ফ্লাডলাইট

শুভ জন্মদিন “ফিউচার ক্যাপ্টেন”!

শুভ জন্মদিন "ফিউচার ক্যাপ্টেন"

২৫ মার্চ ২০১৭, ডাম্বুলায় অভিষেক ওয়ানডে ম্যাচ খেলছেন মেহেদি হাসান মিরাজ। বাংলাদেশের বোলিং এর সময় বল করছিলেন অধিনায়ক মাশরাফি, ওভারের কোন এক বল মন মত না হওয়ায় অসন্তুষ্ট মনে বোলিং মার্কে ফিরছিলেন মাশরাফি, ঠিক তখনই মিড অফ থেকে ছুটে এসে মাশরাফিকে কিছু একটা বলে “টিপস” দিলেন মিরাজ। দৃশ্যটা চোখ এড়ায়নি ডিন জোন্সের। ডিনো বলেছিলেন,

“আমি আমার অভিষেকের পর অধিনায়কের সাথে কথা বলতেই ভয় পেতাম টিপস দেয়ার প্রশ্নই আসে না, আমি সারা বিশ্বে লীগ দেখে বেড়াই এখন আর আমি কোথাও দেখিনি ১৯ বছরের কেউ তার অধিনায়কে বোলিং টিপস দিচ্ছে। এই ছেলেটা অসাধারণ! আমার কথাটা মনে রাখতে পারো আতহার, এই ছেলেটা স্পেশাল।”

হ্যা মিরাজ স্পেশাল! বোলিং হোক, ফিল্ডিং হোক আর ব্যাটিং দলের জন্য নিজেকে নিংড়ে সেরাটা দেয়ার প্রশ্নে মিরাজ স্পেশাল একজন ক্রিকেটার।

মেহেদি হাসান মিরাজ নিয়ন আলোয় neonaloy

এশিয়া কাপের ফাইনালের কথা ধরুন, ওপর পাশে দূর্দান্ত ব্যাট করা লিটনকেও প্রায়ই ডিরেকশন দিচ্ছিলেন, ওভারের মাঝে প্রচুর কথা বলছিলেন। লিটনের শট সুন্দর হলে বাহবা যেমন দিয়েছেন আবার মিস করলে এগিয়ে যেয়ে বলেছেন “ব্যাপার না দেখে খেলেন”!

দলে আসার পর থেকেই দলটাকে নিজের করে নিয়েছেন মিরাজ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক সিরিজে দূর্দান্ত বোলিং করার সময়েও কখনো মনে হয়নি মাত্রই দলে এসেছেন তিনি। হাসি, ঠাট্টা, সেলিব্রেশন সব কিছু দিয়ে দলটাকে মাতিয়ে রাখেন তিনি প্রতিটা মূহুর্ত।

মেহেদি হাসান মিরাজ নিয়ন আলোয় neonaloy

১৯৯৭ সালের ২৫ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন মিরাজ। জন্মের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় সপরিবারে খুলনায় চলে আসেন তার বাবা। খুলনা শহরের খালিশপুরেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। ক্রিকেট খেলার শুরু আট বছর বয়সে স্থানীয় একটি ক্লাবের মাধ্যমে। সেখান থেকেই অনূর্ধ্ব-১৪ দলের জাতীয় টুর্নামেন্টে সুযোগ পান এবং ২০১০ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ পর্যায়ে দেশের সেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন। সে বছর বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড টেস্ট চলারসময় তৎকালীন আইসিসি প্রধানের হাত থেকে দেশ সেরার সার্টিফিকেট নিয়েছিলেন মিরাজ। মিরপুরের এই দিনের আগে সাকিব, মুশফিক, তামিমদের কেবল টিভিতেই দেখেছিলেন মিরাজ।

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নজরকাড়া মিরাজের হাতে তুলে দেয়া হয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়কত্ব। ঘরের মাটিতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। ৬ ম্যাচে ২৪২ রান এবং ১২ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছিলেন মিরাজ।

