নাগরিক কথা

লুঙ্গি পরা লিট ফেস্টে কোন ‘অপরাধ’ নয়

লুঙ্গি লিট ফেস্ট নিয়ন আলোয় neonaloy

গতপরশুই সফলভাবে শেষ হল ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৮। আর এর মধ্যেই ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে সেলেব্রিটি হয়ে গেলেন জনৈক ভদ্রলোক। ওনার দাবি, উনি এবং তার বন্ধুরা গতরাতে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় সোয়া ছয়টার দিকে লিট ফেস্টে ঢোকার চেষ্টা করেন, কিন্তু ওনাদের পরনে লুঙ্গি দেখে পুলিশ নাকি সাথে সাথে গেট বন্ধ করে দেয়। উপরন্তু পুলিশ এবং ভলেন্টিয়াররা নাকি তাদের দিকে তির্যক দৃষ্টি দিয়েছেন লুঙ্গি পরার জন্য। এবং সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত নাকি ভিতরে প্রবেশের জন্য রেজিস্ট্রেশনও করা হচ্ছিলো রেজিস্ট্রেশন বুথে! ওনাদের সাথে থাকার জন্য নাকি সাউন্ড সিস্টেমের একজন কর্মচারীকেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এবং সবশেষে, উনি লুঙ্গি পরা দেশে নিষিদ্ধ নাকি এবং লিট ফেস্টে লুঙ্গি পরা নিষিদ্ধ কেন, এমন কিছু প্রশ্ন করে জাতির কাছে বিচার চেয়েছেন। এবং ওনারা যে লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছিলেন তা প্রমাণ করতে নিজেদের একটি ছবিও তুলে দিয়েছেন।

এই পোস্ট দেয়ার পরপরই ভদ্রলোকের কমেন্ট বক্স গরম হয়ে উঠলো। দেশপ্রেমিকগণ “গেলো গেলো, দেশ রসাতলে গেলো” শীর্ষক ক্যাপশনে এই পোস্ট শেয়ার দেওয়া শুরু করলেন। ভদ্রলোকের জনপ্রিয়তার ভাগীদার হতে অনেক অনলাইন পোর্টালও নিজেদের পেজে এই পোস্ট শেয়ার দেয়া শুরু করলো। যেসকল দেশপ্রেমিক সংগ্রামে বিশ্বাসী, তারা পরবর্তী লিট ফেস্টের পূর্বেই ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে সকলে মিলে ফেস্টে লুঙ্গি পরে অনুপ্রবেশের জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ভদ্রলোক হয়তো ভুলে গেছেন সত্য কখনও চাপা থাকে না, একটা মিথ্যায় আটকা পড়লে প্রতিটি মিথ্যাতেই আটকা পড়তে হয়।

তার লেখার হাত ভাল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। নিজেদের স্বকীয়তাকে ধরে রাখার যে আপ্রাণ চেষ্টা তিনি লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা প্রশংসনীয়। সবার মতো আমিও পুরোটা প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম, কারণ লুঙ্গির প্রতি হীনমন্যতা আমাদের আছে সত্যিই। কিন্তু, সমস্যা বাঁধলো ওই ছবিটাতেই। ছবিটা দেখে অস্বাভাবিক কিছু চোখে লাগছে কি?

মজার ব্যাপার হল, লিট ফেস্টের গেটে দাঁড়ানো ভলেন্টিয়ারদের মতে, গত পরশু তারা সারাদিনে স্ক্যান করেছে প্রায় দশ হাজারের মতো রেজিস্ট্রেশনকারীর। অর্থাৎ প্রায় পাঁচশ অর্গানাইজার, চারশত পুলিশ, দেড়শত ভলেন্টিয়ার এবং আমন্ত্রিত অতিথিসহ প্রায় পনেরো হাজার মানুষের আনাগোনা ছিল বাংলা একাডেমীতে। এবং সকলকেই নির্দিষ্ট একটি গেট থেকে ঢুকতে হয়েছে, নির্দিষ্ট একটি গেট থেকে বের হতে হয়েছে। উপরন্তু, সর্বশেষ সেমিনারটি ছিল সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের, যেটি রাত সাড়ে সাতটা পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ফলে, সেমিনার শেষ হওয়ার পরও প্রায় রাত নয়টা-দশটার সময়ও বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গন ছিল মানুষে পরিপূর্ণ। তাহলে সন্ধ্যা ছয়টা-সাড়ে ছয়টা (ভদ্রলোকের মতে যখন রেজিস্ট্রেশন চলছিল, তখন কিভাবে ওনারা এরকম নির্জন জায়গা পেলেন গেটের সামনে ছবি তোলার জন্য? নাকি ওনারা লুঙ্গি পরা ছিলেন না, পরবর্তীতে প্লান করে সবাই মিলে চট করে লুঙ্গি পরে ছবি তুলে ফেলেছেন?

