নাগরিক কথা

হারিয়ে যাওয়া ছেলের ২৫ বছর পর মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প…

হারিয়ে যাওয়া ছেলের তার মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প

প্রতিদিনই বহু রকমের খবর ঘুরপাক খায় আমাদের দৃষ্টির সীমানায় বেশীরভাগ খবরের শিরোনাম পড়েই মূল খবরের আর খোঁজ নেই না আমরা আজকাল। কারণ, প্রতি মুহূর্তে এত এত খবর তৈরী হচ্ছে আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে যে, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিদিনের এই বিপুল পরিমাণ বার্তাপ্রবাহের স্মৃতি ধরে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে। তথ্যের ওভারফিডিং এর জন্য তথ্যের ক্ল্যাসিফিকেশনও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ আর গুরুত্বহীন তথ্যের মধ্যে বিভেদ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। তাই সংলাপের বিষয়বস্তুর চেয়ে সংলাপরত ব্যক্তিবর্গের আপ্যায়নের খবরটাই প্রধান হয়ে ওঠে। অর্থাৎ চা যেমন তেমন হোক; কাপটা কেমন সেটাই বিবেচ্য।

স্ট্যাচু অব ইউনিটি কিংবা পাকিস্তানের ব্লাসফেমির মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসিয়া বিবির আটবছরের কারাবাসের পর সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক মুক্তির রায়- এসব খবরের পাশে অন্য একটা খবর মাঝে মধ্যে উঁকি দিচ্ছিলো কম জনপ্রিয় কিছু নিউজ পোর্টালে। অভ্যাসবশত প্রথমবার খবরটা এড়িয়ে গেলাম। কিন্তু, তিন-চার বার ঘুরপাক খেয়েও যখন খবরটা পুনরায় নিউজফিডে আসলো, সেবার আর এড়িয়ে না গিয়ে পুরোটা খবর পড়া শুরু করলাম। ‘ঢাকার মিরপুরের একটি রাস্তায় আমেনা খাতুন নামের আশীর্ধ্বো এক বৃদ্ধাকে তাঁর পরিবারের লোকজন ফেলে দিয়ে গেছেন’ (২ নভেম্বর, ২০১৮; ঢাকা টুডে)। খবরটিতে খুব নতুনত্ব কিছু নেই। এমনটা হরহামেশাই হচ্ছে। কিছু পরিসংখ্যান দেয়া যাক-

“নড়াইলের লোহাগড় উপজেলায় ফুজলী বেগমকে রাস্তায় ফেলে আসেন সন্তানেরা” (২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮; প্রথম আলো)

ফরিদপুর শহরের আলীপুর এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে বৃদ্ধ মা’কে রাস্তায় ফেলে মারধর করছিলো ছেলে” (২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬; প্রথম আলো)

দ্বিতীয় ঘটনাটির ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ২০১৬ এর ১৫ সেপ্টেম্বর; ফরিদপুরেরই কমলাপুর ডিআইবি এলাকায় মোটরসাইকেল কেনার টাকার জন্য মা-বাবা’র গায়ে আগুন দেয় সতেরো বছরের কিশোর। এতে ঐ কিশোরের বাবা রফিকুল হুদা ঘটনার ছয়দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। (১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬; প্রথম আলো)

১৬ আগস্ট ২০১৩, কন্যা ঐশীর হাতে মা ও পুলিশ কর্মকর্তা পিতার খুনের ঘটনা নিশ্চয় কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়।

প্রতিদিন এমন অমানবিক খবর পড়তে পড়তে আমাদের মূল্যবোধের হজমশক্তি অনেক বেশী বেড়ে গেছে। মরবিডিটি নিয়ে আমাদের আর সমস্যা হয় না। তারপরও এই বিষয় নিয়ে কিছু একটা লিখতে মন চাইলো। হয়ত একটা মানবিক দায়বদ্ধতা অবচেতন মনে এখনো কাজ করে।

