নাগরিক কথা

যৌন হয়রানী’র শেষ কোথায়?

যৌন হয়রানী’র শেষ কোথায়?

নিত্যদিনের সকালের খবরের কাগজের মধ্যে বিদ্যমান খবরের মাঝে ধর্ষণের খবর যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজের মাঝে এই ধর্ষণ যেন এক অভিশাপ, যেই অভিশাপ প্রতিটি নারীর নিরাপত্তার মাঝে এক বিশাল বাধা। ধর্ষণ শুধু কি কোন নারীর সাথে জোরপূর্বক শারীরিক অত্যাচার নাকি যৌন হয়রানিও এর মধ্যে পড়ে? প্রশ্নটা আপনাদের কাছেই রইলো। ভেবে অবাক হবেন আমাদের দেশের প্রায় ৯৪% নারী সড়ক পরিবহন, শারীরিক ও অন্যান্য রূপে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়তই। ভেবেই দেখুন না আমাদের মা-বোন, স্ত্রী, মেয়ে, নারী আত্মীয়স্বজন তারা কি আসলেই রাস্তা-ঘাটে নিরাপদে আছে নাকি নিজ ইজ্জত হারানোর ভয়ে প্রতিনিয়তই নিজের অস্তিত্বের সাথে যুদ্ধ করে চলছে? আমরা জাতি হিসেবে বড়ই অদ্ভুত। আমি আজ লেখছি ধর্ষণের বিষয় নিয়ে। কিন্তু আফসোস কাল সকালে আবার খবরের কাগজে ধর্ষণের খবর দেখে অন্য খবরের দিকে তাকাবো। কিন্তু মনে রাখবো না এই ব্যাধি কিভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে যাচ্ছে। জাতি হিসেবে আপনি আমি কি একবারও ভাববো? নাকি প্রতিদিনের মত এড়িয়ে চলে যাবো? চলুন আজ দেখি সমাজের একটি ব্যাধির অবস্থা যেটি নিয়ে আমাদের সমাজে কথা বললে জাতি হয়ে যায় দ্বিখন্ডিত, তৈরি হয় নানা মতভেদ, কিন্তু এর সমাধান নিয়ে নেই আমাদের সামান্য মাথাব্যথা।

নারী নির্যাতন নিয়ন আলোয় neonaloy

১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০১৮-তে প্রকাশিত এক খবরে দেখা যায় যে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন যে, ২০১৪ সালের জানুযারী মাস থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৭,‌২৮৯ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে। যার হিসেব অনু্যায়ী বলা যায় প্রতিদিন গড়ে ১২ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে। আপনি বা আমি কতটুকু এই বিষয় নিয়ে অবগত? বলতে পারবেন কি? জেনে আরো অবাক হবেন এদের মাঝে ১৩,৮৬১ জন হচ্ছে নারী আর ৩,৫২৮ জন হচ্ছে শিশু। বাহ, কি জাতি আমরা প্রতিদিন গড়ে ৩ জন শিশুকে ধর্ষণ করতে আমরা ক্ষান্ত হই না। আফসোস এর মধ্যে মধ্যে ৬৭৩ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং ৩,৪৩০ টি মামলায় আদালত ১৭ টি মৃত্যুদন্ড, ৮০ টি যাবতজীবন কারাগার এবং ৫৭৬ টি ভিন্ন কারাগারে নিষ্পত্তি হয়েছে। আফসোস মাত্র ৪৭৭৬টি ধর্ষণের বিচার হয়েছে আর বাকী ১২,৫১৩টি ঘটনার কোন হদিসই নেই। দোষ সরকারকে দিবো না দিবো আমাদের নিজেদেরকে যে কতটা নিচে নামতে পারি তার সামান্য প্রতিচ্ছবি তুলে ধরলাম। সরকার বিচার করতে পারে। নিরাপত্তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে পারে কিন্তু মানুষের মনোবৃত্তি বদলাতে পারে না।

নারী নির্যাতন নিয়ন আলোয় neonaloy

আচ্ছা এত দূরের হিসেবে যাচ্ছি কেন। চলুন না এই সাম্প্রতিক সময়ের কিছু খবর দেখে আসি। জুলাই ১৭,২০১৮ তে প্রকাশিত একটা খবরে বলা হয়, কমপক্ষে ৫৯২ জন নারী ও শিশু ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাস হতে জুন মাসের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়। যার মধ্যে ৯৮ জন নারী গণধর্ষণের শিকার। আফসোস জাতি হিসেবে আমরা কই যাচ্ছি, যেই জাতি আমদের সমাজের নারীদের নিরাপত্তার জন্য সামান্য ব্যবস্থা করতে পারছি না?

সম্প্রতি ব্র্যাক একটি গবেষণা করে যার বিষয়টা ছিল অনেকটা এই রকম যে “Roads free from sexual harassment and crash for women”, যেখানে বলা হয় যে আমাদের লোকাল বাসে চলাচলের সময় ৯৪% নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয় যার মধ্যে ৪১-৬০ বছরের পুরুষের এই ঘটনার জন্য ৬৬% দায়ী। আমরা যেই জাতি সর্বদাই নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার সেই জাতির নারীদেরকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যৌন হয়রানী শিকার হলে তারা কি করে এর মধ্যে ৮১ ভাগ নারীই বলেছেন তারা চুপ থাকেন। তবে কি আমাদের নারীরাও সমাজের এই ব্যধির কাছে হার মানতে শুরু করেছে? তবে সমস্যাটা কোথায়? কেন বাড়ছে এই ব্যধি সমাজে? এই অন্ত কই?

