ইতিহাস

হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল…

সওসা মেন্ডিস নিয়ন আলোয় neonaloy

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্ব দেখেছিল হিটলার বাহিনীর রূদ্রমূর্তি৷ যে যুদ্ধ জন্ম দিয়েছিল শত শত ঘটনার৷ আর সেই সাথে বিশ্ব দেখেছিল কিছু বীরের উত্থান৷ যাদের বীরত্বে রক্ষা পেয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন৷ সওসা মেন্ডিস তাদেরই একজন। যার বদৌলতে প্রাণে বেঁচেছে ১৫,০০০(মতান্তরে ১২,০০০) এরও বেশি ইহুদী। যা তাঁরই মত আরেক মহাত্মন অস্কার সিন্ডলার থেকেও প্রায় ১০ গুন বেশি। অথচ হলিউড মুভি “সিন্ডলার’স লিস্ট” এর কল্যাণে অস্কার সিন্ডলার আজ জগদ্বিখ্যাত হলেও অনেকের কাছে সওসা মেন্ডিসের নামটাই অজানা৷

পুরো নাম অ্যারিস্টেডিস দে সওসা মেন্ডিস ডু অ্যামেরালে অ্যাবরান্চেস। জন্ম ১৯৮৫ সালের ১৯শে জুলাই ক্যাবানাস ডি ভিরিয়াটু, ভিসেউ, পর্তুগালে। তার বাবা হোসে ডি সওসা ছিলেন কয়িমব্রা কোর্টের বিচারক। তারা ছিলেন তিন ভাই৷ সওসা মেন্ডিস এবং সিজার ছিলেন জমজ (মেন্ডিস কয়েক মিনিটের বড়)। যমজ দুই ভাই ভর্তি হয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি ওফ কোয়িমব্রার আইন বিভাগে। আর ছোট ভাই হয়েছিলেন নাভাল অফিসার। আইন পাস করে তার যমজ ভাই বিদেশী দূত এবং তিনি তার ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে কেনিয়া, সান ফ্রান্সিসকো, অ্যান্টোয়ার্প, জর্জিয়া এবং ব্রাজিলে কূটনৈতিকের দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে অ্যান্টোয়ার্পেই ছিলেন প্রায় ১ দশক। শেষে পর্তুগীজ দূত হিসেবে বোর্দোঁ’র দায়িত্বে নিযুক্ত হন। তার স্ত্রীর নাম ছিল মারিয়া এন্জেলিনা দি সওসা মেন্ডিস, তার ছোটবেলার বন্ধু এবং তার ১৪ সন্তানের জননী।

সওসা মেন্ডিস নিয়ন আলোয় neonaloy

সপরিবারে সওসা মেন্ডিস

তার পরিবারে শুরু থেকেই ছিল রাজকীয় রক্তধারা। তার মা ছিলেন দ্বিতীয় ভিস্কাউন্ট অফ মিডোরাসের নাজায়েজ সন্তান৷ এদিকে বাবাও ছিলেন বিচারপতি৷ ফলে সমাজে তার পরিবারের অবস্থান ছিল সম্মানজনকই ছিল। এছাড়া কোয়িমব্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার ফলে মেন্ডিস কিছুটা মুক্ত চিন্তাধারার ছিলেন। ফলে অনেক সময় তাকে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল৷ এমনকি ১৯১৯ সালে ব্রাজিলে থাকার সময় তাকে কিছু সময় নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হয়েছিল।

যুদ্ধ শুরুর সাথে শুরু হল নাৎসী বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ। নাৎসী বাহিনী অগ্রসর হচ্ছিল ফ্রান্সের দিকে। পথমধ্যে বোর্দোঁকে যেন ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ পালিয়ে বেঁচেছিল। ভঙ্গুর সরকার, রাজনৈতিক সমস্যা, শরনার্থী সমস্যা সব একসাথে যেন অন্যরকাম এক অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া বোমারু এবং মৃগীরোগের সমস্যা তো ছিলই। এদিকে পর্তুগালে ঘটল আরেক ঘটনা৷ হিটলারের তুষ্টির জন্য পর্তুগালের তৎকালীন ডিক্টেটর অ্যান্টোনিও দে অলিভাইরা সালজার তার ১৪ নম্বর বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষনা করেন যে, ইহুদী অথবা ঐ ধর্মের অনুগামী ব্যক্তির পর্তুগালে প্রবেশ নিষেধ।

আরো পড়ুনঃ “আমি চাইলেই সব ইহুদিকে মেরে ফেলতে পারতাম”-হিটলার, আসলেই কি?

