টেক

মাইকেল ফ্যারাডে- সত্যিকারের ম্যাগনিটো

মাইকেল ফ্যারাডে নিয়ন আলোয় neon aloy

এক্স-মেন সিনেমার ম্যাগনিটোকে তো আমরা কম-বেশি সবাই চিনি। এক জীবন্ত চুম্বক, মহাবিশ্বের সব চৌম্বকক্ষেত্র যার কথায় উঠে বসে। আজ কিন্তু আমাদের মানবসভ্যতাও এক ম্যাগনিটোতে পরিণত হয়েছে। চৌম্বকক্ষেত্রকে ব্যবহার করে আজ কী-ই না করছি আমরা। কানের মাঝে গান শুনছি হেডফোনে তাতেও চুম্বক, তথ্যের পর তথ্য জমছে কম্পিউটারের মেমোরিতে তাতেও চুম্বক; আর যে হ্যাড্রন কলাইডারকে ব্যবহার করে আমরা ঈশ্বর কণার অস্তিত্ব জেনেছি, তাও কিন্তু বিশাল একটা চুম্বকই বটে। আমাদের এই ম্যাগনিটো হবার পথ বাতলে দিয়েছিলেন যিনি তাঁকেও এখন বিজ্ঞানী মহলে ম্যাগনিটো নামেই স্মরণ করা হয়।

নাম তাঁর মাইকেল ফ্যারাডে। বলা হয়, ইতিহাসের সেরা এক্সপেরিমেন্টাল সায়েন্টিস্ট নাকি তিনি-ই। জন্ম ১৭৯১ এর ২২শে সেপ্টেম্বরে, ইংল্যান্ডের একটি ছোট্ট গ্রাম নিউইংটন বাটে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন কামার। আর ফ্যারাডে যখন আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলেন, তাঁর বাবা তাঁকে লাগিয়ে দিলেন বই বাঁধাইয়ের কাজে।

এই ছোট্ট ব্যাপারটি-ই ছিল মানবসভ্যতার জন্য অন্যতম বড় একটি আশীর্বাদ। কারণ শুধুমাত্র বই বাঁধাই ব্যবসায় থাকার জন্যই প্রতিদিন অনেক অনেক বই আসতো ফ্যারাডে’র হাতে। সেগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে-ই বিজ্ঞানের মোহ পেয়ে বসলো তাঁকে। সেসময়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের লেকচারগুলোতে তিনি যাওয়া শুরু করলেন।

মাইকেল ফ্যারাডে নিয়ন আলোয় neon aloy

সেইসব বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যেই একজন ছিলেন রসায়নবিদ হামফ্রি ডেভি। পটাসিয়াম আর সোডিয়ামকে পৃথকভাবে চেনানোর জন্য আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় তাঁকে। ফ্যারাডে তাঁর লেকচারে অংশ নিয়ে নোট লিখতে লিখতে ৩০০ পৃষ্ঠার একটি নোট তৈরি করে ফেললেন শুধু ডেভি’র লেকচারের উপরই! ফ্যারাডে তাঁর নোটগুলো পাঠিয়ে দিলেন ডেভিকে। ডেভি তো নোট দেখে যারপরনাই মুগ্ধ! তিনি ফ্যারাডে’র জন্য একটি বড়সড় চাকরির ব্যবস্থা করে ফেললেন। ফ্যারাডে হয়ে গেলেন রয়েল সোসাইটিতে ডেভি’র কেমিক্যাল অ্যাসিস্টেন্ট। বিখ্যাত রসায়নবিদ হামফ্রি ডেভি। তাঁর সহকারী হয়েই জীবন বদলে যায় মাইকেল ফ্যারাডের।

“রয়েল সোসাইটি” ছিল তখনকার বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে শুরু করে মতবিনিময় সবকিছুর শুরু হতো সেখানেই। সোজা কথায় বললে, সেটা ছিল অভিজাতদের জায়গা। একজন কামারের ছেলে সেখানে অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে ঢুকে পড়বে, ব্যাপারটা কিছুটা অস্বাভাবিকই ছিল সেসময়ের জন্য। আর এই অস্বাভাবিক বিষয়টিই ফ্যারাডের জন্য খুলে দেয় নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার। অনেক নতুন নতুন ল্যাব সরঞ্জাম কিংবা কেমিক্যাল নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান তখন ফ্যারাডে।

মাইকেল ফ্যারাডে নিয়ন আলোয় neon aloy

তরুণ বয়সে মাইকেল ফ্যারাডে

ফ্যারাডে শুধু তাঁর পরীক্ষার নতুনত্ব দিয়েই রসায়নের বাঘা বাঘা সূত্র বের করে ফেলেন, যেসব সূত্র আজ মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে পাঠ্য আমাদের জন্য- ফ্যারাডে’র তড়িৎ বিশ্লেষণের সূত্র হিসেবে আমরা চিনি সেগুলোকে। যেই বেনজিনের নাম আমরা জৈব রসায়নে এত শুনি তার প্রথম শনাক্তকরণ এবং পৃথকীকরণের কৃতিত্বটাও তাঁর-ই।

