গল্প-সল্প

একজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীর গল্প…

আসামী নিয়ন আলোয় neonaloy


সন্ধ্যার পর আফসারউদ্দীন সাহেব একটু ইতস্তত করে বললেন, “আশফাক সাহেব, ভালোমন্দ কিছু খেতে মন চায়? মন চাইলে বলেন। রাতের বেলা আমার বাসা থেকে পাঠিয়ে দেব।”
যাকে বলা হল তিনি নির্বিকার, দেখে মনে হল কী বলা হল কিছুই বুঝতে পারছেন না। আফসারউদ্দীন সাহেব একটু স্বস্তি পেলেন। সাধারণত এরকম পরিস্থিতিতে সবাই ভয় পেয়ে তাকায়, কেউ কেউ আবার বলেই ফেলে, “স্যার আজকেই কি শেষ রাত? কালকে সকালেই কি ঘটনা ঘটবে?” তখন বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হয় তাকে।
তিনি আবার বললেন, “কিছু খেতে মন চাইলে বলেন। আমার সাধ্যমত চেষ্টা করব পাঠিয়ে দিতে।”
গারদের ওপাশে দাঁড়ানো লোকটা এবার মুখ খুলল, ফিসফিস করে বলল, “কিছু লাগবে না, স্যার।”
দীর্ঘদিনের চাকরি জীবনে এরকম উত্তর পেয়ে অভ্যস্ত আফসারউদ্দীন সাহেব। মৃত্যুর ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে পার্থিব ব্যাপারগুলো মূল্যহীন হয়ে যায় অনেকের কাছেই। তিনি একবার ভাবলেন তৃতীয়বারের মত বলবেন নাকি, কিন্তু কী ভেবে শেষ পর্যন্ত আর বললেন না কিছু। কেন যেন তার মনে হল এই লোকটা অন্যরকম। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের জেলার হিসেবে দীর্ঘ জীবন কাটানোর পথে ফাঁসির আসামী তিনি অনেক দেখেছেন। কিন্তু এই লোকটা আর দশটা ফাঁসির আসামীর মত নয়। এই লোকটা অন্যরকম। অবশ্যই অন্যরকম।


আফসারউদ্দীন সাহেবের সাথে যখন আমার দেখা হয় তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, ক্রিমিনলজি, অর্থাৎ অপরাধ বিজ্ঞানে। হলে থাকি। বিকালবেলা একটা টিউশনি করতে যাই, সন্ধ্যার পর দরজা বন্ধ করে পড়তে বসি। মোটামুটি নিরীহ জীবন বলা যায়। আমার নিরীহ জীবনে পরিবর্তন ঘটল যখন সেকেন্ড ইয়ারে ধবধবে সাদা দাঁড়িওয়ালা একজন প্রফেসর আমাদের ক্রিমিনাল সাইকোলজি নামের একটা কোর্স পড়াতে এলেন। ক্লাসে লেকচারের এক পর্যায়ে তিনি মৃত্যুর ঠিক আগে আগে ফাঁসির আসামীদের সাইকোলজি নিয়ে এমন অদ্ভুত কিছু কথা বললেন যে ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকে গেল। নীলক্ষেত থেকে বেশ কয়েকটা মোটা মোটা বই কিনে পড়লাম কয়েকরাত না ঘুমিয়ে। কিন্তু কেন যেন ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। অবশেষে একদিন ক্লাসের পর স্যারের রুমে গিয়ে দেখা করলাম তার সাথে। আমার অবস্থা দেখে স্যার মৃদু হাসলেন। একথা সেকথার পর বললেন, “ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের এক্স জেলার আফসার সাহেব আমার বন্ধু মানুষ। অনেক ফাঁসির আসামী তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তুমি চাইলে তার সাথে দেখা করতে পার। আমি যোগাযোগ করিয়ে দেব। আশা করি তিনি তোমাকে কিছুটা সন্তুষ্ট করতে পারবেন।”

