নাগরিক কথা

ভুল বক্তব্য ভাইরাল কেন?

ভুল ভাইরাল নিয়ন আলোয় neonaloy

মানব মন বড়ই অদ্ভুত৷ কিছু বিষয়ে খুবই স্পর্শকাতর৷ এই দেখুন না কিছুদিন আগে হয়ে গেল ঢাকা ভার্সিটির ৫১ তম সমাবর্তন। সেখানকার এক ছবি ভাইরাল হয়৷ যেখানে গাউন পড়া এক রিক্সাচালকের সাথে এক গ্রাজুয়েট ছেলের৷  ছবিটি এই ক্যাপশনে ভাইরাল হয় যে “রিক্সাওয়ালার ছেলে গ্রাজুয়েট”।

হ্যাঁ, ওই যে স্পর্শকাতর স্থানটি! মুহূর্তেই গলিয়ে দেয় সবার মন। ছবি! যেমন ক্যাপশনে দেখাবেন তেমনই। যেখানে ক্যাপশনই কথা বলে, সেখানে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবি দেখার সময় কই?

তবে একটু খেয়াল করলেই হয়ত আসল চিত্র চোখের সামনে চলে আসত। সেই ছবির ছেলের হাতে চকচকে ঘড়ি, গায়ে লাল টুকটুকে পান্জাবি। আর তার বাবার গায়ে জীর্ন মলিন কাপড়। খটকা লাগে না মনে? তাও আবার সুস্থ মস্তিষ্কের গ্রাজুয়েটের দ্বারাও কি বাবার সাথে এমন করে ছবি তোলা সম্ভব?!

হ্যাঁ, আসলে ছবিটি সত্য হলেও এর সাথের গল্পটি সত্য ছিল না। ছবিটি তোলা হয়েছিল যে উদ্দেশ্যে, সে উদ্দেশ্য ছাপিয়ে যায় ভাইরাল হওয়া গল্পটিকেও! যা পরবর্তীতে জানা যায় সেই “রিকশাওয়ালার ছেলে” পরিচয়ে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ঢাবি’র সেই শিক্ষার্থী লিটন মুস্তাফিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে।

নিচে তার বক্তব্য পুরোপুরি তুলে ধরা হল-

“স্যালুট…

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে এ ছবির একটি বিশেষ অংশ গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছবির ঐ অংশটি সম্ভবত বিভিন্ন গ্রুপ হয়ে ব্যক্তি থেকে আরম্ভ করে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ফটোগ্রাফার শাহরিয়ার সোহাগ গতকাল অপরাজেয় বাংলার সামনে থেকে এ ছবিটি তোলেন। রিকশায় যিনি বসে আছেন তিনি আমাদের গর্বিত একটি অংশ। মনেই হয় নি সে মুহূর্তে তিনি অন্য একটি অংশ। পৃথিবীর আর সব বাবার মতো এ বাবার চোখেও আমি স্বপ্ন খুঁজে পাই। মোটেও মনে হয় নি তার গায়ের ঘাম লাগলে দুর্গন্ধী হয়ে উঠবে আমার গাউন। এমন ঘামের চর্মশরীরে বেড়ে ওঠা আমার। আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর চাকা এ ‘পিতা’দের ঘামে ও দমে ঘোরে।

আমরা যখন খুব আনন্দ করছিলাম তখন তিনি আনমনা নজরে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বিষয়টি আমি বুঝে ‘পিতা’কে ডাক দেয়। তিনি সাড়া দেন। আমি আমার গাউন, হুড খুলে ‘পিতা’কে পরিয়ে দেই। তারপর ছবি তোলা হয়। একজন গর্বিত গ্রাজুয়েট মনে হচ্ছিলো তখন আমার। এঁদের রক্ত ঘামানো অর্থেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছি। এ ‘পিতা’র পোশাক দেখে স্যালুট না করে পারি নি। এ ছবি তুলে রাতেই ফেইসবুকে পোস্ট করেন ফটোগ্রাফার। ছবিটি ভাইরাল হলে দেখা যায় অনেকেই আমাকে ভুল বুঝছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছবিটি নিউজ হয়ে গেছে। দুঃখিত আমি যে মুখ ঘোলা করার জন্য তবুও বলি, এসব মানুষের মাথা খালি বলেই আমাদের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হুড! যাঁরা ভুল বুঝেছেন আমি তাঁদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ফটোগ্রাফারের হয়ে। এসব মানুষেরা আমাদের সত্যিকার বাবা-ই। কারণ আমি নিজেও কৃষকের লাঙলের ফালা বেয়ে উঠে এসেছি…”

