ফ্লাডলাইট

সময় এখন লিটনের!

লিটন নিয়ন আলোয় neonaloy

১৪২ বলে ২০৩ করেছেন লিটন দাস চার দিনের ম্যাচে! চারের সংখ্যা ৩২, ছয় মেরেছেন ৪ টি।

চার দিনের ম্যাচে টি-টুয়েন্টি খেলেছেন প্রায় ১৪৩ স্ট্রাইক-রেট নিয়ে।

জাতীয় লীগের ম্যাচ হলে সাধারণত মানুষের নজরে কম আসে এসব ইনিংস, সোজা কথায় দাম দিতে চায়না অনেকেই। আর লিটন ঘরোয়াতে সেঞ্চুরি করলে সেটা আর নতুন কি!

তবে ম্যাচ পরিস্থিতি বিচারে লিটন হয়তো তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা প্রথম শ্রেণীর ইনিংস খেলেছেন আজকে। একাই ম্যাচ বাঁচিয়ে দিয়েছেন রংপুরের জন্য হয়তো।

খেলাটা হচ্ছিলো রাজশাহী-রংপুর বিভাগের মধ্যে। রংপুর বিভাগ প্রথম ইনিংসে রান করেছিলো মাত্র ১৫১। জবাবে রাজশাহী নাজমুল হোসেন শান্ত (১৭৩), মিজানুর রহমান (১৬৫) এবং জুনায়েদ সিদ্দিকীর (১০০*) শতকে ভর করে রানের পাহাড় গড়ে ৫৮৯/৪ রানে ইনিংস ঘোষণা করে তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনে।

৪৩৮ রানে পিছিয়ে রংপুর, হাতে আছে পাঁচ সেশন। ড্র করাটাও যেখানে কল্পনার সমান! চোখ রাঙাচ্ছে ইনিংস পরাজয়।

ঠিক তখনই লিটন যেন ব্যতিক্রম কিছু করার চ্যালেঞ্জ নিলেন।

শুরু করলেন স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। রাজশাহীর বোলারদের উপর ছড়ি ঘুরিয়ে চার-ছয়ের বন্যা বইয়ে দিলেন। করে ফেললেন বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড।

তৃতীয় দিনের খেলা শেষে মাত্র ৪৯ ওভারে রংপুরের সংগ্রহ ৩১৯/২, পিছিয়ে আছে মাত্র ১১৯ রানে। হাতে আছে ৮ উইকেট। ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয় না হলে এই ম্যাচ রংপুর ড্র করে ফেলবে।

জাতীয় লীগে সেঞ্চুরি লিটনের জন্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু যেই মানসিকতা নিয়ে লিটন আজ ব্যাট করেছেন সেটাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। জাতীয় লীগের উইকেট, বোলারদের মান ইত্যাদি নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু ৪৩৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করাটা যে পাহাড় সমান চাপের সেটা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই।

এই অবস্থায় ম্যাচ বাঁচাতে হলে অন্তত তিন-চারজন ব্যাটসম্যানকে মাটি কামড়ে উইকেটে পড়ে থাকতে হতো। কিন্তু তবুও ৪৩৮ রান অতিক্রম করে লিড নেয়াটা প্রায় অসম্ভব কাজ হতো। আরেকটা কাজ করা যেত রানের চিন্তা না করে পাঁচ সেশন ব্যাট করা। তবে সেজন্য একজন নয় কয়েকজনকে ব্যাট হাতে খুব ভালো করতে হতো যেটার কোন নিশ্চয়তা ছিলোনা। লিটন যেটা করতে পারতেন একাই দায়িত্ব নিয়ে চমকপ্রদ কিছু করে ম্যাচ বাঁচিয়ে ফেলা, লিটন দাস সেটাই করেছেন সফলতার সাথে।

প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৭ রান করা লিটন দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৩ রান করে আউট হয়েছেন দিনের মাত্র ২ বল বাকি থাকতে তাইজুল ইসলামের বলে সাব্বিরের হাতে ক্যাচ দিয়ে।

অনেকে প্রশ্ন করেন জাতীয় লীগ খেলে উপকার কি হয় আসলে? উইকেট নিয়ে প্রশ্ন, বোলারদের মান নিয়ে অসন্তুষ্টি! কিন্তু উপকার যেটা হয় সেটা হচ্ছে ম্যাচ-সিচুয়েশনের অভিজ্ঞতা। কখনো ৪৩৮ রানের মতো বড় রানের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়লে কিভাবে ব্যাট করা যেতে পারে সেটার একটা অভিজ্ঞতা কিন্তু লিটনের হয়েছে আজকে। আবার চারদিনের ম্যাচেও যে পরিস্থিতিভেদে টি-টুয়েন্টি স্টাইলে ব্যাট করা যায় সেটাও অন্যদের সামনে উদাহরণ হিসেবে রেখে দিলেন।

বড় ক্রিকেটার হতে হলে সবার আগে প্রফেশনাল হতে হয়। যখন যে দলের হয়েই খেলুক না কেন বড় ক্রিকেটাররা সব সময় প্রফেশনাল মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামেন, দলের জন্য যেটা দরকার নিজে দায়িত্ব নিয়ে সেটা করার চেষ্টা করেন। কখনো হয়, কখনো হয়না। জাতীয় লীগ “পিকনিক ক্রিকেট”, জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এখানে সিরিয়াস থাকেনা, সর্বোচ্চ সেরাটা দিতে চাননা এসব কথা শুনেছি অনেক, কিন্তু লিটনের ইনিংসটা ব্যতিক্রম বলবো, হোক জাতীয় লীগ তবুও কেন আগেই পরাজয় মেনে নিতে হবে? একটু ব্যতিক্রম কিছু করলে অনেক সময় একজনই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

অবশ্যই লিটন দাস ম্যাচ ডিফাইনিং একটা ইনিংস খেলেছেন, সম্পুর্ন ডোমিনেট করে খেলেছেন প্রতিপক্ষের উপর, প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য তিনি, কিন্তু লিটনকে আরো বড় দাগে চিন্তা করতে হতো, দিনের শেষ ওভারে আউট হওয়াটা বিচক্ষণ কাজ নয়। আর মাত্র দুটি বল বাকি ছিলো, দেখেশুনে পার করে দিলে কালকে আবার নতুন করে শুরু করতে পারতেন, ইনিংসটা আরো বড় করে দলকে লিড এনে দিতে পারতেন, হয়তো প্রথম ট্রিপলের দেখাও পেয়ে যেতে পারতেন। আমি অনেক লিজেন্ডারি ব্যাটসম্যানদের দেখেছি লাঞ্চ বা চা-বিরতির আগের ওভার বা দিনের শেষ ওভার সফট হ্যান্ডে খেলে বা বল লিভ করে পার করে দিতে, এমনকি ফুলটস বলকেও ঠেকাতে দেখেছি তখন। জাতীয় লীগ থেকে এসব জিনিসই শিখতে হবে লিটনসহ সব ক্রিকেটারদের।

লিটনের ফর্মটা ভালো যাচ্ছে, আশাকরি সামনের আন্তর্জাতিক সিরিজগুলোতেও তার ব্যাট হাসবে। তাহলেও বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল।

সময় মনেহয় এখন লিটনের পক্ষে, অতীতের দুঃসময় হয়তো শেষ হয়েছে লিটনের! অবশেষে!

Most Popular

To Top