নাগরিক কথা

একজন নোবেল, একজন সাকিব, এবং আমাদের “লুঙ্গি বর্জন” এর গল্প…

নোবেল সাকিব লুঙ্গী ট্রল নিয়ন আলোয় neonaloy

কদিন আগেই ভারতের রিয়্যালিটি শো সারেগামাপা অনুষ্ঠানে গান গেয়ে বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের মন জয় করে রাতারাতি সেলিব্রেটি হয়ে যাওয়া গায়ক, গোপালগঞ্জের সন্তান মাঈনুল আহসান নোবেলকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে তার জম্মস্থান গোপালগঞ্জে। ভাল গায়ক অবশ্যই শ্রদ্ধার পাত্র, তার গান শোনা উচিৎ সকল শ্রোতারই এবং শ্রোতারা তার পারফর্মেন্স দেখার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকবে এটাই কাম্য।

প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় দেশের হাজারো মা-বোন, চাচা-চাচী, মামা-মামী পুরো পরিবার বসে যান টিভি সেটের সামনে, জি বাংলায় তাদের পছন্দের শিল্পীর গান শুনতে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি ভানুমতির খেলটা কোথায়? প্রায় বিশ কোটি মানুষের এই দেশের দর্শক শ্রোতারা একসাথে একটা চ্যানেল দেখছি, তাও একটি বিদেশী চ্যানেল! যেখানে প্রায় ২০টির বেশি দেশী চ্যানেল ভাল অনুষ্ঠান, প্রোগ্রামের আয়োজন করেও দর্শকের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে? কখনও কি ভেবেছি দেশীয় কোন চ্যানেলে নোবেল পারফর্ম করলে কখনও দেখতাম কিনা? কিংবা নোবেলের মতো হাজারো তরুণ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গান গেয়ে বেড়াচ্ছে, ভুলেও কি তাদের দিকে কোন আগ্রহ দেখাচ্ছি আমরা? এই নোবেলই কিন্তু সারেগামাপা’র আগে বাংলাদেশের একটি রিয়েলিটি শো’তে অংশগ্রহণ করেছিল- সে খবরই বা আমরা কজন জানি?

নোবেল নিয়ন আলোয় neonaloy

উপরের ছবিতে বাংলালিংক নেক্সটটিউবার শো’তে নোবেল, নিচে সারেগামাপা শো’তে নোবেল।

কি করতাম আমরা তা জানা নেই আমাদের। কিন্তু যা হচ্ছে তা কিন্তু খুবই পরিষ্কার। প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে হয়তো হাজারটা নোবেলের মতো গায়ক আছে। কিন্তু এক নোবেলের বদৌলতে ভারতের এক চ্যানেল প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার দর্শকদের কব্জাবন্দি করে ফেলেছে। এবং পুরো ব্যাপারটা ঘটছে আমাদের চোখের সামনেই। আমাদের চোখের সামনেই আমাদের উপর ছড়ি ঘুরানো হচ্ছে, এমন সেটা আমরা বেশি হাসিমুখেই গ্রহণ করে নিচ্ছি।

মাঝে মাঝে বয়োজেষ্ঠ্যরা বিরক্ত হন এমন প্রশ্নে, অনেকে আবার পাল্টা জবাবও দেন, “আরে, পশ্চিমবঙ্গ তো আমাদের দেশের মতোই, আমাদের জ্ঞাতি ভাই। ওরাও তো আমাদের পছন্দ করে”।

সত্যি! মাঝে মাঝে শিক্ষিত মানুষের এসব কথা শুনে হাসি পায়। যে দেশটা এতো ভালবাসে আমাদের, সে দেশটায় বাংলাদেশী পণ্য ঢুকতে দেয়া হয় না। সে দেশের হাজারো স্যাটেলাইট চ্যানেলের ভিড়ে ঠাঁই মেলে না কোন বাংলাদেশী চ্যানেলের।

“…প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে হয়তো হাজারটা নোবেলের মতো গায়ক আছে। কিন্তু এক নোবেলের বদৌলতে ভারতের এক চ্যানেল প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার দর্শকদের কব্জাবন্দি করে ফেলেছে…”

সমস্যাটা আসলে আমাদেরই। নিজেদের স্বকীয়তাকে আমরা দুর্বল ভাবি, ছোট মনে করি। নিজেদের ভালবাসতে লজ্জা পাই। দেশী পণ্য আমরা কিনি না। আমাদের পণ্য বাইরে যেয়ে ব্রান্ড হয়ে আসার পর আমরা বেশি দাম দিয়ে সেই জিনিসটাই কিনি। বেশি দাম, একই মান তাতে সমস্যা নেই, কারণ বিদেশী ব্র্যান্ডের ট্যাগটা তো আছে। অন্যদের সব কিছু আমাদের থেকে সুন্দর, এইটাই আমাদের মূলমন্ত্র।

