বিশেষ

ব্রোমান্স এর তোড়ে হুমকির মুখে চিরাচরিত রোমান্স!

ব্রোমান্সের কাছে কি হেরে যাচ্ছে নারী-পুরুষের রোমান্টিক সম্পর্ক?

ব্রোমান্স (Brotherly Romance-এর সংক্ষিপ্ত রূপ) শব্দটি হয়তো হাল আমলের, কিন্তু এর চল আছে সেই আদ্যিকাল থেকেই। সেই আদ্যিকাল থেকে পুরুষদের মাঝে তৈরি হয়ে আসছে অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের সম্পর্ক যেখানে যৌনতার কোনো স্থান নেই। শেক্সপিয়ারের বেশ গভীর বন্ধুত্ব ছিল তার সমসাময়িক কিছু তরুণের সাথে, একই গল্প ফ্রেঞ্চ দার্শনিক মন্টেইনেরও। জর্জ ওয়াশিংটনের অনেক চিঠিতে এই গভীর বন্ধুত্বের চিহ্ন পাওয়া যায়, আব্রাহাম লিংকন আর জশুয়া স্পিড ছিলেন রীতিমত মানিকজোড়। এখনো ব্রোমান্স পশ্চিমা সংস্কৃতি বা আমাদের সংস্কৃতি, দু’খানেই বেশ জনপ্রিয়। পশ্চিমে তাকালে আমরা যেমন দেখি বারাক ওবামা এবং জো বাইডেনের বন্ধুত্ব, কিংবা “ফ্রেন্ডস” টিভি সিরিজের জোয়ি-চ্যান্ডলার বা “হাও আই মেট ইউর মাদার” এর টেড-মার্শালের ব্রোমান্স, তেমনি আমাদেরও আছে হিমু-বাদল কিংবা বাকের ভাই আর বদির অনন্য ব্রোমান্সের গল্প।

ব্রোম্যান্স নিয়ন আলোয় neonaloy

তাই চারপাশে এই ব্রোমান্সের উত্থান দেখে ইউনিভার্সিটি অফ উইনচেস্টারের গবেষকরা সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা এই ব্রোমান্সের সামাজিক প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করবেন। তাদের এই গবেষণার ফলাফল যা আসলো তা আসলে বেশ ভয়ংকর। তারা বললেন, এই ব্রোমান্স আমাদের নারী-পুরুষের রোমান্টিক সম্পর্কের জন্য দিন দিন হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে! তারা গবেষণায় দেখেছেন, বেশিরভাগ পুরুষই নারীসঙ্গ থেকে পুরুষের সাথে এই বন্ধুত্বের সম্পর্ককে বেশি ইমোশনালি স্যাটিসফায়িং হিসেবে দেখছেন। নারীদের তুলনায় পুরুষদের সাথেই এখন পুরুষেরা বেশি কমফোর্টেবল। এবং এ কারণে নারী-পুরুষের দীর্ঘমেয়াদী রোমান্টিক সম্পর্ক দিনদিন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

এই গবেষণাটি করতে গিয়ে তারা জরিপ করেছেন ত্রিশ জন হেটেরোসেক্সুয়াল পুরুষের উপর। ৩০ এর মধ্যে ২৯ জনই বলেছেন তাদের ব্রোমান্সের সম্পর্কটি তাদেরকে বেশি কমফোর্ট দিয়ে থাকে। হয়তো এই স্টাডির ফলাফল কিছু নির্দিষ্ট ডেমোগ্রাফির পুরুষের বাইরে প্রযোজ্য কীনা তা এখনো নিশ্চিত বলা যায় না, তবু আশেপাশে তাকালে ব্যাপারটা সত্য মনে হয় বইকি!

ব্রোম্যান্স নিয়ন আলোয় neonaloy

ফ্রেন্ডস টিভি সিরিজের যারা ভক্ত, জোয়ি এবং চ্যান্ডলারের “ব্রোম্যান্স” তাদের জন্য অনবদ্য

তাদের গবেষণার ফলাফলে বেশকিছু মজার মজার তথ্য বেরিয়ে এসেছে যেগুলোর সাথে হয়তো আমাদের পুরুষ পাঠকরাও রিলেট করতে পারবেন। স্টাডিতে অংশগ্রহণকারীরা বলেছে, তাদের মনে হয় তাদের বন্ধুদের কাছে অনেক কম জাজ হতে হয় তাদের গার্লফ্রেন্ডের তুলনায়। একজন ছাত্রের ভাষায়,

“আমার বন্ধু জানে আমার টেইলর সুইফট এবং বিয়ন্সের গান ভালো লাগে, কিন্তু আমি আমার গার্লফ্রেন্ডের কাছে সে ব্যাপারটি লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হই। কারণ গার্লফ্রেন্ডের সামনে আমার একটি পুরুষোচিত ইমেজ মেইন্সটেইন করতে হয়।”

