ফ্লাডলাইট

১৩ বছরেও মুছে যায়নি যে দাগ…

নীচের ছবিটি উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন টেস্ট ভেন্যু ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম নিয়ন আলোয় neonaloy

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাথে মিশে আছে অন্তরঙ্গভাবে। বিশেষকরে ক্রিকেটের ইতিহাসে এই স্টেডিয়ামের রয়েছে অনন্য এক রেকর্ড।

দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে দুইবার টেস্ট অভিষেক হয়েছে এই স্টেডিয়ামের। ১৯৫৫ সালে প্রথম টেস্ট অভিষেক হয় পাকিস্তান দলের হোম গ্রাউন্ড হিসেবে আর ২০০০ সালে পুনরায় টেস্ট অভিষেক হয় বাংলাদেশের হোম ভেন্যু হিসেবে। দুইবারই প্রতিপক্ষ দল ছিলো ভারত।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম নিয়ন আলোয় neonaloy

১৯৫৫ সালে এই স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী ম্যাচ চলাকালীন…

এছাড়া ১৯৭৭ সালে নবগঠিত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল তাদের প্রথম আন-অফিশিয়াল টেস্ট খেলেছিলো এই ভেন্যুতে, প্রতিপক্ষ দল ছিলো সফররত এমসিসি ক্লাব।

প্রথম আন্তর্জাতিক দল হিসেবে ১৯৭৮ সালে শ্রীলংকা বাংলাদেশ সফরে আসলে একাধিক একদিনের ম্যাচ, দুই দিনের ম্যাচ এবং তিন দিনের আন-অফিশিয়াল ম্যাচ হয় এই বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে।

১৯৯৮ সালে প্রথম চ্যাম্পিয়নস ট্রফি (তখন নাম ছিলো আইসিসি নক-আউট টুর্নামেন্ট বা মিনি বিশ্বকাপ) অনুষ্ঠিত হয় এই স্টেডিয়ামে। সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট দল তাদের ইতিহাসের একমাত্র ট্রফি জিতেছিলো এই টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন হয়ে।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম নিয়ন আলোয় neonaloy

মিনি বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ে’র হাতে ট্রফি তুলে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাথে তৎকালীন আইসিসি সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া

এছাড়া এই স্টেডিয়ামে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার ভেতর সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট (বর্তমানের ইমার্জিং নেশনস এশিয়া কাপ) অন্যতম। এই টুর্নামেন্টে ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকার “এ” দল এবং বাংলাদেশের জাতীয় দল অংশ নিতো। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই সৌরভ গাঙ্গুলী, রাহুল দ্রাবিড়, শোয়েব আখতার, রাসেল আরনল্ড, দীনেশ মঙ্গিয়াদের আগমনী বার্তা জেনেছিলো ক্রিকেট বিশ্ব।

এছাড়া এখানে হয়েছিলো এশিয়া একাদশ বনাম বিশ্ব একাদশের ক্লাসিক এক ক্রিকেট ম্যাচ। মাইকেল বেভান এখানেই খেলেছিলেন ১৮৫* রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস।

এই স্টেডিয়ামেই এসেছিলো ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়। অভিষেক টেস্টে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ঐতিহাসিক শতক, নাঈমুর রহমান দূর্জয়ের ৬ উইকেট।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম নিয়ন আলোয় neonaloy

বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের প্রাক্বালে দুই দলের দুই বাঙালি অধিনায়ক

এখানেই প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডে ক্রিকেটে শতক করেন মেহরাব হোসেন অপি, এখানেই ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন আফতাব আহমেদ।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামেই প্রথমবারের মতো দুইজন বাঙালি অধিনায়ক টেস্ট ক্রিকেটে টস করতে নেমেছিলেন, নাঈমুর রহমান দূর্জয় এবং সৌরভ চণ্ডীদাস গাঙ্গুলী।

শুধু বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক এক ভেন্যু এই বঙ্গবন্ধু জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

