ক্ষমতা

সাম্প্রতিক পরিবহন ধর্মঘটের ব্যাপারে “বিদেশী” নেতারা যেই কথাগুলো বলেননি…

পরিবহন ধর্মঘট

এক পৃথিবীতে ছিল এক দেশ, ধরেন দেশটির নাম উগান্ডা কিংবা পাপুয়া নিউগিনি। সেটাও বাংলাদেশের মতই একটা ছোটখাট দেশ ছিল এবং সেই দেশের মানুষরা খুবই সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল। যদিও হাতিশালে হাতি ছিল না আর গোলাভরা ধানও ছিল না, কিন্তু তারপরেও তারা কিভাবে সুখে বাস করছিল?

কারণ তাদের জীবন ছিল জেমস বন্ড এবং বেয়ার গ্রীলসের লাইফস্টাইলের কম্বিনেশন। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে গাড়িচাপা পড়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করে সারাদিন ঘুষের নিচে চাপা পড়ে তিরিক্ষি মেজাজে ঘরে এসে তারা ফরমালিন দেওয়া টাটকা খাবার খেয়ে লোডশেডিং এর মাঝে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে যেত। প্রতিদিন টেলিভিশন আর পত্রিকাতে কয়েকটা খুন-ধর্ষণ, ছিনতাই-অপহরণ কিংবা গাড়িচাপা পড়ে মানুষ মরার খবর না পেলে দেশের নাগরিকদের অনেকেরই “সামথিং ইজ মিসিং” ফিলিং হত এবং পুরা দিনটাই বিস্বাদ লাগত।

সেই উগান্ডা কিংবা পাপুয়া নিউগিনি দেশটাতে ছিল অনেকগুলা রাজা, থুক্কু যানবাহনের পাইলট। তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল রেসিং কার স্টাইলে নিজেদের লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়িগুলাকে রাস্তা, ফুটপাথ এবং মানুষের উপর দিয়ে চালিয়ে নেওয়া। তবে মানুষের উপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে গেলেও পশু-প্রাণিদের প্রতি তাদের ছিল অসীম মমতা।

মমতার কারণ হচ্ছে এই পাইলটদের যিনি উস্তাদ তিনি শিষ্যদের উদ্দ্যেশ্যে একবার অমৃতবাণী করেছিলেন যে,

“গাড়ির পাইলটদের আবার এত পড়ালেখার কি দরকার? কোনটা গরু কোনটা মানুষ এইটা চিনলেই তো হইল।”

তাই উস্তাদের সুযোগ্য শিষ্য হওয়ার জন্য তারা ইচ্ছামত নিজেদেরকে রাস্তার পাইলট মনে করত এবং যখন তখন দুই-তিনটা মানুষ গাড়িচাপা দিয়ে নিজেদের হাত মকশো করে নিত। উগান্ডা কিংবা পাপুয়া নিউগিনির জনদরদী নেতাদের কিন্তু এইসব নিয়ে কোন মাথাব্যথা ছিল না, তারা ভিআইপি রাস্তা দিয়ে যেত ভিআইপি গাড়িতে চড়ে এবং তাদের আমলের উন্নয়নের বয়ান গেয়ে বেড়াতেন। এমন না যে উগান্ডা কিংবা পাপুয়া নিউগিনির ক্ষমতাসীন নেতাদের কথাই শুধু এখানে বলা হচ্ছে, যে দল ক্ষমতায় যায় সেই দলই চোখে রঙ্গিনচশমা পরে নেয়; যে চশমার ফাঁক দিয়ে সাদা-কালো দুনিয়া দেখা যায় না। তবে কিছু দুষ্টু নেতাদের পিছনে ছোঁক-ছোঁক করা সাংবাদিক আবার বের করে ফেলল যে এসব লক্কড়-ঝক্কড় হাওয়াই বাস আর ট্রাকের মালিক আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতারা কিংবা নেতাদের শালা-সমন্ধীরা। তাই বাধ্য হয়ে জনদরদী নেতারা কেউ বলত “রাস্তাঘাটে দুই-চারটা এক্সিডেন্ট তো হবেই” অথবা আরো একধাপ এগিয়ে অনেকে সুফীবাদী দর্শনে দীক্ষিত হয়ে বলত “আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়া গেসে,আমরা তো উসিলা মাত্র।”

দেশের জনগণ বেয়ার গ্রীলস এবং জেমস বন্ডের কম্বো লাইফস্টাইলে নিজের জীবন পার করত এবং প্রতিদিন প্রাণ নিয়ে যে ঘরে ফিরতে পেরেছে এটা নিয়েই খুশি থাকত। রাস্তাঘাটে প্রতিদিন মানুষ মারা গেলেও এটা নিয়ে কারো তেমন মাথা-ব্যথা ছিল না, মামলা হলেও মামলাগুলো হারিয়ে যেত কিংবা উধাও হয়ে যেত। কিন্তু একদিন এক মহাকান্ড হল, ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আসল তাদের বন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে এবং পুরো উগান্ডা কিংবা পাপুয়া নিউগিনিকে কাঁপিয়ে দিল। তখন জনদরদী নেতারা উপায় না দেখে গদি সামলাতে জনগণদের বুঝ মানিয়ে রাখার জন্য চশমা পরে চাপরাশিকে হুকুম দিল “রেসিংকার পাইলটদের নিয়ন্ত্রণ করার ফাইল লেকে আও… তাড়াতাড়ি!”

