ফ্লাডলাইট

খালেদ মাহমুদ সুজনঃ ক্রিকেটে আমার প্রথম হিরো হলেন যেভাবে

খালেদ মাহমুদ সুজন নিয়ন আলোয় neonaloy

আমি শতভাগ নিশ্চিত শিরোনাম দেখেই অনেকে বড়সড় রকমের একটা হাসি দিয়েছেন! খুব স্বাভাবিক খালেদ মাহমুদ সুজন নানা কারণেই আলোচিত-সমালোচিত একজন মানুষ। নানান কারণে একজন হাসির পাত্র হিসেবে অনেকবার আবির্ভূত হয়েছেন।

আর যদি তার সামগ্রিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করা হয় তাহলে অন্তত হিরো মানার কোন কারণই নাই। প্রায় আট বছর ক্রিকেট খেলে তার একটি মাত্র ফিফটি দুই ফরম্যাট মিলিয়ে, ব্যাটিং গড় মাত্র ১২.০৯ (টেস্ট) এবং ১৪.৩৬ (ওয়ানডে)। এমন একজন কিভাবে “হিরো” হয়?

আসলে একজন ক্রিকেট ফ্যানের প্রথম ভালোবাসা বা প্রথম হিরো হতে হলে তার সম্পুর্ণ ক্যারিয়ার বিবেচনা করা লাগে না। প্রথম স্মরণীয় কোন ম্যাচ বা জয় বা মনে রাখার মত কিছু ঘটনায় তার ভূমিকা থেকে এই ভালো লাগার জন্ম হয়।

১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময় আমার বয়স মাত্র নয় বছর। ক্রিকেটের তেমন কিছু বুঝি না, তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের কিছু কিছু স্মৃতি মনের ভেতর জায়গা করে নিয়েছিলো।

সেই ম্যাচে খালেদ মাহমুদ সুজনের অলরাউন্ড পারফর্মেন্স তাকে ম্যাচ সেরার পুরস্কার এনে দিয়েছিলো। ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ২৭ রানের পর সুজন সেরাটা দিয়েছিলেন বল হাতে। ১০ ওভারে মাত্র ৩১ রান দিয়ে তুলে নিয়েছিলেন পাকিস্তানের ৩ উইকেট। শহীদ আফ্রিদি, ইনজামাম-উল-হক এবং সেলিম মালিকের উইকেট তুলে নিয়ে পাকিস্তানের টপ অর্ডার গুড়িয়ে দিয়েছিলেন সেদিন সুজন। ইংলিশ সিমিং কন্ডিশনের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিয়েছিলেন বল সুইং করিয়ে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জয় বলা হয় ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয়কে। কারণ সেদিন নেদারল্যান্ডস জিতে গেলে বাংলাদেশের আর সেমিফাইনাল খেলা হয় না। সেমিফাইনাল না খেললে আর বিশ্বকাপ খেলা হয় না, ওয়ানডে মর্যাদা পাওয়া হয় না। ফাইনালের চার দলই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিলো তাই জরুরী ছিলো সেমিফাইনালে সুযোগ পাওয়া। নেদারল্যান্ডসের সাথে আকরাম খানের ম্যাচ বাঁচানো ফিফটি আমরা দেখি নি, যদি সরাসরি দেখতাম তাহলে হয়তো প্রথম হিরো আকরাম খানকেই বলতাম।

তবে বিশ্বকাপ দেখেছিলাম, আর সুজনের সেই ম্যাচ জেতানো বোলিং এতো ভালো লেগেছিলো যে তখন সুজনকেই হিরো মনে হয়েছিলো। সে সময় আর কতটুকুই বা খেলা বুঝতাম, কয়জনকেই বা চিনতাম! যেটা মনে দাগ কেটেছিলো সেটাই মনে আছে আজও।

যদিও খুবই সাধারণ ক্যারিয়ার সুজনের, বলার মত কিছুই না তথাপি সুজন হতে পারতেন আমাদের প্রথম দিকের একজন ম্যাচ উইনার, হয়তো বিগ ম্যাচ উইনার তকমাটা পেয়েও যেতেন। হয়নি সেটা সুজনের দোষ না, ভাগ্যের দোষ! কিভাবে সেটা বলি তাহলে।

