নাগরিক কথা

ফেসবুকের কাছে কেন হেরে গেল গুগল?

গুগল প্লাস ফেসবুক নিয়ন আলোয় neonaloy

২০১১ সাল। গুগলের ব্যবসা তখন তুঙ্গে। প্রতিষ্ঠার শুরুতে আশেপাশে অনেক প্রতিযোগী থাকলেও, এ পর্যায়ে গিয়ে গুগল বলতে গেলে একসময় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে প্রযুক্তির বিশ্ব শাসন করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা গেল তারা সবদিক দিয়ে সাফল্যের তুঙ্গে থাকলেও অনলাইন ইউজাররা সময়টা সবচেয়ে বেশি কাটাচ্ছে গুগলে নয়, ২০ বছর বয়সী এক যুবকের তৈরি নীল রঙের একটি সাইটে। আমরা সবাই এই সাইটটাকে চিনি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাইট- ‘ফেসবুক।’

ফেসবুকের এই লাগামছাড়া সাফল্যকে গুগল দেখছিল নিজেদের ব্যবসার প্রতি হুমকি হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরির চেষ্টা গুগল নিজেরা করেনি- তা নয়। এর আগে তা করে তিন তিন বার ব্যর্থ হয়েছে গুগল। কিন্তু এবার তারা বুঝলো ফেসবুককে টেক্কা দিতে ফেসবুকের মতোই কিছু বানাতে হবে। তাই তখন তারাও প্রতিষ্ঠা করলো ঠিক ফেসবুকের অনুকরণে তাদের নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম সাইট- ‘গুগল প্লাস’। স্বপ্ন দেখলো ফেসবুকের ব্যবসাকে দখল করে নেওয়ার। তারা গুগল প্লাস এর ডিজাইনকে করলো ফেসবুকের থেকেও বৈচিত্র্যময়, রাখলো অনেক নতুন নতুন সুবিধা, শেয়ারিং অপশন, ফেসবুক লাইভ বা ভিডিও চ্যাটের অনেক অনেক আগেই গুগল তাদের গুগল প্লাসে রেখেছিল এ ধরণের সুবিধা।

অনেকেই ভাবলো এবার বোধহয় ফেসবুকের দিন ফুরিয়ে এল, ফেসবুকের ব্যবসার উর্ধ্বগামী গ্রাফ হয়তো এবার নামতে শুরু করবে নিচের দিকে, ফেসবুকের নীল জগতকে হারিয়ে দিবে গুগলের লাল জগত। এমনকি এ ভাবনায় শামিল হলেন খোদ মার্ক জাকারবার্গ স্বয়ং!

আর ভাববেই বা না কেন? গুগল প্লাস যেভাবে তেড়েফুঁড়ে তার প্রতিদ্বন্দীদের ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল, তা ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য! নিচের গ্রাফটিতেই এর প্রমাণ মিলে।

৫ কোটি ইউজার বাগাতে কোন সোশ্যাল মিডিয়ার কতদিন সময় লেগেছে।

প্রথম ৫ কোটি রেজিস্টার্ড ইউজারের মাইলফলক ছুঁতে ফেসবুক যেখানে সময় নিয়েছে ১৩২৫ দিন (সাড়ে তিন বছরের বেশি), টুইটার নিয়েছে ১০৯৬ দিন (বরাবর ৩ বছর); সেখানে গুগল প্লাস তার প্রথম ৫ কোটি ইউজার পেয়েছে তিন মাসেরও কম সময়ে, মাত্র ৮৮ দিনে!

অথচ আজ সাত বছর পর ২০১৮ সালে এসে এসব ঘটনাগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য বলেই আর মনে হয় না। আজকাল খুব কম মানুষই জানে যে গুগল প্লাস বলে কিছু একটা আছে। কিছুদিন আগে বেশকিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুগল ঘোষণা দিয়েছে আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে তারা গুগল প্লাসের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে। এর পেছন কারণ দেখানো হয়েছে দু’টো, এক হচ্ছে গুগল প্লাসের কোডে এমন একটি বাগ ধরা পড়েছে যা কীনা ৫ লাখেরও বেশি ইউজারের তথ্যকে অনিরাপদ করে ফেলেছে। আর আরেকটি হচ্ছে গুগল প্লাসের ব্যবহারকারীর স্বল্পতা।

