ফ্লাডলাইট

জাতির ভিলেনঃ সাব্বির রহমান

সাব্বির রহমান নিয়ন আলোয় neonaloy

আচ্ছা আপনাকে যদি বাংলাদেশের একাদশ সাজাতে বলে, আপনি ৭ নম্বর পজিশনে কাকে খেলাবেন? আমি ফর্মে ফেরা ‘সাব্বির রহমানকে’ খেলাবো।

কি? মুখের কোণে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি চলে আসছে, তাই না? হাসি আসাটাই স্বাভাবিক। “সাব্বির রহমান” নামটিকে আমরা এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি যে এখন নামটা শুনলেই হাসি পায়, কারো কারো তো মেজাজও খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু বছর তিনেক আগেও কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল না। সবারই পছন্দের একজন প্লেয়ার ছিলেন সাব্বির রহমান, তিনি ক্রিজে নামলে মানুষজন একটু নড়ে চড়ে বসতো, তার প্রতিটি বাউন্ডারিতে এলাকার চায়ের দোকানে সিটি বাজতো। আর এখন টস করার পর একাদশে তার নাম দেখতে পেলেও মানুষজন বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকায়।

আচ্ছা আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি এতো কম সময়ে এই প্লেয়ারটার এতো বাজে পরিণতি কেন হল? “সাব্বির ব্যাক্তিগত জীবনে উশৃঙ্খল”- শুধু এই উক্তির দোহাই দিয়ে কি আমরা আমাদের দায় এড়াতে পারবো? সাব্বিরের এই অধঃপতনে কি বিসিবি কিংবা টিম ম্যানেজমেন্টের কোন দায় নেই? দাঁড়ান ব্যাখ্যা করি।

সাব্বির তার ৪ বছরের ছোট্ট ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ভাল সময় কাটিয়েছেন ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে। ২০১৪ সালে তিনি ৫ ইনিংসে ব্যাট করার সুযোগ পান যার ৪ টিতেই তিনি ব্যাট করেন ৬, ৭, এবং ৮ নম্বর পজিশনে। এসময়ে তার গড় ছিল ৪২ এবং স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩০। নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়।

২০১৫ তে তিনি ১৪ ইনিংস ব্যাট করার সুযোগ পান যার সবগুলোতেই তিনি ব্যাট করেন ৬, ৭ এবং ৮ নম্বর পজিশনে। গড় রান ৩৪ এবং স্ট্রাইক রেট ৯৭। এই বছরটিতেও যে তিনি খুব ভাল ভাবেই পাশ করে গেছেন সেটা বলাই যায়।

অনেকই বলবেন ওয়ানডেতে ৪২ এবং ৩৪ গড়ে রান করা তো আহামরি কিছু না, অনেকেই করে। তাদের বলি কি, বর্তমান সময়ে যারা ৬-৮ নম্বর পজিশনে খেলেন তাদের পরিসংখ্যানটা একটু কষ্ট করে দেখবেন। এই পজিশনে খেললে বেশিরভাগ সময়ই মাঠে নামতে হয় ৪০ ওভারের পরে, তাই এসেই হিট করতে হয় এবং লম্বা ইনিংস খেলার সুযোগও হয় না। হিট করতে গিয়ে বেশিরভাগ সময়ই দ্রুত উইকেট হারাতে হয়, গড় কমে যায়। তাই এই পজিশনে যারা খেলে তাদের গড় রান ৩০-৩৫ এর মধ্যেই থাকে আর স্ট্রাইক রেট থাকে ১০০ প্লাস।

কয়েকটি উদাহরণ দেই। হার্দিক পান্ডিয়ার গড় ২৯, স্ট্রাইক রেট ১১৫। আন্ড্রে রাসেলের গড় ২৮, স্ট্রাইক রেট ১৩০। থিসারা পেরেরার গড় ১৯, স্ট্রাইক রেট ১১১। ম্যাক্সওয়েলের গড় ৩২, স্ট্রাইক রেট ১২১। ফারহান বেহারডিনের গড় ৩০, স্ট্রাইক রেট ৯৭। বুঝতেই পারছেন, ২০১৪-২০১৫ সালে আমরা যে সাব্বির রহমানকে পেয়েছিলাম সে অন্যান্য দেশের হার্ড হিটারদের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না।

এতো বছর পর একজন পারফেক্ট হার্ড হিটার পেয়ে যেখানে আমাদের উচিত ছিল তাকে আরেকটু ঘষেমেজে ধারালো করার, সেখানে আমরা উল্টো পথে হেঁটেছি। সাব্বিরকে খেলিয়ে দিলাম ৩ নম্বর পজিশনে, যে পজিশনে তিনি তার জীবদ্দশায় কোনদিন খেলেছিলেন কিনা সন্দেহ।

এরপর ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ (১ ম্যাচ) সালে তিনি টানা ৩ নম্বরে খেলে যান এবং টানা ফ্লপ হন। এসময় তার গড় ছিল যথাক্রমে ২৪, ২৩ এবং ১২। যেটা ৩ নম্বরে খেলা একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে একাদশের বাইরে পাঠানোর জন্য যথেষ্ট।

বেচারা সাব্বির সেই যে অফ ফর্মে ফিরলেন, আর ব্যাক করতে পারলেন না। এবার বলুন। সাব্বিরের এই অফ ফর্মে যাবার পিছনে কি শুধু তার উশৃঙ্খল জীবনই দায়ী? নাকি আমাদের টিম ম্যানেজমেন্টেরও দায় আছে এতে?

