নাগরিক কথা

“পোস্ত”- শুধুই কি একটি সিনেমা?

পোস্ত নিয়ন আলোয় neonaloy

“অপার স্তব্ধতা দাও
নিশ্চিহ্ন করো
নিশ্চিহ্ন করো
স্তব্ধতা দাও
গীতবিতানেই থেমে যাক
ইমন কল্যাণ…”

এই ক’টি লাইনেই যেন লুকিয়ে আছে সমস্ত সিনেমার চিত্রনাট্য। সিনেমা যদি চিত্তবিনোদনের মাধ্যম হয়, তবে এই সিনেমা চিত্তবোধনের। জীবনানন্দ যেমন বলেছিলেন-

“স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে”

এই সিনেমা দেখার পর একটা বোধ জন্ম নেয় মনের মধ্যে। যা আপনাকে ভাবাবে, আপ্লুত করবে, হয়ত অনাগত দিনের জন্য আশংকাও তৈরী করবে মনের মধ্যে। অনেক্ষণ মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি থেকে যাবে, সাথে ভালোলাগার একটা মৃদু শিহরণ; ভালোবাসার মানুষের প্রথম স্পর্শের মত।

যে সিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছে- সেটা নিয়ে কি অহেতুক কাব্য হয়ে যাচ্ছে? কিন্তু আগাগোড়া লিরিসিজমে ভরা একটা সিনেমা- যে সিনেমার মধ্যে একটাও অহেতুক বাক্যবিনিময় নেই, অপ্রয়োজনীয় চরিত্রের আনাগোনা নেই, সিনেমাকে অযথা প্রলম্বিত করার বানিজ্যিক উপকরণ নেই; কিন্তু যা আছে সেটা আপনার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যাবে। পরিচালকদ্বয়ের (নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) এমন সংযত ও পরিমিত চিত্রনাট্য খুব কম সিনেমায়-ই দেখা যায়। কথা হচ্ছে ‘পোস্ত’ সিনেমা-কে নিয়ে।

কর্পোরেট সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা কত কিছু থেকে যে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি- বিশেষ করে পারিবারিক সম্পর্কগুলো কত শিথিল হয়ে যাচ্ছে; এই সিনেমা যেন সেই কথাগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পারিবারিক সম্পর্ক যতটা শিথিল হবে, সম্পর্কে যতটা ব্যবচ্ছেদ হবে- এতে করে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরই পোয়াবারো।

একটা উদাহরণ দেই। মনে করেন- একটি পরিবারে চাকুরিজীবী একজন যুবক তার স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত পিতা ও মাতা সহ আছেন। সেই পরিবারের জন্য তখন একটি টিভি, একটি ফ্রিজ, সোফাসেট, ওভেন; অর্থাৎ আধুনিক জীবনের যত হোম এ্যপ্লায়েন্স লাগে- মাত্র একটি করে লাগছে। কিন্তু, ঐ পরিবারের চাকুরিজীবী যুবককে যদি তার বৃদ্ধ মা-বাবা থেকে আলাদা করে দেয়া যায়; তখন নতুন একটা বাসার জন্য আরো এক সেট করে নতুন সব হোম অ্যাপ্লায়েন্স লাগছে। কোম্পানিগুলোর বিক্রি দ্বিগুন হচ্ছে। সুতরাং কর্পোরেট মোঘলরা তো চাইবেই- এই উপমহাদেশীয় পারিবারিক বন্ধনে ব্যবচ্ছেদ হোক, এবং এটা হয়েই গেছে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীও আলাদা আলাদা ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। নতু্ন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে দিবাকালীন পরিচর্যা কেন্দ্রে, নতুবা ন্যানির কাছে। আর প্যারেন্টিং কার্যক্রমগুলো স্মার্টফোন নির্ভর যোগাযোগ মাধ্যম দিয়ে চালানো হচ্ছে। এ তো গেল বাস্তবতার কথা। এবার আসি ক্রিটিক’স পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আলোচ্য সিনেমার কথায়।

সত্যজিতের ক্যামেরার সামনে কাজ করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্র্যাফটম্যানশিপ, যেকোন সিনেমার সাফল্যকেই ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। কোন একটা সিনেমায় সৌমিত্রের উপস্থিতি মানে- রাতের আকাশে হাজার তারার মধ্যেও আলোকনির্ঝরিনী একা এক চাঁদের মত। পাশাপাশি অন্যান্য প্রধান চরিত্রে আছেন যীশু সেনগুপ্ত, পরাণ বন্দোপাধ্যায়, মিমি চক্রবর্তী- যারা প্রত্যেকেই ইন্ড্রাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত। পোস্ত ওরফে অর্ক চরিত্রে অভিনয় করা শিশু শিল্পী অর্ঘ্য রায় এর অভিনয় খুবই সাবলীল ছিল। শুধু পোস্তদের বাসার গৃহপরিচারিকার অভিনয়ে যথেষ্ট ঘাটতি ছিলো- ওর স্বগতোক্তিগুলো ডেলিভারে দক্ষতার খুবই অভাব ছিলো। তাছাড়া, পোস্তের বাবার পক্ষের উকিল- সিনেমায় যিনি নিবেদিতা নাম্নী, তার অভিনয় একজন পেশাদার উকিলের উপস্থাপনা রীতিকে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। যদিও- ওগুলো চোখে পড়ার মত এমন কিছু নয়।

নচিকেতার গান আর বাবুল সুপ্রিয়ের অতিথি শিল্পী হিসেবে ক্ষণিকের উপস্থিতি; পুব আকাশে হঠাৎ করে ওঠা রামধনুর মত- বাড়তি ভালোলাগা তৈরী করে।

যেখানে শুরু করেছিলাম, সেখানেই এবার শেষটা টানব। কর্পোরেট জীবনধারার পিছনে ছুটে চলা প্রজন্মের কাছে; রবীন্দ্রনাথ- গীতবিতান- শান্তিনিকেতন, এসব এখন অচল। গীতবিতান কিংবা রবীন্দ্ররচনাসমগ্র বড়লোকের বাড়ির বুকশেল্ফের শোভা বর্ধন আর কৃত্রিম আভিজাত্যের পরিচায়ক হিসেবে শুধু কাজ করে। একটি পাতাও কেউ পড়ে দেখে না। অর্থ-বিত্তের নিশ্চয়তা দিতে না পারা রবীন্দ্রনাথের সকল কল্যাণচিন্তা গীতবিতানের দু’মলাটের ভিতরই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রবীন্দ্রানুরাগী পিতার সাথে আধুনিক চিন্তাচেতনাপুষ্ট পুত্রের যে জেনারেশন কনফ্লিক্ট, সেটা বাস্তব। লজিক এর কাছে আবেগ সবসময়ই মার খায়। সেটা আরো একবার এই সিনেমা দেখিয়ে দিল।

Most Popular

To Top