নিসর্গ

পাহাড়চুড়ায় ক্যাম্পিং, মারাইনথং, আলীকদম- দ্বিতীয় পর্ব

পাহাড়চুড়ায় ক্যাম্পিং, মারাইনথং, আলীকদম- প্রথম পর্ব

অনেকটা উঠে যাবার পরে ধীরে ধীরে নিচের ভ্যালিটা পরিস্কার হচ্ছে। উপর থেকে এই জায়গাটা কি সুন্দর, নিচ থেকে বোঝার কোন উপায়ই নাই। পাহাড়ের একদম শেষদিকে একটা ফ্ল্যাট টাইপ জায়গা। আমি গিয়েই দুম করে শুয়ে পড়েছি। এতোক্ষণে একখান সমতল পেলাম। এখানেই টেন্ট পিচ করে থেকে যাবো কিনা চিন্তা করছি। অনুপ আর দেবু বলে মামা আরেকটু উঠলেই পুরোটাই নাকি সমতল! ওটাই লাস্ট পয়েন্ট। সুতরাং আর ১০০ ফিট মতন উঠতে হবে। উপরে উঠার পথে কিছুদূর উঠেই কনক্রিটের স্ট্রাকচার চোখে পড়ছে। আমরা জানি এখানে একটা বৌদ্ধমন্দির আছে। সবাই এই জায়গাটা মন্দির নামেই জানে। সুতরাং পথের শেষ। পৌছে গেছি পাহাড়চুড়ায়!

বৌদ্ধমন্দির

উপরে উঠে দেখি আমরাই একমাত্র গ্রুপ না। অলরেডি ১০ জনের আরেকটা গ্রুপ ওখানে টেন্ট পিচ করে রিলাক্স মুডে বসে আছে! সে যাই হোক আমরা ওদের পাশে টেন্ট রেখে আরেকটু উপরে একটা জায়গা আছে ওখানে চলে গেছি। তখন সন্ধ্যা ছুইছুই। কুয়াশায় ঢেকে গেছে সবদিক। মন্দিরটা একপাশে। আমরা ওই জায়গা থেকে মন্দিরটাকে ভালো মতোন দেখছি না। অনেকগুলো ছবি তোলা হলো কারণ আলো কমে যাচ্ছে। নিচে নেমেই আমরা টেন্ট পিচ করা শুরু করলাম। আমার একটা টেন্ট আর একটা অনুপের। দুটো টেন্টে ৬ জন অনায়াসে থাকা যাবে। আমরা মানুষ ৪ জন। এবারই প্রথম টেন্ট অনুয়ায়ী মানুষ কম মনে হচ্ছে! দেবু আর অনুপ এতো ওস্তাদ এসব কাজে, ১৫ মিনিটেই দুটো টেন্ট পিচ হয়ে গেছে। হঠাৎ ভাবলাম ফানুস উড়ানো দরকার। এতো সুন্দর জায়গা এসে একটু উদযাপন না করলে কেমনে কি! ফানুসটা কেমন পড়ে যাচ্ছিলো, আবার সুন্দর উড়ে গেছে। ফানুসটা বাতাসে ভাসকে ভাসতে কুয়াশায় মিশে গেছে ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’।

দল আর বাকি সদস্যরা

জায়গাটার একটু বর্ণনা দেই এবার। মারাইনথং, আমরা যে পাহাড়টা উঠে এসেছি। নামটার মানেটা কি আর জিজ্ঞেস করা হয়নি কাউকে। অনুপ জিপিএস বের করে দেখালো হাইট ৫০০ মিটার বা ১৬০০ ফিট মতোন। উপরে উঠার পর জায়গাটা একদমই সমতল। এবং মাঝে দুটো বড় গাছ আছে। জায়গাটা বেশ বড়ই। একপাশে বড় একটা বৌদ্ধমন্দির আর তার পাশে ছোট আরেকটা। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো বুদ্ধ স্বয়ং এ জায়গাটার গার্ডিয়ান এন্জেল হিসেবে রয়েছেন। পাহাড়ের সমতল অংশের বাকি সবদিক খাড়া নিচে নেমে গেছে। আমার অনেকদিন আগে থেকে এই জায়গায় ক্যাম্প করার ইচ্ছে। কিন্তু সময়-সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