১) মুলতান টেস্ট

এই টেস্ট শুরুর আগে সুজনের ঝুলিতে একটি মাত্র টেস্ট উইকেট ছিলো। বোলিং গড় ছিলো চারশোর উপর। টেস্ট ক্রিকেটের নিয়মিত বোলারদের ভেতর সবচেয়ে বাজে গড় সুজনের। কিন্তু মুলতানে যেন অন্য সুজনকে দেখলাম আমরা। প্রথম ইনিংসে ৩৭ রানে ৪ উইকেট আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৮ রান খরচায় তুলে নিলেন ৩ উইকেট। মানে এক টেস্টেই সাত উইকেট!

খালেদ মাহমুদ সুজন নিয়ন আলোয় neonaloy

এই ম্যাচশেষে সুজনের সাথে কেঁদেছিল টিভিসেটের সামনে বসা অজস্র বাংলাদেশী

মুলতানের বেদনাদায়ক স্মৃতি আর উল্লেখ করলাম না। যদি সেদিন পাকিস্তানের উইকেটকীপার রশিদ লতিফ প্রতারণা না করতেন, পাকিস্তানের সর্বশেষ জুটিতে ইনজামাম এর সাথে উমর গুল দাঁড়িয়ে না যেতেন, কিংবা আম্পায়ার আউট দেওয়ার পরেও মোহাম্মদ রফিক নিজের ভুল স্বীকার করে উমর গুলকে ক্রিজে ফিরিয়ে না আনতেন, তাহলেই কিন্তু বাংলাদেশ জিতে যায়। আর বাংলাদেশ জিতে গেলে বোলিং আর অধিনায়কত্ব মিলিয়ে সুজন ম্যাচ সেরা হবার অন্যতম দাবিদার ছিলেন। সেটা না হলেও মুলতান টেস্ট জিতলে সুজনকে নিশ্চয় অন্যভাবে মনে রাখতাম আমরা?

২) হারারে ২০০৪ সাল

বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর শুরু হলো জয় ক্ষরা। কেনিয়া, কানাডার কাছেও হারার দিন দেখতে হয়েছিলো আমাদের। সেই জয় ক্ষরা কাটিয়ে অধরা জয় ধরা দিয়েছিলো হারারেতে। পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ বুলাওয়েতে বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হবার পর হারারেতে কার্যত তিন ম্যাচের সিরিজ হয়ে যায় সেবার। তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচে পাঁচ বছর পর জয় পায় বাংলাদেশ। ম্যাচের বিস্তারিত আর বললাম না তবে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছিলো মাত্র ৮ রানে। মাত্র ৮ রানে জেতা ম্যাচে ব্যাট হাতে খালেদ মাহমুদের ১৬ বলে ২২ রানের ক্যামিওর ভূমিকা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। মোহাম্মদ আশরাফুলের সাথে সুজনের ৫১ রানের ঝড়ো জুটিটাই জয়ের ভিত্তি করে দেয়। দ্বিতীয় ম্যাচ জিম্বাবুয়ে জিতে নেয়। তৃতীয় ম্যাচে অবিশ্বাস্য এক জয়ের সম্ভাবনা তৈরী হয় সুজনের হাত ধরে।

সেই ম্যাচে দুই ওপেনার হান্নান সরকার (৫৯) আর প্রয়াত মানজারুল ইসলাম রানা (৬৩) প্রথম উইকেটে ১০৫ রানের জুটি গড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর রাজিন সালেহ (২১) ছাড়া আর কেউ দুই অংক ছুঁতে না পারলে বাংলাদেশ অল-আউট হয় মাত্র ১৮৩ রানে। সহজ টার্গেট পেয়ে জিম্বাবুয়ে শুরু করলো খুনে মেজাজে। ওপেনিং জুটিতে আসলো ১১২ রান।