পরবর্তীতে এই ছবির ব্যাপারে নিজের ব্যাখ্যা জানিয়েছেন চিত্রগ্রাহক শাহরিয়ার সোহাগ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে।

“প্রোফেশনালি কিংবা শখের বসে ছবি তোলা আমার নেশা। লেখালেখি করি বিধায় কৌতূহলটাও বেশি। ক্যামেরা নিয়ে সেদিন ঘুরতে থাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার মামা লিটন মোস্তাফিজ ও তার বন্ধুরা সমাবর্তন উদযাপন করছিলো। তাদেরও কিছু ছবি তুললাম।

অপরাজেয় বাংলার সামনে আসতেই একজন বৃদ্ধ রিক্সায় বসে অনেকক্ষণ টুপি উড়ানো দেখছিলেন। কৌতূহল নিয়ে কাছে গেলাম আমি আর মামা। “তাঁর ছেলেও নাকি পাশ করেছে।” আমি বিস্তারিত অনুসন্ধান কিংবা জেরা করার প্রয়োজন মনে করি নি। কারণ এমন ঘটনা এখন অহরহ। গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলেমেয়ারাই এই গ্রাজুয়েটের একটা বড় অংশ। উনার সন্তান সমাবর্তন টুপি পরেছেন বা পরবেন সে যা ই হোক, উনি একজন বাবা। তারও সন্তান আছে। আর আজ যারা গ্রাজুয়েট তারাও কোনো না কোনো বাবার সন্তান। অনেককে শুনেছি তাকে বাবা বলে সম্বোধন করতে। আর এত মানুষের বাবা ডাকে উনি তখন আবেগপ্লুত।

আমি আমার তোলা কয়েকটা ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করি। অনেকে অনেক ভাবেই ছবিগুলোতে অতিরঞ্জিত ক্যাপশন ব্যবহার করেছেন। অনেকে আবার ছবি নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। নিজের ভালো লাগার জায়গা থেকে ছবিগুলো পোস্ট করার পর ছবিগুলো রীতিমত ভাইরাল।

আলোচনা কিংবা সমালোচনা কে পাশ কাটিয়ে নিজেকে গ্রাজুয়েট ভাবুন আর বৃদ্ধর ক্লান্ত মুখে নিজের বাবাকে কল্পনা করুন। বাবারা তো একই রকম হয়। আলাদা শুধু চেহারাটা। সব বাবাদের ভেতরটা একই রকম। এখন থেকে রিক্সায় উঠলে কিংবা যে কোনো কাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের যেন সম্মান করি। কারণ আমাদের বাবারা আমাদের কারো কাছ থেকেই যেন কষ্ট না পান। সব বাবারা ভালো থাক। এপারে কিংবা ওপারে।”

শুধু কিছু লাইক-কমেন্ট আর ভাইরাল হবার আশায় আমাদের মধ্যে অনেকেই যারা এই ছবির ভুল ক্যাপশন এবং ব্যাখ্যা যাচাই-বাছাই না করেই নির্বিচারে শেয়ার করেছি, তারা কি লিটন মুস্তাফিজের শুভ মনের পরিচয়টিকেই খাটো করছি না? এই যে এরকম একটি সুন্দর চিন্তাধারা একদিনের মধ্যেই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেলো, সেটা কি খুব ভাল হল? এরপর যখন কোন দিনমজুর কিংবা রিকশাচালকের সন্তান তার গর্বিত পিতাকে কনভোকেশন গাউন পরিয়ে ছবি তুলবে, আপনি নিজেই কিন্তু মনে মনে ভাববেন-

“এরকম বহুত দেখা হয়েছে। সব শো-অফ… ভাইরাল হওয়ার ধান্ধা।”

Most Popular

To Top