ফ্লাডলাইট

চার স্পিনারঃ মুদ্রার অন্য পাশ চিন্তা করেছেন কখনো?

চার স্পিনার নিয়ন আলোয় neonaloy

ম্যাচ জেতার জন্য মাঝে মাঝে ব্যতিক্রমী কিছু করা যায়। উইন্ডিজ সিরিজে চার স্পিনার নিয়ে নামার ধারনা আমি সিরিজ শুরুর আগেই দিয়েছিলাম। তখন অনেকেই বিশ্বাস করেন নি, কিন্তু সিরিজ জয়ের পর এখন ভাবছেন হোম কন্ডিশনে এটাই আমাদের “স্ট্রাটেজি” হওয়া উচিৎ।

এমন কিছু করতে বুকের পাটা লাগে, প্রচণ্ড সাহস লাগে। ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে মাশরাফি চার পেসার খেলিয়েছিলেন। সেটাও ছিলো আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। সাকিব এবার প্রচলিত রীতিনীতিকে পাশ কাটিয়ে চার স্পিনার নামিয়েছেন টেস্টে। এখান থেকে বোঝা যায় ম্যাচ জেতার জন্য কতটা উন্মুখ হয়ে ছিলেন তিনি।

হোম কন্ডিশনে ম্যাচ জিতলেও কিছু কিছু বিষয় আমাদের টিম ম্যানেজমেন্টকে মাথায় রাখতে হবে। এইরকম পিচে আমাদের ব্যাটসম্যানরা কতটুকু মানিয়ে নিতে পারছেন? পরিসংখ্যান কি বলে?

সেপ্টেম্বর ২০১২ থেকে আগস্ট ২০১৪ পর্যন্ত-
স্পিনের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের গড় ৪৮.৬০
প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের গড় ৪৯.৬৮

সেপ্টেম্বর ২০১৪ থেকে আগস্ট ২০১৬ পর্যন্ত-
বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের গড় ৩৯.৩৩
প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের গড় ৩৫.০০

সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে নভেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত-
বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের গড় ২৭.৯২
প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের গড় ২৪.৮৯

অর্থাৎ স্পিন পিচে স্পিনারদের বিপক্ষে গড়ে উইকেট প্রতি মাত্র ২৭.৯২ রান তুলেছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশের গড় স্পিনারদের বিপক্ষে ১৯.৮৫ আর উইন্ডিজের ১৮.২৫। পার্থক্য খুব সামান্য। অর্থাৎ স্পিনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ খুব ভালো ব্যাটিং করে সেটা বলা যাবে না। বরং অনেক সময় এই স্পিনেই কাটা পড়ছে বাংলাদেশ। যেমন শ্রীলংকার বিপক্ষে মিরপুর টেস্ট বছরের শুরুতে।

ESPN Cricinfo এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইসাম ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সাথে কথা বলেছেন, এবং বেশিরভাগ ব্যাটসম্যান নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানিয়েছেন তারা এই ধরনের উইকেটে খেলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। তাদের লম্বা ইনিংস খেলার সম্ভাবনা কমে গিয়েছে। ম্যাচ যখন তিন দিনে শেষ হয়ে যায় তখন বড় ইনিংস খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়। উইকেট মিরপুরের শেষ দুই টেস্টের মতো স্পোর্টিং হলেই মনে হয় ভালো হয়। খুব বেশি টার্নিং উইকেট কি আক্রমণাত্মক মানসিকতা নাকি রক্ষণাত্মক?

