নাগরিক কথা

“স্যার-স্যার” ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলার আগে…

স্যার নিয়ন আলোয় neonaloy

অনেকে আমাকে অনলাইনে বা সামনাসামনি স্যার বলে ডাকেন। আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করছি আমাকে স্যার বলে ডাকবেননা।

স্যার ডেকে সম্মান দেখানোর এই রীতিটি এসেছে বৃটিশ শাসনের সময় থেকে। যখন তারা আমাদের এই উপমহাদেশ শাসন করেছে, তখন তারা আমাদের প্রভু সেজে শাসন করেছে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা তাদেরকে স্যার ডাকতেন, স্যার ডাকতেন তাদের নিয়োগ দেয়া আমলা-কামলা-পুলিশ-মিলিটারি সবাইকে। ডাকতে একরকম বাধ্যই হতেন।

শাসক আর তাদের এদেশীয় দালালেরা জনগনের টাকায় চাকরিবৃত্তি করে প্রভু হওয়ার অপচেষ্টা করে সফলও হয়েছিল, আমাদের অশিক্ষা আর অনৈক্য তাদেরকে সেকাজে সহায়তা করেছিল।

সেই শাসকদের নিজেদের দেশে কিন্তু এইরকম কোনো রীতি নেই। সেখানকার প্রশাসকদেরকে তারা তার পদের নাম ধরে ডাকে, অথবা মিস্টার অমুক বলে, এতে কারও আঁতে ঘা লাগেনা।

প্রেসিডেন্টকে তারা বলে মিস্টার প্রেসিডেন্ট, পুলিশকে তারা সিম্পলি কপ বলে বা অফিসারকে বলে অফিসার, নাম জানা থাকলে নামও বলতে পারে। সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় প্রফেসরকে সবচেয়ে নবীন যে স্টুডেন্ট, সেও প্রফেসর বা মিস্টার অমুক বলে। তাদের মধ্যে পূর্ণ সম্মানের সম্পর্কও অবশ্যই থাকে, কিন্তু এর জন্য তাদের নিজেদেরকে অসম্মানিত করতে হয়না।

আমি কয়েকবার ভারতীয় একটি প্রোগ্রাম ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখেছি, যেখানে সাধারণ একজন পুলিশ অফিসারকে দেখেছি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-শ্রমিক সবাই স্যার-স্যার করে ডাকে৷ এটা সমাজে অপ্রচলিত নয় বলেই হয়ত দেখানো হয়েছে। এই ফালতু মানসিকতাটি এসেছে সেই ব্রিটিশদের কলোনি চালানোর মানসিকতা থেকে।

এদেশে স্যার না ডাকায় বহু জনগনের টাকায় বেতন পাওয়া কর্মচারী-কর্মকর্তা চাকুরেরা জনগনকেই নাস্তানুবাদ করেছেন এমন বহু ঘটনা আপনিও শুনে থাকবেন।

আমরা আর কত কলোনিয়াল মানসিকতা লালনকারী প্রশাসনযন্ত্রের কাছে নিজেদের আত্মসম্মানকে বিলীন করবো?

যে পশ্চিমারা আমাদেরকে এসব শিখিয়েছিল, আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে চুপ রেখে, আমাদের সম্পদ নিয়ে চলে যেত, তারা নিজেদের সমাজেতো এই মানসিকতা চলতে দিতে পারেনি, তাহলে আমরা কেন সেটা চালাচ্ছি?

আমি যদি কারও অধীনে চাকুরি করি, সেখানে চাকুরি নেয়ার আগে যদি বসকে স্যার ডাকার শর্ত মেনে নিয়ে চাকুরি নেই, সেক্ষেত্রে সেটা আলাদা। তবে সেটাও উন্নত বিশ্বে নেই বললেই চলে।

আর এ দেশে বা এদেশের মত বিদেশীদের শাসন শোসনের ইতিহাস থাকা দেশগুলোতে কন্সটেবলও আশা করে তাকে লোকে স্যার ডাকুক। যে মিলিটারির সাথে তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীর কোনো সম্পর্ক নেই তাকেও তার শাসিত পরাধীন মন স্যার ডাকতে চায়। ধনী দেখলে স্যার ডাকতে হয় গরীবদের, টাই দেখলে স্যার ডাক চলে আসে লুংগিধারীর। বড় চেয়ার আমাদেরকে স্যার ডাকায়, এমনকি লেখকেরাও তাদের পাঠকের কাছে স্যার ডাক শুনে প্রীত হতে চান। এ পরাধীন মানসিকতার উত্তরাধিকার আমরা লালন করে চলেছি প্রায় তিনশ বছর ধরে।

আমি জানতে চাই, কোন সংবিধানে আছে ডিসি সাহেবকে আমাদের ডিসি স্যার ডাকতে হবে, কোন আইনে আছে ডাক্তার সাহেবকে আমার স্যার ডাকতে হবে? কোন উন্নত সমাজে এই রীতি আছে অন্তত সেটা জানতে চাই…

এ নিয়ে কথা হওয়া দরকার, পরাধীন মনস্তাত্বিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা দরকার। আমাদের প্রত্যেকেরই আছে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকার। সম্মান আর প্রভুভক্তির মানসিকতার মাঝে ফারাক আছে, প্রভুভক্তি আশা করা মানুষেরাও এটা মানতে শিখুক।

লেখক পরিচিতিঃ
মহিউদ্দিন কাউসার একজন চিকিৎসক, লেখক ও কার্টুনিস্ট। এ পর্যন্ত তার লেখা বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। নিয়মিত লেখেন রস+আলোতে। পড়াশোনা করেছেন সিলেট ক্যাডেট কলেজ এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। লেখকের আরো লেখা এক মলাটে পড়ুন তার প্রকাশিত বইগুলোতে!

Most Popular

To Top