নিসর্গ

নিস্তব্ধ নিঝুম দ্বীপে…

তানভীর সোহানঃ

নিঝুম দ্বীপে আগে থেকে প্ল্যানিং করে খুব কম ট্যুরই সফল হয়ছে। বরাবরই প্ল্যান থাকে একটা আর ঘটে আরেকটা। এবারও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। এবার শীতের শুরু থেকে চিন্তা করছিলাম নিঝুম দ্বীপে একটা ঢুঁ মেরে আসব। কিন্তু ক্লাস-পরীক্ষা, সঙ্গী, টাকা-পয়সা সব মিলিয়ে হচ্ছিল না।

অবশেষে ভার্সিটির কয়েকজন বন্ধু মিলে প্ল্যান করলাম জানুয়ারীর ৪ তারিখ নিঝুম দ্বীপের উদ্দ্যেশে যাত্রা করব। কিন্তু সময় যতই ঘনিয়ে আসছিল লোকবল একজন একজন করে কমতে থাকল। আমি অবশ্য মনে মনে চিন্তা করে রেখেছিলাম আমার সাথে একজন হলেই চলে যাব। শেষ পর্যন্ত কেউ নেই, প্রায় হতাশ অবস্থায় ক্লাসে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম যাবে কিনা? ৩/৪ জন তখন রাজি হলো, শেষ পর্যন্ত সেই সংখ্যা দাঁড়ালো ৬-এ। আমি, টিংকু, নাহিদ, মুসা, নাঈম আর সাব্বির।

যেহেতু আগে থেকে নিশ্চিত ছিলাম না যাওয়ার ব্যাপারে, হঠাৎ করে ঠিক হলো পরদিন যাবো। তড়িঘড়ি করে শুরু হলো ট্যুরের প্রস্তুতি নেয়া। টাকা-পয়সা কোনরকমে ম্যানেজ করে ঐদিন বিকেলে বাসের টিকেট কাটতে চলে গেলাম। ৪ তারিখ রাত ৯:২০ এর বাস, সিলেট-নোয়াখালী সোনাপুর । বাসস্ট্যান্ড পৌঁছেই দেখি বাস ছেড়ে দিচ্ছে, তাড়াহুড়া করে বাসে উঠলাম।

অতঃপর শুরু হলো বহু প্রতীক্ষিত যাত্রা। বাস যখন সোনাপুরে থামলো তখন প্রায় সকাল ৬টা বাজে। বাস থেকে নেমেই যা টের পেলাম তা হচ্ছে হাড় কাঁপানো শীত, সাথে ক্ষুধা তো আছেই। ভাগ্য ভালো পাশেই একটা হোটেল খোলা ছিল। নাস্তা সেরেই সিএনজি নিলাম চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত। এরপর চেয়ারম্যান ঘাট থেকে সি-ট্রাকে (Sea-truck) নলচিড়া ঘাট। সি-ট্রাকে দুইটা ঘন্টা খুবই উপভোগ্য ছিল, আবছা কুয়াশায় ঢাকা চারিদিক, অথৈ জল।

নলচিড়া ঘাট থেকে এবার যেতে হবে মোক্তারিয়া ঘাট, হাতিয়ার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। যাওয়ার উপায় দুটো হয় মোটরবাইক না হলে দেশী চাঁদের গাড়ি (গাড়ীর অবস্থা খুব একটা ভাল না)। আমাদের বাজেট কম থাকায় ঠিক করলাম চাঁদের গাড়ীতেই উঠব। ট্যুরের সবচাইতে ভয়ংকর সিদ্ধান্ত ছিলই এটাই। গাড়ীর মাঝখানে বেঞ্চ দিয়ে সিট দেয়া হয়েছে। এত পরিমাণ মানুষ তোলা হয়েছিল যে মনে হচ্ছিল নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে, সাথে ভাঙ্গা রাস্তার যন্ত্রণা তো আছেই। এত দুর্দশা সইতে না পেরে মাঝপথে নেমেই গেলাম, বাকি রাস্তা বাইকে। আহ…! কি শান্তি!

