টুকিটাকি

এক গুচ্ছ হুমায়ূন…

এক গুচ্ছ হুমায়ূন নিয়ন আলোয় neonaloy

# কালো হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রথম বিয়ে হয়েছে, স্ত্রী গুলতেকিন হলিক্রস কলেজে পড়তেন। হুমায়ূন আহমেদ প্রতিদিন গুলতেকিনকে দিয়ে আসেন কলেজে। একদিন গুলতেকিনের বান্ধবীরা হুমায়ূন আহমেদকে দেখে ফেললেন এবং গুলতেকিনকে জিজ্ঞাসা করলেন বান্ধবীরা, “যে কালো লোকটা তোমাকে নামিয়ে দিয়ে গেল সে কে?”
গুলতেকিন (বরকে কালো বলায় সামান্য ক্ষুব্ধ), “আমার বর।”

পরে বাসায় এসে হুমায়ূন আহমেদকে ধরলেন গুলতেকিন, “তুমি নাকি কালো। আমার বান্ধবীরা বলছিল”
হুমায়ুন আহমেদের তাৎক্ষণিক উত্তর, “আরেহ না না, আমি কেন কালো হতে যাব? আমি তো উজ্জল শ্যামলা। কালো তো আমাদের শাহীন (ছোটভাই আহসান হাবীব)।”

(সূত্রঃ গল্পের জাদুকর/আহসান হাবীব)

# হুমায়ূন আহমেদ এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল

হুমায়ূন আহমেদের কনিষ্ঠপুত্রকে স্কুলে ভর্তি করানো হবে, হুমায়ূন আহমেদ নিজেই নিয়ে গেছেন স্কুলে ভর্তি করাতে। নামীদামী স্কুলের গম্ভীর প্রিন্সিপ্যাল হুমায়ূন আহমেদকে কোনরকম পাত্তা না দিয়ে বললেন, “আপনার স্ত্রী কোথায়? তাকেও আসতে হবে।এখানে ছাত্র ভর্তির আগে আমরা বাচ্চার মা-বাবার ইন্টার্ভিউ নেই।”
হুমায়ুন আহমেদ, “দরকার হলে অবশ্যই আমার স্ত্রী আসবে। কিন্তু আমারতো মনে হয় নিয়মটা হওয়া উচিত উল্টা।”
প্রিন্সিপাল, “মানে?”
হুমায়ূন আহমেদ, “মানে আপনাদের ইন্টার্ভিউ নিব আগে আমরা। আমাদেরতো আগে বুঝতে হবে আপনারা আমাদের ছেলেকে পড়াতে পারবেন কিনা।”

(সূত্রঃ গল্পের জাদুকর/আহসান হাবীব)

# কবরে টু-লেট

হুমায়ূন আহমেদ একবার জেদ ধরলেন যে সুদূর পিরোজপুরের গোরস্থান থেকে নুহাশ পল্লীতে নিয়ে আসবেন বাবার কবর, সব ঠিকঠাক। তখন এক ঘনিষ্ঠজন প্রশ্ন করল, “স্যার তাহলে পিরোজপুরে আপনারা বাবার খালি কবরটায় কি হবে?”
হুমায়ূন আহমেদ একটু ভাবলেন, তারপরে গম্ভীর হয়ে বললেন, “টু-লেট ঝুলিয়ে দিলেই হবে!”

(সূত্রঃ গল্পের জাদুকর/আহসান হাবীব)

# মায়ের পেটের আপন ভাই

হুমায়ুন আহমেদের ছোটবোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকেন। হলে দেখা করার নিয়ম অনেক কড়াকড়ি, আর কোন ছেলে দেখা করতে গেলে তো কথাই নেই, একটা স্লিপে দর্শনার্থীর সাথে সম্পর্ক থেকে শুরু করে অনেক কিছু লেখতে হয়। একদিন ছোটবোনকে হলের হাউজ টিউটর ডেকে পাঠালেন, ডেকে পাঠানোর কারণ হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ বোনের সাথে দেখা করতে এসেছেন এবং এতরকম ঝামেলা দেখে বিরক্ত হয়ে স্লিপে সম্পর্কের জায়গায় লিখেছেন “মায়ের পেটের আপন ভাই”।