তবে এরকম সফল রসায়নবিদ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সবচেয়ে বড় অবদানটি বোধহয় পদার্থবিজ্ঞানে। তড়িতচৌম্বকত্ব নিয়ে তাঁর করা কাজ আমাদের গোটা মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস করা যে কোনো শিক্ষার্থীই বোধহয় ফ্যারাডের সূত্রের নাম শুনে থাকবে। তড়িৎ আর চৌম্বকত্বকে বুঝতে গেলে এই সূত্রটি একজন শিক্ষানবিসকে অবশ্যই জানতে হবে। শুধু একটি তারের কুন্ডলীর চারপাশের পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র রাখলেই যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায় এই সূত্রটির আমাদেরকে জানায় সেটা। ফ্যারাডে শুধু তাঁর রয়েল সোসাইটির ল্যাবে বসে ম্যাগনেট নিয়ে নাড়াচাড়া করেই এই সূত্রটি বের করে ফেলেছিলেন। আজ এই সূত্রই জন্ম দিয়েছে বৈদ্যুতিক মটর, জেনারেটর এবং আরো অনেক প্রযুক্তি যেগুলো সার্কিট বা পাওয়ার গ্রিডে ব্যবহার হচ্ছে নিত্যদিন।

পারতপক্ষে তাঁর সেসময়ের ধারণাগুলোই আজকের আধুনিক প্রযুক্তির মূল ভিত্তি এবং এ সবকিছুরই তিনি জন্ম দিয়েছেন শুধুমাত্র ল্যাবে বসে নানান জিনিসপত্র নিয়ে পরীক্ষা করার মাধ্যমে। অবাক করা বিষয় হলো, তাঁর এসব পরীক্ষার জন্য বেশিরভাগ সরঞ্জাম তিনি নিজেই ল্যাবে বসে তৈরি করেছিলেন!

মাইকেল ফ্যারাডে নিয়ন আলোয় neon aloy

তড়িৎচৌম্বক

এসব ছাড়াও আধুনিক বিজ্ঞানের আরো অনেককিছুর জন্যই আমরা ফ্যারাডে’র কাছে ঋণী। কত কত তড়িৎচৌম্বক প্রযুক্তির যে ফ্যারাডের নামে নাম! ফ্যারাডে ডিস্ক- এক মেটাল ডিস্ককে ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার প্রযুক্তি, কিংবা ফ্যারাডে কেজ বা ফ্যারাডের খাঁচা- কোনো কিছুকে তড়িতচৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার এক অভিনব পদ্ধতি, সবই ফ্যারাডে চুম্বক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ফেলেছেন। যেমন একবার একটি সম্পূর্ন কক্ষ ধাতব ফয়েল দিয়ে মুড়িয়ে ফেলে তিনি দেখলেন তাঁর ভিতরে কোনো তড়িতচৌম্বক ক্ষেত্র কাজ করছে না। তখন তিনি বুঝলেন বদ্ধ খোলে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্র আসলে বাহকের মাঝেই ছড়িয়ে যায়, ভেতরে কোনো প্রভাব ফেলে না। সেই পরীক্ষাতেই আসলে ফ্যারাডের খাঁচাটা আবিষ্কৃত হয়ে গেল যেটা এখন অনেক সংবেদনশীল প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

মাইকেল ফ্যারাডে নিয়ন আলোয় neon aloy

ফ্যারাডে ডিস্ক

ফ্যারাডে’র আবিষ্কৃত সূত্রগুলোকেই পরে আরেক প্রতিথযশা বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক রূপ দেন এবং সেখানেই প্রকৃতপক্ষে আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা। ১৮৪০ এর দশক পর্যন্ত ফ্যারাডে তাঁর এসব পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরপরই তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে এবং ১৮৬৭ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মাইকেল ফ্যারাডে নিয়ন আলোয় neon aloy

ফ্যারাডের খাঁচা

শুধুমাত্র নিজের অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে চুম্বক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে একের পর এক নতুন চেষ্টার মাধ্যমে ফ্যারাডে সম্পূর্ণ মানবসভ্যতার মোর ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আজ যখন প্রযুক্তির প্রত্যেকটা অভিনব আবিষ্কারকে ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, একটু কৃতজ্ঞতার অনুভূতি আসে, সেই কৃতজ্ঞতার কিছুটার দাবি মাইকেল ফ্যারাডেও রাখেন। মিউট্যান্ট হয়ত মানবসভ্যতা দেখেনি, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের এক কামারের ছেলের মাঝেই মানবসভ্যতা পেয়েছে সত্যিকারে ম্যাগনিটো, সেটাই বা কম কি!

আরো পড়ুনঃ
টমাস আলভা এডিসনঃ বধিরতা যার জন্য ছিল আশীর্বাদ…
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি – সময়ের আগে জন্ম নেওয়া এক স্বপ্নদ্রষ্টা

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top