আর তারপরেই সেই ম্যাজিকাল স্পেল সুজনের। মাত্র দুই ওভারের ভেতর তুলে নিলেন জিম্বাবুয়ের টপ অর্ডারের চারজন ব্যাটসম্যানকে। গ্রান্ট ফ্লাওয়ারকে দিয়ে শুরু, টাটেন্ডা টাইবুকে দিয়ে শেষ। জিম্বাবুয়ে ১২০ রান ৫ উইকেটে। ১০-১-১৯-৪, সুজনের বোলিং ফিগার, যার ভেতর ডট বলের সংখ্যা ৪৫! কিন্তু হায়! বাঁধা হয়ে দাড়ালেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক হিথ স্ট্রিক। অপরাজিত ৩১ রান করে তিন উইকেটের জয় ছিনিয়ে নেন। তবে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন সুজন।

সেদিন যদি তাপস, রানা, মুশফিকুর রহমানদের কেউ একজন বল হাতে সুজনকে সাপোর্ট দিতে পারতেন তাহলে বাংলাদেশ সিরিজ জিতে যায়, বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয় সেদিনই হয়ে যায়, আর সেটাও হিথ স্ট্রিকের শক্তিশালী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। আচ্ছা সেটা যদি হতো তাহলে আমরা সুজনকে কিভাবে মূল্যায়ন করতাম সিরিজ জয়ে অবদান বিবেচনায়?

৩) কিংসটন ২০০৪

উইন্ডিজ সফরের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ মাত্র পঞ্চাশ ওভার ব্যাট করে ৮ উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৪৪ রান। অথচ এই ম্যাচটাই বাংলাদেশ প্রায় জিততে জিততে মাত্র ১ উইকেটে হারলো! ১৩৩ রানে উইন্ডিজের নবম উইকেট পতনের পর বাঁধা হয়ে দাঁড়ান ইয়ান ব্র‍্যাডশ আর ফিদেল এডওয়ার্ডস। ব্র‍্যাডশ পুরা ওভার ঠেকিয়ে দেন, শেষ বলে সিঙ্গেল নেয়ার আশায়। কিন্তু সেটা হলো না। ফিদেল এডওয়ার্ডস পরের ওভার খেলে দিলেন। মেডেন ওভার, ডট বলের পর ডট বল। তারপর তিন ওভার পর ব্র‍্যাডশ ছক্কা হাকিয়ে দিলেন। তবে স্ট্রাইকে পাওয়া গেলো ১০ বলে শূন্য রান করা ফিদেল এডওয়ার্ডসকে রান। উইন্ডিজের জয়ের জন্য দরকার ৪ রান, বাংলাদেশের ১ উইকেট। ফিদেল চার মেরে দিলেন।

এই ম্যাচের অধিনায়ক হাবিবুল বাশার পরে বলেছেন নবম উইকেট পড়ে যাবার পর পার্ট-টাইমার রাজিন সালেহকে বল করতে দেয়াটা তার ক্যারিয়ায়ের অন্যতম বড় ভুল সিদ্ধান্ত। এক ছয়সহ রাজিন ৮ রান দিয়েছিলেন। বাশারের হাতে মূল বোলার হিসেবে তাপস, মুশফিকুর রহমান আর মোহাম্মদ রফিকের ওভার বাকি ছিলো। অবশ্য ৮৩ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর উইন্ডিজ ৩৬ রানের জুটি গড়লে এই রাজিনই অধিনায়ক রামনরেশ সারওয়ানকে আউট করেছিলেন। তবে এই ম্যাচে বল হাতে আবার ম্যাজিক দেখান খালেদ মাহমুদ সুজন। তার বোলিং ফিগার এমন ছিলো ১০-৩-১৫-২। হ্যাঁ দশ ওভারে মাত্র ১৫ রান! তুলে নিয়েছিলেন বিপদজনক হতে থাকা ওপেনার রিকার্ডো পাওয়েলের (৫২) উইকেটটাও। ডট বলের সংখ্যা ৪৯!