চার স্পিনার নিয়ন আলোয় neonaloy

সদ্য সমাপ্ত উইন্ডিজ-বাংলাদেশ সিরিজে দুই ম্যাচ মিলিয়ে খেলা হয়েছে ১৫ সেশন, একটি টেস্ট ম্যাচে নির্ধারিত থাকে ১৫ সেশন পাঁচ দিনে। অর্থাৎ টেকনিক্যাল ভাষায় এক টেস্টের সময়কালের ভেতর বাংলাদেশ পুরো সিরিজ জিতে নিয়েছে। যদিও উইকেটের চেয়ে উইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা এখানে প্রধান কারন। কিন্তু চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ইনিংসে বল যখন সত্যিকারের টার্ন নেয়া শুরু করে তখন বাংলাদেশ ১২৫ রানেই গুটিয়ে যায়।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিলেটে সিকান্দার রাজা, শেন উইলিয়ামসরাই আনপ্লেয়াব্যল হয়ে গিয়েছিলো বাংলাদেশের জন্য অথচ এরা কেউই ফ্রন্টলাইন স্পিনার না! এরকম স্পিন ফ্রেন্ডলি উইকেট বানিয়ে নন-এশিয়ান দলগুলোর বিপক্ষে হোম কন্ডিশনে ভালো করা যাবে কিন্তু এশিয়ান দলগুলোর বিপক্ষে না। শ্রীলংকার বিপক্ষে দুই ইনিংসে ১১০ এবং ১২৩ রানই তার প্রমাণ।

আবার উপমহাদেশের বাইরের দল গুলো এখন অনেক স্মার্ট, তারা জানে এশিয়ার জন্য তাদের কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। ইংল্যান্ড ইতিহাস গড়ে শ্রীলংকাকে হোয়াইটওয়াশ করে দিয়েছে গত মাসে। মঈন, লীচ, রশিদ দিয়ে সাজানো তাদের স্পিন আক্রমণ। কাজেই স্পিন ট্র‍্যাক করে আগামী ১০ বছর নিশ্চিত ম্যাচ জেতা যাবে সেই গ্যারান্টি দেয়া যাচ্ছে না। টেস্টে সামগ্রিকভাবে ভালো করার জন্য দরকার ব্যালান্সড পেস আক্রমণ।

চার স্পিনার নিয়ন আলোয় neonaloy

চার স্পিনার থিওরির জনক ভারত বলেন আর ১৯৮৯-৯০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চার স্পিনার খেলানো পাকিস্তানের কথাই বলেন, দুই দলের কাছেই ভালো পেস অপশন আছে। পাকিস্তানের সবসময় ছিলো, এখন ভারতের আছে। বলা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া সফর করা ভারত দলগুলোর ভেতর বর্তমান দলেরই সবচেয়ে ভালো পেস অপশন আছে। ইংল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা সফরেও তাদের পেসাররা ভালো করেছিলো, ডুবিয়েছিলো ব্যাটসম্যানরা।

বাংলাদেশ দলের পরের মিশন নিউজিল্যান্ড সফর। তিন টেস্টের সিরিজ, সেখানে নিশ্চয় চার স্পিনার নিয়ে নামবে না দল। কিন্তু কারা হবে আমাদের পেসার? বা আগামী বছর আফগানিস্তানের বিপক্ষে হোম টেস্টে কি স্পিন ফ্রেন্ডলি উইকেট দেয়া নিরাপদ হবে? বা ভারত সফরে ভারত কি আমাদের স্পিন ফ্রেন্ডলি উইকেট দিবে? আমার মনেহয় স্পোর্টিং উইকেট দিবে এবং দুইজন পেসার খেলাবে! একটা ভারসাম্যপূর্ণ পেস আক্রমণ কিভাবে হবে আমাদের? বা কিভাবে একজন পেসার উন্নতি করবে? কতটুকু সুযোগ দেয়া হয়?