তবে সত্য কথা হচ্ছে, গুগল প্লাস মরে গেছে এর থেকেও অনেক আগে। ২০১২ সালেই দেখা গেছে, যেখানে মানুষ গড়ে ফেসবুকে কাটাচ্ছে মাসে সাড়ে সাত ঘন্টা করে, সেখানে গুগল প্লাসে সময় দিচ্ছে মাত্র ৩.৩ মিনিট! পরের বছর সেসময়টা বেড়ে ৭ মিনিট হয়েছিল, যেটাকে শুধুমাত্র নামেমাত্র বৃদ্ধি-ই বলা যায়, সাফল্য বলা যায় না। আর ২০১৫ থেকেই গুগল প্লাস মোটামুটি মৃত।

এটা খুব সম্ভবত গুগল কোম্পানীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। প্রযুক্তির জগত এখন গুগলের হাতে সত্য, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটা এখনো ফেসবুকের হাতেই। কিন্তু কেন গুগল অন্যান্য সবদিকে এতটা সফল হয়েও, এই ক্ষেত্রে এসে এভাবে ব্যর্থ হলো? কীভাবে এত তর্জন-গর্জন করে শুরু করার পরও গুগল প্লাস এত দ্রুত ধসে পড়লো? ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক-

গুগল প্লাসের কোনো স্বকীয়তা বা নিজস্ব আইডেন্টিটি ছিল না

২০১১-তে গুগলের নতুন সিইও হন ল্যারি পেজ, এবং দায়িত্ব পাবার পরই তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসে ফেসবুকের প্রসারের মোকাবেলা করা। তার তখন ধারণা হয়, ফেসবুক যেভাবে প্রসারিত হচ্ছে, একসময় এটা গুগলকেও দখল করে নিবে। সেই ভয় থেকেই মূলত তৈরি হয় গুগল প্লাস, যার মূল প্রতিপাদ্যই ছিল- “আমরা ফেসবুকের বিকল্প।”

কিন্তু একটি সাইট তখনই ইউজারদের মনে জায়গা করে নিবে যখন তার একটি নিজস্ব আইডেন্টিটি থাকবে, যা অন্য যেকোনো সাইট থেকে আলাদা। যেমন বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের পাশাপাশি আছে টুইটার, স্ন্যাপচ্যাট, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি। এগুলো ফেসবুক থাকা সত্ত্বেও নিজস্ব আইডেন্টিটি থাকার কারণে টিকে থাকতে পারছে। যেমন টুইটারের ইউজার ইন্টারফেসটি ছোট ছোট বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্য খুবই ভালো, এক কথায় বললে টুইটার ‘মিনিমালিস্টিক।’ যে কারণে সেলেব্রিটি বা শোবিজের মানুষদের জন্য টুইটার যথোপযুক্ত, যাদের সার্বক্ষণিক আপডেট জানতে চায় তাদের ফ্যানেরা। আবার ইন্সটাগ্রাম ভালো ছবি শেয়ারের জন্য।

কিন্তু এরকমভাবে গুগল প্লাসের কোনো স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল না। সেটা ছিল শুধু ফেসবুকের অনুকরণ। তাই শুধুমাত্র কয়েকটি নতুন ফিচারের আশায় এতদিন ফেসবুকে অভ্যস্ত থাকা কেউই ফেসবুক বাদ দিয়ে গুগল প্লাস ব্যবহার করতে শুরু করেনি।

এছাড়াও গুগল প্লাস তৈরির কিছুদিনের মধ্যেই ফেসবুক বেশ সতর্ক হয়ে যায় ব্যাপারটি নিয়ে। মার্ক জাকারবার্গ তার কর্মচারীদের বলেন গুগল প্লাসের নতুন ফিচারগুলো যেন দ্রুতই ফেসবুকে নিয়ে আসা হয়, এবং তিনি তাদেরকে বলেন এই ব্যাপারটিকে গুগল এবং ফেসবুকের মাঝের একটি যুদ্ধ হিসেবে দেখতে যে যুদ্ধে ফেসবুকের জিততে হবে। তাই দেখা যায় গুগল প্লাস নতুন যা-ই অফার করুক, ফেসবুক কিছুদিনের মধ্যেই অনুরূপ কিছু নিজেদের সাইটে নিয়ে আসছে। যদি গুগল প্লাসের ফেসবুকের সাথে এতটা মিল না থাকতো, তাহলে কিন্তু এটা সম্ভব হতো না।