১৯৭১ সালে এখানেই আমাদের গর্ব রকিবুল হাসান তার ব্যাটে লাল রঙ দিয়ে “জয় বাংলা” লিখে পাকিস্তানের হয়ে এমসিসি একাদশের বিপক্ষে আন-অফিশিয়াল টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। স্বাভাবিক ব্যাপার, অফিশিয়াল টেস্ট ম্যাচের একাদশে আর জায়গা হয় নি তার। চারিদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আন-অফিশিয়াল ম্যাচটাও কিন্তু শেষ করা সম্ভব হয় নি। দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে ম্যাচ ড্র ঘোষনা করে সব ক্রিকেটারদের তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেয়া হয়। অবশ্যই রকিবুল হাসান বাদে। তাকে স্কোয়াড থেকে “ছুটি” দেয়া হয়।

এই সেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম যেখানে ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিলো বাংলাদেশ সফররত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ২০০৫ সালের এই সিরিজের তৃতীয় ম্যাচ দিয়েই আমার স্টেডিয়ামে বসে সরাসরি ক্রিকেট খেলা দেখার প্রথম অভিজ্ঞতা। ২০০৩ সালে আমি সাফ-ফুটবলের সেমি-ফাইনাল এবং ফাইনাল দেখেছি এখানে। আরিফ খান জয়ের ৯০ মিনিটের অবিশ্বাস্য এক গোলে গ্রুপ পর্ব থেকে সেমি-ফাইনালের টিকিট কাটে বাংলাদেশ ১-০ গোলে জয় নিশ্চিত করে।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০৫ সালের ওই সিরিজেই প্রয়াত মানজারুল ইসলাম রানা পরপর দুই ম্যাচে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হন, যেটা বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রথম ঘটেছিলো তখন। দুই ম্যাচেই রানা ৪ উইকেট করে নিয়েছিলেন। মাঠে বসে দেখেছিলাম সেদিন রানা এবং বাংলাদেশের সাফল্য।

এই সিরিজের শেষ ওয়ানডে ম্যাচটাই ছিলো বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের শেষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেট সরিয়ে নেয়ার তৎকালীন সরকারের সেই সিদ্ধান্ত প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তুলেছিলো বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনকে।

এই স্টেডিয়ামের শেষ ম্যাচে সেই ক্ষোভই যেন জিম্বাবুয়ের বোলারদের উপর ঝেড়েছিলেন আফতাব আহমেদ এবং মোহাম্মদ রফিক। জিম্বাবুয়ের দেয়া ১৯৯ রানের টার্গেট বাংলাদেশ ছুঁয়ে ফেলেছিলো মাত্র ৩৩ ওভারেই। ৭.১ ওভারে ৫০, ১২.১ ওভারে ১০০ করেছিলো বাংলাদেশ। ১০০ রানের জুটি গড়েছিলেন দুজনে মাত্র ৬৫ বলে! রফিক ৬৬ বলে ৭২ রান করে আউট হলেও আফতাব অপরাজিত থাকেন ৮১ রানে।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেট কেন সরিয়ে নেয়া হয়েছিলো? কোন দেশ তাদের এমন আইকনিক এবং ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম থেকে মূল খেলাকে সরিয়ে নেয়? সরকার বলেছিলো এই স্টেডিয়াম ফুটবলকে দেয়া হলে মৃতপ্রায় ফুটবল জেগে উঠবে! আসলে কি সেটা হয়েছে? তাছাড়া তাহলে ফুটবলের জন্য কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম কেন বানানো হয়েছিলো?

আরো পড়ুনঃ একটি রাজনৈতিক স্টেডিয়ামের গল্প…

কারণ তৎকালীন সরকার ভালো জানে তবে অনেকেই বলে থাকেন ক্রিকেট দিয়ে তখন সারা বিশ্বে নতুন করে পরিচিত হতে থাকা বাংলাদেশের প্রধান ভেন্যু হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ব্যবহার করার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার “বঙ্গবন্ধু” শব্দটা উচ্চারিত হয়! বঙ্গবন্ধু কে এবং কেন তাঁর নামে স্টেডিয়াম বিদেশিদের সেই ব্যাখ্যা দিতে হয়!

