নাগরিক কথা

“বড়লোকের মেয়ের গ্র্যাজুয়েশন পার্টি” কি আসলেই আদিখ্যেতা?

গ্র্যাজুয়েশন পার্টি নিয়ন আলোয় neonaloy

হাসনাত কালাম সুহান:

একটা মেয়ের গ্র্যাজুয়েশন পার্টি নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক ‘শেয়ার’ হয়েছে। ট্রল হচ্ছে, মজাও নিচ্ছে লোকজন। আমার মনে হয়, চাওড় হওয়া কয়েকটা ভুল তথ্য এবং ধারণার ব্যাপারে একটু ইনপুট দিই।

“মেয়েটা কি আদৌ কোন ভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট?”

উত্তর হচ্ছে- না।
সে মূলত আমাদের দেশের লেভেলে ‘ইন্টার পাশ’ করেছে। আর তার মা-বাবা এই পার্টি দিচ্ছে (পার্টি করা নিয়ে আমার মূল্যায়ন, একটু পরে বলছি)।

আগে বলি, এই মেয়ের প্রোফাইল ঘুরে যা বুঝলাম সে ক্যালিফোর্নিয়ার একটা নামকরা প্রাইভেট হাইস্কুল থেকে পাশ করেছে।

উল্লেখ্য, আমেরিকায় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখাকে বলা হয় ‘হাইস্কুল’। আমরা আমাদের দেশে এই গ্রেডকে ‘কলেজ’ বললেও আমেরিকায় ভার্সিটি লেভেলের স্নাতক গ্রেডকে ধরা হয় ‘কলেজ’।

“তো, এই মেয়ে ইন্টার পাশ করসে; তাহলে ‘গ্র্যাজুয়েশন পার্টি’ করছে কেন?”

এবার আসি আরেকটা ভুল ধারণায়।

সাধারণ চোখে,আমাদের দেশে গ্র্যাজুয়েট কারা?

সাধারণ অর্থে ৪ বছর মেয়াদী স্নাতক কিংবা অনার্স পাশ করলেই আমরা কাউকে ‘গ্র্যাজুয়েট’ বলি। কেউ গ্র্যাজুয়েট হয়েছে- মানেই সে আন্ডারগ্র্যাড বা স্নাতক পাশ দিয়েছে এমন কেউ।

কিন্তু, একাডেমিক্যালি কিংবা আমেরিকার কালচারে এমনটা হয় না। কারণ, এখানে শিক্ষার প্রতিটা নির্দিষ্ট স্তর অতিক্রমের পর-ই স্টুডেন্টদের ‘গ্র্যাজুয়েট’ বলা হয়।

যেমন ক্লাস ফাইভ পাশ দিল সে, সেই অবধি ‘এলিমেন্টারি স্কুল গ্র্যাজুয়েট’। অষ্টম গ্রেড অবধি ‘মিডল স্কুল গ্র্যাজুয়েট’। আর ইন্টার পাশ করেছে এই যে মেয়েটা। সে হচ্ছে ‘হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েট’। এই মেয়েটা এটাই সেলিব্রেশন করছে।

তারপর অনার্স পড়লে হবে ‘কলেজ গ্র্যাজুয়েট’।

এই মেয়েটা মূলত ‘হাইস্কুল’ গ্র্যাজুয়েট। মানে ইন্টার পাশ করেছে, আমাদের দেশের বিবেচনায়। এখন সে কলেজে যাবে। মানে অনার্স পড়তে যাবে।

এই মেয়ে ভার্সিটি গ্র্যাজুয়েশন শেষে পার্টি দিচ্ছে; এমন একটা ভুল ধারণা আমার বন্ধুদের মধ্যেও দেখলাম আছে। যারা শেয়ার দিচ্ছে। যারা ট্রল করছে। তাই এই ভুলটা নিয়ে কথা বললাম।

এই ‘হাইস্কুল গ্রাজুয়েশন’ পার্টির মহাত্ম্য কি? এটা কতটুকু বাড়তি আদিখ্যেতা মার্কা ফাজলামী?