অংশগ্রহণকারীরা আরো বলেছেন, নিজেদের ব্যক্তিগত আবেগগুলোকেও গার্লফ্রেন্ডের তুলনায় বন্ধুর সাথে শেয়ার করা সহজ। কিংবা স্পর্শকাতর কোনো স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যও তারা পুরুষ বন্ধুর সাথেই সহজে শেয়ার করতে পারছেন।

ব্রোম্যান্স নিয়ন আলোয় neonaloy

“হাও আই মেট ইউর মাদার” এর মার্শাল এবং টেড।

“এই পুরুষদেরকে ইন্টারভিউ করার পর আমরা খুব সহজেই একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছি”, বলছিলেন গবেষকরা, “রোমান্টিক সম্পর্কের তুলনার এই ব্রোমান্টিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক পুরুষদের জন্য মানসিকভাবে অনেক বেশি স্যাটিসফায়িং।”

যদিও এই ফলাফলটি গবেষকদের কাছে অনেকদিক দিয়েই ইতিবাচক মনে হয়েছে, কিন্তু “নারীদের জন্য এই ব্যাপারটি মোটেও ইতিবাচক কিছু নয়”, গবেষকদের মতে।

ইউনিভার্সিটি অফ উইনচেস্টারের ডক্টর স্টেফান রবিনসন বলছিলেন, এই ফলাফলগুলো নারীদের জন্য তাদের মনে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে কারণ সেক্সিজম এবং নারীদের প্রতি বিদ্বেষের একটি নতুন ধরণের সংস্কৃতির উত্থান এখানে স্পষ্ট। গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে দেখা গেছে অনেকেই তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করছেন। একটি “আমরা এবং তারা” অর্থাৎ নারীদেরকে আলাদা কিছু মনে করার মানসিকতা ছিল সেখানে স্পষ্ট।

ব্রোম্যান্স নিয়ন আলোয় neonaloy

ফেসবুকের গলি-ঘুপচি থেকে সংগৃহীত

“এই হেটেরোসেক্সুয়াল মিলেনিয়াল পুরুষেরা তাদের বন্ধুদেরকে এতটাই বেশি পছন্দ করে যে এই পছন্দের অনুভূতির সামনে চিরাচরিত রোমান্সের টিকে থাকা অনেকটা চ্যালেঞ্জের মত”, বলছিলেন ডক্টর স্টেফান রবিনসন।

“এছাড়াও এই টিন্ডার এবং ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডের যুগে, হেটেরোসেক্সুয়াল সেক্স যখন দিনদিন সহজলভ্য হয়ে উঠছে কোনো রোমান্টিক কমিটমেন্ট ছাড়াই, ব্রোমান্স হয়তো আস্তে আস্তে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য লাইফস্টাইল হিসেবে গৃহীত হয়ে যেতে পারে, যেখানে দু’জন বন্ধুই একসাথে থাকছে এবং রোমান্টিক সম্পর্কের সবটুকুই তারা উপভোগ করছে শুধুমাত্র যৌনতা ছাড়া।”

সার্ভে’র সাবজেক্টদের মধ্যেই একজন ব্রোমান্সের সম্পর্ককে বর্ণনা করেছেন এভাবে, “এটা অনেকটা গার্লফ্রেন্ড থাকার মতোই, শুধুমাত্র ‘গার্লফ্রেন্ড’ ব্যাপারটি-ই এখানে নেই।”

আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এই ব্রোমান্স এবং রোমান্সের মধ্যে পার্থক্য কি, উত্তর ছিল, “শুধুই যৌনতা, আর কিছু নয়।”

সুতরাং চিরাচরিত নারী-পুরুষের দীর্ঘমেয়াদী রোমান্টিক সম্পর্কের কাঠামোও ভবিষ্যতে ভেঙে পড়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। যখন পুরুষেরা পুরুষদের কাছেই বেশি কমফোর্ট পাচ্ছে, কেনই বা তারা নারীর ঝামেলায় যেতে চাইবে? নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করার সুযোগ, নিজের আবেগকে শেয়ার করার সুযোগ, নির্ভরযোগ্য সাহচর্য্যের অনুভূতি, এসব যদি বন্ধুত্বই দিতে পারে, তখন প্রেমের প্রয়োজনটা কিছুটা ফিকেই হয়ে যায়। সেই সার্ভের এক অংশগ্রহণকারীর ভাষাতেই বলতে হয়, “প্রেমিকা সাময়িক। কিন্তু বন্ধুত্ব? তা চিরদিনের।”

Most Popular

To Top