সন্ধ্যা ৬ টা। কুয়াশায় ঢেকে গেছে মনে হচ্ছে সবদিক। ঠান্ডা ঠান্ডা একটা অনুভূতি। উপরে উঠে আসার সময় ঘামতে ঘামতে পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু উপরে উঠে কিছুক্ষনের ভেতর ঠান্ডা লাগছে। একটু বৃষ্টি আশা করছিলাম। বৃষ্টি হলে পরদিন ভোরে পুরো জায়গাটা মেঘে ঢাকা থাকে। টেন্ট থেকে বের হয়ে মেঘ দেখবো এটা কতদিনের আশা! দেখা যাক। রাত ৮ টার দিকে চাঁদ উঠে গেছে। মাত্র আগের সপ্তাহেই পূর্ণিমা ছিলো। আর তখন নাকি অনেকজন ছিলো এখানে। তবে সেদিক থেকে আমরা বেশ ভালো আছি। লোকজন কম। পুরো জায়গাটার মধ্যে একটা অদ্ভুত নৈঃশব্দ। লোকজন বেশি হলে এই জিনিসটা পাওয়া যায় না। চাঁদের অল্প অল্প আলোতে জায়গাটা কেমন মায়াময় হয়ে রয়েছে। কবিতা বা উপন্যাস লিখি না বা পড়িও না। তা না হয় এখানে কবিতার আস্ত একখান বই লিখে ফেলা কঠিন কিছু না! জীবনে আর রোমান্টিক হতে পারলুম না! (এটাকে অবশ্য আশির্বাদ হিসেবে দেখি আমি!)

রাত ৯ টার দিকে ক্ষুধায় মাথা নষ্ট অবস্থা। দেবু পেনস্টোভ বের করেছে। অনুপ নুডলস বের সসপ্যানে ঢেলে পানি দিয়ে রান্না শুরু করেছে। অনুপের মতে আমরা নাকি এখানে সারভাইভাল প্রাকটিস করতে গেছি! পাশের টেন্ট গুলোর ফাঁক থেকে মুরগি, বিরানীর গন্ধ ভেসে আসছে আর আমরা ঠিক তার পাশে কাঁচা নুডলস সিদ্ধ করছি! সেলুকাস ব্যাপারটা বোঝার জন্য এধরনের পরিস্থিতি দেখার প্রয়োজন রয়েছে! যাই হোক, পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। একবার এমন পরিস্থিতিতে কাঁচা নুডলস পর্যন্ত খেয়ে সারারাত ছিলাম। এটা তার থেকে ভালো! নুডলস আনা হয়েছে প্রচুর। আসল কথা এটা সেদ্ধ অবস্থায় কোনকিছু ছাড়া বেশি খাওয়া যায় না। দু’প্যকেট খেয়ে আমরা এদিক-সেদিক ঘুরতে বের হয়েছি। এই জায়গাগুলো আড্ডা দেবার জন্য যাকে বলে অতিশয় উত্তম। আড্ডা না দিলেও শুধু চুপচাপ বসে থাকলেও বোরিং লাগবে না। ফিলসফি, মিউজিক, সাহিত্য হ্যানত্যান কথা বলতে বলতে রাত ১০টার উপর বেজে গেছে। ফানুস আছে আরো তিনটা। কিন্তু কেমন যেনো আড়ষ্ট হয়ে গেছি। মানে কোনকিছুই করতে ইচ্ছে করছে না এরকম টাইপ। ইংরেজিতে High হয়ে যাওয়া একটা ব্যাপার আছে। তার জন্য সাইকডেলিক টাইপ ড্রাগ নিতে হয়, কিন্তু ওসব ছাড়াই কেমন high হয়ে আছি! অনুপ নুডলসে কিছু মিশিয়ে দিলো কিনা ভাবছিলাম। আসলে জায়গাটা এমনই। গেলেই ভালো লাগবে। যারা সাজেক গেছেন পূর্ণিমায় তারা কিছুটা বুঝতে পারবেন। রাত ১১ টার দিকে আবার ক্ষুধা লেগে গেছে। বাকি দুপ্যাকেট নুডলস বের করা হলো। এটা মনে হয় পুরোটা খেতেই পারিনি। বলছিলাম একটু কফি খেতে পারলে মন্দ হতো না। অনুপ দেখি আবার কফির প্যাকেট বের করে আনছে। কিন্তু চিনি ছাড়া খেতে কেমন হবে এটা বলতেই সে দেখি চিনির প্যাকেট নিয়ে আসছে! তার ব্যাগটা যে এতোদিনে একটা মুদি দোকান হয়ে গেছে এটা জানতাম না। সে যাই হোক। সেখানে দুটো মুরগি থাকলে কি এমন দুনিয়ার ক্ষতিবৃদ্ধি হোতো তা জানতেই পারলুম না! (এরকম নুডলস খেয়ে সারভাইভাল প্রাকটিস যদি লাইভ দেখানো হয় টিভিতে। আমার ধারণা লোকজন হাসতে হাসতে মরে যাবে!)