এবার বলি, আমেরিকায় শুধু হাইস্কুল না। প্রায় সব লেভেলের স্কুলেই একাডেমিক লেভেলের ‘গ্র্যাজুয়েট’ পার্টি হয়। কিন্তু ইন্টার পাশ শেষে বা ‘হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন’ পার্টি আসলেই অনেক জাঁকজমকপূর্ণ একটা আয়োজন। সম্ভবতঃ ক্রিসমাস, নিউ ইয়ারের পরেই; সবচে বেশী বিক্রি-বাট্টা হয় এই স্প্রিং সিজনে। গ্র্যাজুয়েশন সীজনে।

এর কারণ আছে অবশ্য। পশ্চিমে এই সময়টার পরে মানে এই ‘ইন্টার পাশ গ্র্যাজুয়েশনের পরে ছেলেমেয়েরা ১৮+ হয়ে যায়। তারপর বাড়ি ছেড়ে ভার্সিটি চলে যায়। এই যাওয়ার পরে সে আর পরিবারের সাথে একসাথে থাকে না। এমনও হয় বাপ মা মরে যাচ্ছে। বাপের মায়ের ফিউনারেলেও সে আর আসে না। অন্য স্টেটে, অন্য শহরে, অন্য দেশে বিজি হয়ে যায়। এটাই লাইফ। হ্যাঁ, অনার্স পাশের পর ‘কলেজ গ্র্যাজুয়েশন’ হয় যদিও। আর সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আবেদন এক না।

তো এই যে ‘হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন পার্টি’, এটা ইউনিক কেন?

কারণ, এটা অধিকাংশের বেড়ে উঠার শহরে হয়। নিজের পরিবার, এতদিনের বন্ধু আর স্বজনেরা এক হতে পারে। নিজেরাই হোস্ট হয় এসবে। ইউটিউবে সার্চ দিলেই প্রচুর ভিডিও পাওয়া যাবে।

এটা কেন গুরুত্ব দেয় এরা?

এটা মূলতঃ একজন সন্তানের পূর্ণ স্বাধীন হওয়ার আগে আগে; ফ্যামিলিতে শেষতম একাডেমিক সেলিব্রেশন। আই রিপিট, প্রায় সব ফ্যামিলিই এটা হোস্ট করে থাকে।

তাই অন্য গ্রেডের ‘গ্রাজুয়েশন সেলিব্রেশনের’ চাইতে এটা বেশী হয়।

কিন্তু তারপরেও, ইন্টার পাশ লইয়া এত মাতামাতি কেন ভাই?

কারণ, আমরা আমাদের দেশে যেমন মাস্টার্স পাশ ছাড়া আজকাল পিয়নও নিয়োগ দিই না। বিনামূল্যে শিক্ষা পাচ্ছি বলে। শেখ হাসিনার কথামতো ৩৮ টাকা মাসে দিয়ে। জনগনের ট্যাক্সের টাকায় অধিকাংশ পড়তে পারছি বলে। এত বড় বড় ডিগ্রী নিচ্ছি। কথা কিন্তু একদম সত্য!

আমেরিকায় অবস্থা কিন্তু ভিন্ন। আমেরিকায় এই হাইস্কুলের পর প্রত্যেকটা ডিগ্রী অর্জনের জন্য কয়েক লাখ টাকা গচ্ছা দিতে হয়! বাপ-মা ছেড়ে দেয় বেশীরভাগকেই। সন্তানের দায় আর নেয় না। নিজে পার্ট-টাইম কাজ করে, নিজে ক্লাস করে, লোন নেয়। এভাবে পড়ালেখা করে ওরা। এটাই কালচার।

তাই, আমেরিকায় এরকম বড় ডিগ্রী অর্জনের ভাগ্য সবার থাকে না। উচ্চতর ডিগ্রী তো দূরের কথা; অনার্স পাশ করে খুব কম মানুষ। যারা করে অনেক স্ট্রাগল, কিংবা অনেক গ্যাপ নিয়ে করে।

এজন্যই এই ‘হাইস্কুল পাশ’ ওদের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। বাপ-মা কিংবা প্রিয় মানুষেরা এদেরকে মোটিভেশন দিতেও বেশ জাঁকজমক করে আয়োজন করে।

মোদ্দাকথা হচ্ছে, এই সেলিব্রেশন নতুন বয়স, নতুন স্বাধীনতা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো- এগুলোরও সেলিব্রেশন ওদের ‘হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন পার্টি’। এজন্যই ওদের জন্য এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এই মেয়ে কি আদিখ্যেতা বেশী করছে?