এ সব কথাকে এক বাক্যে বলতে গেলে বলতে হয়, গুগল প্লাস অনলাইন ব্যবহারকারীদের তাদের সাইট ব্যবহারের কোনো স্পষ্ট কারণ দেখাতে পারেনি।

গুগল প্লাস ব্যবহারকারীদের সুবিধার দিকে না তাকিয়ে নিজেদের সুবিধার দিকে তাকিয়েছিল

শুরু থেকেই গুগল প্লাসের উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের শক্তির জায়গা ব্যবহার করে, যত সহজে সম্ভব অনেক অনেক ইউজার বাগিয়ে নেওয়া। তারা চেয়েছিল গুগলের সব সার্ভিসগুলোকে একটি সামাজিক মাধ্যমের নিচে নিয়ে আসতে যাতে তাদের জন্য ম্যানেজ করার কাজটাও সুবিধাজনক হয়ে যায়। তারা চেয়েছিল গুগল একাউন্ট খোলার মাধ্যমেই মানুষকে গুগল প্লাস চালাতে বাধ্য করতে, কিন্তু মানুষ আদৌ সেটা চেয়েছে কীনা তা ভাবেনি। তারা ইউটিউব আর গুগল প্লাস একই সাথে মিলিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল, যাতে কোনো ইউটিউব ভিডিওতে কমেন্ট করতেই গুগল প্লাস একাউন্টের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এসব ব্যাপার মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে তা ভাবেনি। গুগল প্লাসের এই ধরণের কাজগুলো ইউজারদেরকে আরো দূরে সরিয়ে দিয়েছে এটি ব্যবহার করা থেকে।

অথচ আমরা যদি ফেসবুকের দিকে তাকাই, দেখব তাদের সব সিদ্ধান্তই ইউজার অরিয়েন্টেড। বিভিন্ন রিঅ্যাক্ট চালু করা, ইউজার ইন্টারফেসের নানান পরিবর্তন সবকিছুই হয় ব্যবহারকারীদের চাহিদা এবং সুবিধার দিকে তাকিয়ে। এদিক দিয়ে বলতে গেলে গুগলের দৃষ্টিভঙ্গিটাই আলাদা ছিল।

গুগল প্লাসের একটি বড় অংশের দায়িত্বে থাকা সার্গেই ব্রিন নিজেই একবার বলেছিলেন,

“আমি একটা সামাজিক মাধ্যম চালাবার জন্য ভুল মানুষ ছিলাম। কারণ আমি নিজেই সেরকম সামাজিক মানুষ নই, আমি সাধারণের তুলনায় একটু আলাদা।”

হ্যাঁ, তা সত্যই বটে। গুগল প্লাস পিছিয়ে ছিল কারণ তারা সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে পারেনি। ভেবেছে নিজেদের জায়গা থেকে।

তবে পরে আস্তে আস্তে অবশ্য গুগলের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলেছে, কিন্তু এখন তো আর তাদের পক্ষে ফেসবুকের টেক্কা দেয়া সম্ভব নয়। সামাজিক মাধ্যমের ক্ষেত্রটাকে আপাতত ছেড়ে দিয়েই অন্যান্য ক্ষেত্রে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে গুগল আধুনিক চিন্তাধারার সুন্দর পিচাইয়ের নেতৃত্বে।

গুগল প্লাসের কোনো কার্যকরী মোবাইল ভার্সন ছিল না

স্মার্টফোনের যে বৈশ্বিক বিপ্লবটা আমরা চোখের সামনে দেখছি, সেটা মূলত ২০১০-এর পরেই ঘটেছে। এখন সবকিছুরই সফল হতে হলে থাকতে হয় তার একটি কার্যকর স্মার্টফোন অ্যাপ ভার্সন। কম্পিউটারের তুলনায় মানুষ স্মার্টফোনেই বেশি সময় দেয়।

