টেক

আপনার তথ্য হাতিয়ে নিয়েই আপনাকে বদলে দিচ্ছে গুগল-ফেসবুক!

একটা ব্যাপার নিয়ে আমার বেশ কিছুদিন ধরেই খুঁতখুঁত লাগছে। এই খুঁতখুঁতানি শুরু হয়েছিল গত বছর। কবে মনে নেই। একটা কম্পিটিশনের কাজে গুগলে ভ্যানগাড়ি-ট্রাক এসবের দাম এবং ভাড়া জানতে সার্চ দিয়েছিলাম। দেখি সেই রাতেই, আমার ফেসবুক হোমপেজ জুড়ে একগাদা ভ্যানগাড়ি-ট্রাকের বিজ্ঞাপন। সাধারণত সেসব জায়গায় ফ্রেন্ডস, হাউ আই মেট ইওর মাদার টিভি সিরিজের টিশার্টের অ্যাড থাকে। একদিনের সার্চের ধাক্কায় (তাও ফেসবুক সার্চ না, গুগল সার্চ) আমার ফেসবুক হোমপেজ এভাবে বদলে যেতে দেখে খুবই অদ্ভুত রকমের বিরক্ত লেগেছিল।

তো পরে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করলাম। এসব অ্যাড বা কনটেন্ট তো কোনো মানুষ বসে বসে সিলেক্ট করে না, এসব চলে অ্যালগোরিদমে- মেশিন লার্নিং অ্যালগোরিদম। হালকার উপর ঝাপসায় ব্যাপারটা আমার অনেকটা ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশনের মত লাগলো। দিন দিন ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মাধ্যমে এটা পারফেক্ট থেকে পারফেক্টতর হচ্ছে।

শুরুটা হয়েছিল এভাবে যে মোটামুটি আমার যত ইনফরমেশন মেশিন নিতে পারে, তার উপর ভিত্তি করে র‍্যান্ডমলি কনটেন্ট আসবে এবং যেই উপায়ে কনটেন্ট আসলে আমার রেসপন্স ভালো হচ্ছে, অর্থাৎ আমি বেশিক্ষণ সাইটে বসে থাকছি সেই উপায়গুলো টিকে যাবে। তারপর আমার আরো তথ্য নিয়ে সেই অ্যালগোরিদম আরো পারফেক্ট হবে; এবং হতেই থাকবে, হতেই থাকবে। এই সারভাইভাল অফ ফিটেস্ট প্রসেসে আমাদের ব্রেইনও বর্তমান অবস্থায় এসেছে, তার অনেক কিছুই আমরা এখন এক্সপ্লেইন করতে পারি না।

আমাদের নিউজফীডে কি কনটেন্ট আসবে তা নির্ধারণ করে যে মেশিনগুলো, সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে, আপনার ইউটিউব সাজেশন মূলত কি ক্রাইটেরিয়ার উপর ভিত্তি করে আসছে সেইটা ইউটিউবের লোকজনও বলতে পারবে না। আর এখন ইউএসএ’র বেশিরভাগ সাইটের মধ্যেই প্রচুর ডাটা কেনাবেচা হয়। এগুলো আমাদের পার্সোনাল ডাটা, যেই কারণে আমার জিপিএস লোকেশন ট্র্যাক করে ফেসবুকে ফ্রেন্ড সাজেশনও চলে আসে, গুগলে কি লিখে সার্চ দিয়েছিলাম তার উপর নির্ভর করে আসে আলিবাবায় অ্যাড।

এখন এইটার মধ্যে সমস্যা হচ্ছে, এই অ্যালগোরিদমগুলোর মধ্যে তো মোরালিটি নেই, সত্য-মিথ্যা-ভালো-খারাপ তো তাদের শেখানো হয়নি। তাদের খালি শেখানো হয়েছে কীভাবে মানুষগুলোকে স্মার্টফোন আর কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখা যায়। যতক্ষণ মানুষ আটকে থাকবে, তত বেশি তারা বিজ্ঞাপন দেখবে। কনজাম্পশন বাড়বে, কনজিউমার বাড়বে, টাকা-ডলার-ইউরো বাড়বে, অপ্রয়োজনীয় পণ্য দিয়ে ভরে যাবে দুনিয়া। মাঝখানে হাতে গোনা কয়েকটা লোক বিলিয়ন মানুষের তথ্য নিয়ে বসে থাকবে, আর বড় বড় ইলেকশন এলে দেখা যাবে ডেমোক্রেসি আসলে ঘোড়ার ডিম। ভালো, খুবই ভালো। আমার সমস্যা ওইখানে না, আমার সমস্যা অন্যখানে।