আফসারউদ্দীন সাহেব তখন থাকতেন গেন্ডারিয়ায়। রিটায়ার করার পর পুরনো ঢাকায় বেশ কিছুটা জায়গা কিনে বাড়ি করেছেন। ভদ্রলোককে দেখে আমার খুব একটা পছন্দ হল না। তিনিও মনে হল আমাকে দেখে একটু বিরক্ত হলেন। মনে হল, তিনি কথা খুব কম বলেন। প্রথমে তিনি কিছুই বলতে চাইলেন না। একবার শুধু বললেন, “সব একইরকম ব্যাপার। আলাদা করে বলার কিছু নেই।”
আমি এত সহজে ছাড়ার পাত্র না। বেশ কিছুক্ষণ জোরাজুরি করার পর তিনি মুখ খুললেন। আমাকে আশফাক হাসান নামের একজন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীর কথা বললেন। আমি একটু অবাক হলাম। গল্পটা ছিল খুবই সাধারণ। আলাদা করে মনে রাখার মত কিছু না। একটু ইতস্তত করে আমি অবশেষে বলেই ফেললাম, “ইয়ে……মানে……এখানে আলাদা করে মনে রাখার মত কী আছে? এটা তো খুব সাধারণ ঘটনা।”
ভদ্রলোক মনে হল সিগারেট ছাড়ার চেষ্টা করছেন। পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন, কিন্তু ধরাবেন কিনা সে বিষয়ে সম্ভবত মনস্থির করতে পারলেন না। কয়েক মুহূর্ত প্যাকেট হাতে নিয়ে বসে থাকার পর অবশেষে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুজলেন, তখনি বুঝতে পারলেন হাতের কাছে আগুন ধরানোর মত কিছু নেই। তিনি চিৎকার করে রেবা নামের কাউকে বললেন একটা দিয়াশলাই দিয়ে যেতে। মেয়েটা সম্ভবত তার নিজের মেয়েই হবে, সেও মনে হল চায় না যে তার বাবা সিগারেট ধরাক। দিয়াশলাই দিতে এসে এমনভাবে আমার দিকে তাকালো যে মনে হল তার বাবার সিগারেট খাওয়ার জন্য আমিই দায়ী।
যাই হোক, ভদ্রলোক সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে কিছু একটা ভাবলেন, তারপর বললেন, “এত লোকের মধ্যে এই লোকটার কথা আলাদা করে কেন মনে রেখেছি তা আমিও ঠিক বলতে পারব না। তবে সে রাতে একটা ঘটনা ঘটেছিল।”

আমি একটু কৌতূহলী এবার। বললাম, “কী ঘটনা?”
“সে রাতে এগারোটার দিকে জেলখানা থেকে আমার বাসায় একটা টেলিফোন আসে। আমাকে বলা হয়, বাইশ নাম্বার সেলের কয়েদী অর্থাৎ এই আশফাক লোকটা নাকি খুব ছটফট করছে। বারবার বলছে জেলার সাহেবকে অর্থাৎ আমাকে একটু খবর দিতে। কী একটা নাকি সে বলতে চায় আমাকে।”
“আপনি গেলেন?”
“শীতের সময় ছিল। সেই রাতে অনেক বেশি শীত ছিল। একবার ভাবলাম যাব না। পরে কী মনে করে যেন গেলাম। আসলে অনেকদিন ধরে জেলখানায় চাকরি করার পর আসামীদের প্রতি একটা সফট কর্ণার তৈরি হয়েছিল। আর তাছাড়া লোকটার প্রতি আমার কিছুটা কৌতূহলও হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল কোথাও কোনো একটা কিন্তু আছে।”
“কী বলল সে আপনাকে?”

ভদ্রলোকের সিগারেটটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। আশেপাশে কোনো অ্যাশট্রে না পেয়ে তিনি নিজে উঠে জানালা দিয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন বাইরে। তারপর আবার নিজের জায়গায় বসতে বসতে বললেন, “যা বলল সেটা একটু অদ্ভুত। সাধারণত সবাই বলে অমুকের সাথে একটু দেখা করতে চায়, তমুকের কাছে একটা চিঠি পাঠাতে চায় এইসব। কিন্তু ইনি এমন কিছু বলল না। শুধু অনুরোধ করল ফাঁসিটা আর একদিন পিছানো যায় নাকি। শুধু একদিন। এমনটা এর আগে কেউ বলে নি।”
“সেটা তো সম্ভব ছিল না আপনার পক্ষে, তাই না?”
ভদ্রলোক একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মনে হল, “না। এটা একমাত্র রাষ্ট্রপতি পারেন।”
আমার কৌতূহল তখনো মেটেনি। মনে হচ্ছিল গল্পের আরো অনেককিছু মনে আছে। একটু সময় দিলাম ভদ্রলোককে, যদি তিনি নিজে থেকেই কিছু বলেন। কিন্তু মনে হল তার কথা শেষ। অপেক্ষা করছেন কখন আমি উঠব। শেষপর্যন্ত আমি বলেই ফেললাম,
“লোকটা কেন তার ফাঁসি একদিন পিছাতে চেয়েছিল তা কি আপনি পরে জানতে পেরেছেন?”

