নাগরিক কথা

দিন রাখে কথা আসে ফিরে, তুমি তো আসলে না আর…

আইয়ুব বাচ্চু নিয়ন আলোয় neonaloy

আজিজুর রহমানঃ

আমরা তখন ক্লাশ থ্রিতে পড়ি, বিকেল বেলা কলেজ মাঠে খেলাধুলা করি আর এক নাদুস-নুদুস ছেলে তিন-চারজন বন্ধুকে নিয়ে কলেজের রোয়াকে বসে জামিয়ে গান গায়। কানে ভেসে আসে,

“হাসতে দেখ গাইতে দেখ
অনেক কথায় মুখর আমায় দেখ
দেখো না কেউ হাসির শেষে নীরবতা।”

‘বোঝে না কেউ তো চিনলো না’ বলে ভীষণ একটা টান দেয়, মনে হয় বুকে যেন কিছু একটা এসে বিঁধে।

একই গান একই সুর, সেই বিকেল বেলা প্রতিদিন শুনি, খেলতে গেলে মা কিংবা বোনের সাথে কোথাও বের হলে।

গুনগুন করে গাইতে থাকি, পাঁচ-ছয় লাইনের বেশি লিরিক্স বুঝতে পারিনা। অনেক খোঁজ করেও গানের হদিস মেলেনা, সাহস করে তাদের জিজ্ঞেস করা হয়না কার গান। একে-ওকে জিজ্ঞেস করি, কেউই জানেনা।

কম্পিউটার-সিডির দোকান, পাড়ার বরফ ওয়ালা কারো স্পীকারেই বেজে উঠেনা, হাসতে দেখো। একটা সময় মেনে নিতেই হয় গানটা তাদেরই লেখা।

গিটার হাতের নাদুস-নুদুস ছেলেটা আমার বাসার সামনে দিয়েই যাওয়া-আসা করে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের যাওয়া-আসা দেখি সময় মিলে গেলে; আজও তাদের ঝাপসা স্মৃতি মনে পড়ে।

তারও কতদিন পরে মনে নেই, কানে ভেসে আসে পরিচিত দরাজ কণ্ঠে একজন গাইছে- “হাসতে দেখো, গাইতে দেখো…”

আমার শৈশবের চিত্রপটে আঁকা মাথায় ব্যান্ডানা, চোখে সানগ্লাস, ডোরাকাটা এক টিশার্টের আইয়ুব বাচ্চু। স্টুডিওতে বসে গাচ্ছেন এক আকাশের তারা তুই একা গুনিস নে। কখনো আবার গিটার নিয়ে হেলেদুলে, একা একাকি থাকা যায় কিংবা আমি বারোমাস তোমায় ভালোবাসি।

বিয়ে কিংবা কোন অনুষ্ঠান, পিকনিক, সিডি, কম্পিউটারের দোকান- চারিদিক তখন শুধুই আইয়ুব বাচ্চু।

আমাদের খেলাধুলায়, ক্লাসে, ব্রেকে আইয়ুব বাচ্চু। বন্ধুদের ক্ষ্যাপাতেও আমরা লিরিকে নাম জুড়ে দিয়ে গাইতে থাকি, “…… বারোমাস তোমায় ভালোবসে…………”

রাস্তায় একা হাঁটতে থাকা ছেলেটিও জোরে গেয়ে উঠে চারিদিকে বাজতে থাকা গানগুলো।

আমরা বড় হয়েছি তার গানের সাথে। আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে তার গান আর অ্যালবামের সংখ্যা। কখনো নিজ ব্যান্ডের, কখনো সলো, কখনো আবার মিক্সড অ্যালবাম। কোনটারই চাহিদা কম ছিলো না। তবে অপেক্ষায় থাকতাম মিক্সড অ্যালবামেরই। এক ফিতায় এলআরবি, মাইলস, নগরবাউল, প্রমিথিউস, সোলস, অবসকিউর, চাইম পাওয়া ছিলো অনেককিছু।

মিক্সড অ্যালবামে প্রথম সারিতে প্রথমে তার ছবি দেখে, অন্যদের চেয়ে আইয়ুব বাচ্চুর ছবিটা একটু বড় দেখে প্রিয় শিল্পীকে নিয়ে অহংকার জমতো।

ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার আগে ২০০৮-১০ সাল পর্যন্ত মনে পড়ে একেকটা গান কালেক্ট করার পিছনের একেকটা গল্প। ইলেকট্রিসিটি না থাকা রাতগুলোতে তাঁর গানগুলোই ইলেকট্রিসিটি ছিলো আমাদের পাড়ার ছেলেদের কাছে।

কত সহস্রবার বেজেছে…

“দিন রাখে কথা আসে ফিরে
তুমি তো আসলে না আর।
হায় এক বার
ফিরে যদি বলতে আমায়
মুখোমুখি হয়ে
কোনও দিনও ভালোবাসিনি তোমায়।”

মেয়ে, কবিতা, প্রেম, তাজমহল, যুগে যুগে, সিনেমার প্লেব্যাক কিংবা টিভিসি’র ৩০ সেকেন্ডের জিঙ্গেল, “ইউ প্রিটি গার্ল, ইউ আর স্টিল মাইন”।

