ইতিহাস

আইনস্টাইনের থিওরি অফ হ্যাপিনেস: দেড় মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া “সুখের মূলমন্ত্র”

আইনস্টাইন সুখ নিয়ন আলোয় neonaloy

ইতিহাসের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ হিসেবে আমরা চিনি তাঁকে। তাঁর তত্ত্বগুলো পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দিয়েছিল। তবে শুধু বিজ্ঞান নিয়েই নয়, জীবন নিয়েও ছিল আইনস্টাইনের ছিল স্বতন্ত্র মতবাদ। বিশেষ করে তিনি তাঁর “থিওরি অফ হ্যাপিনেস”-এর জন্যেও নামজাদা হয়েছেন এই শতাব্দীতে এসে। এর পেছনের গল্পটাও বেশ মজার।

১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে আইনস্টাইন ইউরোপ থেকে জাপানে যাচ্ছিলেন একটি লেকচার সিরিজ ডেলিভারির জন্য। এই ভ্রমণে থাকা অবস্থাতেই আইনস্টাইন খবর পান, তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেছেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অবদানের জন্য তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।

তাই আইনস্টাইন যখন জাপানে এসে পৌঁছান তখন তাঁর খ্যাতি হঠাৎ-ই অনেকগুণ বেড়ে গেছে। পুরো জাপান জুড়ে ছড়িয়ে গেছে তাঁর নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির ঘটনা। হাজার হাজার মানুষ জায়গায় জায়গায় ভিড় করছেন নোবেল লরিয়েটকে এক পলক দেখার জন্য। এই খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়ে আইনস্টাইন টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে একা একা বসে জীবন সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করছিলেন, লিখছিলেন নিজের একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা।

আইনস্টাইন সুখ নিয়ন আলোয় neonaloy

জাপানে আলবার্ট আইনস্টাইন

ঠিক সেসময়ই তাঁর কাছে একজন বার্তাবাহক আসে, একটি ডেলিভারি দিয়ে যেতে তাঁকে। বার্তাবাহককে বখশিশ দিতে গিয়ে আইনস্টাইন দেখেন তাঁর কাছে খুচরা অর্থ নেই, তাই তিনি তাকে বখশিশ না দিয়ে একটি অভিনব কাজ করেন।

তিনি দু’টো কাগজে কিছু কথা লিখে বার্তাবাহককে দেন। বলেন, যদি ভাগ্য তোমার সাথে থাকে, তবে এই কাগজের লেখা কথাগুলোই আজকের দেওয়া কিছু খুচরা অর্থের তুলনায় তোমার কাছে অনেক মূল্যবান হবে। এই আইনস্টাইনের অটোগ্রাফবাহী কাগজগুলোই গত বছর অক্টোবরের ২৪ তারিখ নিলামে বিক্রি হয়েছিল ১.৮ মিলিয়ন ডলারে।

এর মধ্যে একটি কাগজে লেখা ছিল, “একটি শান্তিপূর্ণ ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবন নিরবিচ্ছন্ন অস্থিরতা নিয়ে সফলতার পেছনে দৌড়ানো জীবনের থেকে অনেক বেশি সুখ এনে দেয়।“ একেই এখন বলা হচ্ছে, “আইনস্টাইন্স থিওরি অফ হ্যাপিনেস।”

এই কাগজটির বিক্রি হয় ১.৫৬ মিলিয়ন ডলারে। অথচ নিলামের আগে ধরা হয়েছিল ৫ থেকে ৮ হাজার ডলারের মত দাম পড়বে চিঠিটার। ওই নিলাম হাউজের চিফ এক্সিকিউটিভ গ্যাল উইনার জানিয়েছিলেন, নোটটির দাম ডাকা শুরু হয়েছিল ২ হাজার ডলার থেকে। আর ২৫ মিনিট ধরে চলেছিল সেই নিলাম।

আরেকটি নোটে লেখা ছিল, “ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়”, ইংরেজিতে। এর দাম উঠেছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছিল সেই নোটটি। এসবই জানা গেছে নিলাম হাউজের কর্মকর্তা এবং তাদের ওয়েবসাইট থেকে। ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের পরিচয়-ই এখনো সাধারণের থেকে গোপন রাখা হয়েছে।

সেই ১৯২২ সালে, এই নোটগুলো লেখার পর, আইনস্টাইনের ছয় সপ্তাহব্যাপী জাপান ট্যুরটা বেশ সফল হয়। আইনস্টাইন জাপান দেশটিকে অনেক ইতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেন। তিনি তার ছেলেদের কাছে চিঠিতে লিখেন,

“এখন পর্যন্ত যত মানুষের সাথে আমি মিশেছি, তাদের মধ্যে জাপানিজ মানুষদেরই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছ, কারণ তারা একই সাথে ভদ্র, চৌকস, বুঝদার, এবং শিল্পেরও সমঝদার।”