রাত ১২ টা। আর একটা কথা বলাই হয়নি। রাত ৯টার দিকে ঢাকা থেকে আরেকটা গ্রুপ এসছে সেটাও মোটামুটি ১০জনের। ওরা এসে আমাদের পাশেই টেন্ট পিচ করেছে। তবে একটা ব্যাপার খুব ভালো লেগেছে এখানে কোন হইচই করা লোকজন নেই। এরকম কিছু ট্যুরিস্ট গ্রুপ দেখি মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হয়। তবে ধীরে ধীরে আমাদের মেন্টালিটি চেন্জ হচ্ছে এটাই বড় ব্যাপার। আমরা ওই জায়গায় মনে হয় ২৫ জনের মতন ছিলাম কিন্তু কারো শব্দ কাউকে ডিস্টার্ব করছে না। যে যার মতোন আড্ডা দিচ্ছে। বা বসে বসে চাঁদ দেখছে। বাংলাদেশে শান্তির জায়গা দিনদিন কমে যাচ্ছে। তবে এখনো কিছু জায়গা আছে যেখানে মনের মতন থাকা যায়। একটু খুঁজে নিতে হয় এটাই মূল ব্যাপার।

আড্ডা দিতে দিতে সময় কোনদিকে পার হয়ে যায় বোঝা যায় না। রাত ১ টা মতন বাজে। সকাল ৬ টায় রওনা দিয়েছি। তারপর আর রেস্ট নেই কারো। দেবুর শরীর খারাপ লাগছিলো। সে আগেই টেন্টে ঢুকে গেছে। রাজ ও একই ব্যাপার। আমার ঘুম আসছিলো না। এটা নিয়ে কততম রাত বন্ধুদের সথে বাইরে আছি সেটা ক্যালকুলটরে হিসেব করতে হবে। একেকটা রাতের অভিজ্ঞতা একেকরকম। কোনরাত থাকে পুরো টালমাটাল, কখনো বা এমন শান্ত ধরণের। টালমাটাল রাতের কথা আসলেই আসবে টাঙ্গুয়ার হাওরে কাটানো রাতগুলোর কথা। কিংবা ছেড়াদ্বীপে প্রথমবার ক্যাম্প করতে গিয়ে যে অসাধারণ অভিজ্ঞতা। নিঝুম দ্বীপের দ্বিতীয় রাতটা তো পুরা কাব্যিক। রাত ৪ টায় আকাশের তারা গুণতে গুণতে প্রায় সকাল হয়ে গেছে। সবগুলো ট্যুরের গল্প এড করলে একটা ছোটখাটো বই হয়ে যাবে। আমার একটা কথা সবসময়ই মনে হয় ট্যুরে গেলে ‘The nights are always young’!

ভোর ৫ টা। রাতে কুয়াশা পুরো বৃষ্টির মতন ঝড়ে পড়েছে। আমাদের টেন্টগুলো ওয়াটারপ্রুফ। নয়তো ভেতরে পানিতে ভাসতে হতো।  টেন্ট থেকে বের হয়েছি । অনেকদিন পর মনে হয় ভোরের সূর্য দেখছি। সূর্যটা একবার উঠে আবার কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। বৃষ্টি হয়নি। নাহলে জায়গাটা মেঘে ঢাকা থাকতো। কুয়াশার জন্য ২০ ফিট দূরে পরিস্কার দেখা যায় না। দেবুকে ডাক দিলাম। ও আর রাজ ঘুমে কাতর। অনুপকে ডাক দিলাম। একাই ওর টেন্টে ছিলো ও। অনেকগুলো ছবি তুলেছিলাম তখন। কুয়াশাঢাকা পাহাড়চুড়া কি যে সুন্দর লাগছে। সৌন্দর্য কিংবা সুখ পুরোটাই সম্ভবত মনের ব্যাপার!

