নাগরিক কথা

ডাক্তারদের হাতের লেখা খারাপ হয় কেন?

ডাক্তার হাতের লেখা নিয়ন আলোয় neonaloy

প্রতিবছর ৭০০০ লোক মারা যায় চিকিৎসকদের “পড়ার অযোগ্য বাজে” হাতের লেখার কারণে। বিশ্বস্ত গবেষণাসূত্রের খবর।

এ বিষয়ে আপনার মতামত কি??

আচ্ছা মতামত আপনার বলা লাগবে না, আমিই বলে দিচ্ছি অনুমান করে। মতামতগুলো হবে এরকমঃ
– “বাঙালী হয়ে হিব্রু লেখে ক্যা??”
– “এসব ডাক্তার নামক পশুর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা উচিৎ”
– “পুলিশে দেওয়া উচিৎ”
– “জেলে দেওয়া উচিৎ”
– “প্রশ্ন ফাস করে পাশ করলে যা হয় আর কি”
– “হাতের লেখা বুঝলে তো তাদের দুই নাম্বারি ধরে ফেলবে মানুষ, এই জন্য বাজে করে লিখে।”
ইত্যাদি ইত্যাদি..

সকলের অবগতির জন্য জানাতে চাচ্ছি উপরের রিপোর্ট টা বাংলাদেশের জরিপের হিসাব না। আমেরিকার হিসাব। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ২০০৭ সালের একটি রিপোর্টেই এমনটা জানা যায়।

খোদ আমেরিকায় গড়ে ৭০০০ লোক চিকিৎসকদের খারাপ হতের লেখার জন্য মারা যায়। তবে কি ঐ দেশেও প্রশ্ন ফাঁস? জালিয়াতি? দুই নাম্বারি???

এখনো কি আপনাদের মতামত আগের মতই থাকবে? নাকি একটু চিন্তা ভাবনার দরজা খুলবেন? আচ্ছা, আমি একটু হেল্প করি চিন্তাভাবনা করতে।

আমি যখন ডাক্তারী পাশ করি, তাখন ভেবেছিলাম হাতের লেখা ঝকঝকে রাখবো। রাখতামও। নিজের একেকটা প্রেসক্রিপশন দেখে মনে হতো প্রেমিকা কে প্রেমপত্র লিখেছি.. কি সুন্দর আহা!

কিন্তু দিন যত গড়ালো, দায়িত্ব তত বাড়লো। কাজের চাপ বাড়লো। আগে সপ্তাহে একটা কলম লাগতো, এখন গড়ে ২ দিনে ১ টা কলম লাগে। এত লেখা লিখতে হয়। সেই করতে করতে কবে যে হাতের লেখার চরিত্র খারাপ হতে থাকলো, তা বুঝতেও পারলাম না।

বিশেষ করে যখন হাতে সময় ২ ঘন্টা, রোগী ৫০ জন, আপনি একা ডাক্তার। তখন হাতের লেখা খুবসুরাত করার চেষ্টা জানলা দিয়ে পালায়। খালি ঔষধের দোকানদার আর হাসপাতালের নার্স বুঝতে পারবে, এমনভাবে লিখতে পারলেই হলো।

কি ভাবছেন? আমি অজুহাত দিতে বসেছি?
বাঙালীর তো আছেই তিন হাত। ডাইন হাত, বাম হাত আর অজুহাত..

না ভুল বুঝবেন না। আমি অজুহাত দিচ্ছি না। মূল সমস্যার দিকে চোখ ফিরাচ্ছি সবাইকে। বাস্তবতা বোঝাচ্ছি।

এই আশা নিয়ে বোঝাচ্ছি যে এরপর কোন বাংলাদেশী ডাক্তারের বাজে হাতের লেখা নিয়ে মন্তব্য করার আগে অন্তত এটা আপনাদের মাথায় উকি দেয় যে, “পৃথিবীর উন্নত দেশেরও ডাক্তারদের হাতের লেখা খারাপ। এটা পৃথিবীজুড়েই তাদের পেশাগত সমস্যা। বাংলাদেশের জাতিগত না ”