ধূলো জমা ফাইল খুঁজতে খুঁজতে রঙ্গমঞ্চ পাল্টে গেল, যদু হয়ে গেল মধু এবং রাত হয়ে গেল দিন। তবে জনগণকে একটু বুঝ মানানোর জন্য নামমাত্র কিছু আইনের প্রস্তাব করা হল। কিন্তু এই নামমাত্র আইনেও আমাদের দিলের টুকরা জাতির রেসিং পাইলট ভাইয়েরা মাইন্ড খেল। রেসিং পাইলট ভাইদের উস্তাদ আবার ব্যাটম্যানের চেয়েও এক কাঠি সরেস, ব্যাটম্যান যেমন দিনে ভালোমানুষ আর রাতে উড়ে বেড়ায় তেমনি উস্তাদ সাহেবও দিনে চশমা চোখে দেন এবং রাতে রেসিং পাইলট ভাইদের সাথে ছোটখাট আড্ডা দেন। তিনি তার দিলদার বন্ধুদের সাথে দিলখোলা হাসি দিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলেন এবং পরদিন থেকে শুরু হল ধর্মঘট।

“হু হু বাবা, এবার কই যাবা?” এই কথা বলে রেসিং পাইলট ভাইয়েরা নিশ্চিন্তে ছিলেন। কিন্তু দেশদরদী নেতার এনে দেওয়া ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে জনগণেরা যখন বাস ছাড়াই চলাচল করা আরম্ভ করল তখন রেসিং পাইলট ভাইয়েরা রাস্তায় নামল এই অপব্যবহারকারীদের ঠেকাতে এবং তাদেরকে ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ ফেয়ার এন্ড লাভলীর বদলে একটু মবিল আর ডিজেল লাগিয়ে দিল গালে।

এখন শুধু রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে এমন ড্রাইভার ভাইদের ভালোবাসা দেখালেই তো হবে না, সাথে অন্যদেরও দেখাতে হবে। তাই আমাদের রেসিং পাইলট ভাইয়েরা রিকশাচালক থেকে রিকশাযাত্রী কাউকেই ছাড় দিল না। “বাদ যাবে না একটি শিশু” স্টাইলে এবং এম্বুলেন্সে করে যে আমজনতার একটা মুমূর্ষু বাচ্চা মারা গেলো তাতেও তাদের কিছু যায় আসে না।

আমাদের চশমাপরা দরদী নেতারা কিন্তু এখনো চুপচাপ, তবে তাদের যে স্বভাব তাতে আমার মনে হয় না যে তারা বেশিদিন চুপ থাকবে, তাই তারা বলা শুরু করবেন শীঘ্রই।

সব নদী যেভাবে সাগরে মিলিত হয় তেমনি নেতাদের সব কথাও একই রকম হয় সবসময়, তাদের সম্ভাব্য বয়ানগুলো এই লেখা থেকে সেভ করে না হয় স্ক্রিনশট দিয়ে রেখে দিন। কারণ আজ থেকে দশ বছর পরেও উগান্ডা কিংবা পাপুয়া নিউগিনির চশমাপরা নেতারা এই ভাষাতেই কথা বলবেন।

গদিতে বসা নেতাঃ

পরিবহন ধর্মঘট নেতা প্রতিক্রিয়া নিয়ন আলোয় neonaloy

গদি ছাড়া নেতাঃ (বিরোধী দল)

রোমান্টিক কবি এবং পল্লীবন্ধু নেতাঃ 

সকালবেলার বক্তব্য-

দুপুরের ডিগবাজি বক্তব্য-

পঞ্চাশদলীয় জোটঃ

সকালের বক্তব্য-

বিকালের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য-

পরিবহন ধর্মঘট নেতা প্রতিক্রিয়া নিয়ন আলোয় neonaloy

চন্দ্রজয়ী নেতার দলঃ 

তেঁতুল নেতাঃ 

উস্তাদ নেতাঃ

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এই লেখাটি ১০০% কল্পনাপ্রসূত। এখানে বর্ণিত নেতা কিংবা তাদের বক্তব্যের সাথে অন্য কোনো কিছুর অনেক দূরসম্পর্কেও যদি মিলে যায়, তবে তার জন্য উগান্ডা কিংবা পাপুয়া নিউগিনির লোক ছাড়া আর কেউ, এমনকি লেখক নিজেও দায়ী নয়।

Most Popular

To Top