বছরখানেক আগে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, নাম ‘Lion’। সেই সিনেমার সাথে এই খবরগুলোর একটা সম্পর্ক খুঁজে বের করতে ইচ্ছে করছে। তাছাড়া বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা অনুযায়ী অন্য একটা সিনেমারও নাম উল্লেখ করা যায় এখানে- ‘A Sepration’। আমাদের চারপাশে যখন বৃদ্ধ মা-বাবা’কে পরিত্যাগের একটা কালচার গড়ে উঠছে, তখন এই সিনেমা দুটোর বিষয়বস্তু নতুন করে কিছু ভাবতে শেখায়।

এখানে শুধু ‘লায়ন’ এর বিষয়াঙ্গিক নিয়েই বরং কিছু কথা বলা যাক। সিনেমাটা একটা হারিয়ে যাওয়া ছেলের তার মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প নিয়ে তৈরী। গল্প বললে একটু ভুল থেকে যায়, কারণ এটা বাস্তব ঘটনা নিয়ে তৈরী একটা বায়োপিক। আবার, প্রথাগত বায়োপিক থেকেও একটু আলাদা।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের খান্ডওয়া জেলার অখ্যাত একটা জায়গার নাম গনেশতলা। সেখানে সারু, বড় ভাই গাড্ডু, তাদের মা আর এক ছোটবোন- এই চারজন একটা ছোট্ট খুপরির ভিতর বাস করে। সারু বছর পাঁচেকের এক শিশু। বড়ভাই গাড্ডুর সাথে একদিন কাজ করতে বের হয়ে হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা বেশ নাটকীয়। সারু একটা ফাঁকা ট্রেনে উঠে ঘুমিয়ে পড়ে। সেটা আবার নন প্যাসেঞ্জার ট্রেন যার গন্তব্যস্থল ছিলো মধ্যপ্রদেশ থেকে ১৬০০ কিলোমিটার পশ্চিমে কলকাতার হাওড়া স্টেশন। ট্রেনের দরজা বাইরে থেকে তালা লাগানো ছিলো বিধায় নিকটবর্তী কোন স্টেশনেই সে নামতে পারেনি।

সারু যখন বন্দীদশা থেকে হাওড়া স্টেশনে এসে নামলো, তখন সে টিকেট কাউন্টারে গিয়ে বারে বারে গনেশতলার টিকেট চাইতে লাগল। ছোট্ট সারু তার আবাসস্থলের কোন ঠিকানা জানত না- কোন প্রদেশের কোন জেলায় এই গনেশতলা অবস্থিত সেটা তার জানা ছিলো না। তাছাড়া কলকাতা শহরের বাংলাভাষীদের কথা সে কিছুই বুঝত না। সারু’র দীনহীন চেহারা আর অকিঞ্চিৎকর পোষাকের জন্য টিকেট কাউন্টারের বাবুদের কেউই তাকে পাত্তা দিতে চাইল না; উপরন্তু সবাই দূর দূর করতে লাগল। এমতাবস্থায় সারু স্টেশনেই অন্যান্য ছিন্নমূল শিশুদের সাথে কিছুদিন কাটায়।

ঘটনাক্রমে সারু’র জায়গা হয় একটা শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখান থেকে স্থানীয় এক সমাজকর্মীর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ান এক দম্পতি সারুকে দত্তক নেন। অস্ট্রেলিয়ায় সেই ব্রিরলে দম্পতির কাছে সারু বড় হতে থাকে। তখন থেকে সারু’র নামের সাথে ব্রিরলে শব্দটাও যোগ হয়ে যায়। একটি জিলিপি খাওয়া যার কাছে স্বপ্নসুদূর ছিলো, সেই সারু সচ্ছলতা আর প্রাচুর্যের ভিতর দিয়ে বেড়ে ওঠে এক সময় মেলবোর্ন এর একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়।

সিনেমা হিসেবে ‘লায়ন’ কেমন সেটা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। শুধু এইটুকু বলে রাখা ভালো যে; ছয় ক্যাটাগরিতে অস্কার নমিনেশন পাওয়া এই সিনেমায় সারুর পালক মা হিসেবে নিকোল কিডম্যানের অভিনয় সবাইকে মুগ্ধ করবে। তাছাড়া, রেলস্টেশনে ছিন্নমূল শিশুদের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার যে লড়াই এই সিনেমায় চিত্রায়িত হয়েছে; এ সিনেমা যারা দেখবে, নিশ্চিত তাদের কারো কারো ঐ হতভাগা শিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একটু হলেও পাল্টে যাবে। শহুরে জনারণ্যে এসব শিশুদের প্রতিদিনের লড়াইয়ের কাছে আমাজন জঙ্গলে বিয়ার গ্রিলস্ এর সারভাইভাল স্টান্টকেও তুচ্ছ মনে হবে।

