হেনরির মৃতদেহ ধাতব কফিনে রাখা বাদে উপায় ছিল না।

৩) বেনজিন রিং আবিষ্কার

জার্মানির প্রখ্যাত রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ ক্যাকুল বেশ কয়েক বছর যাবত কাজ করছিলেন কার্বনের গঠন এবং কাঠামো নিয়ে, কিন্তু কোনভাবেই সঠিক ফলাফলে আসতে পারছিলেন না। এক রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলেন, একটা সাপ বার বার নিজের লেজটা গিলে ফেলার চেষ্টা করছে। ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ এই অদ্ভুত সাপ নিয়ে ভাবলেন ফ্রেডরিখ। ব্যাস, এই সাপের কথা চিন্তা করতে করতেই মাথায় আসলো বেনজিন চক্রের কথা। আবিষ্কার হল বেনজিনের গঠন, উন্মোচন হল জৈব রসায়নের মত রসায়নের বিরাট এক শাখার।

অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ন আলোয় neonaloy

স্নেক রিং ও ফ্রেডরিখ ক্যাকুল

৪) জুলিয়াস সিজারের মৃত্যু

৪৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের প্রখ্যাত সেনাপতি, ঐতিহাসিক ও রাজনিতীবিদ জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে তার স্ত্রী কালপুর্নিয়া স্বপ্নে দেখেন যে, সিনেটের ভিতরে এসে এক গুপ্তঘাতক তার স্বামীকে হত্যা করছে। ভীত কালপুর্নিয়া তার স্বামী সিজারকে এই স্বপ্নের কথা বলে সিনেটে না যেতে অনুরোধ করেন।

অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ন আলোয় neonaloy

জুলিয়াস সিজারের মৃত্যু

সিজার এই স্বপ্নের কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দেন এবং কালপুর্নিয়ার অনুরোধ না রেখে সিনেটের দিকে রওনা দেন। বিধি বাম, সিনেটেই ঘাতকের ছুরিকাঘাতে মৃত্যুবরণ করেন সিজার।

৫) টোয়াইলাইটের সৃষ্টি

সময়টা ২০০৩ সালের জুনের মাঝামাঝি। লেখক স্টেফেনী মায়ার অনেক দিন ধরেই নতুন কিছু লেখার চেষ্টা করছেন। তেমন কোন মানানসই প্লটই খুঁজে পাচ্ছেন না উপন্যাসের জন্য। একরাতে অদ্ভুত এক প্রেমের স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলেন। স্বপ্নে দেখলেন, এক তরুণ আরেক তরুণীর সাথে সবুজ মাঠের ভিতর শুয়ে আছে এবং তাদের ভালবাসা যে কখনই সফল হবে না তা নিয়ে আলোচনা করছে দুজন। জেগে ওঠার পরই ভাবতে বসলেন এই তরুণ-তরুণীকে নিয়ে। স্টেফেনী মায়ার তার ব্যক্তিগত ব্লগে লিখলেন, ‘খুব সাধাসিধে সুন্দর একটি মেয়ে এমন একটি ছেলেকে ভালবেসে ফেলেছে যার সাথে তার কোনদিনই মিল হবে না কারণ ছেলেটি সাধারণ কোন মানুষ না। সে ছিল “ভ্যাম্পায়ার” অর্থাৎ মানুষের রক্তখাদক। সে মেয়েটির রক্তের ঘ্রাণ পেয়েও তাকে হত্যা করতে পারছিল না কারণ সে মেয়েটিকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিল”।

অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ন আলোয় neonaloy

টোয়াইলাইট

ব্যাস, স্বপ্নে দেখা এই ঘটনা নিয়েই তিনি লেখা শুরু করেন এক অন্যরকম প্রেমের উপন্যাস। পরবর্তীতে এই লেখাটিই নিউ ইয়র্ক টাইমসে’র নাম্বার ওয়ান বেস্ট সেলার নির্বাচিত হয়। সারা পৃথিবীতে বিক্রি হয় ১৭ মিলিয়নের অধিক কপি এবং ৯১ সপ্তাহ ধরে বেস্ট সেলারের এক নম্বরে থাকে উপন্যাসটি।

মানব মস্তিষ্কের ছলনা বড়ই জটিল। আমাদের অজান্তেই নানান হিসাব কিতাব মাথার ভেতর হয়ে বসে থাকে। চেতনার লাইম লাইট পড়ার অপেক্ষা থাকে শুধু। ঘুমের দেশেও যে আসলে আমাদের চেতনা আর বাস্তব জীবন আমাদের চিন্তার পালের রাখাল হয়ে থাকে তার প্রমাণই হয়তো উপরের ঘটনা গুলো। স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা প্রত্যেক মানুষের আছে। কি দেখবে তার অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের পারিপার্শ্বিকতার উপর। তবে অনস্বীকার্য ব্যাপারটি হচ্ছে সভ্যতার অনেক কর্মই জ্ঞানী জনের স্বপ্ন প্রসূত। স্বপ্ন দেখার এই নির্মল একাকীত্বটুকু তাই উপভোগ করুন আর যদি সম্ভব হয় তবে স্বপ্নটুকুর অংশ করুন আপনজনদের।

আরো পড়ুনঃ ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরে কেন?

Most Popular

To Top