বিশেষ

দেবী, আমি আপনাকেই খুঁজছিলাম!

দেবী নিয়ন আলোয় neonaloy

বাংলাদেশের সিনেমা দেখতে গেলে একটা সমস্যা হলো, অনেক কিছু মাথায় রেখে দেখতে হয়। সবকিছু তুলনা করতে হয় বাংলাদশের স্ট্যান্ডার্ডে, পৃথিবীর স্ট্যান্ডার্ডে না। এমন কি উপমহাদেশের স্ট্যান্ডার্ডেও না! ভালো মানের ছবি হয়, কিন্তু সেগুলো ব্যবসাসফল হয় না, যেমন মাটির প্রজার দেশে। হাতে গোণা কয়েকটি হলে মুক্তি পায়, অল্প কিছু মানুষ দেখে, খুব পছন্দ করে। কিছু ভালো সিনেমাও ব্যবসাসফল হয়, কিন্তু অনেক কিছুর সাথে আপোষ করে। এই যেমন ঢাকা এ্যাটাক, চোরাবালি! এখানে রেকলেস গ্যাংস্টার, শীতল মেজাজের নিষ্ঠুর পুলিশের পাশাপাশি ন্যাকা ন্যাকা নায়িকা, এবং সুন্দর দৃশ্য সম্বলিত গান ছিলো। তৌকির আহমেদের সিনেমা খুবই ভালো, তিনি কোনো আপোষও করেন না, কিন্তু তিনি মার্কেটিংয়ে বড়ই উদাসীন। আয়নাবাজির মার্কেটিং যেমন করা হয়েছে, ছবি ঠিক ততটা ভালো লাগে নি। দেবী নিয়েও তাই শঙ্কা ছিলো অনেক। বাংলাদেশে এর আগে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার/হরর ঘরানার ছবি দেখি নি কি না! তার ওপর আবার প্রচারণার অংশ হিসেবে ৪ মিনিটের এক মাখামাখা রোমান্টিক গান রিলিজ দেয়া হলো। শঙ্কাটা তখন আরো বেড়ে যায়। তবে শঙ্কা থাকলেও আগ্রহের কমতি ছিলো না কোনোই। শেষ কবে কোনো ছবির জন্যে এত অপেক্ষা করেছিলাম মনে পড়ছে না।

সিনেমার শুরুটা বেশ নাটকীয়। কাহিনী শুরু হয়েছে ১৭৫৭ থেকে। এক গ্রামে একজন কুমারী মেয়েকে বলি দেয়া হচ্ছে। শুরু থেকেই নড়েচড়ে বসতে হলো। এরপর একটু কমিক রিলিফ। মিসির আলির বাসায় বাথরুম ঠিক করতে আসা মিস্ত্রীর অহেতুক বকবক, কমোড ঠিক করতে না পেরে সেখানে চেয়ার বসিয়ে দিলো বোকা লোকটা, মিসির আলি সাদাসিধে নরম প্রকৃতির লোক, তিনি কারো ওপর কঠিন হতে পারেন না, আমরা তখন থেকেই জানতে পারি। মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। আমরা যে মিসির আলিকে কল্পনা করি, একজন ক্ষয়াটে স্বাস্থ্যের অনাকর্ষণীয় চেহারার লোক, চঞ্চলকে তেমন লাগে নি। সেটা যে লাগবে না, তা তো অনেক আগে থেকেই জানা! এখন দেখার বিষয় হলো চঞ্চল অভিনয় দিয়ে এই ঘাটতি কতটুকু পুষিয়ে দিতে পেরেছেন। চেষ্টার কমতি করেন নি, তবুও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারি নি। চঞ্চল চৌধুরীর মধ্যে কিছুটা চটপটে ভাব দেখা গেছে। মিসির আলির ভেতর আরেকটু স্থৈর্য্য আশা করেছিলাম।