এই যে ইউটিউব বা ফেসবুক আমাদের বসিয়ে রাখার এক পারফেক্ট অ্যালগোরিদম বানিয়ে ফেলেছে, যেটা কীনা এখন পুরোই আমাদের যে কারোরই ধরাছোঁয়া বা বোঝারও বাইরে, এটা কিন্তু খুবই ভয়ংকরভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছে। ব্যাপারটা বলি কীরকম।

ইউটিউবে আপনি যদি সাইকোপ্যাথদের নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি দেখা শুরু করেন, দেখবেন কয়েক ঘন্টার মধ্যে বিশ্বের সব কুৎসিত সাইকোপ্যাথদের সাথে আপনার পরিচিত হওয়া শেষ। ইউটিউব কিন্তু তখন আপনারে আর ভালো জিনিস দেখাবে না, দেখাবে কন্ট্রোভার্শিয়াল জিনিসই। কারণ ইউটিউব বুঝে মানুষ আসলে কোনটা বেশি খায়। এমনি করে কারো মধ্যে যদি একটু মৌলবাদী প্রবণতা থাকে, ইউটিউব তাকে কয়েকদিনে মধ্যেই পুরোদস্তর জঙ্গি বানিয়ে দিতে পারবে। সেই মানুষটার ইচ্ছাও থাকা লাগবে না। শুধু ভিডিও দেখতে থাকলেই হবে।

আমি একবার “illuminati” লিখে সার্চ দিয়েছিলাম, আমার সেই জার্নি গিয়ে শেষ হয়েছে এমিনেম কিভাবে শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করে ফেম পেয়েছে এবং বর্তমান পপ সিঙ্গাররা সবাই কিভাবে শয়তানের পূজক- সেসবে। আবার দেখলাম ওবামা পার্টি নাকি আসলে সরীসৃপ টাইপের এলিয়েন। ওইসব ভিডিওতে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম কোথা থেকে আমি ওইখানে গিয়ে পৌঁছালাম আসলে। কিছু কিছু বিশ্বাসও করে ফেলতে ইচ্ছা করছিল, অনেক আকর্ষণীয় কথাবার্তা।

একই ঘটনা ফেসবুকে। ফেসবুক যেদিন টের পেয়েছে আমি কিছুটা ডিপ্রেসড, আমার হোমপেজ ভরে গিয়েছে ডিপ্রেসিং জিনিস দিয়ে। কারণ ফেসবুক তো জানে সবাই এক্সেপ্টেন্স চায়, নিজের দলের লোক চায়, নিজেকে পরিবর্তন করতে মানুষের বিশাল অনীহা। এই ভাষায় অবশ্য জানে না সেটা, জানে অ্যালগোরিদমে। একটু রেসিজমের ছোঁয়া থাকা লোকজন দেখবে এক্সট্রিম রেসিস্ট জিনিসপাতি, একটু সেক্সিস্টদের জন্য থাকবে এক্সট্রিম সেক্সিজম, আর পার্ভার্টদের জন্য তো কথাই নাই। কত মানুষ যে ফেসবুকের হোমপেজ স্ক্রল করেই সুইসাইডাল কিংবা মলেস্টার হয়ে গেছে তার হিসাব কে রাখে? ক্যাম্ব্রিজ অ্যানালিটিকা দেখলাম এই ব্যাপারটা ম্যানিপুলেট করেই ট্রাম্পের ভোটার বাড়িয়ে ফেলেছিল। ফলাফল? একজন অর্ধোন্মাদ, বিকৃত যৌন চিন্তাধারার অধিকারী একটা মানুষ এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী। অথচ এ সবই শুরু হয়েছিল মানুষকে একটু বেশিক্ষণ বসিয়ে রেখে অ্যাড দেখানোর মত আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ চিন্তাভাবনা থেকে।

তাই আমি বলব আরকি মানুষজনকে একটু এলার্ট থাকতে। আমাদের পার্সোনালিটি যেন মেশিন অ্যালগোরিদমরা তৈরি করে না দেয়। ইউটিউবে ক্লিক করতে করতে বা ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে যখন অন্ধকার কূয়োর মধ্যে পড়ে যাচ্ছি, তখন যেন আমরা নিজেদের একটু ইশারা দেই মুদ্রার উলটো পিঠটা দেখে আসার জন্য। যে পিঠ অ্যালগরিদম আমাদের কখনোই দেখাবে না।

আরো পড়ুনঃ
তথ্যফাঁস নিয়ে বিপদে ফেসবুক, বাধ্য হয়ে মুখ খুললেন জুকারবার্গ
ফেসবুকের কাছে কেন হেরে গেল গুগল?

Most Popular

To Top