এখন অনেকেই বলতে পারেন, পরে ছবি তুলেছে তা কি হয়েছে? এমনও তো হতে পারে ওনারা আগে থেকেই লুঙ্গি পরা ছিলেন। চলুন, এই প্রশ্নের উত্তর শোনা যাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী কাজী সায়মুম জান্নাত প্রভার মুখ থেকে,

“তখন সময় সোয়া ছয়টা কি সাড়ে ছয়টা। গেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ততক্ষণে, বাইরে অনেক মানুষের ভিড়, অনেকেই ভিতরে ঢুকতে চাচ্ছেন। ফেস্ট থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছি গেটের পাশেই। এমন সময় দুই-তিনজন লোক আসলো ব্যাগ হাতে, তাদের মধ্যে একজন আমার বন্ধুর পরিচিত। সে-ই আমার বন্ধুকে বলল যে তারা প্লান করেছে ভিতরে ঢুকে ওয়াশরুমে গিয়ে প্যান্ট বদলে একসাথে ঘুরবে, দেখবে অর্গানাইজাররা তাঁদের বের করে দেয় কিনা। এমন অভিনব বুদ্ধি নাকি তাঁদের এই গ্রুপের কোন এক ভাইয়ার মাথা থেকেই এসেছে। তো আমি (প্রভা) তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- সবাই লুঙ্গি পরেই আসতেন, ব্যাগে করে না নিয়ে এসে; ব্যাগ তো ভিতরে পারমিটেড না। উত্তরে তিনি বললেন- আর লাভ কি, সময় তো শেষ, আর ঢুকতে দিবে না।”

মানেটা কি দাঁড়ালো? ভদ্রলোক এবং তার বন্ধুরা লুঙ্গি পরে আসেননি বরং তারা ব্যাগে করে লুঙ্গি নিয়ে এসেছিলেন। এবং ওনারা যখন এসেছিলেন তখন ঢুকতেও দেয়া হচ্ছিলো না।

এখন আসি ঢুকতে না দেওয়ার প্রসঙ্গে। প্রথমেই বুঝতে হবে, লিট ফেস্ট এমন একটা উৎসব যেখানে হাজারো মানুষের আনাগোনা, আমন্ত্রিত থাকেন বিভিন্ন দেশের অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, অভিনয়শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ। এবং কিছুদিন পরেই নির্বাচন, ফলে দুষ্কৃতিকারীদের সহজ টার্গেটের একটি হতে পারে এই মিলনমেলা। অনুষ্ঠান কাভার করতে দেশী-বিদেশী অসংখ্য মিডিয়া, প্রেসের মানুষের উপস্থিত হয়। হিসাব অনুযায়ী, তিন দিনে প্রায় সাড়ে তিনশত’র মতো প্রেস পাস দেয়া হয়েছে। ফলে যে কোন দুর্ঘটনা হলে সে খবর ছড়িয়ে যাবে গোটা বিশ্বে, যার দায়ভার নিতে হবে অর্গানাইজারদের। এজন্য, নিরাপত্তার খাতিরে সকলকেই কোন প্রকার ব্যাগ নিয়ে যাতে মেলায় না আসে, সে অনুরোধ করা হয়। তারপরও, প্রথম দুইদিন যারা ব্যাগ এনেছেন, তাদের ব্যাগ নিজ দায়িত্বে গেটের বাইরে রেখে দেয় রেজিস্ট্রেশন বুথে থাকা ভলেন্টিয়াররা। কিন্তু দ্বিতীয় দিনই ঘটে যায় দুর্ঘটনা, ইতালিয়ান এক ভদ্রমহিলার একটি ব্যাগ চুরি হয়ে যায়, এবং ব্যাগের ভিতরে ভদ্রমহিলার ফিল্ম অর্থাৎ মুভি ছিল, যেটা রিলিজ হয়নি! আমরা কি বুঝতে পারছি একটা প্রকাশিত না হওয়া মুভি চুরি হয়ে যাওয়া মানে কি? দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান শেষে গোটা রাত অর্গানাইজার, ভলেন্টিয়াররা গোয়েন্দা পুলিশের সাথে বসে ছিল, চোরকে খুঁজে বের করার জন্য। তৃতীয় দিন সকালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেরা এসে বলে গেছেন কারো ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেয়া যাবে না, বুথেও ব্যাগ রাখা যাবে না, এমনকি দায়িত্বে থাকা ভলেন্টিয়ারদের বলেন, কেউ গেটের আশেপাশে ব্যাগ রাখার চেষ্টা করলে পুলিশে খবর দিতে। এমনকি, ভিতরে যারা কাজ করছেন বা দোকান আছে, তাদের জন্য যে গেট পাস ছিল, তাও বাতিল করে দেয়া হয়। নির্দেশ দেয়া হয়, এমন কেউ ঢুকতে চাইলে, তার বিভাগের বা স্টলের দায়িত্বে আছেন এমন কাউকে এসে তাকে নিয়ে যেতে হবে। নিরাপত্তা এতই জোরদার করা হয় যে; বন্যা মির্জা, নবনীতা চৌধুরীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিদেরও ব্যাগ নিয়ে ভিতরে প্রবেশের সময় কথা কাটাকাটি হয়। এখন কি আমরা বুঝতে পারছি, কেন তাদের লুঙ্গির ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেয়া হয়নি? আর কেনই বা সাউন্ড সিস্টেমের লোকটিকেও আটকে দেয়া হয়েছিলো?