মিসির আলির বয়স নিয়ে একটা কথা বলার আছে। আমরা মিসির আলিকে পঞ্চাশোর্ধ একজন ব্যক্তি হিসেবেই কল্পনা করে থাকি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দেবী ছিলো মিসির আলি সিরিজের প্রথম উপন্যাস। দেবী বইটিতে মিসির আলির বয়স উল্লেখ করা হয় নি, তবে এর পরের পর্ব, নিশিথীনিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, বয়সটা হলো ৪১। তাই কিছুটা তরতাজা দেখতে মিসির আলিকে কষ্ট করে হলেও মেনে নিতে হবে। মিসির আলি একজন আত্মভোলা লোক। এই ব্যাপারটা খুব অল্প সময়ে বুদ্ধিমত্মার সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে, যখন আমরা দেখি তিনি দুই পায়ে দুইরকম স্যান্ডেল পরে ক্লাস নিতে গেছেন, আর নীলু তাকে দেখে হাসছে মুখ টিপে।

রাণু চরিত্র নিয়ে অনেকেই আপত্তি তুলেছেন। বইয়ে রাণুর বয়স ১৭-১৮ দেয়া আছে, সেখানে জয়া কেন! জয়া কেন? সিনেমাটা দেখার পর বলবেন জয়া ছাড়া অন্য কেউ এই চরিত্র করার মত নেই। সবকিছু বইয়ের মত হবে না, এটাই স্বাভাবিক। জয়ার বয়সও তাই এখানে কিছুটা বেশি। এখানে একটা ইন্টারেস্টিং কথা উল্লেখ করা যায়। বইয়ের হিসেবে কিন্তু জয়ার বয়স ২০-২১ হয়। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই এখানে হিসেবের গড়বড় করে ফেলেছিলেন। কীভাবে? রাণুর জীবনে যে দুর্ঘটনাটা ঘটে, তখন তার বয়স ছিলো ১০-১১। আবার মিসির আলিও যখন তার গ্রামে জিজ্ঞাসাবাদ করতে যান, তখন জানতে পারেন যে ঘটনা ছিলো ১০ বছর আগের। এখন হিসেব করে বলুন রাণুর বয়স আসলে কত ছিলো বইয়ে! বইয়ে রাণু একা একা থাকতো, সিনেমায় রাণু বাজার করতে বের হয়। কিছু পার্থক্য তো থাকবেই!

আবার মিসির আলি প্রসঙ্গে আসা যাক। মিসির আলি অগোছালো, নিজের প্রতি উদাসীন, এটা আমরা জানি, কিন্তু তার রুচি নিশ্চয়ই খারাপ ছিলো না! সিনেমায় দেখা যায় তিনি ড্রইয়িংরুমে মিস্ত্রীর রেখে যাওয়া কমোডের চেয়ারে গোলাপফুল চাষ করছেন, এবং রাণুর স্বামী আনিসকে বলছেন, এটা হলো গোবরে পদ্মফুলের উদাহরণ। মিসির আলি অতি সিরিয়াস প্রকৃতির মানুষ, তিনি এমন স্থুল রূচির কাজ করবেন, এবং বাজে রসিকতা করবেন, এটা মানতে পারি নি। এদিকে একটি দৃশ্যে মিসির আলি জট বাঁধানো দড়ি নাড়াচাড়া করতে থাকেন সূচালো মুখ করে, সেটি মেটাফর হিসেবে খুবই ভালো, মানব মনের জট ছাড়াচ্ছেন, তবে সেখানে মিসির আলিকে যেমন ড্যাশিং এবং ক্রিপি লেগেছে, আমাদের কল্পনার মিসির আলি তো তেমন না! তিনি খুবই সাধারণ, দুর্বল এবং ভঙ্গুর একজন মানুষ! তিনি কেন খামোখা অত কায়দা কসরৎ করতে যাবেন!

রাণু ভয় পায়। রাণুর কাছে কে যেন আসে। রাণু অনেক কিছু বুঝতে পারে আগে থেকে। এক কথায়, একটা ক্রিপি চরিত্র। পরিচালক তার সর্বোচ্চ এফোর্ট দিয়েছেন রাণু এবং তার পারিপার্শ্বিক তৈরি করতে। রাণুকে ডাকা ফিসফিসে কণ্ঠ, রাণুর ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে থাকা, কিছুটা জড়িয়ে কথা বলা, স্থিরদৃষ্টি, রাণুর ভয় পাওয়ার সময়টায় ক্যামেরার শেকি মুভমেন্ট, আবছায়ার খেলা, সবকিছুই খুব ভালো হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলা রাণুর বারান্দার রেলিংয়ে বসে থাকার দৃশ্যটা বেশ গা ছমছমে। একটা দৃশ্য ছিলো, রাণু বারান্দায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পাশ দিয়ে টুপ-টাপ করে পাতা ঝরে যাচ্ছে, তার মানসিক ক্ষরণের চমৎকার মেটাফর! তার পাশে লাল টুকটুকে গোলাপ এবং জবা ফুলকেও সিনেমার চরিত্র বলেই মনে হয়েছে। মাঝেমধ্যে রাতের বেলা দূর থেকে রাণুদের বাসা লং শটে দেখানোর ভেতরেও একটা গা ছমছমে আবহ ছিলো।

