ক্ষমতা

সভ্য জগতে এক পাশবিকতার গল্প…

আসিয়া বিবি পাকিস্তান নিয়ন আলোয় neonaloy

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

একবার এক ইহুদী মহানবী (সাঃ) এর আবাসস্থলে এসে রাত্রি যাপনের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করলে, নবীজী সানন্দে তাকে অনুমতি দিলেন এবং যথাসম্ভব আপ্যায়ন করলেন। নিদ্রার জন্য তাকে সবচাইতে ভালো বিছানা দিলেন। কিন্তু ইহুদী ব্যক্তির উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, তার অন্তরে ছিল কুমতলব। রাত অধিক হলে সে বিছানার ওপর মলমূত্র ত্যাগ করে এবং তারপর দ্রুত বেরিয়ে পড়ে।

অনেক দূর আসার পর হঠাৎ তার স্মরণে আসলো, তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে তার অতীব প্রয়োজনীয় তলোয়ারটাই ফেলে এসেছে। আর ঐ যুগে তলোয়ার বাদে ভ্রমণের কথা চিন্তাই করা যেতো না। উপায়ন্তর না দেখে অগত্যা লোকটি মহানবীর (সা:) বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরতি যাত্রা শুরু করলো। ভিতরে ভয়ের পাহাড় তার সমস্ত দেহের মধ্যে ঝাঁকুনির উদ্ভব ঘটাচ্ছে, না জানি মোহাম্মদ(সা:) বিছানা নোংরা করার জন্য তাকে কি শাস্তি দেন!

ইহুদী ব্যক্তি বাড়িতে উপস্থিত হয়ে লক্ষ করলো, মহানবী (সাঃ) নোংরা বিছানা পরিষ্কারের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। হজরত মোহাম্মদ (সা:) ইহুদী ব্যক্তিকে দেখে কাতর স্বরে বললেন,

“না জানি এই নোংরা বিছানায় ঘুমাতে তোমার কতই না কষ্ট হয়েছে। তুমি আমাকে ডেকে দাওনি কেন, তাহলে তো তোমার জন্য নতুন বিছানার ব্যবস্থা করে দিতে পারতাম? আর এই নাও তোমার তলোয়ার, তুমি ভুল করে রেখে গিয়েছিলে, আমি যত্ন করে তুলে রেখেছি”।

ইহুদী ব্যক্তি নবীজীকে ঘায়েল করতে যেয়ে নিজেই ঘায়েল হলো। আবেগে আপ্লুত হয়ে সে মহানবী (সাঃ) কে জড়িয়ে ধরল এবং বলল, “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াআশহাদু আন্না মহাম্মাদান আবদুহু ও রাসূলুহু” (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই, আমি আর সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মোহাম্মদ (স:) আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল)।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে প্রচলিত এই ঘটনাটি কতটুকু সত্য-সেটা নিয়ে অনেকেই সহমত-দ্বিমত জানাতে পারেন। তবে এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে মুসলমানদের ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা দেওয়া হয় মহানুভবতা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা এবং ধৈর্যের।

এখন চলুন দেখে আসা যাক, প্রিয় নবীর উম্মত, স্বঘোষিত সাচ্চা মুসলমানদের দেশে অমুসলিমদের সাথে কিরুপ ব্যবহার করা হচ্ছে।

২০০৯ সালের কোন এক দিন। অন্য সকল সকালের মতোই নিত্যদিনের গৃহস্থের কাজ করছিলেন দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় ইথান ওয়ালি গ্রামের আসিয়া নরিন, অবশ্য এখন তিনি বিশ্ববাসীর কাছে আসিয়া বিবি নামেই অধিক পরিচিত। ফল তোলার এক ফাঁকে ক্লান্ত হয়ে প্রতিবেশীর বালতি থেকে পানি খেয়েছিলেন একটি কাপে করে। ওইখানেই ঘটে বিপত্তি।

