ফ্লাডলাইট

যখন ক্রিকেট সুন্দর হয়!

ক্রিকেট সুন্দর নিয়ন আলোয় neonaloy

ক্যাপ্টেন্সি নিয়ে খুঁতখুঁতে স্বভাবটা অস্ট্রেলিয়ানদের বরাবরই ছিলো। যে কারণে কিনা নিজের সময়ের সেরা ক্রিকেট মস্তিষ্কের অধিকারী হয়েও শেন ওয়ার্নের কখনো ক্যাঙ্গারুদের নেতৃত্ব দেয়া হয়নি। কারণ আর কিছুই নয়, স্রেফ ব্যক্তিগত জীবনে উচ্ছৃঙ্খলতা। সেই অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বের ঝাণ্ডা এখন টিম পেইনের কাঁধে, দলে টিকে থাকাটাই যাঁর কাছে এখন হতো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক দুরবস্থা বোঝাতে এতটুকু তথ্যই বোধহয় যথেষ্ট।

এছাড়া তো আর উপায়ও ছিলো না। যেমন উপায় ছিলো না তিন অভিষিক্তকে না নামিয়ে। কিছুদিন ধরেই একের পর এক ঘটনায় টালমাটাল অস্ট্রেলিয়া তাই যখন মরুর বুকে  পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে এলো, তাই প্রশ্ন ওঠেনি, ‘কে জিতবে’, বরং প্রশ্ন ছিলো, ‘পাকিস্তান কতটা ব্যবধানে জিতবে!’

৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া টেস্টে যেন ছিলো সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেয়ারই প্রাণান্ত চেষ্টা। দুবাইয়ের ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি উইকেটে টস জিতে পাকিস্তানের ব্যাটিং নেওয়া, ওপেনিংয়ে দু’শো ছাড়ানো পার্টনারশিপ, দুটি সেঞ্চুরির সাথে দুটি সত্তরোর্ধ্ব ইনিংস, পাকিস্তানের ১ম ইনিংসে সবই ছিলো। যা ছিলো না, তা-ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই গিয়েছে। দলের দুই স্ট্রাইক বোলার মিচেল স্টার্ক আর নাথান লায়নের বোলিং-য়ে বিষটাই যে ছিলো না।

ক্রিকেট সুন্দর নিয়ন আলোয় neonaloy

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ টাইমস অফ ইন্ডিয়া

এমন অবস্থায় প্রথম ধাক্কাটাই সবচেয়ে মারাত্মক হবার কথা। আশ্চর্যজনকভাবে অস্ট্রেলিয়া সে ধাক্কাটা পার করে দিলেও এবং প্রায় অভূতপূর্বভাবে অ্যারন ফিঞ্চ-উসমান খাজা ১৪২ রানের ওপেনিং জুটি গড়লেও, ইনিংসে মড়ক ঠিক-ই লাগে, আর যখন লাগে তখন ১৪২-য়ের সঙ্গে আর ৬০ রান যোগ হতেই অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয়বার বোলিংয়ে নামতে হয়। ‘অভূতপূর্ব’, ‘আশ্চর্যজনক’ জাতীয় বিশেষণ ব্যবহার করতে হচ্ছে, কারণ ওপেনিং জুটিতে শতরান আসবার পরেও আর মাত্র ৬০ কিংবা তার চেয়ে কম রান তুলতেই দশ উইকেট হারানোর ঘটনা ইতিহাসে এ নিয়ে কেবল তৃতীয়বার। যার সর্বশেষ ঘটনার বয়সও ৪৪ ছাড়িয়েছে, যেবার এই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই নিউজিল্যান্ড ১০৭-০ হতে দেখতে দেখতেই ১৫৮-১০ হয়ে গিয়েছিলো।

আজ ম্যাচ শেষে অবশ্য আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন, “পাকিস্তানের ম্যানেজমেন্টের কি দ্বিতীয় ইনিংসে মিচেল স্টার্ক, সিডলদের বোলিং করতে দেয়াটা খুব জরুরি ছিলো?” আপনার ভাবনা নিয়ে দোনোমনায় ভুগবার কোনো কারণ নেই, খোদ ক্রিকেট বিশ্লেষক হার্শা ভোগলেও এমন প্রশ্নই তুলেছেন। অবশ্য ম্যাচজুড়েই সরফরাজ আহমেদ আর তার বাহিনী নিয়েছেন এমন অনেক প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত। পঞ্চম দিনের শুরুতে অস্ট্রেলিয়াকে আরও চেপে ধরা যেতো কিনা, একজন অধিনায়িকের আরও একটু মানসিকভাবে শক্ত হওয়াটা জরুরি কিনা, অথবা নিজের অনুভূতি প্রকাশে আরও একটু সংযত আচরণ করা তার উচিৎ ছিলো কিনা, চাইলে এমন আরও গণ্ডাখানেক প্রশ্ন আপনি তুলতেই পারেন।

