নাগরিক কথা

নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই সংসার ভাংছে…

ডিভোর্স নিয়ন আলোয় neonaloy

বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা যে বাড়ছে, দুদিন আগে প্রথম আলো না খুললে যে ব্যাপারটা কেউ টেরই পেতাম না, তা না। আমরা অনেকদিন ধরেই দেখছি, শুনছি, জানছি। সেই সাথে আমাদের মা-খালাদের স্বর্ণালী যুগের কথা ভেবে ভেবে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছি। তো, এই বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধির কারণ কী? মূল কারণ হিসেবে আমি বলব- নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।

একটা সংসার কীভাবে টিকে থাকে, সেটা আমরা সকলেই দেখি এবং জানি- Male Dominance এর মাধ্যমে (পারস্পরিক বোঝাপড়া/সমঝোতা ইত্যাদি হালের চালু হওয়া টার্ম)। সেই ডমিনেন্সি মাঝে মাঝে যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, শারীরিক বা মানসিক নিপীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন নারীরা কী করেন? এতদিন দেখে এসেছি (এবং আজও দেখছি), নারীরা “মেনে নেন”। কারণ “সংসার টিকাইতে হবে”। আর সংসার না টিকাইলে কী হবে? নারীদের আয়-উপার্জন নাই, যাওয়ার জায়গা নাই- যাবে কই? খাবে কী? সুতরাং স্বামীর সংসার ছাড়ার উপায় নাই। তাই মাটি কামড়ে পড়ে থাকো। তাছাড়া, নারী নিজের কথা নাহয় বাদ-ই দিলেন, বাচ্চাকাচ্চাদের কী হবে? ওদের মানুষ করবে কে? আর “বদনাম” এর ভয় তো আছেই। সুতরাং মার খেয়েও চুপ থাকো, ঘর ঝাঁট দাও, হাসিমুখ করে থালাবাসন ধোও। এভাবেই সৃষ্টি হয় “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে” জাতীয় হেজিমনি।

আজ যখন পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে নারী অর্থনৈতিকভাবে বেশি স্বাধীন, তাদের পায়ের তলায় মাটি রয়েছে, তারা নিজের উপার্জিত অর্থে বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করতে পারবে বলে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে, মাত্রাতিরিক্ত মেইল ডমিনেন্সি তারা মানবে কেন? তাদের গায়ে আর কোন অধিকারে হাত দেবে পুরুষ? আর অর্থনৈতিক মুক্তি তাদের “বদনাম” এর ভয় তুচ্ছ করতে শিখিয়েছে।

ফলস্বরুপ, বিবাহবিচ্ছেদ।

এইখানে বলে রাখি, আমাদের দাদী-নানীদের যুগে সংসার শক্তভাবে টিকিয়ে রাখার কৃতিত্ব তাদের “সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা, ধৈর্যশীলতা, ভালোবাসা” ইত্যাদি নয়। এর কারণ ছিল তাদের অর্থনৈতিক দাসত্ব। আনজাস্টিফাইয়েবল মেইল ডমিনেন্সি তখনও ছিল, আরও প্রকটভাবেই ছিল।

এখনকার যুগে মানুষের মধ্যে আগের মত সহনশীলতা নাই- বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধির একটা কারণ হিসেবে আজকাল এই কথা শোনা যায়। প্রথমত, আগের যুগের মানুষের সহনশীলতা বেশি ছিল, এমন ধারণা সৃষ্টি হওয়ার কারণ কী? সহনশীলতা কীভাবে মাপা হল? বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাচ্ছে- এ ছাড়া আর কোন উপাত্ত আছে কী?

তারপর, এই “সহনশীলতা” আমরা কার কাছ থেকে আশা করছি? যেহেতু বেশিভাগ ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের উদ্যোগ নিচ্ছেন নারী, সুতরাং অবশ্যই নারীর কাছ থেকে। অর্থাৎ কি না পুরুষের দাপট নারী সহ্য করে নিচ্ছেন না অর্থাৎ “সহনশীলতা” দেখাতে পারছেন না, এই তার দোষ। এর থেকেই বোঝা যায়, “সহনশীলতা নাই”- দায়টি কতখানি ফাঁপা। কেবল মেইল ডমিনেন্সিই যে বিবাহবিচ্ছেদের একমাত্র দাগী আসামী, তা না। বনিবনা না হওয়া আজকাল একটা কারণ।

বলতে পারেন, এখন বনিবনা নিয়ে এত সমস্যা কেন? আগে তো এসব দেখি নাই!

আগে দেখেন নি, কারণ আগে সংসার চালাতে “বনিবনা” না হলে যে মনের বিরুদ্ধে সংসারের ঘানি না টেনে বিবাহবিচ্ছেদের মাধ্যমে নতুন জীবনের শুরু করা যেতে পারে, সে চিন্তা নারীর মাথায়ই আসে নি। কারণ ওই যে, অর্থনৈতিক পরাধীনতা।

বিবাহবিচ্ছেদ সমাজের চোখে মোটেই ভালো ব্যাপার না। কারণ, এই হারে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটতে থাকলে প্রচলিত “সমাজ” এর অস্তিত্বে টান পড়বে। এদিক থেকে দেখলে, আপনি যে এতক্ষণ ধরে এই লেখাকে “বিবাহবিচ্ছেদের পক্ষে সাফাই” গাওয়া মনে করে বিরক্ত হচ্ছেন, এটা এক ধরনের এক্সিসটেনশিয়াল ক্রাইসিস। পরিবার নাই, আপনার সমাজও নাই- এই চিন্তা আপনাকে প্যারা দেয় কি না?

আমার ফোকাস মূলতে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে না, আমার ফোকাস এই “প্যারা” নিয়ে। আপনার চিরচেনা পরিবারপ্রথা আকা সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে যাচ্ছে দেখে আপনি পীড়িত, অথচ আপনি জানেন এই সমাজব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে একটা বৈষম্যমূলক ভিত্তির উপর। যেখানে নারীদের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, তাদের উপর ভার দেয়া হয়েছে সংসার টিকিয়ে রাখার। মুখ বুজে ডমিনেন্সি মেনে নেয়ার নাম দেয়া হয়েছে “নারীর সৌন্দর্য”।

বলবেন, তা না হলে যে পরিবার টিকে না! সমাজ টিকে না!

টিকে, শুধু কেবল আপনার চেনা জ্ঞানের গন্ডীতে না। এক স্বামী চার স্ত্রীওয়ালা ধর্মত বৈধ পরিবারপ্রথার সাথেও আপনার ভালো পরিচয় নাই, মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের সাথেও আপনার পরিচয় নাই, এক নারী বহু স্বামীর পরিবার তো দূর কি বাত। হয়তো এমন কোন এক নতুন ফরম্যাটে সমাজ দাঁড়িয়ে যাবে।

পেসিমিস্টিকালি থিংকিং, হয়তো দাঁড়াবে না। তবে নারী যদি তার অধিকার নিয়ে পুরুষের সমানতালে দাঁড়াতে চায় আর পুরুষ যদি তার সাথে কোপ আপ করতে না পারে, তবে সে ভাঙ্গনের জন্য পারটিকুলারলি কাউকে দায়ী করতেই হয়, ভেবে দেখুন- সেটা নারী না পুরুষ?

আরো পড়ুনঃ “মাইয়া হইয়া জন্মাইছি, মাইর তো খাইতেই হইবো!”

Most Popular

To Top