আসিয়া বিবি পাকিস্তান নিয়ন আলোয় neonaloy

আসিয়া বিবি

তখন তার প্রতিবেশীরা দাবি করেন, যেহেতু আসিয়া অমুসলিম, তার স্পর্শ করা ঐ পানি তারা খেতে পারবেন না, কারণ ঐ পানি এখন নোংরা হয়ে গেছে। এবং আসিয়াকে মুসলিম হতে হবে। এবং সে সময় আসিয়া বিবির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় বাদীপক্ষ অভিযোগ করেছিল, গ্রামের মহিলারা আসিয়াকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হতে বললে আসিয়া নবী মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। পরে আসিয়া বিবিকে তার বাড়িতে গিয়ে মারধর করা হয়। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, সে সময় আসিয়া বিবি ইসলামের নবী মোহাম্মদ (সাঃ) কে অবমাননা করার কথা স্বীকার করেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের তদন্তের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর ব্লাসফেমির অভিযোগে ২০১০ সালের নভেম্বরে শেখপুরের বিচারক আসিয়া বিবিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন তিনি এবং তখনই আসিয়া বিবি বিশ্ববাসীর নজরে আসেন। বিভিন্ন পরিসর থেকেই তার মুক্তির আহ্বান আসে, পোপ ফ্রান্সিস এবং পোপ বেনেডিক্ট তার মুক্তির জন্য চিঠি লেখে পাঠান পাকিস্তান সরকারের কাছে, ‘ভয়েস অব দ্যা মার্টায়ার’ নামক সংস্থা বিশ্বব্যাপী চার লাখ মানুষের স্বাক্ষর নেয় তার মুক্তির জন্য।

আসিয়া বিবি পাকিস্তান নিয়ন আলোয় neonaloy

আসিয়া বিবি’র মুক্তি এবং ব্লাসফেমি আইন বাটিলের দাবী জানিয়ে পাকিস্তানের রাস্তায় বিক্ষোভ

আসিয়া বিবির মামলা নিয়ে পাকিস্তান এতটাই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে যে সেখানে আসিয়া’র পক্ষে এবং ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে কথা বলায় পাঞ্জাব রাজ্যের গভর্ণর সালমান তাসির এবং মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিকে প্রাণ দিতে হয়। শুধু তাই নয়, সালমান তাসিরের হত্যাকারী, তার নিজের দেহরক্ষী, মুমতাজ কাদিরকে যদিও এই হত্যার দায়ে ফাঁসি দেয়া হয়, পাকিস্তানের কট্টরপন্থী ইসলামী দলগুলো মুমতাজকে তাদের নায়কে পরিণত করে। ইসলামাবাদের উপকন্ঠে মুমতাজ কাদরি’র সমাধিসৌধ তাদের জন্য রীতিমত তীর্থস্থানে পরিণত হয়। এমনকি মুমতাজ কাদরি’র সমর্থকরা একটি রাজনৈতিক দল পর্যন্ত গঠন করে, এই দলের নামই তাহরিক-ই-লাবাইক। এরা ব্লাসফেমি আইন রদ করার বিপক্ষে। গত নির্বাচনে এই দল প্রায় বিশ লাখ ভোট পেয়েছে।

আসিয়া বিবি পাকিস্তান নিয়ন আলোয় neonaloy

আসিয়া’র ফাঁসীর রায় বহাল চেয়ে বিক্ষোভে নামা টিএলপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশ

মূলত, তাহরিক-ই-লাবাইকই অন্যান্য সকল উগ্রপন্থী সমর্থকদের সাহায্যে সম্প্রতিকালে আসিয়া বিবিকে নির্দোষ প্রমানের রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আসিয়া বিবির বিরুদ্ধে মামলাটিতে বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রমাণ হাজির করা হয়নি। জনসম্মুখে আসিয়া বিবিকে হত্যার হুমকি দেবার পর তিনি দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন বলে আদালত উল্লেখ করেছে। এ রায়ে বিভক্ত হয়ে গেছে গোটা পাকিস্তান, ফুঁসে উঠেছে তাহরিক-ই-লাবাইকের মতো উগ্র সমর্থকরা। তারা রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদে রাস্তা অবরোধ করেন এবং ভাংচুর শুরু করেন। এ ছাড়া করাচি ও পেশোয়ারের মতো কয়েকটি শহরে মানুষ বিক্ষোভ দেখিয়েছে। এর আগে ১৩ অক্টোবর উগ্র ডানপন্থী তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান (টিএলপি) আসিয়াকে মুক্তি দিলে দেশব্যাপী বিক্ষোভ করার হুমকি দেয়। রাজধানী ইসলামাবাদে গত মঙ্গলবার রাত থেকে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু থামছে না বিক্ষোভ। কট্টরপন্থীদের মদদে ফুলেফেপে উঠছে বিদ্রোহ। সরকার বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্থানে অফিস, আদালত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। বিদ্রোহীরা চড়াও হয়েছে আসিয়া বিবির এবং তার সমর্থকদের পরিবারের উপরেও। আসিয়া বিবির স্বামী তার চার সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আসিয়ার আইনজীবী সায়িফ মু্ল্লুকও রায়ের পর দেশ ছেড়েছেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তার জন্য আসিয়া বিবিকে আগেই দেশের বাইরে পাঠানো উচিৎ ছিল। জানালাবিহীন সেলের ভিতরেও গত মাসে দু’বার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় আসিয়া বিবির স্বামী বলেছেন, পাকিস্তানে তিনি প্রাণভয়ে আছেন। “আমি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি যে তিনি যেন আমাদের সহায়তা করেন,” বলেছেন আসিয়া বিবির স্বামী। তিনি একই সাথে কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন। এর আগে জার্মান সংবাদ মাধ্যম ‘ডয়েচে ভেলেকে’ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আসিয়া বিবির স্বামী তার পরিবারের সদস্যদের জীবন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