দলে কোর্টনি ওয়ালশকে কেন রেখেছি আমরা? উনি বারবার বলেন এভাবে পেসার ডেভেলপ করা যায় না। ২০১৬ সালে কামরুল ইসলাম রাব্বির অভিষেক দিয়েছিলো বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ড সফরে বেশ ভালো বল করলেন, এখন কেন কামরুল জাতীয় দলে নেই? শুভাশিস, শ্রীলংকায় সকাল থেকে বিকাল একই ছন্দে, একই জায়গায় টানা বল করে গেলেন, ক্রিকবাজ লিখলো এটাকি বাংলাদেশের ম্যাকগ্রা নাকি! কোথায় সেই শুভাশিস? এক বিপিএল কান্ডে ক্যারিয়ার শেষ? সেটাতো অন্যায়! রাহি উইন্ডিজ সিরিজে প্রশংসা পাবার মতো বল করলেন, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিলেটে কি এমন খারাপ বল করলেন যে ঢাকায় বাদ দিতে হলো? খালেদের অভিষেক দিলো, আবার চট্টগ্রামে মুস্তাফিজ খেললো কেন? খালেদকে খেলানোই তো কাম্য ছিলো? এমনিতেই আমাদের সিলেকশন নিয়ে অনেক কথা হয়, তার ভেতর নির্দিষ্টভাবে পেসারদের সিলেকশন বা বাদ যাওয়া কিসের ভিত্তিতে করা হয়?

চার স্পিনার নিয়ন আলোয় neonaloy

এভাবে চললে বাংলাদেশ কখনো ভালো পেস আক্রমণ পাবে না এবং বিদেশ সফরে যাচ্ছেতাই রকমের বাজে করতে থাকবে। পেসারদের সুযোগ দিতে হবে, যদি এক পেসার করে খেলায় তবুও একজনকেই টানা খেলাতে হবে। একেক বার একেক জনকে না। আর স্পিন ফ্রেন্ডলি উইকেটেও পেসাররা উইকেট নিতে পারে। কিন্তু ম্যাচে ৪-৫ ওভার করে করালে সেটা কিভাবে সম্ভব হবে?

বাংলাদেশ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে পেসারদের ব্যাক করেই। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলেছে পেস ব্যাক করেই। সেখানকার একাদশে কিন্তু বিশেষজ্ঞ চার স্পিনার বা তিন স্পিনার নিয়ে খেলেনি। ঠিক সেভাবেই টেস্টেও ভালো করা যাবে বিদেশের মাটিতে যদি পেসারদের উপর ট্রাস্ট রাখা হয়, কনফিডেন্স ফিরে পায় তারা।

আমাদের সিস্টেমে কিভাবে একজন পেসার কনফিডেন্ট বোলিং করবে সেটা বুঝি না আমি। আমরা হোম কন্ডিশনে জিততে চাই অবশ্যই। তাই আপাতত দুই এক সিরিজের জন্য চার স্পিনার থিওরি ঠিক থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করলে ঠিক নেই।

আমাদের পেসারদের বিদেশের মাটিতে নামায় দিলেই ভালো করবে সেটা ভাবার কারন নাই, পর্যাপ্ত ম্যাচ অনুশীলন দরকার তাদের, অধিনায়ক এবং কোচের আস্থা দরকার তাদের। নাহলে নিউজিল্যান্ডের সবুজ উইকেটেও ভালো করতে পারবে না আত্মবিশ্বাসের অভাবে।

আরেকটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব হচ্ছে, বাংলাদেশ যদি লম্বা সময়ের জন্য চার স্পিনার থিওরি গ্রহণ করে বা পেসারদের এমন ৪-৫ ওভার করে বল করায় তাহলে শিশু বা কিশোর ক্রিকেটাররা আর পেসার হতে চাইবে না, অলরেডি নাইমের গল্প সবাই শুনেছে, পেস ছেড়ে কিভাবে স্পিনার হয়েছে সে। আমি ভুল না করলে সাকিব নিজেও বাচ্চা বয়সে পেসার ছিলেন তাই না?

আমরা ভারতের দিকে তাকাতে পারি, ঘরের মাটিতে স্পিন তাদের মূল অস্ত্র হলেও তাদের একাদশে দুইজন পেসার থাকেই। সেটা ফ্রন্ট লাইন পেসার হোক আর পেস বোলিং অলরাউন্ডার।

যাইহোক, বাংলাদেশ সিরিজ জেতায় আর সবার মতো আমিও খুশি। এই সিরিজে চার স্পিনার খেলানোতেও আপত্তি নেই কিন্তু লংটার্ম চিন্তাও থাকা উচিৎ আমাদের।

Most Popular

To Top