অথচ গুগল প্লাসের প্রাথমিক প্ল্যানে এর মোবাইল ফোন ভার্সন নিয়ে কোনো চিন্তাই ছিল না। যদিও অ্যান্ড্রয়েড ব্যাপারটাই গুগলের, সেখানে গুগল প্লাসকে ভালোমত বসাতে না পারাটা গুগলের ব্যর্থতাই বলতে হবে।

ফেসবুক এবং টুইটার দু’টোই বেশ পরিচ্ছন্ন মোবাইল সাইট এবং অ্যাপ দিয়েছে ব্যবহারকারীদের জন্য। তাই এখানেও পিছিয়ে গিয়েছিল গুগল প্লাস।

গুগল প্লাস ব্যবহার করা ছিল কিছুটা কঠিন

গুগল প্লাস ফেসবুককেই একটু নিজেদের মত করে বানাতে গিয়ে কিছু জিনিস বেশ জটিল করে ফেলেছিল। গুগলের মিশন স্টেটমেন্ট হচ্ছে তথ্যকে গুছিয়ে মানুষের সামনে নিয়ে আসা। তারা গুগল প্লাসেও করছিল সে চেষ্টাই। সামাজিক সব তথ্যকে গুছিয়ে নিয়ে আসবে আমাদের সামনে। কিন্তু গোছানো ব্যাপারটা কিন্তু স্বভাবতই জটিল। ঠিক সেভাবে গুগল প্লাসে আপনার তথ্যকে ঠিকঠাক দেবার ব্যাপারটাও ছিল বেশ জটিল।

উদাহরণস্বরূপ, গুগল প্লাসে আপনি বিভিন্ন সার্কেল তৈরি করার সুযোগ পেতেন। আপনার বন্ধু, পরিবার, কলিগ- ইত্যাদি। ব্যাপারটি শুনতে সুবিধাজনক লাগলেও, এভাবে আপনার কন্ট্যাক্টসকে গোছানোর চাইতে ফেসবুকের শুধু বন্ধু বানানোর সিস্টেমটা অনেক সহজ। তাই এই সহজ সিস্টেম থেকে গুগল প্লাসের জটিল সিস্টেমে স্থানান্তরিত হতে কেউই চায়নি।

হারানো কান্ডারী!

২০১৪ সালের এপ্রিলে গুগল প্লাসের চিফ এক্সিকিউটিভের দায়িত্বে থাকা ভিক গান্দোত্রা গুগল ছেড়ে চলে যান। এর ফলে গুগল প্লাস টিম হঠাৎ নেতৃত্বশূণ্যতায় পড়ে যায় এবং তাদের এগোনোর সুনির্দিষ্ট কোনো পথ থাকে না। তারপর বিভিন্ন মানুষ এই পদে আসেন এবং বিভিন্ন পরিবর্তন আনেন গুগল প্লাসে, কিন্তু কোনোটাই কার্যকরী হয় না।

গুগল প্লাসের দায়িত্বে থাকাকালীন ভিক গান্দোত্রা

অথচ ফেসবুকের নেতৃত্বে থাকা মার্ক জাকারবার্গ সবসময়ই তার দলের নেতা হিসেবে ছিলেন। সব প্যারাডাইম শিফটিং সিদ্ধান্তগুলো তার থেকেই আসে। এ কারণে ফেসবুক সবসময়ই এগিয়ে যাচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে।

গুগল প্লাসের এই ধস আমাদের ব্যবসা এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে যেমন অনেক শিক্ষা দেয়, তেমন আমাদেরকে সাধারণ কনজিউমারদের মানসিকতাও বুঝতে শিখায়। তাই এই ঘটনাটি এ দেশের ক্যারিয়ার সচেতন তরুণ প্রজন্মের জন্য অনেক শিক্ষণীয় হতে পারে। ব্যবসাকে প্রাধান্য দিয়ে গ্রাহককে ভুলে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এবং এরকম ভুলে গুগলের মত দানবকেও যেখানে ধাক্কা খেতে হয়, সেখানে অন্য যে কেউ খড়কুটোর মত উড়ে যাওয়ারই কথা!

Most Popular

To Top