নাগরিক কথা

প্রশ্নফাঁস, এবং একজন আখতার হোসেন…

প্রশ্নফাঁস নিয়ন আলোয় neonaloy

প্রশ্নফাঁস- হোক সেটা বোর্ড পরীক্ষা কিংবা ভর্তি পরীক্ষার, বিষয়টার এতটাই স্বাভাবিকীকরণ ঘটেছে যে সবাই ধরে নিচ্ছে প্রশ্নফাঁস একটি অবধারিত বিষয়, এর মধ্য দিয়েই প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় টিকে থাকতে হবে। প্রতিবছরের মত এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “ঘ” ইউনিটের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আসে এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ ছ’জনকে ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলেও যথাসময়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

নিউজ মিডিয়ায় সমালোচনা চলছে, “গ” ইউনিটে ফেল করে “ঘ” ইউনিটে প্রায় অবিশ্বাস্য নম্বর পেয়ে প্রথম হওয়া ছাত্রকে নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় হচ্ছে তুমুল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, বাদ-প্রতিবাদ। এসব সম্ভবত এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, যেহেতু প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটা রীতিমত ডাল-ভাত হয়ে গিয়েছে, কিন্তু বাদ সাধলেন জনৈক আখতার হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের ছাত্র আখতার হোসেন ঢাবিতে ভর্তিচ্ছু ১৩ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতেন। প্রশ্নফাঁসের ঘটনাটির পর আখতার হোসেনের একজন ছাত্র জানতে চান, “স্যার, আমরা এত পড়াশোনা করলাম, কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় আমরা কি চান্স পাব? তাহলে কি আমরা দুর্নীতির কাছে হেরে গেলাম?” এর সদুত্তর ছিল না আখতার হোসেনের কাছে। বিবেকের তাড়নায় সিদ্ধান্ত নেন, একা হলেও এর প্রতিবাদ করবেন। ফলপ্রকাশের দিন, দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তিনি “ঘ” ইউনিটে ভর্তিপ্রক্রিয়া বাতিলসহ চারটি দাবী আদায়ের লক্ষ্যে অনশন কর্মসূচী শুরু করেন।

প্রশ্নফাঁস নিয়ন আলোয় neonaloy

অনশন চলুক, আমরা এখন একটু প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলি। ২০১৫ সালে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মুড়ি-মুড়কির মত বিক্রি হতে থাকে। প্রথমে ৫ লাখ, পরে পাঁচ হাজার; এমনকি রাত বাড়ার সাথে সাথে বিনামূল্যে প্রশ্ন বিতরণও চলে। পুরো মেডিকেল ভর্তিপরীক্ষার ব্যাপারটিই রীতিমত প্রহসনে পরিণত হয়। কঠোর আন্দোলনের ফলেও ফলপ্রকাশ ও ভর্তিপ্রক্রিয়া আটকায় নি। সাম্প্রতিক সময়ের প্রশ্নফাঁসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সম্ভবত এটাই। এছাড়া গতবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ সেশনের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বন করে ভর্তির অভিযোগ আনা হয়, যা শেষ পর্যন্ত অভিযোগ আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তো পুরনো। সবচাইতে ভয়াবহ ব্যাপার হল, ক্লাস ফাইভের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে

এভাবে আশংকাজনকভাবে প্রশ্নফাঁসের পেছনে আমি বলব নীতিহীনতা ও প্রশাসনিক অক্ষমতার দায় তো আছেই, তবে মূল সমস্যাটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে, শেখাবার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নয়। ছোটবেলা থেকে আমাদের শিশুদের বলা হচ্ছে, তোমাকে ক্লাস প্রথম হতে হবে। সে কী শিখছে তা মূখ্য নয়। বোর্ড পরীক্ষায় এ-প্লাস পেতে হবে, নইলে পাশের বাড়ির ভাবীর সামনে মুখ দেখানো যাবে না। এখন কলেজে ভর্তিপ্রক্রিয়াও এসএসসিতে প্রাপ্ত গ্রেডের ভিত্তিতে, সুতরাং “স্বনামধন্য” কলেজে ভর্তি হতে হলে এ-প্লাস পাওয়ার কোন বিকল্প নেই। অথচ “ভালো কলেজ” তৈরী করা অর্থাৎ কলেজগুলোর গুণগত মানের উন্নতি করার দিকে কারও কোন মাথাব্যাথা নেই। এইচএসসি’র গ্রেড আবার যোগ হবে ভর্তিপরীক্ষায়, সুতরাং এ-প্লাস পেতেই হবে যে করেই হোক। এই “এ-প্লাস” নিয়ে এমনই মাতামাতি, এমনই হুজুগ যে আমরা তৈরী করে নিয়েছি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিহীন “গোল্ডেন এ-প্লাস”।