বড় হয়ে দেখেছি তার মাথায় কালো হ্যাট, কখনো ক্যাপ। চোখে সানগ্লাস। কালো প্যান্ট, টিশার্ট আর গিটারে এক আইকনিক রোল মডেল, একটি ট্রেডমার্ক, যেন একটা জীবন্ত ভাস্কর্য্য।

ক্যাপ আর সানগ্লাসের ফাঁক গলে আঁধার নামতে তার কপালে। সেই আঁধারের মতোই অনাবিষ্কৃত মনে হয়ে চিরচেনা শিল্পীকে, ভীষণ অভিমানী আর চাপা স্বভাবের মানুষটাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আপনার কি মনে হয় আপনি যোগ্য সম্মান পেয়েছেন? অভিমানে উত্তর দিয়েছিলেন- কিভাবে পাবো? আমরা কি কখনো কাউকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছিলাম?

গিটার হাতে যিনি এমন ক্ষিপ্রতা দেখাতেন, বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন নিরেট ভদ্র মানুষ, অনুকরণীয় আদর্শ; শান্ত স্বভাবের, ভীষণ রসবোধসম্পন্ন আর সাদা মনের মাটির মানুষ। যেন আমাদের গ্রামের পাশের বাসার কেউ, খুব আপন কেউ।

আজীবন বোহেমিয়ান মানুষটি অভিমানে ছোট্ট বয়সে ঘর ছাড়ে, শেষে বয়সেও এসে সংসার থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। কিছুদিন আগে লিখেছেন,

“দূরে কোথাও যাবো
যেখানে পাহাড়ে বসে মেঘ ছোঁব
ভিনদেশী বৃষ্টিতে
ভিজে যাবো ।
জমে থাকা কথাগুলো
আকাশকে জানাবো।”

আবার সব ছেড়েছুঁড়ে দেশের মধ্যেই কোথাও হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন । সকল প্রকার যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে, সবার থেকে অনেক দূরে গিয়ে নিজের আত্মজীবনী লিখে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন।

তার সেই আত্মজীবনী, তার সেই জমা থাকা কথা কেউ জানলো না। আজ তবে আকাশও যে কিছুটা বঞ্চিত হলো তা কি নিজে সে আকাশ জানে?

নাহ! আজ তিনি আকাশেই ফিরে গেছেন আকাশেই আজ তার বাড়ি, আকাশই কি আজ তবে অহংকারে টিপ্পনি কেটে হাসে আমাদের না থাকার হাহাকার দেখে?

আভিমান লিখেছে, কষ্ট লিখেছে, বারবার লিখেছে চলে যাবার গান, উড়াল দেওয়ার গান, কেন গাইলে মরিবো মরিবো দাওগো বিদায়? কেন গাইলে রুপালি গিটার, সাজানো পৃথিবীটা ছেড়ে যেতে পারি কেন গেয়েছিলে? কেন গাইলে আমার সমাধির পর আমি চাই না তোমার উপহার? জ্বলে জ্বলে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলে, নীরবে ফুরিয়ে যেতে চেয়েছিলে! ঘুম ভাঙা শহরে মায়াবী সন্ধ্যা চাঁদ জাগা এক রাতে… আহা কি যে সুখ! কে দিয়েছিলো সন্ধান? তুমিই তো!

কিসের এত তাড়া ছিলো চলে যাবার? ফিরে কি আসতে নেই?

তবে কেনই বা একবার মৃত্যুকে জয় করে এসে গাইলে, রাখে আল্লাহ মারে কে!

৫বছর আগে হাবিবের সুরে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে ১৪-১৫ জন নবীন-প্রবীন শিল্পী নিয়ে তৈরি করা হলো বিজয় দিবসের একটি গান। এই প্রথম নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে আসলেন তিনি। সবার সাথে মিলিয়ে উপস্থিত হলেন নীল সাদা ফেড জিন্স আর সাদা টিশার্ট-ক্যাপে। ক্যাপের নিচের ব্যান্ডানা নেমে গেছে চুলের সাথে, মেদ ঝেড়ে ফেলে সুঠামদেহে দুহাত মেলে তিনি গাচ্ছেন সংসদের আঙিনায়।

শ্বেত-শুভ্র আইয়ুব বাচ্চুকে দেখে মনে হয়েছিল যেন সাক্ষাৎ মেঘদূত, ঢাকার মাটিতে মেঘ নেমে এসেছে।

সেই মেঘদূত, বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, ঈর্ষনীয় ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটা আজ আবারো সেই সাদা পোষাকে মেঘদূতের মতোই শহর ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন।

ভালো থাকবেন প্রিয় ব্যক্তিত্ব, হাতে রাবার ব্যান্ড থাকবেনা, মাথায় থাকবেনা ক্যাপ।ক্যাপের নিচে সানগ্লাসে আঁধার জমবেনা, গিটারে সুর না তুলে নিথর পড়ে রবেন- এইভাবে কখনো আপনাকে দেখতে পারবোনা।

প্রথম দেখাটাই শেষ দেখা হয়ে থাকুক প্রিয় মানুষ।

Most Popular

To Top