ভদ্রলোক কিছু বললেন না। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম উনি আর কিছু বলবেন না। কিছু মানুষ আছে যারা কিছু রহস্য নিজের মধ্যেই রাখতে পছন্দ করেন। উনি সেই দলের মানুষ। আমি বেশ আহত হলাম। যতটা না কৌতূহল না মেটার কারণে তার চেয়ে বেশি ব্যাথা পেলাম আতিথেয়তার অভাবের কারণে। নিতান্ত অপরিচিত মানুষকেও মানুষ এক কাপ চা খাওয়ায়। এই বাসায় তাও পেলাম না। মনে খারাপ করে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার সিক্সথ সেন্স আমাকে বারবার বলছিল কোথাও নিশ্চয়ই কোনো একটা রহস্য রয়ে গেছে এখনো। সম্ভবত আমার সামনে বসা আফসারউদ্দীন নামের এই ভদ্রলোক আরো কিছু জানেন, কিন্তু বলছেন না। বলবেনও না কোনোদিন। হঠাৎ আমার কিছু একটা হল, একটা প্রচণ্ড কৌতূহল জেগে উঠল আমার ভিতর। মনে হল আশফাক হাসান নামের এই লোক সম্পর্কে আরো অনেককিছু জানতে হবে আমাকে। চলে আসার আগে আমি সাহস করে আমার শেষ চেষ্টাটা করলাম,
“এই কেসের ইনভেস্টিগেশন অফিসার কে ছিল আপনি জানেন?”
“না।” ভদ্রলোক বললেন বেশ রুক্ষ কণ্ঠে। আমার আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস হল না।

আফসারউদ্দীন সাহেবের কাছ থেকে আমি আর কোনো আশা করি নি। কিন্তু আমাকে অবাক করে ঠিক দুদিন পর রাতের বেলা টেলিফোন করলেন তিনি। তখনও দেশে মুঠোফোনের প্রচলন হয়নি বললেই চলে। উনি টেলিফোন করলেন আমার হল অর্থাৎ সূর্যসেন হলের অফিসে। আমি যে সূর্যসেন হলে থাকি এই তথ্য উনি কীভাবে জোগাড় করলেন জানি না। রাতের দশটার দিকে হলের পিওন আমার রুম থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। ফোন ধরতেই ওপাশে আফসারউদ্দীন সাহেবের গলা শুনতে পেলাম। তার কণ্ঠ খুবই স্বাভাবিক, যেন আজ রাত দশটার দিকে তিনি টেলিফোন করবেন এটা আগে থেকেই ঠিক করা। কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি আসল কথায় গেলেন তিনি,
“তুমি আশফাক হাসানের কেসটার ইনভেস্টিগেশন অফিসার কে ছিল জানতে চেয়েছিলে। তোমার জন্যও আমি অনেক পুরনো কেস হিস্ট্রি ঘেঁটে ঘেঁটে সেটা বের করেছি। কেসটার তদন্ত করেছিলেন সানাউল হোক নামের ডিবির একজন অফিসার। উনার অ্যাড্রেস খুঁজতে গিয়ে জানলাম, কোনো কারণে উনি মাঝপথেই চাকরি ছেড়ে দেন। রাজশাহীতে বাড়ি করেছেন নিজের। সেখানেই থাকেন এখন। অ্যাড্রেসটা বলছি, লিখে নাও।”

অ্যাড্রেসটা একবার বলেই খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন তিনি, আমাকে কোনো কথা বলার সু্যোগ না দিয়েই।