ক্রিকেট সুন্দর নিয়ন আলোয় neonaloy

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ফক্স স্পোর্টস

তবে এসব প্রশ্ন তুলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বীরত্বকে খাটো করবার উপায় দেখছি না। উপমহাদেশের মাটিতে, চতুর্থ ইনিংসে ১৪০ ওভার (আচ্ছা মানছি, ১৩৯.৫ ওভার) ব্যাট করবার বীরত্বকাব্যকে কেবল যে শব্দ জুড়ে জুড়ে লম্বাই করা যায়, খাটো করবার সুযোগ কোথায়! চতুর্থ ইনিংসে এর চেয়ে বেশি ওভার খেলা হয়েছে একবারই, ১৪২ ওভার। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সে কাজটা বাংলাদেশ-ই করেছিলো!

এ বীরত্বপূর্ণ ব্যাটিংয়ে কাউকে না কাউকে নেতৃত্ব দিতেই হতো। যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই উসমান খাজা গত বছরের ভারত সফরে সুযোগ পাননি স্পিন বোলিংয়ের বিরুদ্ধে বড্ড বেশি দুর্বল হওয়ায়। সে দুর্নাম ঘোচাতেই কিনা, এ ম্যাচের ৪র্থ ইনিংসে একাই খেললেন ৩০২ বল, যা এ সিরিজের আগে উপমহাদেশের মাটিতে ৯ ইনিংসে খেলা বলসংখ্যার চেয়েও ৮ টি বেশি। এ ৩০২ বলে এসেছিলো ১৪১ রান, যার কল্যাণে উপমহাদেশের মাটিতে ৪র্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের মালিক এখন খাজাই।

শুধু একটি সেঞ্চুরি-ই নয়, এ যেন ছিল সমালোচকদের জন্য একটি দাঁতভাঙ্গা জবাব!

খাজা যদি নায়ক হন, তো ট্রাভিস হেড আর অ্যারন ফিঞ্চরা পার্শ্বচর হয়েই রইবেন। দুই অভিষিক্তের দুটি হাফ সেঞ্চুরি-ই তো ম্যাচে টিকে থাকার ক্ষণিক আশা বাঁচিয়ে রেখেছিলো।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কত্ব পদটাই বোধহয় এক জিয়নকাঠি। যিনি এই আসনে আসীন হন, তাকে নিয়ে আর প্রশ্ন তুলবার অবকাশ হয় না। তাইতো, এক অধিনায়কের ১৯৪ বলে ৬১ রানের ইনিংস খেলেন, ৯ম উইকেটে ২৯ রান আসে, ৭৩ বল নষ্ট হয়, বিকেলের আলোর সাথে সাথে পাকিস্তানের জয়ের স্বপ্নও মরে আসে, বিলাল আসিফকে নির্বিষ মনে হয়। টিভি ক্যামেরায় পাকিস্তানি সমর্থকদের মোনাজাত চোখে পড়ে, আকুতি চোখে পড়ে। কিন্তু এরই ফাঁকে ক্রিকেট ভক্তরা আরেকটি ম্যাচ নিয়ে জাবর কাটার সুযোগ পায়।

নিউল্যান্ডসের ‘স্যান্ডপেপারগেট’ অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটকে বদলে ফেলেছে অনেকটাই। বদল এসেছে অধিনায়কত্বে, বদল এসেছে কোচিং স্টাফে, এমনকি বদল এসেছে প্রধান নির্বাহীর চেয়ারেও। কেবল বদল আসেনি একটা জায়গাতেই…..

চিরায়ত অস্ট্রেলিয়ান মানসিকতায়, হারার আগেই হারবো না মানসিকতায়।

তাই দুবাই টেস্ট ড্র হয়। ক্রিকেটটা তখন দেখতে খুব সুন্দর হয়।

আরো পড়ুনঃ
সময় এখন লিটনের!

Most Popular

To Top