বিশেষ

দেবী: বিকল্প ধারার গল্পে তৈরি হওয়া মূলধারার চলচ্চিত্র

দেবী নিয়ন আলোয় neonaloy

রানু মেয়েটা কেমন যেন অস্বাভাবিক। না দেখেই অনেক কিছু বলে দিতে পারে সে। রাতের বেলায় বাসায় কোনো এক অশরীরীর অস্তিত্ব টের পায় সে। অন্ধকারে কার সাথে যেন কথাও বলে। রানুর এসব অস্বাভাবিকতার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে না পেয়ে আনিস (রানুর স্বামী) মিসির আলীর শরণাপন্ন হন। শুরুতে অনীহা দেখালেও রানুর কেসটা একসময় নিতে রাজি হন মিসির আলী। রানুর সাথে কথা বলে, রানুর গ্রামের বাড়ি গিয়ে লোকজনের সাথে কথা বলে তিনি রানুর অস্বাভাবিকতার লৌকিক ব্যাখ্যাও দাঁড় করান। প্রমাণ করেন, রানু বা বলেছে সবই তার মনগড়া। কিন্তু আসলেই কি তা-ই?

নিঃসন্দেহে মিসির আলী বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম চরিত্রগুলোর একটি। এবং দেবী মিসির আলীর সেরা উপন্যাসগুলোর একটি। সেরা উপন্যাস নিয়ে যখন আপনি সিনেমা করবেন, তখন সেই সিনেমা থেকে আপনার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কমই থাকে। হারানোর ভয়টাই বেশি। আর জনপ্রিয় চরিত্রদের রূপালি পর্দায় আনাটাও বেশ কঠিন কাজ। সত্যজিৎ বাদে কেউই ফেলুদাকে নিয়ে জুত করতে পারেননি। আজ পর্যন্ত ব্যোমকেশ বক্সীর বলার মতো কোনো ফিল্ম এডাপটেশন আসেনি। উপমহাদেশের কথা বাদ দিলাম। ১৯৩১ সাল থেকে শার্লকের মুভি এডাপটেশন হয়ে আসছে। এই কিংবদন্তী গোয়েন্দা চরিত্রকে নিয়ে প্রায় ৫০টির মতো ছবি তৈরি হলেও এর মধ্যে খুব অল্প ছবিই দেখার মতো। সেই হিসেবে মিসির আলীকে প্রথমবার পর্দায় ফোটানোর যে প্রয়াস অনম বিশ্বাস দেখিয়েছেন, তা প্রশংসা পাওয়ার মতোই।

চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে রানু চরিত্রের জন্য জয়া আহসানকে পূর্ণ নাম্বার দিতে হবে। এককথায়, এই সিনেমার প্রাণই জয়া আহসান। তার ঐশ্বরিক চেহারা, দেবী-সুলভ টানা চোখ, নিষ্পাপ দৃষ্টি; জয়া বাদে রানু চরিত্রে আর কাউকে যেন কল্পনাই করা যায় না।

মিসির আলী চরিত্র নিয়ে দর্শকদের কাছ থেকে মিশ্র মতামত পাওয়া যাবে। আমাদের কল্পনায় মিসির আলী বয়সের ভারে নুয়ে পড়া রুগ্ন এক ব্যক্তি। মিসির আলীর অধিকাংশ উপন্যাসের ক্ষেত্রেই আমাদের এই কল্প-মূর্তিটা ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘দেবী’ মিসির আলীর প্রথম উপন্যাস। এখানে তার বয়স বলা হয়েছিল ৪১ বছর। সুতরাং, বয়সের বিবেচনায় চঞ্চল বেশি যুবক হয়ে গিয়েছেন তা বলতে পারবেন না। তবে একটা বিষয় মানতেই হবে, মিসির আলী চরিত্রের কাছ থেকে আমরা যে গাম্ভীর্য বা একাকীত্বের অনুভূতিটা আশা করেছি, চঞ্চলের কাছ থেকে তা পাইনি। নীলু ও আনিস চরিত্রে যথাক্রমে শবনম ফারিয়া ও অনিমেষ আইচের অভিনয় ছিল বেশ পরিমিত।