হঠাৎ চলে আসা উদ্যম হঠাৎই চলে যায়। আশফাক হাসানের কেসটার ব্যাপারেও তাই হল। ক্রিমিনাল সাইকোলজির ভূতটা আমার মাথা থেকে নেমে গেল একসময়। আমি আবার আমার নিরীহ জীবনযাত্রায় ফিরে গেলাম। সারাদিন ক্লাস, বিকালবেলা টিউশনি, আর সন্ধ্যার পর দরজা বন্ধ করে পড়তে বসা। আশফাক হাসানের কেসটার কথা আমি আস্তে আস্তে ভুলেই গেলাম। সানাউল হোক নামের প্রাক্তন ডিবি অফিসারের ঠিকানা পড়ে রইল আমার ডায়েরীর ফাঁকে, সেটা আর দ্বিতীয়বার খুলে দেখা হল না। ধীরে ধীরে ধূলার মোটা আস্তরণ জমতে শুরু করল তার উপর।

সময় খুব দ্রুত যায়। দেখতে দেখতে আমার ভার্সিটি লাইফ শেষ হয়ে গেল। কয়েকদিন বেকার থাকার পর একটা চাকরিও পেয়ে গেলাম। যদিও পড়াশোনা করেছি অপরাধবিজ্ঞানে, কিন্তু চাকরি পেলাম একটা ব্যাংকে। আমি বেশ সন্তুষ্টই হলাম। বাংলাদেশে চাকরির বাজার সম্পর্কে ততদিনে আমার ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে। আর তাছাড়া ব্যাংকের চাকরিটাও বেশ ভালো ছিল। বেসরকারি ব্যাংক ছিল, মাস গেলে পাওয়া টাকার অঙ্কটাও ছিল বেশ ভালো।

আমার জীবন মোটামুটি সুখেই চলছিল বলা চলে। হল ছেড়ে দিয়ে মালিবাগে দুই রুমের একটা ছোট্ট বাসা ভাড়া করলাম। কয়েকমাস চাকরি করার পর একদিন আমার ব্যাচেলর জীবনেরও সমাপ্তি ঘটল। বিয়ে করলাম আমাদের ভার্সিটির আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই জুনিয়র একজন মেয়েকে। বেশ কাব্যিক একটা নাম ছিল ওর, একা। এখানে আমি একটা ছোট্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলাম। অবশ্য অন্যদের কাছে এটা তেমন সাহসিকতার কিছু নাও হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে রূপবতী যে মেয়েটি, যার সাথে আমি জীবনে কোনোদিন কথাই বলি নি এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে আমাকে চিনতই না এর আগে, তার বাসায় নিজে থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া ছিল যথেষ্ট সাহসের কাজ।

এই গল্প থাক। মূল গল্পে আসি। দিন যায়, দিন আসে। বিয়ের পর আরো বেশ কয়েকটি বসন্ত পার হয়ে গেল। আশফাক হাসান নামের সেই ব্যক্তি আমার জীবন থেকে একরকম হারিয়েই গেল বলা চলে। আফসারউদ্দীন সাহেবের সাথে আমার দেখা হওয়ার প্রায় দশ বছর পর, একদিন হঠাৎ একার দূরসম্পর্কের একজন বোনের বিয়ের দাওয়াত পেলাম আমরা। বিয়েটা হবে রাজশাহীতে। আমার তেমন একটা যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু একার জোরাজুরিতে যেতে হল।

আমি বরাবরই খুব চুপচাপ ধরণের মানুষ। হৈ চৈ খুব একটা পছন্দ করতাম না। রাজশাহীতে এসে বিয়েবাড়ির হৈ চৈ তে মাথা ধরে গেল। বরযাত্রী আসার পর সবাই যখন তাদেরকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমি এক ফাঁকে বিয়েবাড়ির বাইরে এসে বাগানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। তখনই আমার চোখ পড়ল একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের উপর। বাগানের এক কোণে চুপচাপ বসে সিগারেট খাচ্ছেন আর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রাতের নিকষ কালো আকাশের দিকে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমিও তাকালাম। ঢাকায় থাকতে থাকতে ভুলেই গিয়েছিলাম রাতের আকাশ দেখতে কেমন লাগে। ছোটবেলায় গভীর রাতে বাবার পাশে ছাদে শুয়ে আকাশের তারা গোণার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ।

কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে ছিলাম জানি না। একসময় হঠাৎ একার কথায় বাস্তবে ফিরলাম। “কী হল, সবাই বর দেখা নিয়ে ব্যস্ত আর তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছ কেন? তোমাকে না কতবার বলেছি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিতে?”
আমি তার কথার উত্তর না দিয়ে ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করে বললাম, “উনাকে চেন?”
একা বলল, “না তো। তোমার দরকার? আচ্ছা একটু দাঁড়াও, শুনে আসছি।”
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, “না, তেমন দরকার নেই।” কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই একা ভিতরে ঢুকে গেল। বিয়েবাড়ির আনন্দে তখন তার সবকিছুতেই অনেক আগ্রহ। একটু পরেই সে বের হয়ে বলল, “উনার নাম সানাউল হক। আগে পুলিশে ছিলেন, এখন রিটায়ার করেছেন। মিলির বাবার বন্ধু।”

মিলিটা কে আমি ঠিক চিনতে পারলাম না, যদিও আমি ভালো করেই জানতাম যে মিলি হল একার সেই দুরসম্পর্কের বোন যার আজ বিয়ে। বরং সানাউল হোক নামটা শুনে আমি একটু চমকে উঠলাম। নামটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগল। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপরেই সব মনে পড়ে গেল। আফসারউদ্দীন সাহেবের কথা, আশফাক হাসান নামের একজন ফাঁসির আসামীর কথা।
দশ বছর আগের সেই কৌতূহলটা আবার জেগে উঠল আমার ভিতরে। একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গেলাম আমি। একটা চেয়ার টেনে বসলাম ভদ্রলোকের সামনে। ভদ্রলোক মাথা নামিয়ে তাকালেন আমার দিকে, একটু অবাক হলেন মনে হল। চিন্তায় বাঁধা পড়ায় একটু বিরক্তও মনে হল তাকে। আমি একটু অপ্রস্তুত বোধ করলাম। জোর করে সেটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টাও করলাম সাথে সাথে। নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, “আপনি নিশ্চয়ই সানাউল হক সাহেব, এক্স ডিবি অফিসার?”
ভদ্রলোকের বিস্মিত ভাব তখনো কাটে নি। আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না তিনি। নীরবতাকেই সম্মতির লক্ষ্মণ ধরে নিয়ে আমি বললাম, “আশফাক হাসানের কেসটার ইনভেস্টিগেশন কি আপনিই করেছিলেন?”

অনেকদিন আগের কথা। একজন পুলিশ অফিসার তার জীবনে কয়েকশ কেস তদন্ত করে থাকেন। তার মধ্য থেকে যে কোনো একটা কেসের কথা আলাদা করে তার মনে নাও থাকতে পারে। কিন্তু কেন যেন আমি নিশ্চিত ছিলাম আশফাক হাসানের কেসটার কথা তার মনে থাকবে। হলও তাই। ভদ্রলোক এবার নিজেকে সামলে নিলেন কিছুটা, আমাকে দেখলেন ভালো করে, তারপর হাতে ধরা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, “জ্বি। কিন্তু এত বছর পর আপনি তার কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”

আমি তখন সবকিছু খুলে বললাম। আফসারউদ্দীন সাহেবের কথা, তার ঠিকানা পাওয়ার কথা সব। ভদ্রলোক সবকিছু মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তার হাতে ধরা সিগারেটটা ততক্ষণে শেষ হয়ে এসেছিল। আমার কথা শেষ হলে সেটা ছুঁড়ে ফেললেন দূরে। তারপর বললেন,
“আপনি বলছেন ফাঁসির আগের রাতে সে জেলার সাহেবকে বলেছিল তার ফাঁসিটা আর একদিন পিছানোর জন্য?”
“জ্বি। তার পিছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। আর আমার ধারণা আপনি কারণটা জানেন।”
“ঠিক শিওর বলতে পারব না। তবে অনুমান করতে পারি। তার স্ত্রীর পরের দিন একটা অপারেশন হওয়ার কথা ছিল, একটা কঠিন অসুখ হয়েছিল তার। অসুখের নামটা এই মুহূর্তে আর মনে নেই। সম্ভবত সে কারণেই তিনি চেয়েছিলেন আর একটা দিন বেশি বাঁচতে।”
আমার সন্তুষ্ট হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কেন যেন হতে পারলাম না। দশ বছর আগের সেই অনুভুতিটা আবার জেগে উঠছিল আমার ভিতর। আমি জানি না আমি কীভাবে বুঝলাম, কিন্তু আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আশফাক হাসান নামের এই ফাঁসির আসামীর গল্পটা এত সহজ নয়, আরো অনেক কিছু জানার বাকি আছে এখনো। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম, গল্পের সবটুকু জানতে হবে আমাকে। আজকেই।

