লাইফস্টাইল

কেন এই “নো শেইভ নভেম্বর”?

নো-শেইভ-নভেম্বর নিয়ন আলোয় neonaloy

প্রতি বছর নভেম্বর মাস এলেই নিউজ ফিড ভরতে শুরু করে ‘নো শেইভ নভেম্বর’ নামক হ্যাসট্যাগে। অনেকে হয়তো শরীকও হয়ে থাকেন। উন্নত বিশ্বে খুব ঘটা করেই পালিত হয় এই যজ্ঞ। আমাদের দেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পালিত হলেও খুব একটা প্রচলিত নয়। চলুন, যেনে আসা যাক নো শেইভ নভেম্বরের খুঁটিনাটি।

প্রথমেই যেনে নেয়া যাক, মূল ব্যাপারটা কি। আসল কথা হচ্ছে, গোটা নভেম্বর মাসটা কোন রকম শেইভের ভিতর দিয়ে না যাওয়া। সেটা হতে পারে ছেলেদের দাঁড়ি কিংবা গোঁফ, অথবা মেয়েদের পায়ের লোম। মূলত, দাঁড়ি গোঁফ কিংবা লোমকে স্বাধীনভাবে বড় হতে দেওয়াই হচ্ছে এর লক্ষ্য। এবং সেলুনে গিয়ে শেইভ বা পার্লারে যেয়ে ওয়াক্সিং (মোম দিয়ে লোম উঠানো) না করানোর বেঁচে যাওয়া টাকাটা মাস শেষে মরণব্যাধিতে আক্রান্তদের হাতে তুলে দেওয়া।

শুরুটা কিভাবে হল? খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, কিছুদিন আগেই ‘নো শেইভ নভেম্বর’ এর উৎপত্তি। ২০০৩ সালের নভেম্বরের ঘটনা। অস্ট্রেলিয়ার কতিপয় যুবক মিলে একটা ইভেন্ট খুললেন। ইভেন্টটা এইরকম যে, তারা মাসব্যাপী শেইভ করবেন না ত্রিশ দিনের জন্য এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং অণ্ডকোষীয় ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য সাহায্য তুলবেন। শেইভ না করার পিছনে তাদের যে ব্যাখা ছিল তা হল, তারা তাদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা লোম-দাঁড়িকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে চায় এবং প্রাকৃতিক উপায়ে বড় হতে দিতে চায়, কেননা ক্যান্সার রোগীরা হাজার চাইলেও তাদের শরীরের লোম-দাঁড়ি আর ফিরে পায় না। এবং একই সাথে এতজনকে দাঁড়িসহ দেখে মানুষজন কথা বলতে উৎসাহী হয় এবং তাদেরকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা যায়।

অস্ট্রেলিয়ান ত্রিশ জন যুবকের এই ইভেন্টের নাম ছিল ‘মভেম্বর’ (movember)। এবং মজার ব্যাপার হল, ২০১৩ সালের মধ্যে দাঁড়ি রাখা এই যুবকদের অলাভজনক ইভেন্টে প্রায় ২১ মিলিয়ন ইউএস ডলারের মতো সাহায্য তুলে ফেলেছে ক্যান্সার রোগীদের জন্য।

মভেম্বর’র ইউকে ডিরেক্টর মার্ক হেডস্ট্রোম বলেন, “কোন রকম খরচ বাদেই এভাবে মানুষের মনোযোগ পাওয়া সম্ভব এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব। গর্বের সাথে বলছি, আমাদের সংস্থা প্রায় ২৫টি দেশে কাজ করছে। সামনে বছর থেকে আমরা পুরুষদের শরীর ফিট রাখার ব্যাপারেও সচেতন করব এবং প্রয়োজনীয় টিপস দিব।”

