বিশেষ

ফাস্টফুড দেখলেই যে জিভে পানি চলে আসে- এর দোষ কিন্তু পুরোপুরি আপনার না!

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

ফাস্টফুড আমরা কমবেশি সবাই পছন্দ করি। স্বাস্থ্যকর না হলেও স্বাদের দিক ফাস্টফুড অনেকের কাছেই অনন্য। আর এখনকার সময়ে তো রেস্তোরাঁয় গিয়ে একগাদা ফাস্টফুড খাওয়া মোটামুটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে ছাত্ররা এখন প্রচুর পরিমাণে ফাস্টফুড খাচ্ছে, তাই এর ব্যবসাও এখন তুঙ্গে। কিন্তু কেন ফাস্টফুডের প্রতি মানুষের এই অদম্য আকর্ষণ? এর পেছনে কি কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে? হ্যাঁ, আছে। ফাস্টফুডের প্রতি মানুষের এইরকম লক্ষণীয় আকর্ষণের কারণ খুঁজতে অনেক দিন ধরেই গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

ইদানীং “ভাল খাবার” এর সংজ্ঞাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ফাস্টফুড

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হচ্ছে, এই আকর্ষণের কারণ হচ্ছে ফাস্টফুডগুলোতে একই সাথে চর্বি এবং শর্করার উপস্থিতি। গবেষকরা দেখেছেন আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টার বা স্ট্রিয়াটাম সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল হয় যখন এ দু’টো পুষ্টি উপাদান একইসাথে বেশি পরিমাণে থাকে। অর্থাৎ প্রচুর চর্বিযুক্ত খাবার দিন, আমাদের মস্তিষ্ক তাতে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, শর্করাযুক্ত খাবার দিন, যেমন শুধু ভাত রুটি- এতেও মস্তিষ্কে তেমন প্রতিক্রিয়া হবে না।

কিন্তু শর্করা এবং চর্বিজাতীয়- এই দু’টোকে একই সাথে দিলেই মস্তিষ্কে সুখানুভূতি তৈরি শুরু হয়ে যাবে। এ কারণেই শুধু পাউরুটি বা শুধু মাখনের তুলনায় মাখন- পাউরুটি আমাদের কাছে এতটা সুস্বাদু, বিস্কুটের তুলনায় ক্রিম বিস্কুটের প্রতি শিশুদের এত বেশি আকর্ষণ, আর নিহারী পরোটার কথা ভাবলেই আমাদের জিভে জল এসে একাকার। এরকম উদাহরণ আসলে অগণিত। বর্তমানে ফাস্টফুড তৈরিতে এ ফর্মুলাটি বেশ ঢালাওভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে- বার্গার, সাব স্যান্ডউইচ বা নাচোস, সবখানেই শর্করা আর চর্বির জয়-জয়কার। এটা অনেকটা আমাদের মস্তিষ্ককে হ্যাক করার মতোই।

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

খুব কম মানুষই আছেন যাদের জিভে পানি আসবে না এই পিতজাটি দেখে

তবে এই ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের নজরে একদম নতুন পড়েনি। অনেক আগেই বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের মাঝে এ ব্যাপারটি দেখতে পেয়েছিলেন। শুধু শর্করা বা চর্বিজাতীয় খাবার পেলে ইঁদুররা যত খায়, চর্বি-শর্করার মিশ্রণের খাবার পেলে খায় তার ঢের কয়েকগুণ বেশি। তবে মস্তিষ্কে ব্যাপারটি কীভাবে ঘটতো, আমাদের মানুষের মাঝেও এই প্রক্রিয়াটি আছে কীনা, সেসব ব্যাপারে তেমন কিছু আমরা জানতাম না।

আর এটি ভালভাবে বুঝতেই জার্মানী আর আমেরিকার কয়েকজন স্নায়ু এবং শারীরবিজ্ঞানী ছোটখাটো একটি খাবারের মেলার আয়োজন করে শুধুমাত্র এই ব্যাপারটির একটা হ্যাস্তন্যাস্ত করার উদ্দেশ্যে। মেলা বলতে আয়োজনটা হয়েছিল অনেকটা নিলামের মত, যেখানে অংশপ্রহণকারীরা বিভিন্ন খাবারের জন্য বিড করবে এবং সেসময় তাদের মস্তিষ্কে চলা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এফএমআরআই-এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। উল্লেখ্য যে সেখানকার প্রত্যেকটা খাবারের ক্যালরি ছিল সমান, তবে কিছু খাবারের ক্যালরি তৈরি ছিল শর্করা দিয়ে, কিছু চর্বি দিয়ে, আর কিছু দু’টোর মিশ্রণে। ক্যালরি এভাবে সমান রাখা হয়েছিল যেন শক্তির দিক থেকে প্রতিটি খাবারের প্রতি ক্রেতাদের চাহিদা প্রায় একই থাকে। এছাড়া গবেষকরা এটাও নিশ্চিত করেছিলেন যে প্রতিটা খাবারই ভোক্তাদের কাছে প্রায় সমান জনপ্রিয় এবং পছন্দনীয় থাকে, আর এটা করতে তারা এই মেলার আগে আরেকটি পরীক্ষারও আয়োজন করেছিলেন।

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

আপনি কোনটি বেছে নিবেন উপরের দুটি খাবারের মাঝে?

