নাগরিক কথা

এই শহরে দেবী আসেন না…

দেবী আসেন না নিয়ন আলোয় neonaloy

গত সপ্তাহদুয়েক সবাই তো বেশ হই-হুল্লোড় করে হলে গিয়ে “দেবী” সিনেমাটি দেখে এসেছি, না? আমিও গিয়েছিলাম, সিনেমা দেখেছিও। কিন্তু কিছু ঘটনা মাথা থেকে সরাতে পারিনি।

ঘটনা ১

তানজিনাকে সকালে মা ক্ষেতে পাঠিয়েছিলেন বাবার কাছে। উদ্দেশ্য, বাবার ক্ষেত থেকে তোলা সবজি রান্না হলে তা খেয়েই স্কুলে যাবে তানজিনা। বাবার কাছ থেকে মিষ্টি কুমড়া আর কুমড়ার ফুল নিয়ে বাসার দিকে রওনা দেয়। মা’ও ভাত চড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন তানজিনার জন্য।

কিন্তু সেদিন আর মায়ের কাছে ফেরা হয়নি তানজিনার, স্কুলেও যাওয়া হয়নি। শুধু সেইদিন না, আর কোনদিনই তানজিনার সুযোগ হয়নি মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার।

দেবী-আসেন-না নিয়ন আলোয় neonaloy

আসার পথে চাচা জিয়াউলের সাথে দেখা হয় তানজিনার। মিষ্টি দেওয়ার নাম করে ক্ষেতের ভিতরে নিয়ে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করে জিয়াউল।

ধর্ষণের পর মায়ের কথা বলে কান্না করতে থাকে তানজিনা। তখন সাথে থাকা চাকু দিয়ে তানজিনা’র গলা কেটে দেয় জিয়াউল। তারপর হাতমুখ ধুয়ে আবার তানজিনা’র বাবার সাথে ক্ষেতে কাজ করতে চলে যায়।

তখনও বেঁচে ছিল তানজিনা। ‘মা-মা’ করতে করতে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে তানজিনা।

সেদিন অনেকক্ষণ যুদ্ধ করেছিলো বারো বছর বয়সী তানজিনা। মৃত্যুর দিকে ঢলে পরতে পরতে যখন ক্ষীণ স্বরে ‘মা-মা’ ডাকছিল; না, তখন আসেননি দেবী।

ঘটনা ২

ক্লাস শেষে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল রিতা। রাস্তায় থাকতে ফোন দিল সদ্য বিবাহিত বড়ভাই। হাসিমুখে কথা হল বড় ভাইয়ের সাথে। রিতা অভিযোগ করেছিল- “বিয়ের পর ভাইটা ভুলেই গেছে বোনকে, কোন খোঁজ নাই। অথচ বোনের কত কথা জমে আছে!” বড় ভাই উত্তরে বলেছিলেন, “বাসায় যা, সব কথা শোনা হবে”। রিতা হেসে বলেছিল, “আচ্ছা, বাসায় যেয়েই ফোন দিচ্ছি”।

ভাইয়া অধিক আগ্রহে বসে ছিলেন বোনটা কখন বাসায় যেয়ে ফোন দিবে। কিন্তু না, বোনটা ভাইকে কোন কথা শোনানোরই আর সুযোগ পেল না। ভাইটা পুলিশের কাছে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল, “স্যার, একটু শুনবার চাই, বোনডা কি বলবার চাইছিল”।

সেদিন বাসায় ফেরার পথে রেলস্টেশনের কাছে রিতাকে ডাক দেয় পাশের বাসার মকবুল। তারপর বন্ধুদের সাহায্যে অপহরণ করে নিয়ে যায় রিতাকে। অপহরণকারীদের গণধর্ষণের শিকার হয় রিতা।

নৃশংসতা এইখানেই হয়তো শেষ হতে পারতো, কিন্তু হয়নি। ধর্ষণের পর অজ্ঞান রিতাকে ফেলে রাখা হয় রেললাইনের উপর। ট্রেনের চাকায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় রিতার দেহ। (নিউজ২৪বিডি)

না, যেদিন রিতাকে যখন হায়েনারা এভাবে খুবলে খুবলে খেলো, সেদিন পাশে এসে দাঁড়াননি দেবী…

ঘটনা ৩

মা-বাবা বিদেশে চলে যাওয়ার পর মামা-মামীদের সাথেই বসবাস ষোড়শী আঁখির। একদিন মামা-মামীরা সবাই মিলে বাইরে গেলে স্কুল থেকে ফিরে এসে শুধু মামাতো ভাই রায়হানকে বাসায় পায় আঁখি। একপর্যায়ে আঁখির রুমে গিয়ে তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেয় রায়হান। এতে আঁখি চরমভাবে ক্ষিপ্ত হলে জোরপূর্বক আঁখিকে ধর্ষণ করে। আঁখি তখন ধর্ষণের কথা পরিবারের সবাইকে বলে দেওয়ার হুমকি দিলে গলা টিপে হত্যা করে তাকে। এরপর কাঁথা দিয়ে লাশ মুড়িয়ে ফেলে দিয়ে আসে দূরে।