কথাটা বিশ্বাস হলো না? “Doctors Handwriting” লিখে আপনার প্রিয় গুগলে সার্চ দিন। দেখেন পৃথিবীর সব দেশেই এটা নিয়ে ট্রল করা হয়।

আর আমরা কি করি? কোন একটা প্রেসক্রিপশন বাজে হাতের লেখা দেখলেই হয়েছে। আল্লাহর নামে নিজের দেশকে, জাতিকে এবং দেশের ডাক্তার এর মা-বাপ তুলে গুষ্টি উদ্ধার করি।

আচ্ছা করেন। গালাগালি করা একটা বিনোদনের ব্যাপার।

কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো, এতক্ষণ তো বললাম সমস্যার কথা। ইনিয়ে-বিনিয়ে সমস্যার কথা বললে তো হবে না। যতই বুঝাই, লাভ তো নাই। বুঝ দিয়ে তো পেট ভরবে না। পেট ভরবে সমাধান দিয়ে। হাতের লেখার না বুঝার কারণে আমার রোগী যদি সঠিক চিকিৎসা না পায়, লজ্জাটা আমারই। এরপরে যতই পন্ডিতী ফলানো কথা বলি, লাভ নাই।

কি করা যেতে পারে?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এখন প্রেসক্রিপশন লেখাটাকে ডিজিটালাইজ করে ফেলেছে। ছাপানো লেখার প্রেসক্রিপশন। যাতে রোগীর বুঝতে সমস্যা না হয়। যেহেতু ডাক্তারদের হাতের লেখা সুন্দর করা সম্ভব না, সেহেতু উপায় বদলে দিয়েছে তারা।

বাংলাদেশে এটার প্রচলন হয়েছে, কিন্তু সব ডাক্তার এটা এখনো ব্যবহার করতে পারছেন না। কারণ সেটা সহজলভ্য ছিলো না।

তারপরেও আমরা কিন্তু পিছিয়ে নেই।
লক্ষ করে দেখবেন অনেক হাসপাতালেই রোগী ছুটির কাগজের প্রেসক্রিপশন ছাপানো অক্ষরে দেয়া হয়।  তার মানে আমরা বাংলাদেশী রা কিন্তু বসে নেই। সমাধানের পথে কাজ কিন্তু আগাচ্ছে।

আবার সফটওয়ার বানালেই তো হবে না, ওটা যাতে ডাক্তারদের জন্য ইউজার-ফ্রেন্ডলি হয় সেটাও দেখতে হবে। ওটা ব্যবহার করে প্রেসক্রিপশন লিখতে যাতে ১ মিনিট এর বেশী না লাগে সেটাও দেখতে হবে।

আজকাল অনেকেই উৎসাহী হয়েছেন এরকম সফটওয়ার বানিয়ে দিতে। সবাই সফল হচ্ছেন না, কেউ কেউ হচ্ছেন।

আমি আশাবাদী। আপনারাও আশাবাদী থাকুন।

আর যদি কোন সফটওয়ার ইন্জিনিয়ার বা উদ্যোগী কেউ সাহস করে উদ্যোগ নিতে পারেন, তাইলে আরও সফটওয়ার বানিয়ে দিন। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই বানান। ব্যাপারটা আরো প্রচলিত, সহজলভ্য এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য হলে হয়তো একসময় সরকারী হাসপাতালগুলোতেও ছাপানো প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা পৌঁছে যাবে।

তখন এই যে লাখ লাখ গরীব মানুষ সরকারী হাসপাতালে সেবা নিচ্ছেন, তাদের কি পরিমাণ উপকার হবে ভাবতেই ভালো লাগে।

দেখা যাক কি হয়.. গালির পাশাপাশি একটু দোয়াও দিবেন প্লিজ।

(লিখতে লিখতে আজকাল বেশী কথা বলে ফেলি। কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে জানাবেন, H2O-তে ট্রিট দিবো)

Most Popular

To Top