বিশেষ

লুঙ্গি কি নিষিদ্ধ পরিধেয় এই দেশে?

আজকে লিটফেস্টে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে। এইবার লিটফেস্টের আগের দিনগুলিতে যেতে পারি নি। আজকে শেষ দিনে ডিসাইড করলাম যাই একবার। ভাবলাম, লুঙ্গি পরে গেলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ। আমরা কয়েকজন লুঙ্গি পরে চলে গেলাম। এবং গিয়ে বুঝলাম লুঙ্গি না পরে গেলে শিল্প-সাহিত্য-শ্রেণি-রাজনীতির অনেক কিছুই বোঝা বাকি থাকতো, কাগু!

আমাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় নি। যদিও সরাসরি বলা হয় নি যে লুঙ্গির কারণে আপনাদের ঢুকতে দিবো না, কিন্তু আচরণে সেইটাই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনা বিস্তারিত বলি।

আমরা আনুমানিক সোয়া ছয়টার দিকে বাংলা একাডেমির গেটে যাই। আমরা কয়েকজন লুঙ্গি পরা ছিলাম। আমাদের দেখার সঙ্গে সঙ্গে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার ঠিক পূর্বমুহূর্তেও লোকজন ঢুকছিলো!

তখন গেটের দায়িত্ব থাকা পুলিশ কর্তৃপক্ষের অজুহাত দিয়েছে। এই এক আজব অজুহাতের সিলসিলা দেশে আছে! এক কথা কর্তৃপক্ষের নিষেধ আছে/ কর্তৃপক্ষ বলেছে। অথচ সময়মতো কর্তৃপক্ষ খুঁজে পাওয়া যায় না। আজকেও আমরা সেখানে দায়িত্বরত ব্যক্তি বা ভলান্টিয়ার বা পুলিশ কারো কাছে জিজ্ঞেস করেও জনাব ‘কর্তৃপক্ষ’র দেখা পেলাম না। বরং পেলাম ভলান্টিয়ার ও পুলিশের আমাদের লুঙ্গির দিকে অদ্ভুত চোখে তাকানো। যেন ‘এই প্রাণীগুলা কই থিকা আসছে?’

আবার গেটের বাইরে কয়েকজন পুলিশ দায়িত্বে ছিলো। আমাদের দেখে তারা নিজেদের মধ্যে বললো, আমরা চা খেয়ে আসি। বলে তারা গেট থেকে সরে গেল। গেটের কাছে ভেতরে সিভিল পোশাকে এক জন ছিলো। ‘আমি কিছু জানি না’ বলে সেও বিরক্তি নিয়ে ভেতরে চলে গেলো। এমনকি সাউন্ড সিস্টেমের একজন লোক, তার কার্ড দেখানোর পরেও, লুঙ্গি পরা আমরা তার পাশে ছিলাম বলে তাকেও ঢুকতে দেওয়া হয় নি।

‘কেন ঢুকতে দেওয়া হবে না’র ব্যাপারে একজন পুলিশ কথা বললেন পরে। সেই পুলিশ জানিয়েছেন, “কর্তৃপক্ষ বলেছে সাড়ে ৬ টায় বন্ধ করতে।” অথচ আমরা সোয়া ছয়টায় গেটে ছিলাম!

আমাদেরকে এক গেট থেকে অন্য গেটে পাঠানো হয়। সেই গেট থেকেও ঢুকতে দেওয়া হয় নি। আবার আগের গেটে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কয়েকটা প্রশ্নঃ

# যদিও রেজিস্ট্রেশন করতে দেওয়া হইলো, কিন্তু ঢুকতে দেওয়া হয় নি। তাহলে রেজিস্ট্রেশন বুথ কেন বন্ধ হয় নি বা সেখান থেকে কেন বলা হয় নি যে এখন ঢুকতে দেওয়া হবে না? রেজিস্ট্রেশন বুথ খোলা ছিলো প্রায় সাড়ে ৬টা পর্যন্ত। যদি লুঙ্গি পরে ঢুকতে দেওয়া না-ই হবে সেইটা আগে কেন জানানো হবে না?

# লিটফেস্টে নির্দিষ্ট ড্রেস কোড জাতীয় কোন কিছু যদি থেকে থাকে, তা থাকতে পারে, (ব্রিটিশ আমলে যেমন ক্লাবের সামনে নোটিশ থাকতোঃ নেটিভ আর কুকুরের প্রবেশ নিষেধ) তা আগে জানাবে না কেন?

# সবার জন্যে উন্মুক্ত একটা আয়োজনে এমন আচরণ কেন?

# আর জনাব ‘কর্তৃপক্ষ’ কী করছিলেন? তার দেখা পাওয়া যায় নি কেন?

# আর সবচাইতে জরুরি যে প্রশ্ন তা হচ্ছেঃ লুঙ্গি জিনিসটা ‘ছোটলোক/গরিব’-এর পরিধেয় হিসাবে ট্যাগ খাওয়া নিষিদ্ধ পোষাক নাকি এই দেশে? যদি নিষিদ্ধই হয় কারা ঠিক করলো যে এই দেশে লুঙ্গি নিষিদ্ধ পরিধেয়?

জাস্ট ইম্যাজিন, ভেতরে বাউলদের গান হচ্ছিলো, লোক সংস্কৃতি -মংস্কৃতি হচ্ছিলো। অথচ বাংলার সবচেয়ে পরিচিত পরিধেয় লুঙ্গি পরা ছিলাম বলে আমাদেরকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় নি! এর চেয়ে আইরনিক ব্যাপার আর কি হইতে পারে?

[এডিটর’স নোটঃ প্রতিটি ঘটনার পিছনেও কিছু ঘটনা থাকে। ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৮-এর এই ঘটনাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই লেখাটির বিপরীতে আরো একটি ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে যেখানে বিস্তারিত জানা যাচ্ছে কেন কিছু মানুষ সেদিন ঢাকা লিট ফেস্টে প্রবেশাধিকার পাননিঃ লুঙ্গি পরা লিট ফেস্টে কোন ‘অপরাধ’ নয়]

Most Popular

To Top