(সূত্র; গল্পের জাদুকর/আহসান হাবীব)

 # সস্তা লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

হুমায়ূন আহমেদকে একবার এক বুদ্ধিজীবি বললেন যে এইসব ফরমায়েশি ছাইপাশ লেখা-লেখি বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করতে। হুমায়ূন আহমেদ একদিন বুদ্ধিজীবির কাছে গিয়ে হাজির হলেন তার সদ্য লেখা উপন্যাস নিয়ে। কঠিন বুদ্ধিজীবি উপন্যাস পড়ে বিরক্ত হয়ে বললেন যে এইসব কি লিখেছেন, সাহিত্যের তো কিছুই হয়নি। তখন হুমায়ূন আহমেদ ডবল বিরক্তি দেখিয়ে বললেন, “মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা যদি সাহিত্য না হয় তবে আমার লেখাও সাহিত্য হবার দরকার নেই, এইটা আমার রচনা না এইটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা।”

(সূত্র; গল্পের জাদুকর/আহসান হাবীব)

# লেখালেখি থেকে প্রথম উপার্জন

হুমায়ূন আহমেদের বাবার এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল, তিনি অসুস্থ হলেই সন্তানদের কবিতা আবৃত্তি করে শুনাতে বলতেন, প্রতিটা কবিতার জন্য এক আনা করে দেওয়া হবে। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বাবার প্রিয় কবিতা “এবার ফেরাও মোরে” মুখস্ত করে ফেললেন, এত দীর্ঘ কবিতা একবারে মুখস্ত বলতে পারায় হুমায়ূন আহমেদের বাবা খুশি হয়ে এক আনার বদলে চার আনা দেন হুমায়ূন আহমেদকে। এটাই সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপার্জন।

# প্রথম বিয়ের প্রস্তাব

ক্লাস টু’তে পড়ার সময়ই হুমায়ূন আহমেদ প্রেমে পড়ে গেলেন, তার ক্লাসের এক রূপবতী বালিকাকে ভালোবেসে ফেললেন। গম্ভীর গলায় মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন যে সে বড় হয়ে হুমায়ূন আহমেদকে বিয়ে করতে চায় কিনা। তবে রুপবতী বালিকা হুমায়ূনের প্রস্তাবে রাজী হওয়ার বদলে খামচি মেরে তার চামড়া তুলে দেয় এবং হেডস্যারের কাছে নালিশ দিয়ে দেয়।

(সূত্রঃ আমার ছেলেবেলা)

# চুরিবিদ্যা

তোষকের নিচ থেকে সিকি চুরি করার পরে হুমায়ুন আহমেদের প্রতিক্রিয়া, “একটা সিকি চুরি করে সারাদিন আতংকে নীল হয়ে ছিলাম, কখন মা ধরে ফেলবে সেই ভয়ে, কিন্তু মা কিছুই বললেন না। পরদিন সেই সিকিটা নিয়ে আমি আর শেফু চা খেতে চলে গেলাম। আমাদের মত ক্ষুদে কাস্টমার পেয়ে দোকানদার মহা অবাক, যত্ন করে বসিয়ে দুইকাপ চা হাতে দিলেন এবং একটা পরটা ছিঁড়ে দুইভাগ করে দুই-ভাইবোনকে দিয়ে দিলেন।”

(সূত্রঃআমার ছেলেবেলা)

# বহুরূপী

“বান্দরবনের বাসায় প্রথমদিনেই এক কান্ড হল। রাত ন’টার মত বাজে, বাইরে ‘হুম হাম হিউ’-বিকট শব্দ। একসংগে সবাই জানালার কাছে ছুটে গেলাম। কি সর্বনাশ একটা রাক্ষস দাঁড়িয়ে আছে! রাক্ষসের হাতে কেরোসিনের কুপী! সে কেরোসিনের কুপিতে ফুঁ দিতেই তার মুখ দিয়ে আগুণের হলকা বের হয়ে এল, আমরা সবাই ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। আমার মা পর্যন্ত ভয় পেয়ে বললেন ‘এইটা কি?’ রাক্ষস তখন মানুষের মত গলায় বলল, ‘ভয় পাবেন না,আমি বহুরুপী, খোকাখুকীরা ভয় পেয়ো না’।”