সওসা মেন্ডিস চোখের সামনে হাজার হাজার ইহুদীকে মরতে দেখে হয়ত যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যদি তাদের পর্তুগালে ঢোকানো যায়, তবে তারা হিটলারের হাত থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু একটি দেশের প্রতিনিধি হয়ে সে দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মুখের কথা নয়। বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার দুইদিনের মাথায় তিনি সিদ্ধান্ত নেন তাকে কিছু করতে হবে।

“আমি তাদের সবাইকে মরতে দিতে পারি না। তোমাদের অনেকেই ইহুদী এবং আমাদের সংবিধানে বলা আছে যে ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাস কোন বিদেশী ব্যক্তির পর্তুগালে প্রবেশে বাধা হবে না। আমি এই নীতিতে বিশ্বাস রাখব বলে ঠিক করেছি। তার মানে এই না যে আমি পদত্যাগ করব। আমি খ্রীষ্টান এবং এ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখি। আর তাই এটিই একমাত্র পথ আমি বিবেকের দ্বারা কাজ করব।”

– এই কথাগুলোই সওসা মেন্ডিস তাঁর দূতাবাসের স্টাফদের বলেছিলেন। তারা সবাই তার এই ঐতিহাসিক বিবৃতি সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়৷

জুন ১৭। সওসা মেন্ডিস নিজের এক প্রোডাকশন লাইন তৈরী করেন যেখানে ৩০,০০০ ভিসা, পাসপোর্ট এবং ভ্রমনের যাবতীয় কাগজপত্র তৈরী করেন। তিনি কাগজগুলো ইস্যু করেন মোট তিন জায়গা থেকে- বোর্দোঁ, হান্ডায়ি ও বয়োন্নি। অথচ এগুলো তখনকার ডিক্টেটর সালাজার কড়া নির্দেশের বিরুদ্ধে। তিনি জানতেন তার সামনে কি হতে যাচ্ছে এমনকি তিনি তার পরিবারের কথাও ভাবেননি।

আরো পড়ুনঃ হিটলার কি ১৯৪৫ সালের পরেও বেঁচে ছিলেন?

প্রায় ১২,০০০ (মতান্তরে ১৫,০০০) ইহুদিকে সওসা মেন্ডিস সে সময় সাহায্য করেছিলেন৷ যার মধ্যে ছিলো বেলজিয়ান কেবিনেটের সদস্যরা, হলিউড অভিনেতা মন্টগোমেরী এবং অষ্ট্রিয়ার প্রিন্স অটো ভন হ্যাবসবার্গ। মানুষ ২৪ ঘন্টা তার সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত সোনার টিকিটের জন্য, যাতে তারা ফ্রান্সে নাৎসি দুঃস্বপ্ন থেকে বাঁচতে পারে।

তবে সওসা মেন্ডিস শুধু কাগজ দিয়েই মানুষদের সাহায্য করেন নি। বর্ডারে গিয়েও সাহায্য করেছিলেন। যেখানে গিয়ে তার দেখা হয় আরেক মহান ব্যক্তি জেনারেল চার্লস ডি গাউল্লির সাথে। যার সহযোগিতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রেও ইহুদীদের পালাতে সাহায্য করেন। যখন সালাজার জানতে পারে তখন তিনি মেন্ডিসকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ ঘোষনা করেন। এরপরও মেন্ডিস বলেছিলেন,

“আমি বিবেকের দ্বারা কাজ করি, যেটি আমি যে খ্রীষ্টান তার একমাত্র পরিচয়৷”

