বিশেষ

ইনসেপশনঃ কিভাবে কি হলো? [স্পয়লার অ্যালার্ট]

“Inception” চলচ্চিত্রের কাহিনীকথা

ক্রিস্টোফার নোলানের বিখ্যাত ফিলোসফিকাল-সায়েন্স ফিকশন চলচিত্র “Inception”। চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র বললে একটুও ভুল হবে না। তার সাথে এই চলচ্চিত্রকে সবচেয়ে ক্রিটিকাল চলচ্চিত্রের তালিকায় উপরের দিকে রাখলেও ভুল হবে না।

অনেকেই এই চলচ্চিত্রের গল্প গুলিয়ে ফেলে, অথবা বুঝতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক। কারণ এর গল্প, প্রেক্ষাপট, নির্মাণ এতটাই ক্রিটিকাল। তাই গল্পটার ব্যাখ্যা দেয়ার ইচ্ছে হলো।

চলচ্চিত্রের গল্প এবং কনসেপ্ট বা ভিত্তি গড়ে উঠেছে স্বপ্ন-বাস্তবতা, সত্য-মিথ্যার এক অদ্ভুত সমন্বয়ে। এমনকি এই চলচ্চিত্র আমাদের জীবনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। সবার প্রথমে আসি এর প্রেক্ষাপট নিয়ে।

এই চলচ্চিত্র একজন মানুষ যার নাম ডমিনিক কব, সংক্ষেপে ডম কব (লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও) কে নিয়ে, যে কিনা মানুষের স্বপ্নের মধ্যে যাবার উপায় বের করে ফেলেছেন। তার কাছে এমন একটা মেশিন আছে, যার সাথে যদি দুইজন মানুষ একসাথে ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে অন্য জনের স্বপ্নে যেতে পারে (এখানে সাবকনশাস মাইন্ড বা অবচেতন মনকে আমি স্বপ্ন বললাম কারণ বুঝতে সুবিধা হবে)। এমনকি শুধু দুইজন না, অনেক মানুষও যদি একসাথে এই মেশিনের সাহায্যে ঘুমিয়ে যায় তাহলেও সবাই অন্যের স্বপ্নে যেতে পারে। তবে অন্যের স্বপ্নে শুধু যেতেই পারে না, অন্যের চিন্তা চুরিও করতে পারে এবং কোন একটি চিন্তার বীজ অন্যের মনে রেখেও দিয়ে আসতে পারে। সে আইডিয়া হতে পারে খুব দামী বা বিপজ্জনকও। এতে করে একে অন্যের ক্ষতি করা খুব সহজ আবার অন্যের উপকারও সহজ।

ইনসেপশন নিয়ন আলোয় neonaloy

ডমিনিক কব চরিত্রে লিওনার্ডো ডিকাপ্রিও

যেমন, একজন ব্যবসায়ী একটি বিজনেস প্লান করেছে। এখন সেটাকে এই মেশিনের সাহায্যে চুরি করে তার আগেই নিজেই সেই প্লান মোতাবেক কাজ করে যাতে করে যে আসলে জিনিসটা চিন্তা করেছে সে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই কাজ করে ডন কব এর টিম। এই স্বপ্ন থেকে ফিরে আসার একমাত্র উপায় হলো স্বপ্নে তার মৃত্যু হতে হবে। এই হলো ফিল্ম এর বেসিক কনসেপ্ট। এরপর আসি গল্পে।

ডম কব এবং তার টিম একজন বড় ব্যবসায়ী নাম মিঃ সাইতো এর মাথা থেকে চিন্তা চুরি করার জন্য যায়। কিন্তু সেই ব্যবসায়ী অনেক বুদ্ধিমান এবং এই স্বপ্নে গিয়ে আইডিয়া চুরি করার ব্যাপারে বেশ সতর্ক এবং এই বিষয়ে তার বেশ জানাশোনা আছে। তাই ডম কবের টিমকে সে সফল হতে দেয় না। বরং সে এই টিমের একজনকে ধরে নিয়ে যায় এবং ব্লাকমেইল করতে শুরু করে। ব্লাকমেইল করে সেই তার নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য একটা কাজ করে দিতে বলে।