কিন্তু এত বছর পর এসে আইনস্টাইনের “সুখের তত্ত্ব”-টি আসলে কতটুকু সময়োপযোগী? কারণ সুখ তো আসলে বৈজ্ঞানিক আপেক্ষিকতার থেকেও অনেক বেশি আপেক্ষিক, তাই এর রহস্য এখনো বিজ্ঞানীরা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেননি। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা যায়, গড়পড়তা চাকরি-বাকরির চেয়ে স্বনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার সংগ্রামশীল জীবন আসলে বেশি সুখকর। এটি আসলে আইনস্টাইনের তত্ত্বটির সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক। এর বিপরীতে আরেকটি বড়সড় গবেষণায় দেখা গেছে ভারসাম্যযুক্ত জীবন হচ্ছে সুখী জীবন, পরিবারকে, ক্যারিয়ারকে, নিজেকে সবকিছুকেই সমানভাবে সময় দেওয়া মানুষেরা বেশি সুখী। এটি আসলে আইনস্টাইনের তত্ত্বটির সাথে মিলে যায়।

সুখের পেছনে অন্যতম একটি গবেষণা প্রকাশ হয় ২০০৫ সালে। সেখানে বিজ্ঞানী সুখের পেছনে হওয়া এর আগের ২২৫টি গবেষণার উপর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে আসেন, সফলতা আসলে সুখ নিয়ে আসে না, বরং সুখ নিয়ে আসে সফলতা। অর্থাৎ, “সুখ মানুষের আচরণে এমন সব পরিবর্তন আনে যা কাজ, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য সবখানেই মানুষকে সফল করে তুলে।”

এখান থেকে আমরা বলতে পারি, হয়তো আইনস্টাইন তার তত্ত্ব অনুযায়ী নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটিয়ে সুখী ছিলেন বলেই তিনি তার কাজে এতটা সফল হয়েছিলেন, এতকিছু অর্জন করেছিলেন পদার্থবিদ্যায়।অনেক মনস্তত্ত্ববিদই আসলে দেখেছেন, আমরা আসলে কখনোই সুখী হই না, বরং “সুখের চরকি”-তে ঘুরতে থাকি।

নক্স কলেজের সাইকোলজির প্রফেসর ফ্রাংক টি ম্যাকএন্ড্রু তাঁর একটি লেখায় বলেছেন,

“আমরা একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অনেক পরিশ্রম করি, সেই উদ্দেশ্যটি আমাদের কতটা সুখ এনে দিবে সেই আশায়, কিন্তু উদ্দেশ্যটিতে সফল হলেই কিছুদিনের মধ্যে আমরা নতুন অবস্থানে থিতু হয়ে যাই, আবার নতুন উদ্দেশ্য তৈরি করি, তার পেছনে ছুটতে থাকি কারণ আমরা নিশ্চিত এই উদ্দেশ্য হাসিল হলেই আমাদের সুখ নিশ্চিত।”

বেশিরভাগ মানুষের জীবনটা আসলে এই চক্রের মধ্যেই কেটে যায়। একারণে লটারি বিজয়ী কিংবা সফল উদ্যোক্তা কিংবা তারকারা, কাউকেই আসলে ব্যক্তিগত জীবনে তেমন সুখী দেখা যায় না। এটি মুখের কথা নয়, একটি গবেষণারই সিদ্ধান্ত।

তাই নোবেল প্রাইজ পেয়ে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছার পর হয়তো আইনস্টাইন বুঝেছিলেন এই সাফল্য আসলে তাঁকে তেমন কোনো সুখ এনে দেয়নি, বরং চক্রের মধ্যেই ফেলে রেখেছে। তাই হয়তো তিনি চক্রের বাইরে বের হওয়ার একটি তত্ত্ব আমাদের সামনে এনে দিয়েছেন। বলেছেন সফলতার পেছনে না ছুটে নীরব নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে যা হয়তো আসলেই আমাদের এই অস্থির চরকি থেকে বের করে নিয়ে আসবে। তাই বলতে হয়, আইনস্টাইনের অন্যান্য সব যুগান্তকারী তত্ত্বের মতোই তার সুখের তত্ত্ব বা “থিওরি অফ হ্যাপিনেস”-ও এখনো সময়োপযোগী।

কিন্তু আইনস্টাইনের উপদেশ কি আমরা আসলেই শুনছি? উদ্যোক্তা এবং মোটিভেশনাল স্পিকাররা কিন্তু উল্টো কথাটা বলছে। সফল উদ্যোক্তা এবং লেখক বিল পেসি’র কথাই ধরুন। তার নির্দেশনা-

“সফল হয়েই সন্তুষ্ট থাকা যাবে না, বরং সাফল্যকে কিভাবে আরও ছাড়িয়ে যাওয়া যায় সেই চেষ্টায় লেগে থাকতে হবে অবিরত”।

এখন সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কোন পথে এগোবেন।

বিল পেসি’র বক্তব্য বিস্তারিত পড়ুন এই লিঙ্কে

নিয়ন আলোয়-এর পক্ষ থেকে আমরাও বের হয়েছিলাম “সুখ” এর  সন্ধানে। কি পেয়েছি আতিপাতি খুঁজে, দেখবেন?

Most Popular

To Top