এখন আসা যাক, রেজিস্ট্রেশন চলছিলো, এমন অবস্থায় লুঙ্গি পরিহিতদের দেখে গেট বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে। নিরাপত্তার খাতিরে গেটে দায়িত্বে থাকা পুলিশদের বলে দেয়া হয়েছিলো সন্ধ্যা ছয়টার সময়ই গেট বন্ধ করে দিতে। ওনারা নিজেদের বিবেচনায় ৬.৩০ পর্যন্ত খোলা রেখেছিলেন। নিয়মটা এতই কড়াকড়ি ভাবে পালন করা হয় যে, প্রথম দিন ৬.৩০-এ রেজিস্ট্রেশন বুথে থাকা ভলেন্টিয়ারদের অতিথিদের গিফট ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেয়া হচ্ছিলো না, প্রায় সাতটা পর্যন্ত বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিলো। এমনকি, একজন অর্গানাইজার বাইরে এসেছিলেন ওদের সাহায্য করতে, ওনাকেও ঢুকতে দেয়া হয়নি সাতটার আগে। তাই দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিন বুথ ছয়টার সময়ই বন্ধ করে দেয়া হয়। পূর্বসিদ্ধান্ত মোতাবেক রেজিস্ট্রেশনের সার্ভারও বন্ধ করে দেওয়ার কথা ৬টার মধ্যে, যেটা কোন কারণে হয়তো করা হয়নি; এ কারণে তারা ৬টার পরে রেজিস্ট্রেশন করতে পারলেও ভিতরে ঢুকতে পারছিলেন না। কিন্তু ওই ভদ্রলোক ছয়টার পর কিভাবে, কাকে রেজিস্ট্রেশন বুথে দেখলেন এইটাও একটা গবেষণার বিষয়।

এখন একটু ভাবা যাক, ‘লুঙ্গি পরলেই স্বকীয়তা’ এই আদর্শের যোদ্ধাদের নিয়ে। ভাই,  লুঙ্গির সাথে শার্ট, টিশার্ট পরে ‘নিজস্ব পোশাক’ বলে চিল্লালে কিভাবে হবে? লিট ফেস্টে লুঙ্গি পরে ঢুকতে পারা নিয়ে ইভেন্ট খুলে ফেলছেন, কিন্তু এই মানুষরাই পাঁচ নম্বরের ক্লাস প্রেজেন্টেশনের জন্য সবার আগে ঠিকই কোট, ব্লেজার, টাইটা নিয়ে হাজির হন, চাকরির ভাইভা তো বাদই দিলাম। আর ভাই, লিট ফেস্ট হচ্ছে কবি, সাহিত্যিকদের মেলা; এদের আর যা-ই থাকুক, জামাকাপড়ের হিসাব সাধারণত খুব কমই থাকে। কত লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-ধুতি পরা মানুষকে এই তিনদিনে অতিথি হিসাবে বরণ করে নেয়া হল! এইখানে কেন লুঙ্গি পরলে আটকাবে? কিন্তু ভাইয়া, প্রবেশের সময় শেষে, এইরকম একটা আন্তর্জাতিক উৎসবে এসে এমন ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে কি হবে? দেশীয় পোশাক লুঙ্গির উপর একটা পাঞ্জাবি পরে নির্দিষ্ট সময়ে আসলেই তো আরামসে ঢুকে পরা যেতো। এতো ভুল তথ্য দিয়ে বানোয়াট একটা গল্পও লেখা লাগতো না।

সব শেষে প্রশ্ন থাকতেই পারে, এই লেখার লেখক কিভাবে এতো তথ্য পাচ্ছে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই লেখক নিজেই ছিলেন লিট ফেস্টের রেজিস্ট্রেশন বুথের ভলেন্টিয়ার, খুব কাছ থেকেই গেটে কি কি হচ্ছে তা দেখার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।

শেষ কথা, সকলকে পরবর্তী বছরের লিট ফেস্টে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে শেষ করছি। প্রয়োজন হলে ইভেন্ট খুলে, সবাই মিলে লুঙ্গি পরেই আসবেন। তবে একটা অনুরোধ- অনুগ্রহপূর্বক, প্রবেশের নির্দিষ্ট সময় শেষের আগেই আসবেন, এবং সাথে কোন ব্যাগ নিয়ে আসবেন না প্লিজ।

আরো পড়ুনঃ ভুল বক্তব্য ভাইরাল কেন?

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top