নাগরিক কথা

কন্যাশিশু দিবসঃ কি দরকার এই অযথা প্রহসনের?

কন্যাশিশু নিয়ন আলোয় neonaloy

এক।

গত ১০ই অক্টোবর নাকি আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস ছিল এবং দেশে অনেকে নাকি যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবস টি পালন ও করেছে!! যেই সমাজে দিনে দুপুরে ধর্ষণের পরও, আসামী চোখের সামনে থাকার পরও তার বিচার হয় না বছরের পর বছর; সেই সমাজে কিছু স্যান্ডউইচ-কোক খাওয়া সেমিনার আর কিছু অকারণ সময় নষ্টকারী বিশাল বক্তৃতা বাণী প্রসব করা ছাড়া এই দিবস দিয়ে আর কি কাজ হয় আমার বোধে আসেনা।

এই “কন্যা শিশু দিবস” যে আসলে অল্প বয়সেই মানুষের মনে অহেতুক প্রবল লিঙ্গ বৈষম্যের সূচনা করে দেয়, সেটা কি কেউ কখনো ভেবে দেখেছেন? অবশ্য অনেক “বাদী”রা এই “সূচনা”টা কে নানান রঙের রংচং মাখিয়ে তাকে লিঙ্গ সচেতনতা বলে ব্যাখ্যা করেন!! অতি অল্প বয়সেই এমন একটি বিভেদ বাচ্চার মনোজগতে না ঢুকিয়ে দিলেই কি আমাদের চলছে না? আমার সন্তান কে তো শুধুমাত্র “সন্তান” হিসাবেই দেখি; সে কন্যাসন্তান না ছেলে সন্তান সেটা কখনোই চিন্তায় আসেনি।

এর কারণ হিসাবে অনেকে শিক্ষা, মানসিক বিকাশ, সচেতনতা, বাসস্থানের অবস্থানের কথা বলবেন। সত্যি বলতে এগুলোই কারণ এবং যতটুকু বুঝি দিবসটি পালনের কারণ আসলে সবাইকে (আসলে কন্যাশিশুর পিতামাতাদের) কন্যাশিশুর অধিকার-কর্তব্য সমন্ধে সচেতন করে তোলা। কিন্তু এই দিবসের বাস্তব চিত্র কেমন থাকে তার একটা ধারণা আমাদের সবারই আছে।

দুই।

“আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস” এর পরদিনই দেখলাম যশোরের এমপি সাহেবের ভিডিওটা। অনেক কষ্টে ৩ বারে শেষ করলাম। ‘৯০ এর দশক অথবা তার আগে যারা বাংলা বা হিন্দি ছবি দেখেছেন, এই ভিডিওটার সাথে তারা হয়তো কিছু জিনিস রিলেট করতে পারবেন। এটা কেন বলছি এবারে সেটা বলি, এই ভিডিওটি দেখার পরে আমার কাছে শুধু “বাঈজি এবং জমিদার বাবু”র চরিত্রের কথা মনে হয়েছে। আর এই ঘটনা হয়েছে একটি স্কুলে, একজন জনপ্রতিনিধি আর স্কুল শিক্ষকেরা হাসিমুখে সেখানে বসে আছেন। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই লজ্জা জাতি হিসাবে কোথায় রাখি? কার কাছে এর প্রতিকার চাইবো?

স্কুল শিক্ষকেরা যখন বুঝে যান যে গোলামী-ই হচ্ছে টিকে থাকার একমাত্র উপায় এবং এমন নির্লজ্জ গোলামী হাসিমুখে মেনে নেন – তখনই আসলে একটি জাতির ভবিষ্যৎ ছবি ফুটে উঠে। একবার কেউ ভালোভাবে লক্ষ্য করেছেন সেই বাচ্চা মেয়েগুলোর মুখ, কতটা বিব্রতকর অবস্থায় ছিল তারা! ঠিক একদিন আগেই যারা ঘটা করে “আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস” পালন করলেন; তারা কেউ প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে এর বিরুদ্ধে একটি কথা বলেছেন? আমি এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার ঘৃণা আর প্রতিবাদটুকু জানিয়ে রাখলাম।

তিন।

আমার সন্তান এমন শিক্ষকদের কাছে পড়াশোনা করছে, এমন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে- এটা আমি মেনে নিতে পারিনা। আমি নিশ্চিত এই মেয়েদের কয়েকজনের পিতামাতাও সেটা পারেননি; কিন্তু ক্ষমতার জোরের সামনে তারা কিছুই বলতে বা করতে পারেননি। আবার আমি নিশ্চিত এমন কিছু অভিবাবকও ছিলেন যারা তাদের সন্তান “এম পি সাহেবের সামনে পারফর্ম করছে”- ভেবে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন! আসলে সমস্যাটা যে আসলে শিক্ষা আর মানসিকতায়, সেটা সবাই জানি এবং বুঝি। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো নিয়ে কথা বলতে বা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন অর্থবহ কাজ করতে রাষ্ট্রীয় পদে বহাল মানুষদের যেন বরাবরই অনীহা। আর এই অনীহা যুগযুগ ধরেই চলে আসছে এবং সেই অনীহা প্রতিনিয়ত যেন কেবল বাড়ছেই।

আসলে অল্প পরিশ্রমে “তেল” ঢেলে কাজ হলে আর শিক্ষা ব্যাবস্থা ঠিক করার প্রয়োজনই বা কি? আর শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়াটা কোন দেশেই, কোন কালেই সহজ বিষয় নয়- এটা আমাদের রাজনীতিবিদেরা বেশ ভালোই বুঝেন! আর আপনি নিজে যতদিন আপনার নিজের সন্তান কে “পুত্র বা কন্যা সন্তান” না ভেবে শুধু সন্তান ভাবতে পারবেন; যতদিন না সমাজের মানুষদের মানুষ হিসাবে না ভেবে সবসময়ই সব জায়গাতেই কেবল নারী-পুরুষ হিসাবে ভাববেন, ততদিন কোন রাস্ট্র-সমাজই কিছু করতে পারবেনা; সে তারা যত উদ্দ্যোগই নিক না কেন! তাই আশপাশের মানুষকে তার যোগ্যতায় পরিমাপ না করে শুধু লিঙ্গ বিচারের আগে আরেকবার ভাবুন, এখনো হাতে ভাবার সুযোগ আছে – কিছুদিন পরে হয়তো সেই সুযোগও পাবেন না!

Most Popular

To Top