ইনসেপশন নিয়ন আলোয় neonaloy

মিঃ সাইতো। একমাত্র তার হাতেই ধরা পড়েছে ডমিনিক কব।

কাজটা হলো মিঃ সাইতো এর সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী ব্যবসায়ীর ছেলের মাথায় একটি চিন্তা গেঁথে দিতে হবে। চিন্তাটা হলো, ছেলে তার বাবা এর ব্যবসা কে ধ্বংস করে দেবে। তার ব্যবসার সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী। তাকে হারাতে পারলেই সে ব্যবসা আরও বড় করতে পারবে। তার প্রতিযোগী ব্যবসায়ী ছিলো বুড়ো। তার মানে খুব তাড়াতাড়ি সেই কোম্পানি তার ছেলের নামে হবে। তাই ছেলের মনে চিন্তাটা গেঁথে দিতে হবে।

তখন তার টিমের এক লোক বলে, এই কাজ এত সহজ না। কারো মাথা থেকে চিন্তা চুরি করা সহজ হলেও, চিন্তা গেঁথে দেয়া অনেক কঠিন। কিন্তু সেই ধুরন্ধর ব্যবসায়ী মিঃ সাইতো জানে দলের প্রধান ডম কব সেই কাজ জানে এবং সে আগেও একবার এই কাজ করেছেও। সে আইডিয়া তার স্ত্রী’র মাথায় দিয়েছে। কিন্তু তার স্ত্রী আত্মহত্যা করে মারা যায় এবং একটি চিঠিতে লিখে উকিলের কাছে দিয়ে যায় যে, তার মারা যাবার দায়ভার তার স্বামীর অর্থাৎ ডম কব এর। যার জন্য সে তার নিজের ছেলেমেয়ের সাথেও দেখা করতে যেতে পারে না, স্ত্রী’র মৃত্যুর দায়ভারের অভিযোগে। তখন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মিঃ সাইতো তাকে নির্দোষভাবে তার ছেলেমেয়ের কাছে ফিরিয়ে দেবারও প্রস্তাব দেয়।

এখন আসি ডম কব কিভাবে তার স্ত্রী’র মৃত্যুর জন্য দায়ী। সে ভুলে তার স্ত্রী’র মাথায় এমন চিন্তর বীজ বপন করে দিয়েছিলো যার জন্য তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছিলো। এই অংশ আসলে তার অন্যের স্বপ্নে যাওয়া শেখার প্রথম দিককার ঘটনা। সে তখনও পরীক্ষা নিরিক্ষা করছিলো। সেখানে সে দুইটা বড় জিনিস জানতে পারে।

ইনসেপশন নিয়ন আলোয় neonaloy

ডমিনিক কব, এবং তার স্ত্রী ম্যালের চরিত্রে ম্যারিয়ন কটিয়ার্ড।

এক- স্বপ্নের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা যায়।

দুই- স্বপ্নের মধ্যের সময় বাস্তবের সময়ের ২০ গুন। তার মানে কেউ বাস্তবে একঘন্টা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলে সেটা স্বপ্নে হবে ২০ ঘন্টা। এখন স্বপ্নের মধ্যে যদি আবার আরেকটা স্বপ্ন দেখে তাহলে, সেই স্বপ্ন হবে প্রথম স্বপ্নের ২০ গুন। তারমানে বাস্তবের একঘন্টা হয়ে যাবে ৪০০ ঘন্টা। এভাবে আরও যদি স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন দেখি তখন তা ঠিক আগের স্বপ্নের ২০ গুন করে সময় বেড়ে যাবে।

আর ডম কব ওনার স্ত্রী’র সাথে স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে দেখতে এতই দূরে চলে যায় যে, স্বপ্নের মধ্যে ৫০ বছর পার করে দেয়। তারপর স্বপ্নের মধ্যে যখন বুড়ো হয়ে যায় তখন তারা জেগে ওঠে। যখন তারা জেগে উঠে, মানে বাস্তবে ফিরে আসে তখন তারা তরুণ বয়সে আবার ফিরে আসে। ডন কব বুঝে যে সে স্বপ্ন থেকে বাইরে চলে এসেছে। কিন্তু তার স্ত্রী তখনও বিশ্বাস করছিলো তারা স্বপ্নেই আছে। তার স্ত্রী বিশ্বাস করতো এই দুনিয়া সত্য না। তারা যেসব স্বপ্নের মধ্য দিয়ে গিয়েছে সে ভাবতো তারা সেই স্বপ্নগুলোর কোনো একটা স্বপ্নের মধ্যে আছে।

