গল্প-সল্প

অপেক্ষা…

ছোটগল্প নিয়ন আলোয় neonaloy

– “সারাদিন ধরে একই পেপারের কি যে পড়ো তুমি, বুঝিনা কিছুই। ছেলেটা যে আজ আসবে সে খেয়াল আছে তোমার?”

সালমার কথা শুনে পেপার থেকে চোখ তুললেন আমজাদ সাহেব। একটু উদাসীন হয়েই বললেন, “থাকবে না খেয়াল ? ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এবারই প্রথম বাসায় আসছে। বুঝলে সালমা, অথচ এই ছেলেটাকে নিয়েই আমার যত দুশ্চিন্তা ছিল। যা দুরন্ত ছিল ফাহিম। একটুও পিয়াসের মত হয় নি।”

পিয়াস, আমজাদ সাহেব আর সালমা দম্পত্তির প্রথম সন্তান। খুব মেধাবী ছিল ছেলেটা। সেবার এসএসসিতে যখন বোর্ডে ফার্স্ট হল পিয়াস, সেকি আনন্দ আমজাদ সাহেবের। সামান্য একজন স্কুল শিক্ষক তিনি। কিন্তু এই ছেলেটাকে মানুষ করতে বিন্দুমাত্র কার্পন্য করেননি তিনি। যতগুলা টিউশনি লাগছে দিয়েছেন। সারাটা দিন পড়ালেখা করতো ছেলেটা। ভাবতেন, এই ছেলেটাকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন তিনি। সামান্য একজন স্কুল মাস্টারের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে, ভাবতেই চোখ ছলছল করে ওঠে আমজাদ সাহেবের।
সালমা মুখে আচল চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন , “আজকের দিনেও পিয়াসের কথা মনে করতে হবে তোমার? কত করে বলছিলাম, ছেলেটাকে এলাকার কলেজে পড়াও , শুনলে না আমার কথা। ইন্টারমিডিয়েটেই ঢাকায় পাঠিয়ে দিতে চাইলে। সেবার ঢাকায় না গেলে ঐ বাস এক্সিডেন্টটাও হত না। আর আমার পিয়াসটাও এতদিনে …।”

পেপারটা টেবিলের উপর রেখে বৃদ্ধ চোখটা থেকে চশমা খুললেন আমজাদ সাহেব। ১৩টা বছর চলে গেল দেখতে দেখতে। এই সেদিনের কথা, পিয়াস ঢাকার সেরা কলেজটাতেই ভর্তি হবার সুযোগ পেলো। নিজে টাকার অভাবে ভালো কোথাও পড়তে না পারলেও ছেলের ক্ষেত্রে এটা করেননি আমজাদ সাহেব। বেশ কয়েকবছরের জমানো টাকাটা গর্বের সাথেই খরচ করছিলেন তিনি। সেবার বাসে ঢাকা যাবার সময় ফরিদপুরের ঐখানে বাস এক্সিডেন্টটা না হলে আজ পিয়াসের বয়স হত ২৯। এতদিনে পিয়াসের জন্য ঠিক একটা ডাক্তার মেয়ে খুঁজে বের করতেন তিনি আর সালমা।

“এদিক থেকে কি দুরন্তই না ছিল ফাহিম”, বৃদ্ধা সালমা সাহেব কাঁদতে কাঁদতে স্মৃতিচারণ করলেন। বছর চারেক ছোট ছিল পিয়াসের থেকে। সারাদিন এই মাঠে-ঐ মাঠে ঘুরতো। পড়ালেখার বালাইটাও ছিল না। রোজ রোজ নালিশ আসতো বাসায়। অথচ পিয়াসের এক্সিডেন্টের খবর শুনে কেমন জানি হয়ে গেলো ছেলেটা। হয়তো ঐ বয়সেই বুঝে ফেলছিল, বাবার স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্বটা ওর হাতে। সেবার যখন সেভেন থেকে এইটে ওঠার সময় ফাহিমের রোল ৪২ থেকে ৮ হলো, অবাক হয়েছিলেন আমজাদ সাহেব। যদিও কাউকে কিছু বলেন নি তিনি। ছেলেটাকে বাড়ির পাশের কলেজেই পড়ালেন তিনি। ইন্টারপাশের পর ফাহীম যখন বুয়েটে চান্স পেলো, আমজাদ সাহেব কেঁদে ফেলেছিলেন ফাহিমকে জড়িয়ে ধরে। তিনি পিয়াসের জন্য যেটা আশা করেছিলেন, সেটা ফাহিম করে ফেললো। ভাগ্যটা এমনই।