আসিয়া বিবি ইস্যুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভের নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। গত বুধবার টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন,

“যেসব কট্টরপন্থী বিক্ষোভ করেছেন তারা মূলত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে কাজ করছেন। তারা ইসলামের জন্য কিছু করছেন না। ইমরান খান আরো বলেন, বিক্ষোভের মাধ্যমে যখন এভাবে ব্লাকমেইল করা হয় তখন কোন সরকার তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারে? এর ভুক্তভোগী হয় আমাদের পাকিস্তানিরা, সাধারণ জনগণ, গরিব মানুষ। আপনারা রাস্তা অবরোধ করে সাধারণ মানুষের জীবিকা ডাকাতি করছেন। এটাকে ইসলামের জন্য কাজ করা বলে না। এটা দেশের সঙ্গে শত্রুতা। বিচারপতিদের হত্যা করা উচিত এমন কথা শুধু রাষ্ট্রবিরোধীদের পক্ষেই বলা সম্ভব। এমন কথায় সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহের সূচনা হতে পারে। এর মাধ্যমে বিক্ষোভকারীরা শুধু তাদের ভোটব্যাংক শক্তিশালী করতে চাইছেন।”

এদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী বলছিলেন, আসিয়া বিবিকে রক্ষার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, “একটা পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে এবং আমরা সেটি মোকাবেলা করছি। আমি নিশ্চয়তা দিতে চাই যে তার জীবন ঝুঁকিতে নেই।” তিনি আরও বলেছিলেন, “শীঘ্রই বিক্ষোভকারীদের সাথে বসা হবে, তাদের দাবিদেওয়া শুনে সমঝোতা করা হবে”।

অন্যদিকে, তেহরিক-ই-লাব্বাইক (টিএলপি) প্রধান খাদিম হোসেন রিজভি বলেছিলেন, আসিয়া বিবিকে দেশের বাইরে পাঠালে কোন আলোচনায় বসা হবে না। বাইরে পাঠানো হবে না এই শর্তেই টিএলপি বৈঠকে বসবে। তিনি আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি মিয়া সাকিব নিসারের ফাঁসি হওয়া উচিৎ।

আসিয়া বিবি পাকিস্তান নিয়ন আলোয় neonaloy

টিএলপি প্রধান খাদিম হোসেন রিজভি

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত তিন নভেম্বর তেহরিক-ই-লাব্বাইক (টিএলপি) সাথে সমঝোতা হয়েছে ইমরান খান সরকারের। মুক্তি পাওয়ার পর আসিয়া তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারে এমন আভাসের মধ্যেই টিএলপি ও সরকারের মধ্যে সমঝোতাটি হয়। এই চুক্তির পর আন্দোলনকারীদের চলা বিক্ষোভ থেমে যায়। সমঝোতা অনুযায়ী সরকার আসিয়ার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেবে এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিলেরও সুযোগ থাকবে। এছাড়া আন্দোলন চলাকালীন সময়ে যাদের আটক করা হয়েছে, সরকার তাদের ছেড়ে দিলেও যারা সহিংসতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে। এর বদলে টিএলপি বিক্ষোভ বন্ধ করবে এবং সমর্থকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে নেবে।

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিবিসিকে তিনি জানান, এখনই উগ্রবাদ দমন না করতে পারায় এ পথেই হাঁটতে হচ্ছে তাদের। কেননা, সরকার ধারণা করছে, এই অস্থিতিশীল অবস্থার সুযোগ নিতে পারে অন্যান্য জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top