মেহেদি হাসান মিরাজ নিয়ন আলোয় neonaloy

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, ২০১৬ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক করানোর পরিকল্পনা নেয়া হলেও সে সময়ের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকের ইচ্ছানুযায়ী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের চমক হিসেবে রাখা হয় মিরাজকে।

আন্তর্জাতিক অভিষেক ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ওভার করেছিলেন মিরাজ। সিরিজে ১৯ উইকেট নেয়ার গল্পটা সবার জানা এখন। একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ।

মেহেদি হাসান মিরাজ নিয়ন আলোয় neonaloy

মিরাজের অভিষেক সিরিজকে ১৯৯৩ সালের এশেজে ওয়ার্নের অভিষেকের সাথে তুলনা করেছে উইজডেন ইন্ডিয়া। হুট করে দলে এসে রাতারাতি দলের মূল স্ট্রাইক বোলার হয়ে যাওয়া!

নিজের প্রথম দুই টেস্টে তিনবার ৫-উইকেট নেয়া ৬ষ্ঠ বোলার মিরাজ। অভিষেকে ম্যান অব দ্যা সিরিজ হওয়া নবম টেস্ট ক্রিকেটার, বাংলাদেশের প্রথম।

মিরাজের বিশেষত্ব কি? মানসিক দৃঢ়তা, মিরাজ একজন দৃঢ়প্রত্যয়ী ক্রিকেটার।

দলে আসার পর থেকেই তাকে কঠিন কঠিন সময়ে বল করতে হয়েছে। সেটা পাওয়ার প্লে যেমন তেমনি ডেথ ওভারেও। নিউজিল্যান্ড সফরে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কোন স্পিনার হিসেবে বোলিং শুরু করার রেকর্ড করেন মিরাজ। একজন বোলার মানসিকভাবে শক্ত না হলে অধিনায়ক তার উপর এই ভরসা রাখতে পারেননা।

ভয়ডরহীন মিরাজ! ব্যাটসম্যান হয়তো খুনে মেজাজে তার উপর চড়াও হয়েছে, কিন্তু মিরাজকে কখনো দেখবেন না ভয় পাচ্ছে! সে তখনো ব্যাটসম্যানে ফ্লাইট দিয়ে যাচ্ছে, খেলানোর টোপ দিচ্ছে! আর মুখের হাসিটা যেন লেগেই থাকবে। খেলায় হার-জিত থাকবেই কিন্তু মিরাজ মানসিকভাবে কখনো হারেনা।

আরেকটা বড় গুন মিরাজ খুব ভালো “থিংকিং ক্রিকেটার”, সবসময় চিন্তা করেন। নতুন নতুন কিছু জিনিস চেষ্টা করেন। গত বছর সাউথ আফ্রিকায় এবং পরে বিপিএলে মিরাজ বেশ কয়েকবার লেগ স্পিন করেছেন চমক হিসাবে ওভারের ভেতর। ব্যাটসম্যানের নাম মনে আসছেনা তবে লেগ স্পিনে বোল্ড করার পর বারবার মিরাজ হাত দিয়ে দেখাচ্ছিলেন এটা লেগ স্পিন ছিলো। হয়তো ভালোভাবে আয়ত্ব করলে বিশ্বকাপে কিছু চমক ডেলিভারি দেখতেও পারি আমরা মিরাজের থেকে।

এমনিতে মিরাজ একজন অলরাউন্ডার, পজিশন হিসাবে ৪-৫ নাম্বারে ব্যাট করতেন তিনি। যুব বিশ্বকাপেও মিডিল অর্ডারে ব্যাট করেছেন। মিডিলে ব্যাট করেন, দশ ওভার বল করেন আবার অধিনায়কত্ব, এসব মিলিয়েই ভবিষ্যৎ “সাকিব আল হাসান” বলা হতো তাকে। একই রকম ভূমিকার জন্য, এমন নয় যে তাদের খেলার ভেতর খুব মিল ছিলো, ব্যাটিং, বোলিং সব দিক থেকেই তিনি এবং সাকিব সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিডিয়া শুধু শুধু অভিষেকের পর সাকিবের সাথে তুলনা করে মিরাজের উপর অতিরিক্ত প্রেসার দিয়ে তার স্বকীয়তা নষ্ট করে দিচ্ছিলো। সৌভাগ্যবশত সেটা এখন কমেছে।