“কিছু মনে করবেন না, আপনি কি আমাকে এই কেসের সব ডিটেইলস খুলে বলবেন। কেসটার ব্যাকগ্রাউন্ড কী? মানে লোকটা কেন খুনটা করেছিল, এসব?”
সানাউল হক সাহেব কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন, মনে হল যেন উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কিছু বলবেন কিনা, কিংবা বললেও কী বলবেন। শেষ পর্যন্ত উনি মনে হয় কথা বলারই সিদ্ধান্ত নিলেন। বললেন,
“আশফাক হাসান নামের ঐ লোক কী করত আপনি জানেন?”
“না।”
“একটা ছোট অফিসে অ্যাকাউন্টস সেকশনে চাকরি করত। খুব নিরীহ ধরণের লোক ছিল। যে লোকটা মার্ডার হয়েছিল তাকে আপনি চেনেন?”
“না।” আবারো বললাম আমি।
“লোকটার নাম ছিল নজরুল ইসলাম। একটা কলেজের প্রফেসর ছিল। সাথে বিভিন্ন সোশ্যাল ওয়ার্কও করত। আশফাক হাসানের তার কোনো শত্রুতার কানেকশন পাওয়া যায় নি।”
“তাহলে?”
“আফসানা পারভীন নামের কাউকে চেনেন?” ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন আবার।
“না।”
“ভদ্রমহিলা আশফাক হাসানের স্ত্রী ছিলেন। যার অপারেশন হয় তার ফাঁসির পরের দিন। অপারেশন সাকসেসফুল হয়। এখন তার পরিচয় কী জানেন?”
“এখন তার পরিচয় হল নাসিরউদ্দীন সাহবের স্ত্রী। কাউকেই তো আপনি চেনেন না। নাসিরউদ্দীন সাহেবকে চেনেন নিশ্চয়ই?”
নাসিরউদ্দীন? নামটা চেনা চেনা মনে হল আমার কাছে। সাথে সাথেই মনে পড়ল। নাসির গ্রুপের মালিকের নাম নাসিরউদ্দীন। কয়েকদিন আগে এমপি হয়েছেন।
“আপনি কি নাসির গ্রুপের নাসিরউদ্দীনের কথা বলছেন?” আমি বললাম।
ভদ্রলোক একটু হাসলেন। “জ্বি। তার আরো একটা পরিচয় আছে, জানেন নিশ্চয়ই? এখন তিনি একজন এমপি।”
“জ্বি। জানি।” সবকিছু কেমন যেন ধাঁধাঁর মত মনে হচ্ছিল আমার কাছে। আমার সিগারেটটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। পকেট থেকে মার্লবোরো অ্যাডভান্সের নীল প্যাকেট বের করে আরো একটা সিগারেট ধরালাম আমি। তাতে লম্বা টান দিয়ে জট পাকানো মস্তিষ্কটা খোলার চেষ্টা করলাম কিছুটা। নিকোটিনের ধোঁয়ায় সত্যি কিছু একটা হয়তো আছে। অস্পষ্টভাবে কিছু বিষয় হঠাৎ বুঝতে শুরু করলাম আমি। মনে হল একটা কুয়াশার গাঢ় চাদর যেন সরে যেতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। দূরে ঝাপসাভাবে উঁকি দিতে শুরু করেছে আলোর রেখা। আমার সামনে বসা সানাউল হক সাহেব তখন আবার আকাশের দিকে তাকিয়েছেন। দূর মহাকাশে তিনি হয়তো খুঁজছেন কোনো অজানা নক্ষত্র।
চারপাশের বাতাস যেন ক্রমেই ভারী হয়ে আসছিল। একসময় এই নীরবতা অসহ্য হয়ে উঠল আমার কাছে। আমি আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম,
“সানাউল হক সাহেব, আশফাক হাসানের ব্যাপারে আপনি যা জানেন প্লীজ বলুন। এই গল্পটা জানা আমার জন্য ভীষণ জরুরী।”