ভোরে উঠে আরেকটা জিনিস চোখে পড়েছে। মন্দিরের কাছেই একটা সিঙ্গেল টেন্ট ছিলো গতরাতে। সকালে সুন্দরমতন এক মেয়ে বের হয়ে ছবি তুলছে। আরো দু-একজন বন্ধুদের সাথে এসেছে। এই জায়গাটা অতোটা রিমোট প্লেস তা বলবো না, তবে মেয়েরা ক্যাম্পিং-এ আসছে এখন এ জিনিসটা দেখা খুব আনন্দের। আমার ইচ্ছে আছে একবার আমার পিচ্চিগুলো বড় হয়ে গেলে বৌ’কে নিয়ে এখানে আসবো। দেখা যাক! (আমার স্ত্রীর ব্যাপক দুঃখ ওকে কোন জায়গা ক্যাম্পিং-এ নিয়ে যাই না) রোমান্টিক জায়গায়। রোমান্স করার লোকজন না থাকলে কেমনে কি! হয়তো আমার মেয়েগুলো বড় হলে ওরাও এখানে ক্যাম্প করতে আসবে কোনদিন। ওরকম হলে ব্যাপারটা কি অসাধারণ হবে গল্প লিখতে লিখতে চিন্তা করছি।

আমাদের পাশে যারা ছিলো তারা মূলত ইভেন্টের মাধ্যমে এসেছে। আমি মারাইনথং র ডে ছবি দেখে প্রেমে পড়েছিলাম, সে জায়গা এতদিনে। এতোই যে জনপ্রিয় হয়েছে এটা জানা ছিলো না। এই জায়গাটার বিশেষত্বটা হলো, খুব বেশি উচুঁ না হলেও এই উপরের ভ্যালিটাতে সবসময়ই মেঘ থাকে, দ্বিতীয়ত এখানে আসার সময় কোন আর্মি, বিজিবি’র সিকিউরিটি নিয়ে ঝামেলা নেই। আমার জীবনে সত্যিকারের একটা ইচ্ছে ছিলো সাজেকে ক্যাম্প করার। কিন্তু আর্মিরা থাকতে দেয় না এখন। পাহড়চুড়ায় ক্যাম্প করে থাকার ইচ্ছেটা এ জায়গায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তবে একটাই আশা করছি এটা আরেকটা সাজেক হয়ে যাবে না। সাজেকের সত্যিকার ইতিহাস জানলে আপনার হয়তো ওই জায়গা এতোটা ভালো লাগবে না। এখানকার পাহাড়ি পরিবারগুলো এমনভাবেই থাকুক।

সকাল ৭টার দিকে আমাদের পাশের গ্রুপ টেন্ট গুছিয়ে নিচে রওনা হয়েছে। ওদের সবার গন্তব্য ‘ দামতুয়া ঝর্না ‘। এখান থেকে নিচে নেমে বেশ কিছুটা গাড়িতে, তারপর হেঁটে ওই ঝর্নায় যেতে হয়। ওই গ্রুপের একজনের সাথে কথা হলো। ওরা দামতুয়া ঝর্ণা দেখে সেখান থেকে থানচি চলে যাবে (একটু বলে রাখি, আলিকদম থেকে থানচি পর্যন্ত রাস্তাটা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাস্তা যেটা থানচি ব্রিজের একপাশে ডিম পাহাড়ের উপর দিয়ে তিন্দু হয়ে নিচে নেমে এসেছে, যারা ওসব জায়গা গিয়েছেন ছবির মতোন ভেবে নিতে পারবেন), এরপর নাফাখুম, আমিয়খুম দেখে তারপর উনারা ঢাকা ব্যাক করবেন। নাফাখুম, আমিয়াখুম নাম শুনলেই আমার একগাদা সুখের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। উনাকে বললাম ‘সবকিছু দেখে ঠিকঠাক যদি ব্যাক করতে পারেন,  তো ভাববেন দেশের সবচাইতে সুন্দর জায়গাগুলোর কিছুটা দেখে ফেলেছেন’ বেস্ট অব লাক। আমরাও হয়তো দামতুয়া যেতাম তবে দেবুর শরীর নাকি বিশেষ ভালো না। তাই প্ল্যান বাদ দিয়ে সকাল ১০ টা পর্যন্ত ওই জায়গায় বসে ছিলাম। একেবারে কোন লোকজন না থাকলে। জায়গাটা একটুকরো স্বর্গ!