দেশের ভিতরে সুন্দর কোথাও গেলে পরে এসে তার বর্ণনা দেই এইভাবে,

“ভাইরে, এতো সুন্দর! মনেই হবে না বাংলাদেশে আছি, মনে হবে বিদেশ চলে আসছি”।

আমরা ধরেই নিয়েছি, বাংলাদেশ অসুন্দর, বিদেশ মানেই সুন্দর। একটা দেশের জন্য এর চেয়ে অপমানজনক আর কি হতে পারে? সবচেয়ে নিম্নমানের মদের নাম দিয়েছি বাংলা মদ, অংক সমাধানের সবচেয়ে নিম্নমানের কৌশলকে আমরা বলি বাংলা স্টাইল। সেদিন এক ভদ্রলোককে দেখলাম, গালি দিচ্ছেন, “ছোট লোক, বাঙ্গাল, অসভ্য” বলে। নিজের জাতি, সম্প্রদায়কে ছোট করায় আমাদের থেকে আর কেউ সেরা আছে?

কদিন আগেই ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান লুঙ্গির সাথে ব্লেজার পরা ছবি দিলেন। ব্যাস, আমরা মেতে উঠলাম ট্রল করতে। ব্লেজার হলো এইচএসসি-এসএসসি’র জিপিএ ফাইভ, লুঙ্গি হলো ভার্সিটির সিজিপিএ ২.৫। ব্লেজার হলো উন্নত মিরপুর DOHS, আর লুঙ্গি হলো মিরপুর। ব্লেজার মানে প্রগতি, লুঙ্গি মানে অবনতি। বিপরীত শব্দ টাইপ, ভালো–মন্দ; উন্নতি–অবনতি; উঁচু–নীচু; ব্লেজার–লুঙ্গি এমন।

সাকিব লুঙ্গী ট্রল নিয়ন আলোয় neonaloy

মজা করতেই হবে, দরকার হলে স্বকীয়তায় আঘাত করে হলেও; এবং নিজেদের স্বকীয়তায় আঘাত করেই বরং বেশি মজা পেলাম। লুঙ্গি পরতে না পারায় একটা প্রচ্ছন্ন আধুনিকতা প্রকাশ পায়। অনেক ভাইয়ার মতেই লুঙ্গি রিকশাওয়ালারা পরে। অনেককে গর্বের সাথে বলতে শুনেছি, “ছোট বেলা থেকেই জিন্স পরে অভ্যস্ত আমি, লুঙ্গিফুঙ্গি আবার ভদ্রমানুষ পরে নাকি!”

বাঙালি হয়েও শাড়ি পড়তে না পারায় কিছুটা লজ্জা আজও আছে, তবে লুঙ্গি না পরতে পারায় একদমই লজ্জা নাই। কদিন পরে হয়তো শাড়িও থাকবে না। আপুরাও প্রেজেন্টেশন শেষে ব্লেজার পরে ছবি পোস্ট করে ক্যাপশন দিবে ‘attitude is everything’। ব্লেজার-টাই না পরলে আমাদের এটিচিউটটাই ঠিক আসে না।

দুঃখের ব্যাপার হল, ব্রিটিশরা যখন ভারত উপমহাদেশে প্রথম আসে, এ দেশের শাড়ি-লুঙ্গি দেখে তারা খুবই অবাক হয়েছিলো। কোন রকম বেল্ট, ফিতা, বন্ধনী ছাড়াই কাপড় এতো সুন্দর করে পরা সম্ভব এটা তাদের মুগ্ধ করেছিলো। বিদেশীদের অন্ধ অনুকরণে সেই আমরাই লুঙ্গিকে ভুলে জিন্স আপন করে নিয়েছি। আধুনিকতার নামে গরমকে তুচ্ছ করে জিন্স পরেই ঘুমাতে যাচ্ছি। এমনকি বাংলাদেশেই এমন জায়গা আছে অনেক যেখানে লুঙ্গি পরে প্রবেশ নিষেধ! ঠিক যেমনটা নিষিদ্ধ ছিল প্রায় পৌনে এক শতক আগে ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়। ব্রিটিশরা চলে গেছে এই ভূখণ্ড ছেড়ে, কিন্তু প্রভুভক্তি যায়নি আমাদের মগজ থেকে!

ব্লেজার আধুনিকতা। লুঙ্গি স্বকীয়তা। আধুনিক হওয়াতে দোষ নাই, কিন্তু স্বকীয়তার অপমানে অবশ্যই দোষ আছে।

আসুন, দেশীয় পণ্যের, গুণের কদর করতে শিখি এবং নিজেদের হাতে থাকার সময়ই করি; বিদেশী কিংবা ভিনদেশিরা বলার পরে নয়। নিজের দেশের সম্পদ অন্যকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আগে নিজেরা সেটার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে শিখি। দেশটাকে ভালবাসতে শিখি, নিজেদের স্বকীয়তাকে নিয়ে গর্ববোধ করতে শিখি।

Most Popular

To Top