এই মভেম্বরের হাত ধরেই মূলত শুরু, একই পদক্ষেপ নিয়েছে আরও অনেক সংস্থা। বর্তমানে গোটা বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০০ ইভেন্ট আছে নো শেইভ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে। ২০০৯ সালে থেকে প্রতি নভেম্বরে অ্যামেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি ফেসবুকে একটি ইভেন্ট খুলে, যা থেকে তোলা অর্থ অ্যামেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির রোগীদের জন্য ব্যয় করা হয়।

একই পদক্ষেপ ধরে যৌন হয়রানির আক্রান্তদের জন্য অর্থ উপার্জন করে এফ.এল.এ.এম.ই(F.L.A.M.E.) নামক প্রতিষ্ঠান। তারা মূলত মানুষকে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি সম্পর্কে সচেতন করে এবং উপার্জিত সাহায্য ধর্ষণের শিকার হওয়াদের সাহায্যে ব্যয় করে। ফ্লেম প্রেসিডেন্ট ম্যালি ফেল্টনার বলেন, “সেই পুরানো গ্রিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমরা নো শেইভ নভেম্বরের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। গ্রিক সভ্যতায় নভেম্বর মাসের প্রচলন ছিল না। কিন্তু, প্লাটো প্রস্তাব দেন, শিশু প্রতিপালনের জন্য অভিভাবকদের হয় ঈশ্বরের ন্যায় জ্ঞানী হতে হবে নয়তো জ্ঞানীর রূপ ধরতে হবে। এরপর থেকে তরুণ অভিভাবকরা ঈশ্বরের রূপ ধরতে ত্রিশ দিন শেইভ না করে থাকতো। পরবর্তীতে, অ্যারিস্টটল এই দর্শনকে প্রসারিত করে দাঁড়ি না কাটাকে মূল্যবোধ চর্চার একটি কৌশল বলে ব্যাখা দেন”।

তিনি আরও বলেন, “নো শেইভ নভেম্বর টার্মটির জনক কার্ল মারক্স। তিনিই প্রথম এই টার্মটি ব্যবহার করেন এবং একে সমাজতন্ত্রের একটি উৎসব বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেছিলেন এই উৎযাপন বুর্জোয়া সম্প্রদায়ের মুখে প্রকাশে চপেটাঘাত হবে। এবং আমলাতন্ত্র তার এই মন্ত্রে এতই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, তখন থেকেই দাঁড়িগোঁফ পুরোপুরি ক্লিন রাখা আমলাতন্ত্রের প্রধান দর্শন হয়ে যায়। এখনও আমরা দেখতে পাই, নারীপুরুষ সবাই লোমদাঁড়ি পুরোপুরি ছেঁটে রাখতেই পছন্দ করে”।

সেই মভেম্বর দিয়ে শুরু, সময় গড়িয়েছে অনেক। মূলমন্ত্র এক থাকলেও সেই মভেম্বরের সাথে আজকের ‘নো শেইভ নভেম্বর’ এর অনেক পার্থক্য। মভেম্বরের সদস্যদের শুধু গোঁফ রাখলেই হতো, গালের দাঁড়ি নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা ছিল না। এবং নো শেইভ ক্যাম্পেইনে যোগ দেয়া সদস্যরা মাসব্যাপী কোন খারাপ কাজ কিংবা অন্যায়ের সাথে নিজেকে জড়িত করতে পারবে না এমন নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। এবং প্রয়োজন মোতাবেক স্বহস্তে ট্রিম কিংবা ছাঁটা যাবে, কিন্তু সেলুনে বা অর্থ ব্যয় করে নয় এমনটাই মূল কথা। মোট কথা, উন্নত বিশ্বে ছেলেদের সেলুনে চুল কাটতে এবং মেয়েদের ওয়াক্সিং করতে ৩০০০-৪০০০ টাকার মতো যে খরচটা, সে খরচটাই ক্যান্সার রোগীদের জন্য ব্যয় করতেই এই ক্যাম্পেইনিং।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top