রাণুর সাথে আনিসের সম্পর্কে একটা দূরত্ব ছিলো বইয়ে। সিনেমাতেও তা বজায় থেকেছে। আনিস দায়িত্বপরায়ণ, সৎ, রাণুকে ভালোওবাসে খুব, কিন্তু সে একটু নির্বিকার ধরণের। আবেগের প্রকাশ ঠিকমত করতে পারে না। এই দিক দিয়ে আনিস, তথা অনিমেষ আইচ ঠিক আছে, কিন্তু সমস্যাটা বেঁধেছে তার সংলাপ বলার সময়। কন্ঠ অস্পষ্ট, উচ্চারণও ভালো না। অনেক সংলাপ ঠিকমত বোঝা যায় নি।

এখন আসা যাক গানের প্রসঙ্গে। আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, এই গান এখানে খামোখা ঢোকানো হয়েছে। এর কোনো দরকারই ছিলো না। গান শুরু হবার সময় আমার পাশের ভদ্রলোক উঠে চলে যান পপকর্ন কিনতে। অডিয়েন্সকেও খুব একটু মোহিত মনে হয় নি। তবে গানটি খুব অল্প সময় দেখানো হয়েছে। পুরো চার মিনিট দেখালে নিপীড়িত বোধ করতাম।

নীলু চরিত্রে আসা যাক। শবনম ফারিয়া চমৎকার অভিনয় করেছেন। তবে এখানে একটা দ্বন্দ্বের ব্যাপার আছে। বইয়ে বলা হয়েছিলো নীলু দেখতে ভালো না। তার কোনো বন্ধু নেই, প্রেমিক তো দূরের কথা! কিন্তু শবনম ফারিয়া তো দেখতে যথেষ্ট ভালো! তাহলে গোল বাঁধলো কোথায়! কোথাও গোল বাঁধে নি। বইয়ে কিন্তু নীলুকে অন্য কেউ দেখতে খারাপ বলে নি। নীলু নিজেকে অসুন্দর মনে করতো। এখানেও তাই। সে যুগের সাথে তাল মেলাতে না পারা ইনফিরিয়র কমপ্লেক্সে ভোগা একটি মেয়ে। তার পোষাক, চুল বাঁধা, চলাফেরা, সবই কেমন আড়ষ্ট। সে অসুন্দর না, তবে সাদামাটা। সিনেমাতেও তাকে সাদামাটাই লেগেছে। শবনম ফারিয়া খুব ভালো অভিনয় করেছেন।

তবে এখানে একটা জিনিস মিসিং। সেটা হলো নীলুর বোন বিলুর ক্যারেক্টার। বইয়ে বিলু ছিলো অসম্ভব সুন্দর এবং উচ্ছল। তার অনেক বন্ধুবান্ধব। আর মূলত এ কারণেই নীলু হীনম্মন্যতায় ভোগে। সিনেমাতে বিলু একদমই অপ্রকাশিত। তাকে একটু মেলে ধরলে নিলুর চরিত্রটি আরো অর্থবহ হতো। তার বেদনার উৎস বোঝা যেতো। নীলুর বাবা চরিত্রটাও অপ্রধান হলেও গুরুত্ববহ ছিলো। সিনেমাতে তাকে পেলাম না।
মিসির আলির গ্রাম অনুসন্ধান পর্বটি আরেকটি বিস্তৃত হতে পারতো। যদিও জিজ্ঞাসাবাদে অনেক ধরণের চরিত্র পাওয়া গেছে, এবং সবাই বেশ সাবলীল ছিলো, কিন্তু রাণুর বোন হনুফা, যার বিয়েতেই সব ঘটনার সূত্রপাত, সে আরো গুরুত্বের দাবীদার ছিলো।