(সূত্রঃআমার ছেলেবেলা)

# তবলাবাদক হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আমন্ত্রণে সেদেশের বইমেলাতে গিয়েছেন। একজন এসে হুমায়ুন আহমেদকে বললেন, “আপনি কি রুনাদি’র সাথে তবলা বাজাতে এসেছেন?”
হুমায়ূন আহমেদ উত্তরে বললেন, “না আমি শাওনদি’র সাথে এসেছি।”

(সূত্রঃ হুমায়ূন আহমেদের আত্মজীবনী)

# হুমায়ূন আহমেদের প্রথম কবিতা

তার ভাষায়, “স্বনামে স্কুল-ম্যাগাজিনে প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছে। ঈশ্বর-বিষয়ক অতি উচ্চশ্রেণীর ভাববিষয়ক ইংরেজী কবিতা। কবিতার নাম “গড”। কবিতাটা ছাপা হয়েছে কবির ছবিসহ, ছবির নিচে লেখা Humayun Ahmed Class X Section B.”

মাইকেল মধুসূদন দত্ত হবার চেষ্টা থেকে নয়, বরং স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য হুমায়ূন আহমেদের লেখা কোন বাংলা সাহিত্যকর্ম নির্বাচিত না হওয়ায় বেচারা ইংরেজীতে কবিতা লিখে জমা দিয়েছিলেন।

(সূত্রঃ বলপয়েন্ট)

# প্রথম সাহিত্যকর্ম

“বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাসার সামনে বিশাল পুকুর। পুকুর থেকে ঝুপ ঝুপ বৃষ্টির শব্দ আসছে। পিরোজপুর শহরে বৃষ্টি হওয়া মানেই কারেন্ট চলে যাওয়া। আমি সিরিয়াসলি পড়ছি ভেবেই আমার সামনে হারিকেন দেওয়া হয়েছে। আমার মাথার ভেতরে একের পর এক লাইন আসছে। এক ধরণের অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আমি লিখতে শুরু করেছি আমার প্রথম উপন্যাস- শঙ্খনীল কারাগার”।

(সূত্রঃ বলপয়েন্ট)

# বাবার কবর জিয়ারত

“সবুজ সাথী” নাটকের জন্য হুমায়ূন আহমেদ খুলনা থেকে বরিশাল যাচ্ছিলেন, হঠাত খুলনা-বরিশাল হাইওয়েতে এসে তার মনে হল যে খুব পরিচিত কোন জায়গায় তিনি চলে এসেছেন। সাথে সাথে গাড়ি থেকে নামলেন এবং হাঁটাহাঁটি করতে লাগলেন, কেউ একজন বলল যে সামনে পিরোজপুর কবরস্থান। পিরোজপুর কবরস্থানেই হুমায়ূন আহমেদের বাবাকে দাফন করা হয়েছিল, তিনি ত্রিশ বছর পর বাবার কবর জিয়ারত করলেন।

(সূত্রঃ হুমায়ুন আহমেদের আত্মজীবনী গ্রন্থ)

# নামকরণ

একজন ছেলের নাম রাখার জন্য হুমায়ূন আহমেদের কাছে এসেছেন। এসেই নানান রকম শর্ত! “স্যার ছেলের নামের প্রথম অক্ষর হতে হবে আ দিয়ে, কারণ আমার নামের প্রথম অক্ষর আ, আতিয়া। আবার ছেলের বাবার নামের প্রথম অক্ষর ল, লতিফ তাই ছেলের নামের শেষ অক্ষর রাখবেন ল দিয়ে। নামের অর্থ যদি নদী, আকাশ বা মেঘ হয় তাহলে খুবই ভালো হয়। তারচেয়েও বড় কথা-নামটা হতে হবে আনকমন।”
হুমায়ুন আহমেদের উত্তর, “ছেলের নাম রাখো আড়িয়াল খাঁ”।

(সূত্রঃ ফাউন্টেন পেন)

Most Popular

To Top