সিনেমার প্রথম দৃশ্য থেকেই যে বিষয়টি দৃশ্যমান তা হচ্ছে পরিচালক একটি হরর মুভি বানাতে চেয়েছেন। সিনেমা শুরুই হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর কুমারী বলিদানের দৃশ্য দিয়ে। ‘দেবী’র নির্মাণ ধরণ হিসেবে পরিচালক দুটি পদ্ধতির একটি বেছে নিতে পারতেন; সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার অথবা হরর। হরর তৈরি করতে গিয়েও এখানে খুব মামুলি কিছু ট্রিক ব্যবহার করা হয়েছে। স্কেয়ার জাম্প (Scare jump) বা যুক্তিহীন সাউন্ড ইফেক্ট দিয়ে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু বাড়তি (এবং অপ্রয়োজনীয়) অশরীরী চরিত্র এনে ক্লাইম্যাক্স সৃষ্টি করা হয়েছে। আধিভৌতিকতার দিকে যতটা নজর দেয়া হয়েছে, মিসির আলীর ইনভেস্টিগেশনের দিকে ততটা নজর দেয়া হয়নি। প্রতিটি উপন্যাসেই একটি অংশের জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, কখন মিসির আলী পুরো সমস্যাটিকে যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করবেন। বলা যেতে পারে এই অংশটাই গল্পের ‘বিগ রিভিল’ (big reveal)। কিন্তু ছবিতে হতাশাজনকভাবে বিগ রিভিলটাই করা হয়েছে খুব সাদামাটাভাবে। ভৌতিক সাউন্ড ইফেক্ট বাদে বিশেষ কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও ছিল না এই ছবিতে।

১৯৮৫ সালের উপন্যাসকে ২০১৮ সালের পটভূমিতে হাজির করা হয়েছে। এই আধুনিক রূপান্তরটি বেশ সুচারুভাবেই করেছেন চিত্রনাট্যকার অনম বিশ্বাস। উপন্যাসে যেখানে আমরা দেখেছি নীলু চিঠি চালাচালি করছে, সেখানে সিনেমায় নীলু ফেসবুকে মেসেজিং করছে। সিনেমাটি হরর ঘরানার হলেও চিত্রনাট্যে ভালোই কমিক রিলিফ রেখেছেন অনম। সিনেমার সেট ও কস্টিউম ডেকোরেশন ছিল দৃষ্টিনন্দন। মনপুরা, স্বপ্নজালের মতো এখানেও ক্যামেরার পেছনে থেকে আরেকটি দৃষ্টিনন্দন সিনেমাটোগ্রাফি উপহার দিয়েছেন কামরুল হাসান খসরু।

এই ছবি তৈরির পেছনে জয়া আহসানের অবদান স্বীকার না করলেই নয়। বলতে গেলে, তার একক ইচ্ছাশক্তির জন্য বাস্তবের মুখ দেখেছে এই ছবি। ছবিটিকে বাণিজ্যিক সাফল্য দেয়ার জন্য পুরো ‘দেবী’ পরিবারের প্রয়াসই ছিল চোখে পড়ার মতো।

আগেই বলেছি, শার্লক হোমসকে নিয়ে ৫০টির মতো ছবি তৈরি হয়েছে। আমরাও চাই আমাদের প্রিয় চরিত্রগুলো নিয়ে আরও বেশি বেশি সিনেমা তৈরি হোক। চঞ্চল চৌধুরী সবার মনের মিসির আলী না হতে পারলেও ভবিষ্যতে আরও প্রতিভাবান কেউ আসবে মিসির আলীকে আরও গ্রহণযোগ্য রূপে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে।

পরিশেষে বলবো, দেশের সিনেমার প্রেক্ষাপট বিচারে এবং উপন্যাস ‘দেবী’র আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করলে অনমের ‘দেবী’ অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় কাজ। দেবী বিকল্প ধারার গল্প নিয়ে তৈরি হওয়া একটি মূলধারার চলচ্চিত্র। দেশের মূলধারার চলচ্চিত্রের যে অগ্রগতি হচ্ছে, তার উদাহরণও দেবী।

Most Popular

To Top