চশমাটা টেবিলের উপর রেখে সালমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমজাদ সাহেব, “ফোন করেছিল ছেলেটা ? কতদূর পৌছালো ? তোমার এই ছেলেটাতো বাসায় একটুও ফোন করে না , কেমন জানি একা থাকে এখন।” সালমার কান্নাটা তখন অনেকটা কমে গিয়েছে। নিজেকে সামলাতে সামলাতে বললেন, “হ্যা , ফোন দিয়েছিল আধাঘন্টা আগে। বাসে উঠছে ঘন্টাখানিক হলো।”

আমজাদ সাহেব জানেন না এই কাজটা তিনি কেন করেন, কিন্তু প্রতিবার যখন ফাহিম বাসে ওঠে আমজাদ সাহেব নামাজে বসেন। দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা ছাড়া তার যেন কিছুই করার থাকে না। বয়সকালে যে লোকটা ধর্ম কর্মে বিশ্বাস করতো না, বড় ছেলেটা মারা যাবার পর ঐ লোকটাও যেন কিভাবে বদলে গেলেন। নামাজ পড়তে থাকলেন নিয়মিত। সেদিন এক্সিডেন্টের আগে তার অবচেতন মন কিছু একটা যেন আন্দাজ করেছিল। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে ড্রাইভারকে দিয়ে বাস থামিয়ে তিনি গিয়েছিলন জল ত্যাগ করতে। আর কিছুক্ষণ পরেই নিয়ন্ত্রণহীন একটা বাস এসে কিভাবে যেন তাদের বাসের উপর আছড়ে পড়লো। ততক্ষণে অনেক কিছুই ঘটে গিয়েছে। ছেলেটাকে হসপিটালে নিয়ে যাবার সময়টা পর্যন্ত পেলেন না আমজাদ সাহেব। এখনো ছেলেটার ছবির সামনে প্রায়ই দাঁড়িয়ে কাঁদেন তিনি। সেদিন ছেলেটাকেও বাসের বাইরে আনতে পারলে এই দৃশ্য হয়তো দেখতে হতো না তার।

নফল নামাজটা পড়ার পর তসবি নিয়ে বসলেন আমজাদ সাহেব। ছেলেটার বাড়ি পৌছানোর আগে বেশ কিছুসময় তসবি পড়বেন তিনি। ছেলেটার পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই সকাল হবে। ফজরের নামাজের পর আজকে তিনি হাটতে বের হবেন, সেই সন্ধ্যা থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতাটা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে যাবেন তিনি। অনেক দিনের স্বপ্নপূরণ বলে কথা, সামান্য একজন স্কুল মাস্টারের ছেলে বুয়েট ইঞ্জিনিয়ার।

মাঝরাতে সালমার ঘুম ভাংলো রাতুলের ফোনে। রাতুল ফাহিমের রুমমেট। একই হলে থাকতো ওরা। হুট করে একটা ধাক্কা খেলেন তিনি। আমজাদ সাহেবকে জাগিয়ে তুললেন, একটা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে কাঁপা-কাপা হাতে ফোনটা রিসিভ করলেন সালমা।

-“হ্যালো আন্টি , স্লামাইলাইকুম। ফাহিমের সাথে কতক্ষণ আগে কথা হয়েছে আপনার?” রাতুলের কথাটা শুনে সালমার মনে পড়লো, শেষ কথাটা ৪ ঘন্টা আগে হয়েছে। তারপরেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন তারা।

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে শেষ করলো রাতুল, “মাত্র ফেসবুক থেকে জানলাম ফেরিঘাটের একটু পরে ফরিদপুরে নাকি বড়সড় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। মুখোমুখি দুইটা বাস, তারমধ্যে একটা যশোরগামী। ফাহিমের ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি। ফেসবুকেও নেই অনেকসময় ধরে।”

কথাগুলো শুনে বিশ্বাস করতে পারলেন না সালমা। ফোনটা রেখে একটা আর্তচিৎকার দিলেন। আমজাদ সাহেব কথাটা শুনে দিশেহারা হয়ে গেলেন যেন। মাঝে মাঝে ঈশ্বরকে তার অপরিচিত লাগে। তিনি বোধহয় চাননা, একটা সামান্য স্কুল টিচারের পায়ে হাত দিয়ে একজন বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার সালাম করুক। ফাহিমের যে দুই-তিনটা নাম্বার আছে সবগুলোতেই বারবার চেষ্টা করতে থাকলেন। সবগুলোই বন্ধ।