নারী নির্যাতন নিয়ন আলোয় neonaloy

Humboldt State University তাদের এক গবেষণায় বলেন ধর্ষকদের ধর্ষণের পিছনের প্রধান কারণ হিসেবে তারা যেটি বলে থাকে তা হচ্ছে –“একজন নারীর পোশাক পরিচ্ছদ”। কথাটা আমরা প্রায়শই আমাদের নিজেদের মাঝে শুনে থাকি। বিষয়টা হচ্ছে অনেকটা এই রকম যে কোন নারী যদি আবেদনময়ী কোন পোশাক পরে তখন তাকে নিয়ে আমরা বিভিন্ন রকমের খারাপ সমালোচনায় মেতে উঠি। মূল্যবোধ আমাদের কি এতটাই তবে নিচে নেমে গেল যে আমরা সামান্য পোশাকের আউটফিটেই নারীদের ইজ্জত নিয়ে খেলায় মেতে উঠি?

দ্বিতীয়ত যেই বিষয়টি আমাদের সমাজের বড় একটা অভিশাপ মাদকের জন্য অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সাধারণত ধর্ষকদের অধিকাংশকেই মদ্যপায় অবস্থায় দেখা যায় অথবা নেশাগ্রস্থ। যাকে বলা হয় Drug-facilitated sexual assault (DFSA) অথবা Predator rape.

তৃতীয়ত যৌন সহিংসতা কিছু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে পরিবার থেকেও লব্ধি হয়ে থাকে। দেখা যায় যে পারিবারিকভাবে দেখে আসা যৌন সহিংসতা শিশুগুলোর প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন যৌন সহিংস ব্যবহার তার পরবর্তী জীবনে প্রদর্শন করে।

মূলত এই অভিশাপ ধ্বংস করতে পারি আমরাই। কারণ হাজার গবেষনা করে এর কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে কিন্তু বন্ধ করা কি যাবে? আমাদের উচিত আমাদের ধারণা আমাদের চিন্তার মধ্যে পরিবর্তন আনা। মনে রাখতে হবে আমাদের নারীরা কোন ভোগ্য পণ্য নয়। আমাদের সমাজের সবচেয়ে বাজে জিনিসটি হচ্ছে আমরা প্রতি নিয়তই নারীদেরকে অধীনস্ত করে রাখছি। তাদের স্বাধীনতা যেই ভাবে আমরা খর্ব করছি ঠিক সেই ভাবে তাদের স্বাধীন চলাফেরায়। একজন নারীরও সমান অধিকার আছে রাতে রাস্তায় অবাধে চলাফেরা করার। আর এইটা আমাদের দায়িত্ব যে তার জন্য নিরাপদে অবাধে চলাফেরা করার ব্যবস্থা করার। আমাদের টনক কখন নড়বে?

আমরা কখন সচেতন হবো? যখন আমাদের পরিবারের কারো সাথেও ব্লেড দিয়ে যৌনাঙ্গ কেটে ধর্ষণ করা হবে যেমনটা দিনাজপুরের ৫ বছরের শিশু পূজাকে সারারাত ভর ২ জন ধর্ষণ করে।

কখন আমরা বুঝবো আমাদের নারীদের নিরাপত্তার কথা যখন আমাদের কারো মা বা বোনেরকে ধর্ষণ করা হবে আর বিচার চাইতে গেলে তার বিচার হবে না?

হায় আফসোস এই দেশে সব কিছু নিয়েই আমাদের আন্দোলন হয়, সব কিছুরই বিচার চাওয়া হয়।কিন্তু ইজ্জতের মুল্য এতটাই কম যে তার জন্য বিচার চাওয়া হয় না। তাইতো আমরা নারীদের নিয়ে সমালোচনা করি, ইভটিজিং করি কিন্তু কখনো ভাবি না যে আমাদের ঘরে মা বা বোন আছে। তা না হলে কি আর তনুর মত মেয়েকে ক্যান্টনমেণ্ট মত জায়গায় নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়। আর আমরা তা অবলোকন করে গেলাম কিন্তু পারি নাই বোনের জন্য ন্যায্য বিচারটা ছিনিয়ে আনতে। নিত্য নতুন অনেক বিষয়ই আসবে। আমরা তাকে নিয়ে ট্রল করবো। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা আজ এতটাই অধম হচ্ছি কবে জানি ধর্ষণ নিয়েই ট্রল করে বসি?

নারী নির্যাতন নিয়ন আলোয় neonaloy

পরিশেষে একটা কথা কোন নারী যখন “না” বলে তখন তার এই “না” কে মর্যাদা দিন। তবেই গড়ে উঠবে একটি সুন্দর সমাজ। সমাজটা আমাদের সমান অধিকার নারীদেরকেও দিন এই প্রত্যাশাই সবার নিকট।

তথ্যসূত্রঃ

Study: 94% women victims of sexual harassment in public transport
Bangladesh sees more than 17,000 rape cases registered in four years
Bangladesh witnesses 592 rapes in six months
Bangladesh experiences disturbing rise in child rape
Causes of sexual violence

Most Popular

To Top