খালেদ মাহমুদ সুজন নিয়ন আলোয় neonaloy

উপরে বলেছিলাম খালেদ মাহমুদের ভাগ্য খারাপ।

এবার চিন্তা করেন বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের পাশাপাশি যদি মুলতান টেস্ট জিতে যেত বাংলাদেশ তাহলে দেশের প্রথম টেস্ট জয়ের কারিগর হতেন সুজন, সেটাও বিদেশের মাটিতে! তারপর বিদেশের মাটিতে প্রথম সিরিজ জয় যদি হারারাতে হতো, আর শক্তিশালী উইন্ডিজকে তাদের দেশে যেয়ে সেদিন হারানো যেত তাহলে সুজনকে নিশ্চয় আমরা বিগ ম্যাচ উইনার বলতাম? তাও বিদেশের মাটিতে সবগুলা। এই জয়গুলা থেকে বাংলাদেশ খুব সামান্য দূরে ছিলো, আর তাই সুজনের পাওয়া হয়নি ম্যাচ উইনারের তকমা! বলেছিলাম সুজনের ভাগ্যটা খারাপ, তার শেষ দুটো উদাহরণ দেই

– ২০০১ সালে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়েছিলো দুটি টেস্ট খেলতে। সিরিজের প্রথম টেস্ট হ্যামিল্টনে, ভয়াবহ অবস্থা উইকেটের, আউটফিল্ড আর উইকেট আলাদাভাবে চেনা যায় না, এতো সবুজ! নিউজিল্যান্ডের ৩৬৫ রানের জবাবে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ একপর্যায়ে ১৫৬/৮, উইকেটে কোন ব্যাটসম্যান না থাকায় মেরে খেলা শুরু করলেন সুজন, দশম ব্যাটসম্যান মাশরাফি ছয় ওভারে মাত্র ৭ বল খেলেছেন, দারুণভাবে স্ট্রাইক-রোটেট করছেন সুজন। সুজনের রান তখন ৪১ বলে ৪৫। তখনই মাশরাফি আউট। লাস্ট ব্যাটসম্যান উইকেটে। সুজন উপায় না দেখে শেন বন্ডকে চার্জ করলেন। বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ। ৪৫ রানে আউট হলেন সুজন, দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান করলেন। তবে এই ৪৫ রানই তার ক্যারিয়ার বেস্ট হয়ে থাকায় বঞ্চিত হলেন টেস্ট ফিফটির। এবং সুজনই বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট অধিনায়ক যার টেস্ট ফিফটি নেই।

– সুজন ২০০৬ সালে ঘরের মাটিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচ খেলে অবসর নেন, আর দ্বিতীয় ম্যাচেই বাংলাদেশ জয় পায় বগুড়ায়। আচ্ছা এই জয়টা প্রথম ম্যাচে আসতে পারতো না সুজনের অবসরের ম্যাচে! তবে হ্যা, সুজন একটা রেকর্ড করেছেন যেটা এখনো অটুট আছে। লিস্ট “এ” ক্রিকেটে সুজনের একমাত্র সেঞ্চুরি (১৪৫*) করার দিন মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর সাথে ২৬৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি করেছিলেন। বাংলাদেশের লিস্ট “এ” ইতিহাসে এটাই পঞ্চম উইকেটের সর্বোচ্চ রান এখনো।

কিছুদিন আগে হুট করে মনে হয়েছিলো ছোটবেলায় কার খেলা প্রথম মনে দাগ কেটেছিলো? কে ছিলো প্রথম হিরো আমার কাছে? উত্তর খুঁজতে যেয়ে পেলাম খালেদ মাহমুদ সুজনকে। তারপর তার ক্যারিয়ার নিয়ে কিছুটা ঘাটাঘাটি করেছিলাম রংপুর ভ্রমণের সময়। আজ লিখলাম সময় করে।

অনেকে হয়তো সুজনকে নিয়ে অনেক মন্তব্য করবেন। সেসব নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন নেই, কম-বেশি সবাই জানে। তবে তার ব্যক্তিজীবন বা সামগ্রিক ক্যারিয়ার নিয়ে আমার এই পোস্ট না।

আমি কখনোই খালেদ মাহমুদ সুজনের ফ্যান ছিলাম না, বরং ছোটবেলায় ভাবতাম তিনি কেন জাতীয় দলে খেলেন? মাঠের বাইরের কোন ঘটনা ব্যতীত তাকে নিয়ে লেখার পরিকল্পনাও করি নি আগে। অথচ আজকে তাকে নিয়েই লিখলাম। ক্রিকেট বড় অদ্ভুত সুন্দর খেলা, আর আমরা নিজেরাও বড় বিচিত্র!

Most Popular

To Top