ঐ মাঝরাতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন বৃদ্ধ। বাস স্ট্যান্ডে না গেলে কিছুই জানতে পারবেন না। যদিও তার এই মফঃস্বল এলাকায় এই রাতে বাসের কাউন্টার খোলা থাকার কথা না। যশোরগামী যে বাসটা এক্সিডেন্ট করছে, সেটাতে তার ছেলেটা শেষ কয়েকবারই যাতায়াত করছে। এদের সার্ভিস নাকি বেশি ভালো। কাউন্টারে গিয়ে দেখলেন বাস কাউন্টারে লোকজনগুলা বেশ তাড়াহুড়ার মধ্যে। তাদের নতুন এসি সার্ভিস এটা, অনেক টাকায় কেনা। আমজাদ সাহেব বারবার জানতে চাইলেন, ঢাকা থেকে ওঠা যাত্রীদের লিস্ট পাওয়াটা খুব দরকার তার। এদিকে সালমা তাকে বার বার ফোন করে যাচ্ছে। লিস্টে পারভেজ নামে একটা যাত্রীর নাম চোখে পড়লো তার। ফাহিমের ভালো নামটা পারভেজ। এটাই কি ফাহিম ? ভাবতে পারলেন না আমজাদ সাহেব। সেই রাতেই একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে তিনি এগুতে থাকলেন ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। সালমাকে বললেন, বাসায় তার জন্য অপেক্ষা করতে। আর নামাজে বসতে। আল্লাহ্‌ ছাড়া কেউ নাই এখন তাদের মাথার উপর।

ঘন্টা দুই পরে তিনি যখন ফরিদপুর পৌছালেন, প্রথমেই চলে গেলেন এক্সিডেন্ট যেখানে হয়েছে সেখানে। এই জায়গাটার সাথে তার অনেক ঘটনা জড়িত। তার বড়ছেলে পিয়াসকে এখানেই শেষবারের মত জীবিত দেখেছিলেন তিনি। ঘুমিয়ে ছিল ছেলেটা বাসের মধ্যে। আর কিছু চিন্তা করতে পারছিলেন না তিনি। ঘটনাস্থলে অনেক মানুষ। তখনো উদ্ধারকাজ শেষ হয় নি। রক্তে রাস্তাটা সেদিনের মত কালো হয়ে আছে। কালো চাপ চাপ রক্তের উপর জুতার দাগ অসংখ্য। লাইন ধরে অনেকগুলা মৃতদেহ সাজানো। একটার পর একটা মৃতদেহ দেখলেন। একটা লাশের মুখটা থেঁতলে গিয়েছে। এই ছেলেটার শরীরটা অনেকটা ফাহিমের মত। তিনি চিন্তা করতে পারছিলেন না কিছু।

ছেলেটার পকেটে কোন ফোন বা মানিব্যাগ খুঁজে পেলেননা তিনি, যেটার মাধ্যমে ছেলেটাকে সনাক্ত করা সম্ভব। বাস এক্সিডেন্টের পর একশ্রেণীর মানুষের প্রথম কাজ থাকে যাত্রিদের পকেটের মানিব্যাগ, মোবাইল কিংবা হাতের আঙটিটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলার। জানতে পারলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিছু আহত মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাদের একজনের বর্ণনার সাথে ফাহিমের বর্ণনা প্রায় মিলে যায়। উদ্ভ্রান্তের মত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে গেলেন আমজাদ সাহেব। নাহ, যে ছেলেটার কথা বলছিল সবাই, সেটা ফাহিম না। তবে কি ফাহিম ঐ ছেলেটাই যার কোন পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাবতে পারলেন না আমজাদ সাহেব।

পুরোনো নোকিয়া ফোনটা তখন বারবার বেজে যাচ্ছে। সালমা ফোন করেছে। কি বলবেন সালমাকে তিনি? খুঁজে পাচ্ছেন না ছেলেকে? সেবার যখন মেলায় ভিড়ে পিয়াস হারিয়ে গেলো, ঠিক এতটাই অসহায় বোধ করছিলেন তিনি।

ফোনটা ধরতেই শান্তির একটা কন্ঠ শুনলেন তিনি। ফাহিম এক নিঃশ্বাসে বলে গেলো, “বাবা, ফোনে চার্জ ছিল না, ফোন অফ ছিল। তুমি কই এখন?”

ফজরের আজান শুনতে পেলেন সাথে সাথে আমজাদ সাহেব। নাহ অনেকটা ভিজে গেছেন তিনি, কাদা-মাটিতে প্যান্ট নোংরা হয়ে আছে। তিনি এখন একটা মসজিদ খুঁজছেন। ফজরের নামাজ পড়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ার কথা তাঁর। ছেলেটা মাত্র জার্নি শেষ করে এসেছে, রেস্ট নিতে থাকুক। নামাজটা শেষ করে বাসায় যাবেন তিনি। যদিও তিনি অনেক ক্লান্ত, তারপরেও তার আজ ছেলেটাকে নিয়ে হাঁটতে যাবার কথা। পিয়াসের কবরটা জিয়ারত করে আসা দরকার ফাহিমকে নিয়ে।

Most Popular

To Top