যাই হোক শেষ ম্যাচের পরেও দেশের সাবেক ক্রিকেটার, আম্পায়ার এবং ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন যদি সরকারকে সিদ্ধান্ত বদলের জন্য রাজি করানো যায়! সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদ চলছিলো গুলিস্তান এলাকায়।

বিসিবি যতদূর মনেপড়ে ৬০ দিন সময় চেয়েছিলো ক্রিকেটকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না হলেও তখনো জাতীয় লীগের ম্যাচ হচ্ছে স্টেডিয়ামে, ক্রিকেটারদের নিয়ে এক সকালে অনুশীলনে যেয়ে ঢাকা বিভাগের ক্রিকেটাররা দেখলেন সবগুলি উইকেট কোদাল দিয়ে কুপিয়ে উঠিয়ে ফেলেছে একদল শ্রমিক! এই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন অনেক ক্রিকেটার।

জাতীয় দলের কোন ক্রিকেটার সরাসরি প্রতিবাদ করেননি একজন বাদে। তিনি খালেদ মাহমুদ সুজন। স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে তিনি সরাসরি মানব বন্ধনে দাঁড়িয়ে যান। মিডিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন

‘কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আমার অন্তরটাই রক্তাক্ত করে দিয়েছে!’

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামকে হারানোর বেদনা হয়তো এখনো অনেক সাবেক ক্রিকেটারের মনে রয়ে গিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে তড়িঘড়ি করে ক্রিকেট সরিয়ে নেয়ায় এবং শেরে-বাংলা স্টেডিয়াম তখনো প্রস্তুত না হওয়ায় কপাল খুলেছিলো নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের। কিছুদিনের জন্য “ঢাকার ভেন্যু” হিসেবে ম্যাচ পেয়েছিলো। তবে শেরে-বাংলা প্রস্তুত হবার পর আবার অনিয়মিত হয়ে পড়ে ফতুল্লা।

যাইহোক, দেশের ঐতিহ্যবাহী বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে মোট টেস্ট হয়েছে ১৭ টি, যার ভেতর ৭ টি টেস্ট হয়েছে স্বাধীনতার আগে। পাকিস্তানের হোমগ্রাউন্ড হিসেবে। যেখানে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড-পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ-পাকিস্তান ম্যাচ হয়েছে।

১৯৮৮ সালে এশিয়া কাপের তৃতীয় আসরের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথম কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করে এবং দেশের মাটিতে প্রথম ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম এবং চট্টগ্রামের এম. এ. আজিজ স্টেডিয়ামে একই সাথে দুটি ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকায় পাকিস্তান-শ্রীলংকা এবং চট্টগ্রামে বাংলাদেশ-ভারত মুখোমুখি হয় ২৭ অক্টোবর ১৯৮৮ সালে।

টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পূর্বে বাংলাদেশের যে কোন ম্যাচে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম উপহার দিয়েছে গ্যালারী উপচে পড়া দর্শক। সফররত দেশগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে একটাই বার্তা দিতো, যেই দেশে এতো দর্শক হয় সেই দেশে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কারণ নাই কোন।

এক নজরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ম্যাচ সংখ্যা-

টেস্ট ম্যাচঃ ১৭
প্রথম টেস্টঃ ১-৪ জানুয়ারি ১৯৫৫, পাকিস্তান বনাম ভারত
শেষ টেস্টঃ ১৪-১৮ জানুয়ারি ২০০৫, বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে

ওয়ানডে ম্যাচঃ ৫৮
প্রথম ওয়ানডেঃ ২৭ অক্টোবর ১৯৮৮, পাকিস্তান বনাম শ্রীলংকা (এশিয়া কাপের ম্যাচ)
শেষ ওয়ানডেঃ ৩১ জানুয়ারি ২০০৫, বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে।

ক্রিকেটের পাশাপাশি আরো একটি কারণে বিখ্যাত বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, ১৯৭৮ সালে কিংবদন্তী বক্সার মোহাম্মদ আলী একটি প্রদর্শনী বক্সিং ম্যাচে ১২ বছরের একজন বাংলাদেশি কিশোরের সাথে লড়েছিলেন।

যাইহোক, স্মৃতির পাতা থেকে অনেক কিছু লিখলাম। তবে একটা জিনিস সবসময় কষ্ট দিবে, আমাদের দুইটা ঐতিহাসিক ভেন্যু ছিলো, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম এবং এম. এ. আজিজ স্টেডিয়াম, কোনটাতেই আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা হয় না। এম. এ. আজিজে এখনো ক্রিকেট খেলা হয় কিন্তু আমাদের ৬৩ বছরের পুরাতন টেস্ট ভেন্যু থেকে আমরা ক্রিকেটকে তাড়িয়ে দিয়েছি দৃশ্যত কোন কারণ ছাড়াই। হয়তো শুধুমাত্র নামের কারণে!!

Most Popular

To Top