পদ থেকে অব্যাহতি তো হওয়ারই ছিল। তাকে তার কূটনৈতিক পদবী থেকে বিচ্যুত করা হয়েছিল৷ এমনকি তার পেনশন এবং আইনজীবীর উপাধিও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল৷ কেউ তাঁকে কিংবা তাঁর পরিবারকে সাহায্য করবে না -সরকার এমনটাই নির্দেশ দেয়। মানুষজন রাস্তা দিয়ে গেলে তাকে মূমুর্ষ অবস্থায় দেখতে পেত৷ তার সকল সন্তানরাও তাকে ছেড়ে দূরদেশে পাড়ি জমায় ভালো কিছুর আশায়।

ভাবুন, প্রায় ১৪ বছর যিনি ছিলেন সম্মানীয় রাষ্ট্রদূত, যার নিচে কাজ করত শত শত কর্মচারী! এখন তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেন। তার সাহায্যের জন্যও কেউ ছিল না! তাও আবার নিজ শহরেই!

আরো পড়ুনঃ আর্মেনিয়ান গণহত্যা- ভুলে যাওয়া ১৫ লক্ষ মানুষ

আর এভাবে ধুঁকে ধুঁকেই ১৯৫৪ সালে তার মৃত্যু হয়। একজন মহান হৃদয়ের মানুষ, যার জন্য রক্ষা পেয়েছে এত মানুষের জীবন, তার এমন করুণ পরিনতি সত্যিই অবিশ্বাস্য।

তবে পরবর্তীতে সওসা মেন্ডিস তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পেয়েছিলেন৷ ১৯৬৬ সালে ইসরাইল তাকে “Righteous among the nations” উপাধিতে ভূষিত করে যা ছিল ইহূদী বহির্ভূতদের মধ্যে দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান। এই সম্মাননাটি দেওয়া হয়েছিল সে সময়ে যারা নাৎসী বাহিনীর হাত থেকে ইহুদীদের বাঁচিয়েছিল, তাদের। আর সওসা-ই ছিলেন প্রথম কূটনীতিবিদ যাকে এমন সম্মান দেওয়া হয়েছিল।

ইহুদি র‍্যাব্বাই খাইম ক্রুগেরের সাথে সওসা মেন্ডিস, ১৯৪০।

তবে তাঁর নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মাননা পেতে লেগেছিল আরও ২০ টি বছর। যাদের জন্য আজীবন বিশ্বস্ততার সহীত কাজ করেছিলেন, তাদের থেকে সম্মাননা তো পাওয়ারই ছিল। ১৯৮৮ সালে পর্তুগীজ পার্লামেন্ট তার বিরুদ্ধে সকল চার্জ উঠিয়ে নেয় এবং কূটনৈতিক সম্মানও ফিরিয়ে দেয়৷  তাকে মরণোত্তর “The Cross of Merit” উপাধীতেও ভূষিত করা হয়।

যদিও তাঁর মৃত্যুর পর অনেক সময় চলে যায়। তবে গড়ে ওঠে সওসা মেন্ডিস ফাউন্ডেশন, যার একটি ব্রাঞ্চ যুক্তরাষ্ট্রেও ছিল। এই ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ছিল সওসা মেন্ডিসের প্রাক্তন বাড়িকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মানবাধিকারের স্মরণে মিউজিয়াম হিসেবে গড়ে তোলা।

সওসা মেন্ডিসের মত মানুষ পৃথিবীতে সচরাচর আসেন না, যারা মৃত্যু অনিবার্য জেনেও এগিয়ে যায়। তার বাঁচানো মানুষের সংখ্যা অস্কার সিন্ডলারের থেকেও প্রায় ১০গুন বেশি। এর চেয়েও বড় কথা হল, তিনি এমন মানুষগুলোর জন্য নিজের সারাজীবনের সব অর্জন, সব সম্মান উৎসর্গ করেছিলেন, যাদের তিনি চিনতেনই না!

শেষে প্রশ্ন থেকেই যায়, মেন্ডিস কি পারতেন না নিজে সুন্দরভাবে বেঁচে থেকে এসব বসে বসে দেখতে? হ্যাঁ সেখানেই রয়েছে উত্তরটি। আপনি কি সত্যিই মানুষ, নাকি রক্ত মাংসে গড়া বিবেকহীন খেলনা? উত্তর খুঁজে নিবেন।

আরো পড়ুনঃ আপনি কি হিটলার-অনুরাগী?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top