মূল বইয়ে ঘটনা আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেকার। কিন্তু এখানে টাইমলাইনটা ২০১৮ই রাখা হয়েছে। নীলু আর সাবেতের মধ্যে চিঠির বদলে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ দেখানো হয়েছে। এই একটি বিষয় বাদ দিলে আসলে ৯০ অথবা ২০১৮ তেমন একটা পার্থক্য বহন করে নি। তাই টাইমলাইন এখানে গুরুতপূর্ণ কিছু না। তবে একটা ঝামেলা তৈরি হয়ে গেছে এর ফলে। সেটা হলো, উপন্যাসে যে লাশটি রাণুকে নদীর নিচে জড়িয়ে ধরে সেটিকে উদ্ধারের পর দুইদিন পড়ে থেকে গলে যায়, কারণ সেই সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ ছিলো, ফলে পুলিশ আসতেই দুদিন লেগে যায়। কিন্তু প্রিয় অনম বিশ্বাস, দেবী সিনেমার টাইমলাইন অনুযায়ী এই ঘটনা ২০০৩-০৫ এর। তখন কি যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটা খারাপ ছিলো?

সাবেত চরিত্রটি সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলছি না, স্পয়লার হয়ে যাবে বলে। তবে সে আসার পর সিনেমার গতি অনেক বেড়ে যায়। পুরো দ্বিতীয়ার্ধই খুব গতিময় ছিলো। প্রথমার্ধ অনেকের কাছে কিছুটা স্লো লেগেছে। কিন্তু কাহিনীটাই তো এমন! কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে ক্যারেকটার ডেভেলপমেন্টই মুখ্য ছিলো, এবং তা করা হয়েছে যথাযথভাবেই।

সিনেমাটিতে বেশ কিছু ভয় পাবার মত মুহূর্ত ছিলো। বিশেষ করে জিতু মিয়ার ভয় পাবার মুহূর্তে পুরো হল চিৎকার করে উঠেছিলো!

একদম শেষের দিকে যখন রাণুর শরীরে দেবী ভর করে, তখন চারপাশের আবছায়ার মধ্যে রাণুর মুখে উজ্জ্বল আলোর প্রক্ষেপন ভালো লেগেছে।

সিনেমার এডিটিং ছিলো অসাধারণ। মিসির আলি ভাবছেন, রাণুর অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক, আবার রাণুর বর্তমানে ফিরে আসা, নীলুর বিপদ, রাণুর অতিপ্রাকৃত অনুভূতি এই ট্রাঞ্জিশনগুলো চমৎকার ছিলো। তবে রাণুর সমস্যার উৎস যেখান থেকে সেই নদীতে স্নানের দৃশ্যটা আরো ভয়ের হতে পারতো। বিশেষ করে সেই মৃতবক্তির রাণুর পা জড়িয়ে ধরাটা দেখার বড়ই ইচ্ছে ছিলো। রক্তমাংসের দেবীর পেছনে যে সময় দেয়া হয়েছে, সে তুলনায় মন্দিরের দেবীকে তার প্রাপ্যটা দেয়া হয় নি। দেবীমূর্তিটা অসম্ভব সুন্দর ছিলো। তার তো আর অভিনয় করার ব্যাপার নেই, তাকে আরেকটু বেশি দেখালেই হতো!

সিনেমা শেষে ম্যাজিকের মত দেবী টিম উপস্থিত হলো সামনে। তখন দর্শকদের সে কী খুশি! আমার নিজেরও হাততালি থামছিলোই না।

সবশেষে বলি, দেবী দেখতে গিয়ে ঠকি নি, সময়টা ভালো কেটেছে। কাহিনীটা জানা না থাকলে আরো বেশি ভালো লাগতো নিশ্চিত। দেবী টিম যা প্রমিজ করেছে, তা ডেলিভারি দিতে পেরেছে। বাংলা ভাষায় নিখাঁদ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার-হরর দেখার সৌভাগ্য আগে হয় নি। কলকাতার বাইশে শ্রাবণও অনেক জায়গাতেই আপোষ করেছে, দেবী তা করে নি। তাই দেবী না দেখলে অবশ্যই আপনি মিস করবেন! দেবীর পরবর্তী পর্ব নিশিথিনীও তৈরি হোক আশা করবো। সেটা নিশ্চয়ই এরচেয়ে অনেক ভালো হবে!

আমার রেটিং 7.5/10

লেখকঃ হাসান মাহবুব

Most Popular

To Top