তারপর তার স্ত্রী যেহেতু ভাবে সে স্বপ্নে আছে এবং যেহেতু এক স্বপ্ন থেকে আবার পিছনের স্বপ্নে আসার জন্য সেই স্বপ্নে মারা যেতে হয় সেহেতু তার স্ত্রী তার বিশ্বাস অনুযায়ী স্বপ্ন দিয়ে বাস্তবে আসার জন্য মারা যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। সে এইজন্য আত্মহত্যা করে এবং তার স্বামী ডম কবকে দায়ী করে লেখা চিঠি উকিলের কাছে রেখে যাওয়ায় ডম কব ফেঁসে যায় এবং তার ছেলেমেয়ের সাথে দেখা করা অব্দি বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনা দিয়ে ডম কব বুঝতে পারে যে স্বপ্নে চিন্তা অন্যের মাথায়ও দেয়া যায়। আর এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে ব্লাকমেইল করে সেই ব্যবসায়ী মিঃ সাইতো। তারপর ডম কব আর তার টিম রাজি হয়। তারা প্লান বানানো শুরু করে কিভাবে কাজটি করবে।

ইনসেপশন নিয়ন আলোয় neonaloy

আত্মহত্যার পূর্বমুহুর্তে ম্যাল

ডম কব হিসেব করে দেখে তাদের ৩ টা স্বপ্নের ব্যবহার করতে হবে। কারণ, তারা বাস্তবে সময় পাবে ১০ ঘন্টা যেটা প্রথম স্বপ্নে হবে প্রায় এক সপ্তাহ, তার পরের স্বপ্নে হবে প্রায় ৬ মাস এভাবে বাড়বে। আর ৩ নং স্বপ্নে আগের স্বপ্নের কথা ওভারল্যাপ করে টার্গেট ব্যবসায়ীকে নিজের মানুষকেই ভুল বুঝিয়ে সে চিন্তাটা তার মাথায় দিয়ে দিবে। কিন্তু এর জন্য যার মাথায় এই চিন্তা গেঁথে দিবে তার সাথে একসাথে ওই মেশিনে তাদের ঘুমাতে হবে এবং সেটা ১০ ঘন্টার ঘুম হতে হবে। তখন তারা জানতে পারে সেই লোক প্রতি দুইসপ্তাহে একবার লস এঞ্জেলেস থেকে সিডনি যায়। যা কিনা ১০ ঘন্টার ফ্লাইট। কিন্তু সে প্রাইভেট প্লেনে যায়। তাই তারা প্ল্যান করে তাকে পাবলিক প্লেনে নেয়। যার ব্যবস্থা করে ব্লাকমেইল করা ব্যবসায়ী মিঃ সাইতো। এভাবে সেই ফ্লাইটে বসে সবাই স্বপ্নে যায়।

ইনসেপশন নিয়ন আলোয় neonaloy

এই একটি ইনসেপশনই বদলে দিতে পারে ডমের জীবন!

কিন্তু নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সবাই একসাথে স্বপ্ন থেকে বাস্তবে আসতে পারে না। একসময় ডম কব মনে করে সে স্বপ্ন থেকে বের হয়ে এসেছে এবং নিজের বাড়িতে ফেরত আসে। এসে তার ছেলে মেয়ের সাথে দেখা করতে যাবে তখন তার মনে সন্দেহ জাগে আসলেই কি সে স্বপ্ন থেকে বের হয়ে এসেছে কিনা। এটা নিশ্চিত হবার জন্য তার কাছে একটা লাটিমের মতো জিনিস সব সময় থাকে। যেটা ঘুরাতে শুরু করেন। যদি সেটা থেমে যায় তাহলে সে বাস্তবে ফিরে এসেছে। যদি না থেমে যায় তাহলে সে স্বপ্নে আছে। কিন্তু সেটা ঘুরানো শুরু করেই সে খেয়াল না করে তার ছেলেমেয়ের দিকে এগিয়ে যায়।

সেখানেই এই চলচ্চিত্রের শেষ।

ইনসেপশন নিয়ন আলোয় neonaloy

ডমিনিক কবের সেই টোটেম। আর এই নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আজও তর্ক করে যাচ্ছে কোটি-কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমী!

তাহলে কি আসলেই ডম কব নিজের একটি স্বপ্নের মধ্যেই আটকা পড়ে আছে যেটাকে সে সত্যিকারের জীবন ভাবছে, আর তার স্ত্রী’র ধারণাই সঠিক? নাকি সে সত্যিকারের জীবনে আছে, কিন্তু তার স্ত্রী ভুল বুঝে আত্মহত্যা করেছে। এই দোদুল্যমান অবস্থাতেই নোলান সৃষ্টি করেছেন চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রহস্যের!

এতকিছুর পরেও সব গোলমেলে লাগছে? তাহলে মুভিটি দেখতে দেখতে মিলিয়ে নিন এই চার্টটি!

ইনসেপশন নিয়ন আলোয় neonaloy

Most Popular

To Top