আমরা নিচে নামতে শুরু করেছি। গতকাল যেটাতে উঠতে আড়াই ঘন্টা লেগেছে ওটা আমরা ১ ঘন্টায় নেমে গেছি। তবে পাহাড়ে ওঠার থেকে নামাটা সবচেয়ে রিস্ক। গ্রাভিটি বেপারটা সুবিধার না। উঠতেও কষ্ট, নামতেও। বৃষ্টি হলে এ জায়গা তে নামতে সাবধানে নামা উচিত নয়তো। দুপাশের খাড়া পাহাড়ে একদম পপাত ধরণীতল!

নিচে নামার সময় সমস্যায় পড়ে গেছি। ১০ লিটার পানির এক ফোঁটাও নাই। মাথার উপর সূর্যমামা ভালো পেইন দিচ্ছে। দেবু আর অনুপ পায়ে স্প্রিং লাগাইছে আমার ধারণা। আমি যথারীতি সবার পেছনে! আমার অল্প সামনে রাজ ছেলেটা। মাঝে তৃষ্ণায় অস্থির হয়ে এক পাহাড়ি দাদা থেকে দুটো কমলালেবু নিয়ে নিয়েছি। কিন্তু চামড়া ছিলে খাবার টাইম নাই। তেতো স্বাদের চামড়া সহ কচকচ করে খেয়ে একটু ভালো লাগছে! ভিটামিন সি পানির তৃষ্ণা দূর করে দিয়েছে।

একদম নিচে নেমে সবার আগে চলে গেছি এক টিউবওয়েলে। পানির অপর নাম জীবন এটা ভুল না। এক লিটার জল খেয়ে একটা পাড়ার সামনে দোকানে বসে চা খেলাম। ওটা সম্ভবত ত্রিপুরা পাড়া। আমরাও একটা ঝর্ণাতে যাবো, ওখান থকে কাছেই। ওই দোকানে ব্যাগ রেখে সবাই রওনা হয়েছি ঝর্ণার দিকে। যাবার সময় দেবু একটা কথা বলছে,  ‘মামা, তোর হাঁটার ব্যালান্স নাই’। আসলে ও আর অনুপ অনেক বেশি পাহাড়ে যায়। পাহাড়ে চড়ার মূল নিয়ম হলো ধৈর্য রেখে ধীরে ধীরে উঠতে হয়। তাড়াহুড়ার কোন ব্যাপার নেই। তার উপর আমার জল খেতে হয় অনেক বেশি। তবে ধৈর্য জিনিসটা কম হবার কারণে পাহাড়ে উঠতে বেশি কষ্ট হয় আমার।