মেহেদি হাসান মিরাজ নিয়ন আলোয় neonaloy

অলরাউন্ডার হলেও দলে মিরাজ মূলত বোলিং-অলরাউন্ডার হিসেবে খেলেছেন শুরু থেকে। একটা সাইড দিয়ে দলে এসে পরে পুরোদম্ভর অলরাউন্ডার হবার অনেক ঘটনা আছে। লিজেন্ডারি ক্রিকেটারদের ভেতর কপিল দেব, ইমরান খানদের নামটাও পাবেন যাদের আগমন বোলিং-অলরাউন্ডার হিসেবে। মিরাজের ব্যাটিং এর উপর আমার ভরসা আছে, দল যদি কখনো মনেকরে মিরাজকে ৪-৫ নাম্বারে খেলাবে তাহলেও মিরাজ মানিয়ে নিতে পারবে। এইটুকু বিশ্বাস মিরাজের উপর না থাকলে তাকে এশিয়া কাপে ওপেন করতে পাঠাতো না নিশ্চিত!

মিরাজ কেমন ক্রিকেটার সেটা আমরা জানলেও তার সত্যিকারের প্রমাণ আমরা পেয়েছি সদ্য সমাপ্ত এশিয়া কাপে।

টেস্ট এবং টি-টুয়েন্টিতে নিয়মিত হলেও মিরাজ কিন্তু ওয়ানডে একাদশে স্থায়ী ছিলেন না। শুরুতে ওয়ানডে ফরম্যাটে উইকেট টেকার না হয়ে ইকোনমিকাল বোলারের ভূমিকায় খেলেছেন, ১৮ ইনিংসে ১৮ উইকেট আর ৪.৪৬ ইকোনমি সেটাই বলে। যার কারনে টেস্ট বোলার হিসেবেই বেশি পরিচিতি পেয়ে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু মিরাজের অন্যতম সেরা গুন সে কুইক লার্নার, খুব দ্রুত শিখতে পারেন, মানিয়ে নিতে পারেন। সাফল্যের ক্ষুধাটা তার ভেতর চোখে পড়ার মতো। যার কারনে ওয়ানডেতেও এখন নিয়মিত উইকেট নিয়ে থাকেন তিনি।

এশিয়া কাপ মিরাজকে অন্যভাবে চিনিয়েছে, বল হাতে যেমন ছিলেন একুরেট, নিয়ন্ত্রিত, উইকেট টেকার তেমনি ব্যাট হাতেও কিছু রান পেয়েছেন। ওপেন করেছেন, নীচে রান পেয়েছেন দলের বিপর্যয়ে। ভারতের বিপক্ষে ৪২ রানের ইনিংসে কয়েকটা দূর্দান্ত শট ছিলো প্রোপার ব্যাটসম্যানের। আজ অথবা কাল সিনিয়র কাউকে নীচে দিয়ে মিরাজকে উপরে তুলতেই হবে। এই কাজটা অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অরবিন্দ ডি সিলভা করেছিলেন মাহেলা, সাঙ্গাকারা দলে আসার পর, নিজেদের ডাউন দিয়ে। একই কাজ মাহেলা, সাঙ্গাকারা না করায় এখন শ্রীলংকা সাফার করছে।

আর ফিল্ডিং? এশিয়া কাপের প্রতিটা ম্যাচে অন্তত ১৫-২৫ রান মিরাজ একাই বাঁচিয়েছেন। কাভার, পয়েন্টে দেখার মতো ফিল্ডিং করেছেন।