মোক্তারিয়া ঘাটে যখন পৌঁছলাম তখন দুপুর হয়ে গেছে। খাবারের জন্য পেট হাহাকার করছিল। ঘাট থেকে ঐ পাড়ে নিঝুম দ্বীপ দেখা যায়। এপারেই খাওয়া দাওয়া শেষ করে নৌকায় উঠলাম। ২০ মিনিট পরই নিঝুমদ্বীপ এর মোক্তারিয়া ঘাট। সেখান থেকে আবার বাইকে নামারবাজার। নামারবাজারে যখন নামার পর দেখি ৩ টা বেজে গেছে, প্রচুর ক্লান্তি লাগছিল। কোন জার্নিতেই আজ পর্যন্ত এতগুলো যানবাহন পাল্টাতে হয়নি। তবে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছিল যখন কিছুদূর হেঁটে নদীর তীরে আসলাম, এটাকে অবশ্য রিভার বীচ বলা যেতে পারে। তাঁবু খাটানোর জায়গা ঠিক করার জন্য একটু আশেপাশে ঘুরে দেখলাম, তখনই নিঝুম দ্বীপের সৌন্দর্য কিছুটা অবলোকন করলাম। একপাশে বিস্তীর্ণ বালুর চর, নদী, অন্য পাশে ঘন সবুজ বন। সবচাইতে ভাল লেগেছিল চৌধুরী খাল।

নদী থেকে বনের ভেতর দিকে চলে গেছে। সত্যি অপরুপ ছিল, তার সাথে শীতল বাতাস তো আছেই। তাঁবু টানানোর জায়গা ঠিক করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দিনের আলো থাকতে থাকতেই তাঁবু টানানো, ক্যাম্পফায়ার এবং বারবিকিউ এর জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে হবে। আমি আর নাঈম গেলাম বাজারের দিকে। বাকিরা এইদিকেই রয়ে গেল। বাজারে যাওয়ার আগে দুজন মিলে বনের ভেতর একটা চক্কর দিয়ে আসলাম। বনের ভেতর একটু আগানোর পরেই চৌধুরী খালটা আবার চোখে পড়ল।

শ্বাসমূল খালের পাড়ে উঁকি দিচ্ছিল। পাশেই একটা ওয়াচ টাওয়ার। ওয়াচ টাওয়ার এর উপর থেকে পুরো দ্বীপটা দেখা যায়। পানিতে ঘেরা সবুজ বন, নির্জনতায় যার প্রতিচ্ছবি। বাজার থেকে কেনা কাটা শেষ করে গিয়ে দেখি তাঁবু টানানো হয়েছে, তার সামনে আগুন জ্বালানো হয়েছে। স্থানীয় এক পিচ্চিকে দিয়ে ওর বাসা থেকে মুরগি কাটা এবং জালির ব্যবস্থা করা হল।

তারপর শুরু হলো প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ। হাড়কাঁপানো শীতে, প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে চলছিল মুরগি পোড়ানো। ভালই যাচ্ছিল সময় কিন্তু কে যেন মুসার নতুন জুতা চুরি করে নিয়ে গেছে। জুতা চুরির শোকে মুসা ততক্ষণে টেন্টের ভেতর ঢুকে গিয়েছে। কত শখ করে একটা উকুলেলে নিয়ে এসেছে ছেলেটা খাওয়া দাওয়া শেষ করে তারা দেখবে, সবাই মিলে গান গাইবে। তা আর হলো না। কিন্তু ঘুমানোর আগে নাহিদ যে গান শুনালো তা কখনও ভোলার নয়। হাসতে হাসতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই। সবাই ভোরবেলাতেই উঠে গেছি, ঐদিনই আবার ফিরতে হবে।

যাওয়ার আগে হরিণ দেখার জন্য বনের ভেতর গেলাম সবাই। অনেক দূর যাওয়ার পর হরিণ এর খোঁজ পাওয়া গেল। দুই একজন নাকি দেখেছে হরিণ দৌড়ে চলে যাচ্ছে। আমার অবশ্য সে ভাগ্য হয়নি।

ঘন জঙ্গলে শ্বাসমূল এর উপর দিয়ে হাটতে ভালই লাগছিল। নিঝুম দ্বীপ এর নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল তখন। কিন্তু সব ইচ্ছে তো আর পুরোপুরি পূরণ হয় না। খানিক বাদেই সাথে থাকা গাইড এর সংকেত, আমাদের সময়সীমা ফুরিয়ে এসেছে। কি আর করার নিঝুমদ্বীপ এর মায়া কাটিয়ে সেদিনই আবার ফিরে আসতে হলো সিলেটে। শুধু রয়ে গেল কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু স্মৃতি, কিছু ভালোলাগা মুহূর্ত। নির্জনতায় ঘেরা সেই নিঝুম দ্বীপ, সবুজ অরণ্য, অথই পানি, যেখানে মানুষ এর জীবন যাপন খুবই সাধারণ যা খুব সহজেই আকৃষ্ট করবে যেকোনো পর্যটককে। শহরের কোলাহল ও ব্যস্ততা ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে অবসর কাটানোর জন্য উৎকৃষ্ট ভ্রমণ স্থান নিঝুম দ্বীপ।

Most Popular

To Top