পাড়া থেকে ১৫ মিনিটের দূরত্বেই ঝর্ণাটা। এটা আসলে এই পাড়ার পানির একটা সোর্স। আমরা ১০ মিনিট ঝিরিপথে হেঁটেই ঝর্ণায় চলে গেছি। এতো কাছে যে একটা ঝর্ণা আছে তেমন কেউ জানেই না। ওখানে গিয়ে দেখি আরো কিছু লোকাল লোকজন আছে। আমাদের দেখে তারা সরে গেছে। এগুলো বাঙ্গালি। সত্যিকারভাবে বলতে গেলে চাঁটগাইয়া। আশেপাশে বাড়ি। ওদের সাথে কথা বললাম। আমরাও চিটাগং এর (অনুপ অবশ্য চাঁটিগার না, তবে সে এতো বেশি চিটাগং আসে ওকে চিন্তা করতেছি এবার নাগরিকত্ব দিয়ে দিবো পারমানেন্ট)। আমি সবসময়ই বলি নতুন কোন জায়গা গেলে অবশ্যই লোকাল লোকজনের সাথে কথা বলা উচিত। সে পাহাড়ি বা বাঙ্গালি। ওরাই আপনাকে ওখানকার সব কথা বলে দিবে। আপনি অপরিচিত কাউকে জিজ্ঞেস করবেন ‘কেমন আছেন’, এই অল্প একটু কথাবার্তা আপনাকে ওদের আপন করে দিবে। আমরা ঝর্ণায় বসে আছি। খুব বেশি বড় জায়গা না। বড় পাথরের চাঁতাল আমরা ৪ জন ব্যালান্স করে বসছি। উপর থেকে সমানে পানি পড়ছে মাথার উপর। লোকাল লোকজনগুলো খুশি হয়ে পেয়ারা নিয়ে আমাদের জন্য কোন এক গাছ থেকে। আশপাশ পুরোটা জঙ্গল। গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত যত না ক্লান্তি। সব মনে হয় একবারে শেষ। পাহাড়ি ঝর্ণাগুলোর মতোন রিফ্রেশিং কিছু হতে পারে না।

আমরা মনে হয় দুঘন্টার উপর বসে ছিলাম ওখানে। ওখানে বসে আড্ডা দিচ্ছি আর মনে হচ্ছে ‘জীবনটা বেশ কিছুটা সুন্দর’। তবে ঝামেলা হলো নামতেই ইচ্ছে করছে না। এই ঝর্নার উপরে অনেকগুলো স্টেপ আছে, যারা খইয়াছড়া ঝর্নায় গেছেন তারা বুঝতে পারবেন। আমরা একদমই নিচে বসা। পাহাড়ি ঝর্নাগুলোর আমরা যে অংশটা দেখি আর ভাবি এটাই প্রথম বা এটাই একমাত্র স্টেপ৷ কিন্তু এর উপরে আরো যে কত স্টেপ আছে তা না দেখলে নিচ থেকে বোঝার উপয় নেই। এখানে দু-তিনটি পানির পাইপ টানা আছে যেটা দিয়ে পাহাড়ি কোন পরিবারে সরাসরি পানি চলে যাচ্ছে।

আমরা আবার পাহাড়ি পাড়াটাতে চলে এসেছি। আবার চা, বিস্কিট, কলা খেলাম আমরা। এখানেও বেশকিছু পাহাড়ি পিচ্চি আছে। ওগুলোর সাথে কিছু ছবি তুলে আমরা রওনা দিয়েছি। এখন বাড়ি ফেরার পালা। আবার গতকালকের সেই স্টার্টিং পয়েন্টে। পাশে এক রেস্টুরেন্ট থেকে ভাত খেয়ে বাসে উঠে চকরিয়া চলে এসেছি। এরপরের গল্প খুব সিম্পল কক্সবাজারের বাসে চিটাগং চলে এসেছি ৪ জনই। রাজ ছেলেটা বিদায় নিয়েছে ব্রিজের গোড়া থেকে। আমরা তিনজন ওখান থেকে দামপাড়ায় গেলাম অনুপ রাতের বাসে ঢাকা যাবে তার টিকেট করতে, ওখান থেকে সরাসরি রয়েল হাটে। অনুপরে বললাম কালকে রাতে চিকেন খেতে দেস নাই, তোরে খাওয়াই আজকে। তিনজনেই ডাবল ডাবল খেয়ে স্টেডিয়ামের পাশে বিখ্যাত এক চায়ের দোকান চা খেতে খেতে আড্ডা দিলাম অনেকক্ষন। পরে অনুপকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে আমি আর দেবু বাসার দিকে রওনা দিয়েছি।

পাহাড়ে কেনো যাই? উত্তর একটাই- Happiness Is Out There!

লেখকের আরো কিছু ভ্রমণ অভিজ্ঞতাঃ

চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (১ম পর্ব)
চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (২য় পর্ব)
চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (৩য় পর্ব)
চন্দ্রগ্রস্ত রাত… এবং একটি জুমঘর! (৪র্থ পর্ব)
এইসব দিনরাত্রি…. টাঙ্গুয়ার হাওর… টাইমলাইন ৩/৭/১৫

Most Popular

To Top