সানাউল হক সাহেব আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে আবার আমার দিকে তাকালেন। চোখ থেকে মোটা ফ্রেমের চশমাটা খুলে রাখলেন সামনের টেবিলে। কয়েক মুহূর্ত বসে রইলেন চুপচাপ। তারপর খুব আস্তে আস্তে বললেন,
“হাসান সাহেব, পুলিশের চাকরি থেকে রিটায়ার করেছি অনেকদিন হল। তারপরও পুলিশের কিছু বদঅভ্যাস এখনো ছাড়তে পারিনি। পুলিশের জীবনের ডার্ক সাইডটা এখনো কারো সামনে বলতে ইচ্ছা করে না, লুকিয়ে রাখি। কিন্তু আপনাকে দেখে কী যেন মনে হল, অনেক কিছু বলে দিলাম। বাকিটাও শুনুন তাহলে। আসলে ঐ প্রফেসরের সাথে আশফাক হাসানের কোনো ঝামেলা ছিল না, ছিল এই নাসিরউদ্দীনের।”
আমি কিছু বললাম না। কুয়াশার চাদর তখন অনেকটাই সরে রেখে গেছে, স্পষ্ট হতে শুরু করেছে আলোর রেখা। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সানাউল হক সাহেব আবার বললেন,
“আপনি হয়তো এখন বুঝতে পারছেন কিছুটা। আশফাক হাসানকে লোভ দেখিয়েছিলেন নাসিরউদ্দীন সাহেব। প্রফেসরকে খুন করার বদলে তার স্ত্রীর চিকিৎসার সব দায়িত্ব নেওয়ার কথা দিয়েছিলেন তিনি। তার স্ত্রীর যে অসুখটা হয়েছিল তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার ছিল। স্বাভাবিকভাবেই এত টাকা আশফাক হাসান কোনোদিন যোগাড় করতে পারত না। আর সে কারণেই খুনটা করতে রাজি হয়ে যায় সে। স্ত্রীকে হয়তো অনেক বেশি ভালোবাসত সে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, ধরা পড়ে যায় আমাদের হাতে। তবে নাসিরউদ্দীন সাহেব তার কথা রেখেছিলেন। তার স্ত্রীর চিকিৎসার সব খরচ তিনি দিয়েছিলেন।”

একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে থামলেন ভদ্রলোক। হাতে ধরা সিগারেটে একটা টান দিয়ে শুরু করলেন আবার,
“তবে এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। নাসিরউদ্দীন সাহেব ইচ্ছা করলেই বড় কোনো প্রফেশনাল কিলারকে দিয়ে কাজটা করাতেন পারতেন। তাতে তার নাম সামনে আসার সম্ভাবনাও অনেক কম ছিল। তা না করে তিনি একজন আনাড়ি লোককে দিয়ে কাজটা করালেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তরও আমি অনেক ভেবে বের করেছি, যদিও পুরোটাই আমার অনুমান। আমার ধারণা, আশফাক হাসানের স্ত্রীর প্রতি তার একটা লোভ ছিল। ভদ্রমহিলা একসময় অসম্ভব রূপবতী ছিলেন। আর নাসিরউদ্দীন সাহেবেরও আগের স্ত্রীর সাথে তার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল অনেকদিন আগে। তার অসুখের সুযোগে তিনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। এবং মারতে পেরেছেনও। আপনাকে তো আগেই বলেছি, ভদ্রমহিলা এখন তার স্ত্রী। সুস্থ হয়ে ওঠার পর যখন জানতে পারেন তার স্বামীর অপরাধের কথা তখন প্রচণ্ড একটা ঘৃণার জন্ম নেয় তার মনে। এই শক কাটিয়ে উঠতে তার অনেক সময় লেগেছিল। তারপর আস্তে আস্তে জানতে পারেন নাসিরউদ্দীন সাহেবের সাহায্যের কথা। একসময় তাকে বিয়েও করেন। প্রস্তাবটা এসেছিল নাসিরউদ্দীন সাহেবের পক্ষ থেকেই। যাই হোক, তার স্বামী কেন খুনটা করেছিল তা তিনি কোনোদিন জানতে পারেন নি। অবশ্য জানার কথাও না। কথাটা একমাত্র জানতেন নাসিরউদ্দীন সাহেব নিজে। তিনি তো আর বলতে যাবেন না নিশ্চয়ই। আমার এখন মনে হয় যে আশফাক হাসানের ধরা পড়ার পিছনে আসলে হাত ছিল এই নাসিরউদ্দীন সাহেবেরই।”