সারু’র এই জীবনকাহিনী এখানে উল্লেখ করার বিশেষ একটা তাৎপর্য আছে। প্রারম্ভেই যে তথ্যের পরিসংখ্যান দিয়ে লেখাটা শুরু করেছি- সেখানে সারু ব্রিরলে’র জীবনকাহিনী সম্পূর্ণ বিপরীত ধারার একটা উদাহরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। হতদরিদ্র একটা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অদৃষ্টক্রমে অস্ট্রেলিয়ার এক সচ্ছল পরিবারে বড় হওয়ার পরও তার নাড়ীর টানকে সে কখনোই অস্বীকার করতে পারে নি। খুব অস্পষ্ট কিছু পারিবারিক স্মৃতিকেই সে তার ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত আঁকড়ে ধরেছিলো। উন্নত জীবনযাত্রা, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সুন্দরী বান্ধবী কিংবা সচ্ছলতার মোহে সারু কখনোই তার ফেলে আসা অতীতকে ভুলে যায় নি। সারু তাই তার বান্ধবী কিংবা অন্যান্য বন্ধুদের কাছে অবলীলায় স্বীকার করে-সে তার বর্তমান পিতামাতার দত্তক নেয়া সন্তান যাকে একটা রেল স্টেশনে কুড়িয়ে পাওয়া যায়। খুব অস্পষ্ট স্মৃতি থেকে সে এও বলে যে- তার জন্মদাত্রী মা একজন লেবার ছিলেন। কিছু বন্ধুর পরামর্শ ও উৎসাহ; ছেলেবেলা থেকে যত্নে লালিত অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি আর গুগল আর্থের মত প্রযুক্তির সাহায্যে সারু তার জন্মস্থানের খোঁজ চালাতে শুরু করল। প্রায় এক বছরের প্রচেষ্টায় সারু তার কাঙ্ক্ষিত গণেশতলার খোঁজ পায়। অবশেষে পঁচিশ বছর পর ২০১২ সালে সারু তার জন্মস্থানে ফিরে গিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষের সহযোগীতায় তার মা আর বোনকে খুঁজে বের করে।

আচ্ছা; সারুর মনে কি কখনো রবীন্দ্রনাথের -‘ফিরে চল মাটির টানে/ যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে’ গানটা অন্য কোন কবির অন্য কোন ভাষায় অস্ফুট স্বরে বাজত? তা না হলে কিসের টানে সে জরাজীর্ণ–অনাধুনিক-অনুন্নত এক প্রত্যন্ত গ্রামে তার ফেলে আসা শৈশবের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা পঁচিশ বছর ধরে পুষে রেখেছিলো? শুধুই কি অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশগত আর ভৌগলিক অবস্থানের কারনেই এটা সম্ভব হয়েছিলো? আমাদের এই উপমহাদেশীয় পরিবেশে কি এরকম একটা সারু তৈরী হওয়া সম্ভব? যেখানে এই উপমহাদেশীয় এক পৌরাণিক কাহিনীতে পিতার আদেশে বীর ছেলের হাতে মাতৃহত্যার বর্ণনা পাওয়া যায়।

আমাদের চারপাশে যখন কিছু সন্তান তার পিতামাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব ঘাড় থেকে নিষ্পৃহতায় ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছে; কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর গেঁয়ো-আনকালচারড বাপ-মা’র সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে- তখন সারুকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর এক মহাপুরুষ বলে মনে হয়। আর মহাপুরুষ বলতে যদি কারো আপত্তি থাকে, তবে সিংহপুরুষ তো বলতেই হয়। কারন, সারু তার মায়ের কাছে ফিরে এসে জানতে পারে তার প্রকৃত নাম ‘শেরু’; যার অর্থ সিংহ।

Most Popular

To Top