প্রশ্নফাঁস নিয়ন আলোয় neonaloy

তারপর ভর্তিপরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের তুলনায় দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। সেই সুযোগে শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে শিক্ষা-ব্যাবসায় মেতেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যেখানে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য অনেকেরই নেই। সুতরাং, যেভাবেই হোক ভর্তি হতে হবে পাবলিকে। তার জন্য যদি প্রশ্ন কিনতে হয়, তাতেও আপত্তি নেই।

তারপর আসে প্রশাসনিক দূর্নীতি, অবহেলা এবং অনিয়ম। প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠিত হয় কিন্তু সেই তদন্ত আর আলোর মুখ দেখে না। চুনোপুঁটি পর্যায়ে কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়, কিন্তু পর্দার পেছনের আসল ব্যক্তিরা ধরা পড়েন না। কোনবারই ফলপ্রকাশ স্থগিত করা কিংবা ভর্তিপ্রক্রিয়া বন্ধ করার পদক্ষেপ নেন না কর্তৃপক্ষ। প্রথমদিকে “প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই/ কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি” ইত্যাদি কথা বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও একসময় তা এতই ঠুনকো হয়ে পরে যে কর্তৃপক্ষ নিজেই শরমিন্দা বোধ করতে থাকেন এগুলো উচ্চারণ করতে। তাই যখন ঢাবি’র উপাচার্য “পরীক্ষার মাত্র ৪৩ মিনিট আগে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে” বলে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, আমাদের অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।

আখতার হোসেনের কাছে ফিরে আসি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি অনশনরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে অনশন ভঙ্গ করেন। অসুস্থ একটা জাতিকে সুস্থ করার চেষ্টা সহজ কাজ নয়।

প্রশ্নফাঁস নিয়ন আলোয় neonaloy

পুনরায় ভর্তিপরীক্ষা নেয়ার পাশাপাশি আখতার হোসেনের অন্য তিনটি দাবী ছিল-
* প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা চাই
*পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১ মিনিট আগেও প্রশ্নপত্র পাওয়া গেলে সেটাও প্রশ্ন ফাঁস
*ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত যারা জালিয়াতি করে ভর্তি হয়েছে তাদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করতে হবে
*যারা এই প্রশ্নফাঁসের মতো ঘৃণ্য অপরাধে জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

প্রশ্ন হল, একজন আখতার হোসেনকে কেন অনশন কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে যেতে হবে? প্রশ্নফাঁসের এতগুলো ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কি নিজ থেকে উদ্যোগ নেয়ার কথা ছিল না? আখতার হোসেনের দাবীগুলো কি এবারই আমরা প্রথম শুনেছি? প্রতিবার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর কি এই একই দাবীগুলো ধ্বনিত হয়নি? তবে কি কর্তৃপক্ষের সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যাপারে আদৌ কোন মাথাব্যাথা নেই? এমনকি, তিনি অনশনে যাওয়ার দুদিন পর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ তার সাথে যোগাযোগ করেনি।

তবে সুখের বিষয়, আখতার হোসেনের সাথে প্রতিবাদ কর্মসূচীতে যোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্ল্যেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী। পুনরায় ভর্তিপরীক্ষার দাবি জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ এবং আখতার হোসেনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে মানববন্ধন করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মীরা। এবং সব কিছু বিবেচনায় এনে ‘ঘ’ ইউনিটে উত্তীর্ণদের পুনরায় যাচাই করে দেখার জন্য ভর্তিপরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

প্রশ্নফাঁস নিয়ন আলোয় neonaloy

ব্যক্তিগতভাবে আমি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাগ্রস্থ। “আশা রাখি, ভালো কিছুই হবে, আখতার হোসেনের প্রতিবাদ বৃথা যাবে না/বৃথা যায়নি” ইত্যাদি বলে লেখাটি শেষ করতে পারলেই ভালো হত সম্ভবত, তবে নিজের সাথে হিপোক্রেসি হয়ে যায় বলে কথাগুলো উচ্চারণ করছি না। একজন আখতার হোসেন যেটুকু বুঝেন, অনুধাবন করেন, তার চাইতে অনেক বেশি বিচক্ষণ ব্যক্তিবর্গ এই প্রক্রিয়াগুলো পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। তাহলে আখতার হোসেনকে এই প্রশ্নফাঁসের দৌরাত্ম্য নাড়া দিয়ে গেলে তাদের কেন টনক নড়ল না এতগুলো বছর?

আরেকটা কথা, অনশন কর্মসূচীতে বসে আহমদ ছফার “গাভী বিত্তান্ত” বইটি পড়ার যে ছবিগুলো নিউজ মিডিয়ায় এসেছে, তা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিছু শিক্ষালাভ করবেন- এইটুকু কাম্য।

Most Popular

To Top