ভাইয়ের হাতেও নিরাপদ ছিল না আঁখি…

পুলিশ লাশ খুঁজে পাওয়ার পর আঁখির মা-বাবার সাথে গ্রামের বাড়ি গিয়ে আঁখির কবর জিয়ারতও করে আসে রায়হান। (দৈনিক যুগান্তর, ৪ মার্চ,২০১৮)

সেদিন যখন এক সাথে বেড়ে ওঠা মামাতো ভাইয়ের ধর্ষণের শিকার হয়েছিল আঁখি, সেদিনও আসেননি দেবী।

শুধু আঁখি, তানজিনা কিংবা রিতা নয়, এমন হাজারো মেয়ে আজ সমাজে ধর্ষণের শিকার। অনন্তকাল তাদের কাটে দেবীর অপেক্ষায়।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের দেবী ভর করেন মানবদেহে, রক্ষা করেন সাম্ভাব্য ধর্ষণের ভিক্টিমকে। কিন্তু বাস্তবে কই সে দেবী? না, এই দেবীর অস্তিত্ব সম্ভবত শুধুই বইয়ের পাতায়, খুব বেশি হলে সিনেমার পর্দায়।বাস্তবে দেবী আসেন না। জালালউদ্দিনের মতো ধর্ষক পশুরা যুগ যুগ ধরে নাম পাল্টায়, মুখোশ পাল্টায়, লেবাস পাল্টায়। একসময় তারা সাবেত হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু এ শহরে বিচার হয় না তাদের, শাস্তি পায় না তারা। একের পর এক চলতে থাকে তাদের পাশবিকতা, পশুত্বের বলি হতে হয় সমাজের অসহায় মেয়েদেরকে। বিধিবাম, পুরুষশাসিত এ সমাজে প্রতিবাদের সুযোগ খুব একটা নেই তাদের, কলঙ্কের ছাপ এসে লাগে তাদের শরীরেই। সমাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয় নির্মমতার শিকারদের। অন্যদিকে, বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করে এই জালালউদ্দিন, সাবেতের মতো মানুষেরা।

তবে দেবী না আসলেও আমাদের আশেপাশে কিন্তু মিসির আলি’র অভাব নেই! গল্পের মিসির আলি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের চেষ্টা করলেও আমাদের মিসির আলিরা এত বোকা নন। আরে বাবা, ঘটনা তো পরিষ্কার! দোষ মেয়েটার! পর্দার মিসির আলি যেখানে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন- “মৃত মানুষ পাজামা খুলতে পারে না”; আমাদের মিসিরেরা সেটাকে একরকম উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “খোলামেলা পোশাক পরলে, ঢ্যাং-ঢ্যাং করে চোখের সামনে ঘুরে বেড়ালে কচি-বুড়ো ছেলে তো উত্তেজিত হবেই, মুর্দাও জিন্দা হয়ে যাবে! দোষ তো ওই মেয়েরই”।

হয়তো দেবী লজ্জা পায়, আমাদের সমাজের অনাচার দেখে ভয় পায়। আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের আদর্শের মাপকাঠি খুবই ভিন্ন, অনেকটা মশারির মতো। মশা খুবই বদ পতঙ্গ। সুযোগ পেলেই কামড়ে ধরবে, রক্ত চুষে খাবে। আমরা মেনেই নিয়েছি যে মশাকে বশ মানানো সম্ভব না। তাই আমরা নিজেরাই মশারির ভেতর ঢুকে পড়েছি। এই সমাজটাও এইরকম, মেনেই নিয়েছে যে মেয়ের সাদা পা দেখলে মনের সাপ ফণা তুলবেই, সারাদিন পরিশ্রম করা মেয়েটার ঘামে ভেজা কাপড়ের ফাঁক দিয়ে ব্রা’য়ের ফিতাটার দিকে চোখ আটকাবেই। পুরুষমানুষরেরা তো একটু এমন হয়ই। তাই তাদের কিছু না শিখিয়ে, আমরা মেয়েগুলোকে খাঁচার মধ্যে বন্দী করে বাঁচানোর চেষ্টা করি। তাদের ডানা কেটে, প্রতিবাদের দুয়ার বন্ধ করে দিয়ে তাদের দুর্বল করে রাখি।

দেবী আসবেন কি! হয়তো এসব অনাচার দেখে লজ্জায় মুখ লুকিয়েছেন। নাকি দেবী এসেছিলেন? আটকা পড়ে গেছেন এই শকুনদের ধূর্ত চালে? কি জানি, যে হায়েনারা ধর্ষণ করতে পারে নিজের বোনকে, যে পশুরা ধর্ষণের পর কবর জিয়ারত করতে পারে, কিংবা ঠাণ্ডা মাথায় ১২ বছর বয়সী ভাতিজীর গলায় ছুরি বসিয়ে আবার মিনিটকয়েক পরেই ভাইয়ের সাথে একসাথে কাজ করতে পারে;  তাদের ধর্মে অসম্ভব বলে কিছু আছে?

Most Popular

To Top