তারপর নিলাম শুরু করার পর দেখা গেল, সবগুলো মিশ্র খাবারই বেশি দাম পাচ্ছে, একটুও ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বাদাম, পনির বা বিস্কুটের তুলনায় চকোলেট চিপ কুকিজ কিংবা ক্যান্ডি বার দেখে মানুষ অনেক বেশি উত্তেজিত হচ্ছে। আর এই প্রতিক্রিয়াগুলো করার সময় মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড রিজিয়ন, অর্থাৎ পুরষ্কার প্রাপ্তির ফলে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে মস্তিষ্কের যে অংশ- সেটা অনেক বেশি ক্রিয়াশীল হচ্ছে। সেখান থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, আমাদের মস্তিষ্কের শর্করা আর চর্বির জন্য রিওয়ার্ড রিজিয়ন ক্রিয়াশীল হবার প্রক্রিয়া বোধহয় আলাদা, তাই মিশ্র খাবার দেখলে দু’টো প্রক্রিয়াই ক্রিয়াশীল হয়, আমরা অনেক বেশি উত্তেজনা অনুভব করি।একই সাথে দুটো রিওয়ার্ড সার্কিট এভাবে ক্রিয়াশীল হলে সেটা আমাদের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনা। এই ব্যাপারটি কেন হয় তা বুঝতে আমাদের তাকাতে হবে আমাদের পূর্বপুরুষদের দিকে।

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

আপনার বার্গারপ্রীতির দোষ পুরোপুরি আপনার নয়!

ইতিহাসের শুরুতে মানুষের খাদ্যাভ্যাস অনেকটা একমুখী ছিল, কারণ তখন তারা খেত শিকার করে, যখন মাংস পেত, সেই চর্বিযুক্ত মাংসই খেত। যখন মধু বা ফলমূল পেত, যেগুলো মূলত শর্করা প্রধান, তখন সেগুলোই খেত। একই সাথে শর্করা এবং চর্বিতে আতিশয্যপূর্ণ খাবার প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে নেই বললেই চলে। তাই এরকম খাবারের সন্ধান পাওয়া ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের জন্য অনেকটা ঈদের মতই আনন্দের ব্যাপার। আর লক্ষ-লক্ষ বছর ধরেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের ডিএনএ-তে প্রবাহিত হয়েছে এই বার্তা।

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

তারপর যখন কৃষির উত্থান হলো তখন আমরা খাবার সংরক্ষণ করতে শুরু করলাম, বিভিন্ন ধরণের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাদ্য আমরা তখন একসাথে খাওয়া শুরু করলাম। আর একইসাথে সব পুষ্টি উপাদান আছে এমন খাদ্য কৃত্রিমভাবে তৈরি করা শুরু করেছি আমরা মোটে গত দেড়শ বছরে, তার আগে এমন খাবারের চলই ছিল না। কিন্তু এই দেড়শ বছরে মুছে যায়নি শত-সহস্র বছরের অভ্যাস।

 

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের ডিএনএ-তে প্রবাহিত হচ্ছে এই বার্তা

তাই দেখা গেল, আমাদের বিবর্তনিক ইতিহাসের অধিকাংশ সময়েই আমরা একমুখী খাবার গ্রহণ করে এসেছি। তাই শর্করা এবং চর্বি দু’ধরণের খাবারের জন্য আমাদের মস্তিষ্কের দু’রকম রিওয়ার্ড সিস্টেম গড়ে উঠেছে যার শেষ হয়েছে এক জায়গাতেই, আমাদের রিওয়ার্ড সেন্টারে। তাই ফাস্ট ফুড আমাদের এমন সুখানুভূতি বা উত্তেজনার অনুভূতি দেয় যা ভাত-মাছ-সবজি আমাদের কখনোই দিতে পারে না। এ কারণে ফাস্টফুড- বার্গার, পিতজা, পাস্তা এগুলো দিনে দিনে হয়ে পড়ছে আমাদের জন্য নেশার শামিল, যা পশ্চিমে ইতোমধ্যেই নেশায় পরিণত-ই হয়েছে। ডিপ্রেশনে পড়লেই সেখানে মানুষ ফাস্টফুডের সাগরে ডুবে পড়ছে অহরহ, আর সেই রোগ এখন আমাদের মাঝেও দেখা যাচ্ছে। অথচ শরীরের জন্য ফাস্টফুড মোটেও ভালো নয়।

ফাস্টফুড নিয়ন আলোয় neonaloy

সাময়িকভাবে হতাশা ভুলতেও অনেকে ডুবে যাচ্ছে ফাস্টফুডে!

ফাস্টফুড ভালো লাগার পেছনের বিজ্ঞানকে জানার মাধ্যমে আমরা বুঝলাম ফাস্টফুড আসলে আমাদের মস্তিষ্কের সাথে প্রতারণা করে, তার দুর্বলতার সুযোগ নেয়। এই প্রতারণার শিকার হয়ে আমরা বাড়াই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ইত্যাদির ঝুঁকি। পরবর্তীতে তাই ফাস্টফুডের জগতে নিজেকে ডোবানোর আগে আমাদের এর পেছনের বিজ্ঞানকে একবার ভেবে তারপরই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, এদেশের একটা বড় অংশ হৃদরোগ সহ নানান রোগের ঝুঁকি নিয়ে বড় হোক- তা নিশ্চয়ই আমরা কখনোই চাই না।

আরো পড়ুনঃ
এই খাবারটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে দেখলে আপনি হয়তো মামলা করে দিবেন!
ব্রোমান্স এর তোড়ে হুমকির মুখে চিরাচরিত রোমান্স!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top