মেহেদি হাসান মিরাজ নিয়ন আলোয় neonaloy

দায়িত্ব নিয়ে খেলা, দলকে উজ্জীবিত রাখা, বোলারের সাথে কথা বলা, এসব একজন অধিনায়কের বৈশিষ্ট। বয়সভিত্তিক থেকেই এসব আয়ত্ব করেছেন বলবো না কারন মিরাজের বেলায় এসব আয়ত্ব করার ব্যাপার না, জন্মগত নেতার চারিত্রিক গুণাবলি এগুলা মিরাজের। ভেতর থেকেই আসে তার। মাঠের যেখানেই থাকুক সে নিজের উপস্থিতি জানান দিবেই। সাফল্যকে উপভোগ করে মিরাজ, সেটা নিজের বোলিং এর সময় উইকেট নিয়ে হোক, অন্য কেউ উইকেট নিলে হোক, দল জিতলে হোক, রান-আউট করে হোক, নিজে ব্যাট করে হোক আর অপর প্রান্তের ব্যাটসম্যানের শট খেলাকে এপ্রিসিয়েট করেই হোক।

আমি জানিনা ঠিক কিনা তবে এসবের উপর ড্যারেন স্যামির প্রভাব থাকতে পারে, বিপিএলে স্যামির অধিনায়কত্বে খেলেছেন তিনি। আর দেশের ভেতর মাশরাফির অন্যতম প্রিয়পাত্র এই মিরাজ।

আপনারা একমত হবেন কিনা জানিনা তবে গেলো এশিয়া কাপে আমি একজন ফিউচার অধিনায়ক খুঁজে পেয়েছি। ভবিষ্যৎ সাকিব হবেন কিনা সেটার উত্তর সময় দিবে কিন্তু ভবিষ্যৎ অধিনায়ক মিরাজ একদিন হবেন সেটা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নাই।

অধিনায়ককে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করতে হয় মাঠ এবং মাঠের বাইরে। মিরাজ যেভাবে সবার স্নেহ, ভালোবাসা অর্জন করে নিয়েছেন ঠিক সেভাবে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করে নিবেন। আর মাঠের বাইরেও মিরাজ খুব নিয়ন্ত্রিত।

প্রতিটা দলেই এমন আদরের একটা “ছোটভাই” থাকে, মিরাজকে পাবেন সবার মাঝে, দলীয় উৎযাপনে, টিম ফটো সেশনে, অন্যদের সেলফিতে। মিরাজ এখন দলটার মধ্যমণি। আর এভাবেই একজন অধিনায়ক জন্ম নেয়।

Leaders are born, not made – কথাটা মাশরাফিকে দেখলে যেমন মনেহয় তেমনি মিরাজকে দেখলেও। কিছু জিনিস মিরাজের জন্মগত, শিখতে হয়নি।

চ্যাম্পিয়ন মানসিকতা, সাফল্যের ক্ষুধা, হারার আগে হার না মানা, প্রতি মুহুর্তে শেখার আগ্রহ, একই ভুল বারবার না করার প্রচেষ্টা এবং সাফল্যকে উপভোগ করতে শেখার ইতিবাচক মানসিকতা মিরাজকে একদিন অনেক বড় মাপের অধিনায়ক হিসেবে গড়ে তুলবে আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

আমরা প্রায়ই চিন্তা করি আমাদের ভবিষ্যৎ কি ক্রিকেটে? সিনিয়র প্লেয়াররা অবসর নিলে কি হবে? আমি সবাইকে বলি আরো অন্তত চার-পাঁচ বছর হাতে আছে (ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাসটিক মাশরাফি বাদে), এখনই এতো নেতিবাচক চিন্তা করার দরকার নেই। আর আমাদের তরুণ ক্রিকেটাররা যদি মিরাজের মত মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যায় তাহলে বলবো আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন চিন্তাই করার দরকার নাই! ওরা শুধু খেলাটার উপর সৎ থেকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাক আজেবাজে কাজে সময় না দিয়ে। বাকিটা সময়ের সাথে এমনিতেই হয়ে যাবে।

যাইহোক আজ মিরাজের ২১ তম শুভ জন্মদিন। অনেক অনেক ভালোবাসা এবং শুভকামনা মিরাজের জন্য। শুভ জন্মদিন “ফিউচার ক্যাপ্টেন”!

একদিন সারা বিশ্ব যেন গর্ব করে বলে আমরা সেই সময়ের দর্শক যারা মিরাজের খেলা দেখেছি!

Most Popular

To Top