কুয়াশার চাদর এখন সরে গেছে পুরোপুরি। আলোর রেখা এখন সম্পূর্ণ স্পষ্ট। আমি কিছু একটা বলতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমি মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই মনে হয় আমার মনের কথা বুঝে ফেললেন সানাউল হক সাহেব। আমি কিছু বলার আগেই তিনি আবার শুরু করলেন,
“আপনি হয়তো ভাবছেন সবকিছু জানার পরেও নাসিরউদ্দীন সাহেবকে আমরা কিছু করলাম না কেন। উত্তরটা খুব সহজ। ক্ষমতার কাছে পুলিশের হাত বরাবরই অসহায়। তিনি তার ক্ষমতা দিয়ে চারপাশের সমস্ত মানুষকে কিনে রেখেছিলেন। অনেক উপর থেকে আমাদেরকে চাপ দেওয়া হয়েছিল আমাদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য। আমি প্রথমে রাজি হতে চাই নি। কিন্তু আমি তো আর মহাপুরুষ না, আমারও একটা ফ্যামিলি আছে, তাদের উপর দায়িত্ব আছে। আমি একা আর কী করব বলুন? সে সময় এখনকার মত এত মিডিয়ার দৌড় ছিল না, কেউ কিছুই জানতে পারে নি। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? এই ঘটনার ঠিক পাঁচ বছর পর আমার একমাত্র ছেলে অনিক স্কুল থেকে পিকনিকে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায়। স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিল সে। তারপরেই আমি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেই।”

একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার আকাশের দিকে তাকালেন সানাউল হক সাহেব। তার সামনে একা বসে রইলাম আমি, নিশ্চুপ। চুপচাপ উড়িয়ে গেলাম নিকোটিনের বিষাক্ত ধোঁয়া। মার্লবোরো অ্যাডভান্সের বিষাক্ত ধোঁয়ায় হঠাৎ একটা অপূর্ব সুন্দর বিভ্রম তৈরি হল আমার সামনে। আশফাক হাসান নামের একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে যেন স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি। সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত একজন মানুষ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে নিউমার্কেটের দিকে। আজকে অফিসের বেতন দিয়েছে। কয়েকদিন আগে তার স্ত্রী নিউমার্কেটে একটা শাড়ি খুব পছন্দ করেছিল। কিন্তু টাকার অভাবে সেদিন কেনা হয় নি সেটা। বেচারী খুব মন খারাপ করেছিল। আজকে ঐ শাড়িটা কিনে চমকে দিতে হবে তাকে। স্ত্রীর হাসিমুখটা বারবার ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। দ্রুত পা চালায় সে। অনেকটা পথ হাঁটতে হবে তাকে।

“তুমি এখনো বসে আছ এখানে?” একা কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারি নি। “আর এখনো সিগারেট খাচ্ছ তুমি? কয়টা খেলে এখন পর্যন্ত বল তো। কী মজা পাও তোমরা এই ছাইপাশটার মধ্যে?”
বলতে বলতেই আমার ঠোঁট থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলল সে। আমার হঠাৎ কী মনে হল। আমি একার হাতটা চেপে ধরলাম অনেক জোড়ে। কখনো যেন এ হাত ছাড়তে না হয় আমাকে।

Most Popular

To Top