উত্তর হচ্ছে- অনুষ্ঠানের ভেন্যু বাংলাদেশে হওয়ায়; আদিখ্যেতা মনে হচ্ছে। ফেসবুকে চাওড় হচ্ছে। ট্রল হচ্ছে।

এর আগে গুলশানে নিহত তারুশি জৈন, ফারাজ হোসেন; এদের একজনের কারো প্রোফাইলে গিয়ে দেখেছিলাম। গ্র্যাজুয়েশন পার্টির ছবি ছিল। এরকম আড়ম্বর ছিল না। কিন্তু আমাদের মূল আপত্তি কিন্তু ‘গ্রাজুয়েট হইসে দেইখ্যা পাট্টি দিতেসে কেন?’- এইটা ছিল। সেটা তার পরিবার আমেরিকায় করেছিল বলেই- ফেসবুকে চাওড় হয়নি।

এই যে, এখন যে মেয়েটাকে নিয়ে এত ট্রল হচ্ছে- কেবল বাংলাদেশে বলেই। আমরা যেহেতু জানি না ওদের স্কুলের কালচার। তাই ‘মজা’ নিচ্ছি।

ওর ক্লাসমেট ধরেন ৫০ জন। ধরেন, তারা ২০টা দেশের। তার বন্ধুদের অধিকাংশ-ই কিন্তু এরকম ‘গ্র্যাজুয়েশন পার্টি’ করেছে। তাদের নিয়ে এত উচ্চবাচ্য হই-হুল্লোড় হতো না। আমাদের মতন। প্রচুর ইন্ডিয়ানের এরকম ভিডিও আছে ইউটিউবে।

সবশেষে একটা কথা, পশ্চিমের ট্রেন্ডকে অনুকরণ করে বাংলাদেশের সব ক্যাম্পাসে পাশ করে বেরোনোর আগে ‘র‍্যাগ ডে’ কালচার সেলিব্রেট হচ্ছে। এমনকি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্রম কিং’  এবং ‘প্রম কুইন’ বাছাইয়ের আদলে ‘বিদায়ী ব্যাচের রাজা’ এবং ‘ব্যাচের রাণী’ বাছাই হচ্ছে। তাও বেশ কয়েক বছর ধরে। মেডিক্যাল কলেজগুলো ‘ইন্টার্ন এন্ডিং’ করছে সেই পশ্চিমকে অনুসরণ করেই। গত ৩-৪ বছর ধরে, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ‘গ্র্যাজুয়েশন নাইট’ হচ্ছে। এসবের চাইতে ফ্যামিলিতে ‘গ্র্যাজুয়েশন পার্টি’ হোস্ট করা এত আহামরি উদ্ভট কিছু না।

একটা ফ্যামিলি আমেরিকায় পড়তে যাওয়া অন্য বাংলাদেশীদের মতন; সন্তানের হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন পার্টি আমেরিকায় আয়োজন না করে। বাংলাদেশে তাদের জ্ঞাতি স্বজন দাওয়াত দিয়ে করেছে। তারপর, বাংলা দাওয়াত কালচার আর পশ্চিমের কোরিওগ্রাফি মিলিয়ে তার মেয়ের ‘হাইস্কুল গ্রাজুয়েশন পার্টি’ প্রচার হচ্ছে।

তো, খুব একটা সমস্যা কোথায়?

ইন্ডিয়া আর আমেরিকা কালচার একসাথে মিশায়ে ‘র‍্যাগ ডে’ পালন করা আমাদের সমস্যা থাকার তো কথা না!!

Most Popular

To Top