ফ্লাডলাইট

লায়লা থেকে লিসা, এতিমখানা থেকে সুপারস্টার

১৯৭৯ সালের ১৩ আগস্ট, ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনে শহরের সাশুন হাসপাতালে দরিদ্র এক বাবা-মার কোলজুড়ে জন্ম নিয়েছিলো একটি মেয়ে। জন্মের সময়েই তার টানা টানা চোখ সিস্টারদের নজর কেড়েছিলো। হাসপাতালের সিস্টাররা অথবা মা-বাবা নাম রাখলেন লায়লা। দরিদ্র বাবা-মা চায়নি কন্যাসন্তান। তাই নিজেদের নাম পরিচয় লুকিয়ে লায়লাকে রেখে গিয়েছিলেন হাসপাতালের পাশের “শ্রীভাতসা” নামক এতিমখানায়।

ভারতের জন্ম নেয়া হারেন স্থালেকার এবং ইংল্যান্ডের সুই স্থালেকার দম্পতি কাজ করেন একটি মিশনারির হয়ে। ছয় বছর আগে মুম্বাই-এর একটি এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়েছিলেন একটি কন্যাসন্তান। এবার এসেছেন একটি পুত্রসন্তান খুঁজতে। কিন্তু মুম্বাই, দিল্লীর বিভিন্ন এতিমখানা ঘুরেও এমন কোন ছেলেশিশু পাননি যাকে দেখেই মনে হবে “এই বাচ্চাটা যদি আমাদের হতো”! নিজেদের কর্মস্থল আমেরিকার মিশিগানে ফিরে যাওয়ার মাত্র তিনদিন আগে পুনের শ্রীভাতসা এতিমখানায় আসেন হারেন-সুই দম্পতি। সেখানেও কোন ছেলে শিশুকে পছন্দ করতে পারেননি তারা। ফিরে আসার আগমুহুর্তে লায়লাকে দেখেন সুই স্থালেকার। লায়লার সেই টানা টানা চোখের প্রেমে পড়ে যান সুই। হারেন এবং ছয় বছর আগে দত্তক নেয়া আরেক কন্যাও পছন্দ করেন লায়লাকে। ছেলে নয় আবারো মেয়েশিশু দত্তক নিলেন স্থালেকার দম্পতি।

কিন্তু তিন দিনের ভেতর কিভাবে আইনগত সব নিয়মকানুন শেষ করে আমেরিকায় নিয়ে যাবে? হারেনের বাবা মানে লায়লার দত্তক বাবার পিতা সোজাভাবে লায়লার নতুন দাদা জীবনে কোন একসময় মুম্বাই এর প্রধান পাসপোর্ট অফিসারের কোন একটা উপকার করেছিলেন। সেই ভদ্রলোক উপকারীর উপকার করার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন দীর্ঘদিন। সেই সুযোগ পেলেন লায়লার পাসপোর্ট করার মাধ্যমে। মাত্র ৪০ মিনিটের ভেতর লায়লার পাসপোর্ট প্রস্তুত করে দিলেন।

পাসপোর্ট করার সময় লায়লার নাম হয় লিসা, লিসা স্থালেকার। অস্ট্রেলিয়া মহিলা ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বর্তমান সময়ের পরিচিত একজন ধারাভাষ্যকার।

পাসপোর্ট করার পর লিসার নতুন বাবা হারেন বিশেষ অনুরোধ করে একদিনের ভেতর আমেরিকান এম্বেসি থেকে ভিসা নিলেন। লায়লা লিসা হয়ে উড়াল দিলেন আমেরিকায়। শৈশব কেটেছে আমেরিকায়, তারপর কিছুদিন কেনিয়ায়। তারপর স্থালেকার দম্পতি স্থায়ী হন সিডনিতে।

“ক্রিকেট সব ভারতীয়র রক্তে মিশে আছে” এই বিশ্বাস থেকেই বাবা হারেন মেয়েকে ক্রিকেটে উৎসাহ দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় নিয়ে যেতেন নর্থ সিডনি ওভাল গ্রাউন্ডে। লিসার প্রথম ক্লাব “গর্ডন ক্লাব”। পড়াশুনা করেছেন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে, সাইকোলজি এবং রিলিজিয়াস স্টাডি নিয়ে। ১৯৯৭-‘৯৮ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস মহিলা দলের হয়ে কুইন্সল্যান্ড দলের বিপক্ষে অভিষেক হয় লিসা স্থালেকারের। শুরুতে বিশেষজ্ঞ অফ-স্পিনার হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ধীরে ধীরে পূর্নাঙ্গ অলরাউন্ডার হয়ে উঠেন লিসা। ২০০১ সালে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া মহিলা ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় তার। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই টেস্ট অভিষেক। ২০০৫ সালে টি-টুয়েন্টি অভিষেকেও প্রতিপক্ষ দলের নাম ইংল্যান্ড।

সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৮ টেস্ট, ১২৫ ওয়ানডে এবং ৫৪ মহিলা টি-টুয়েন্টি খেলেছেন লিসা। টেস্টে ৩২ গড়ে ৪১৬ রান করেছেন, নিয়েছেন ২৩ উইকেট। সর্বোচ্চ ১২০*। ওয়ানডেতে ৩০.৬৫ গড়ে করেছেন ২৭২৮ রান, নিয়েছেন ১৪৬ উইকেট। দুই সেঞ্চুরি আর ১৬ ফিফটি পেয়েছেন, সর্বোচ্চ ১০৪*, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে ৫৪ ম্যাচে ১১৯৬ রান করেছেন, নিয়েছেন ৬০ উইকেট। এলিসি পেরির আগমনের পূর্বে লিসা ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সেরা মহিলা অলরাউন্ডার। মহিলা ক্রিকেটে সর্বপ্রথম ১০০০ আন্তর্জাতিক রান এবং ১০০ উইকেটের ডাবল অর্জন করেন লিসা। টেস্টে ১০ উইকেট নিয়ে এলান বোর্ডার মেডেল জিতেছেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মহিলা বর্ষসেরা ক্রিকেটার হয়েছেন ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে।

আইসিসি প্লেয়ার র‍্যাংকিং শুরু করলে লিসা টি-টুয়েন্টির ১ নাম্বার অলরাউন্ডার এবং ওয়ানডে ক্রিকেটের ২ নাম্বার অল-রাউন্ডার ছিলেন। ২০১২ সালের আইসিসি বর্ষসেরা মহিলা টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটার নির্বাচিত হন।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২০০৫ এবং ২০১৩ সালের মহিলা বিশ্বকাপ জিতেছেন। ২০০৫ সালের ফাইনালে জন্মস্থান ভারতের বিপক্ষে ৫৫* রানের মহাগুরুত্বপূর্ন ইনিংস খেলে জয় নিশ্চিত করেন। এছাড়া ২০১০ এবং ২০১২ সালের মহিলা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছিলেন।

২০১৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল জেতার পরদিনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন লিসা। উইন্ডিজের বিপক্ষে ফাইনালে ২০ রানের বিনিময়ে ২ উইকেট নেন এবং শেষ ব্যাটারের ক্যাচ নিয়েছিলেন ডাইভ দিয়ে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে নিউ সাউথ ওয়েলস মহিলা দলের হয়ে এখনো খেলে যাচ্ছেন। পাশাপাশি আইসিসি ইভেন্ট এবং আইপিএলে ধারাভাষ্যকার হিসেবে স্টারের সাথে চুক্তিবদ্ধ একমাত্র সাবেক নারী ক্রিকেটার লিসা স্থালেকার।

২০১২ সালে লিসা পুনের সেই এতিমখানায় এসেছিলেন নিজের আত্মজীবনী লেখার সময়। সেখানে এসে ইমোশনাল হয়ে পড়লেও নিজের আসল বাবা-মাকে খোঁজার চেষ্টা করেননি। এমনমি এতিমখানার প্রধান খুঁজে দিতে চাইলেও না করেন তিনি। লিসা তার দত্তক বাবা-মাকেই নিজের একমাত্র বাবা-মা হিসেবে মেনে নিয়েছেন বলে জানান। সেই এতিমখানায় লিসার “ঘরে ফেরা” অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। পাশের সেই হাসপাতালেও কিছু সময় কাটান লিসা।

তবে এই এতিমখানায় এসেই তিনি সিদ্ধান্ত নেনে বাবা-মার দেখানো পথেই চলবেন তিনি, অর্থাৎ এতিমদের নিয়েই কাজ করবেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তাই অবিবাহিত লিসা দুটি সন্তান দত্তক নিয়েছেন। একজন ভারতের, অন্যজন অস্ট্রেলিয়ার।

২০১৬ সালে Adapt Change নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে জানতে পারেন ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এতিমখানায় প্রায় ৪০ হাজার বাবা-মা ছাড়া শিশু রয়েছে যাদের মাত্র ২১৬ জন নিরাপদ বাসস্থান এবং নতুন পরিবার পেয়েছে। লিসা নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করেন কারন স্থালেকার দম্পতির মতো একটি পরিবার তাকে দত্তক নিয়েছিলো এবং ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দিয়েছিলো।

অন্য বাচ্চারাও যাতে এমন নিরাপদ বাবা-মা খুঁজে পায় এবং অন্য বাচ্চাদের মতো বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় সেটা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন লিসা স্থালেকার এবং Adapt Change।

লিসা তার আয়ের বেশিরভাগ অংশ ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এতিমখানায় ডোনেট করে থাকেন। এতিমখানা থেকে বাচ্চা দত্তক নেয়ার আইনি প্রক্রিয়া বেশ লম্বা এবং জটিল। Adapt Change এই প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং দত্তক বাবা-মাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য, কাউন্সিলিং করে থাকে। লিসা নিজেই এসবের সাথে সরাসরি যুক্ত হন।

২০০২ সালে লিসার দত্তক মা সুই স্থালেকার মারা যান। বর্তমানে বাবা হারেন স্থালেকার, দত্তক বোন এবং নিজের দুই দত্তক সন্তান নিয়ে সিডনিতেই স্থায়ী হয়েছেন লিসা তবে স্টারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় এবং ভারতের এতিমদের নিয়ে কাজ করায় বছরের বড় একটা সময় ভারতেই কাটান যেখানে রয়েছে তার শিকড়!

লায়লা বা লিসার এই মহৎ কাজের জন্য শুভকামনা জানাই।

Most Popular

To Top