বিসিবিও এখানে দায় এড়াতে পারবে না। বিসিবি দেখায় আমরা খুব কঠোর, চুন থেকে পান খসলেই আমরা শাস্তি দিব। কিন্তু তারপরেও নারী কেলেঙ্কারি আর উশৃঙ্খলতা লেগেই আছে টিমে। “নারী কেলেঙ্কারি” আর “উশৃঙ্খলতার” ট্যাগ লাগানো প্লেয়ারের সংখ্যা এতই বেশি যে শুধু এদের নিয়েই ১৫ সদস্যের একটি দল বানানো যাবে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে বিসিবির প্লেয়ারদের শাসন পদ্ধতি কিংবা মেন্টাল ট্রেইনিং-এ কোথাও তো কোন গণ্ডগোল আছে।

তাছাড়া আমার ব্যাক্তিগতভাবে মনে হয় বিসিবি সঠিকভাবে শাস্তি দিতেও জানে না। যেমন কিছুদিন আগে দর্শক পেটানোর অভিযোগে সাব্বিরকে মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা করা হল, সাথে ঘরোয়া লিগ থেকেও ব্যান করা হল কিন্তু আন্তর্জাতিক ম্যাচ তিনি দিব্যি খেলতে পারবেন। এটা কি ধরনের শাস্তি? একটা প্লেয়ারকে ডমেস্টিক লীগে খেলতে না দিলে সে তার খেলার ইম্প্রুভমেন্টটা কই করবে, ফর্ম কিভাবে ফিরাবে? তখন উচিত ছিল তাকে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচে ব্যান করে টানা বছরখানেক ডমেস্টিক খেলিয়ে যাওয়া। তখন সে তার খেলার ইম্প্রুভও করতে পারতো, সাথে শাস্তিও পেত। লাভ হতো দেশের।

শুনলাম সাব্বিরের জন্য নাকি আবার শাস্তি রেডি করা হয়েছে। আগামী ১ বছরের জন্য সবধরনের ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ থেকে নিষিদ্ধ হবার কড়া গুঞ্জন চলছে। যদি এমনটাই হয় তাহলে আরেকটি বড় ভুল করতে যাচ্ছে বিসিবি।

২০১৯ ওয়ার্ল্ড কাপের বাকি আছে প্রায় ১ বছর, এখন সাব্বিরের কোন ব্যাকআপ রেডি না করেই তাকে ব্যান করাটা নিঃসন্দেহে বোকামি। অনেকে আরিফুলকে সাব্বিরের রিপ্লেসমেন্ট ভাবলেও আমার কাছে সেটা কখনই মনে হয় নি। ২০১৪-১৫ সালের সাব্বিরের সাথে এখনকার আরিফুলকে তুলনা করলে আপনি নিজেও তাদের মধ্যে পার্থক্যটা ধরতে পারবেন।

আমাদের এখন উচিত ছিল সামনের ১ বছর সাব্বিরকে টিমের সাথে রেখে তার একজন রিপ্লেসমেন্ট রেডি করা, আরিফুলকে আরেকটু ঘষেমেজে তৈরি করা, আরও কিছু হার্ড হিটার বের করে আনা। এতে করে সামনের ওয়ার্ল্ড কাপের পরেও সাব্বিরের কোন উন্নতি না দেখলে তাকে বেশ বড়সড় শাস্তি দিয়ে দীর্ঘদিনের দিনের জন্য দলের বাইরে পাঠিয়ে দিলেও টিমে হার্ড হিটারের অভাব অনুভব করতে হত না।

তাছাড়া “ফর্মে ফেরা সাব্বিরকে” আমার সবসময়ই একজন ম্যাচ উইনার মনে হয়েছে। অন্তত পরিসংখ্যান তাই বলছে। সাব্বিরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫ টি হাফ সেঞ্চুরির ৪ টিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জয় পাওয়া ম্যাচগুলোতে সাব্বিরের গড় রান(৩০) তার ক্যারিয়ার গড়ের(২৪) চেয়ে বেশি।

টি-২০ টিমে তো এখনও সাব্বিরকে আমার একজন অপরিহার্য মেম্বার মনে হয়। তামিম, সাকিব, রিয়াদ কিংবা মুশির চেয়েও রানের গড় বেশি সাব্বিরের। ক্যারিয়ারের ৪ ফিফটির ৩ টিতেই ম্যাচসেরা হয়েছেন, সিরিজ সেরা হয়েছেন একবার। ২০১৬ সালের এশিয়া কাপে শ্রীলংকার সাথে ৮০ রানের ইনিংস এবং পাকিস্তানকে প্রথমবারের মত টি-২০’তে হারানোর ম্যাচে সাব্বিরের ফিফটি এখনো আমার কাছে বাংলাদেশীদের মধ্যে অন্যতম সেরা টি-২০ ইনিংস।

পরিশেষে একটা কথাই বলব, এত বছর এই বেয়াদপ আর উশৃঙ্খল ছেলেকে সহ্য করতে পারলে আরও কিছুদিন কি টিমের স্বার্থে এই ছেলেটাকে সহ্য করা যায় না?

Most Popular

To Top