ফ্লাডলাইট

বেঁচে থাকলে আজকে তাঁর ‘স্কোর’ হত ১১০, নট আউট

স্যার ডন ব্র্যাডম্যান নিয়ন আলোয় neonaloy

তারেক আহসান ঈগলঃ ক্রিকেটের সবচে’ বিখ্যাত মানুষ তিনি। মাঠে এবং মাঠের বাইরে- তার মত আর কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। মনে হয়না,কেউ কখনো পারবে।

৯৯.৯৪ কোথাও ভেসে উঠলে আলাদা করে আর নাম বলতে হয় না, ক্রিকেট জানে এরকম যে কেউ বুঝে যায় কার কথা বলা হচ্ছে।

১৯০৮ সালের আজকের দিনে নিউ সাউথ ওয়েলসের বাউরাল গ্রামে তার জন্ম। গলফ বল আর একটা স্ট্যাম্প- পানির ট্যাংকিতে একা একা ব্যাটিং প্রাকটিস করতেন। প্রথাবিরোধী গ্রিপের শুরু তখন থেকেই। ১৯২১ সালে বাবার সাথে সিডনিতে অ্যাশেজ দেখতে গিয়ে বলেছিলেন, এই মাঠে আমি একদিন খেলবই। তা এমন কথা তো কত বালকই বলে, কথা রাখতে পারে কজন? উনি রেখেছিলেন। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের সাথে তার আত্মা জুড়ে গিয়েছিল হয়ত সেদিনই। ক্রিকেট বিশ্ব তার প্রমাণ পেয়েছিল আরো পরে।

এরপরের গল্প সর্বজনবিদিত। ১৯ বছরেই স্টেটের হয়ে ফার্স্ট ক্লাস ডেব্যু। নেমেই সেঞ্চুরি। সব মিলিয়ে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে তার ক্যারিয়ার- ২৩৪ ম্যাচ, রান ২৮,০৬৭!

টেস্ট দলে ডাক পেলেন। ১৮,১ রান করলেন দুই ইনিংসে। দল হারলো ৬৭৫ রানে! বাদ পড়লেন (হ্যাঁ, উনিও ড্রপড হয়েছিলেন, ওই একবারই)। সিরিজের তৃতীয় টেস্টে ফিরেই সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের রেকর্ড গড়লেন।

১৯৩০ এর অ্যাশেজে যাবেন ইংল্যান্ডে। মাত্রই প্রথম শ্রেণীতে রেকর্ড ৪৫২* রানের ইনিংস খেলেছেন। কথার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে এক ইংলিশ অলরাউন্ডার বললেন, ‘তাকে আউট করতে খুব একটা বেগ পেতে হবেনা। সে একই ভুল বার বার করে, নিজেকে বদলায় না।’ ওই সিরিজে উনি লাঞ্চের আগে সেঞ্চুরি করেছেন, একদিনে তুলেছেন ৩০৯ রান! পুরো সিরিজে ১৩৯ গড়ে করলেন ৯৭৪ রান! এক ট্যুরেই ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচসহ করলেন ২,৯৬০ রান! ইংলিশরা চিনল ২২ বছরের, ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার এই বিস্ময়কে।

১৯৩২/৩৩ অ্যাশেজ। ইংলিশ ক্যাপ্টেন ডগলাস জার্ডিন তাকে আটকানোর জন্যে এক কুখ্যাত উপায় বেছে নিলেন। হ্যারল্ড লারউড, বিল ভোসদের সাথে নিয়ে ইতিহাসের সবচে বিতর্কিত সিরিজের চিত্রনাট্য আঁকলেন। বডি লাইন সিরিজ। লেগ সাইডে প্রায় সব ফিল্ডার সাজিয়ে, টানা তার শরীরে বল করে গেলো ইংলিশ দীর্ঘদেহী পেসাররা। তাকে ‘আটকানো’ গেল, অস্ট্রেলিয়া বাজেভাবে সিরিজ হারলো। (তার এভারেজ ছিল ওই সিরিজে ৫৭!)

পরের সিরিজেই তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করেন, যা ইংলিশরা আর কখনোই নিতে পারেনি যতদিন তিনি মাঠে ছিলেন।

ওই সিরিজের শেষে লোকটা ভয়াবহ অসুস্থ হয়ে পড়েন। লম্বা এক অপারেশনের দরকার হয়, ইংলিশ ডক্টররা তার কন্ডিশন ‘ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে ঘোষণা দেন। অপারেশনের জন্যে ব্লাড লাগবে জানতে পেরে হসপিটালে এত মানুষ এসেছিল যে কতৃপক্ষ তা সামলাতে হিমশিম খেয়ে যায়! রাজা থেকে শুরু ইংল্যান্ডের (তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের) সমস্ত মানুষ তার জন্যে প্রার্থনা করে। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসেন তিনি। প্রায় শত্রু বনে যাওয়া প্রতিপক্ষের মাটিতে আর কেউ কোনদিন এত ভালবাসা পেয়েছিল?

ফর্মের চূড়ায় ছিলেন, পৃথিবীর বুকে নেমে এল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের অংশ হলেন, আর্মির ফিজিক্যাল টেস্টে দেখা হল তার ‘আই সাইট পুওর’, অর্থাৎ দৃষ্টিশক্তি দুর্বল! সাথে ধরা পড়ল আরো কিছু অসুখ। এসব নিয়ে উনি ক্রিকেট কিভাবে খেলেছেন, তা এক মিথে পরিণত হয়।

১৯৪৬ সালে আবার ফিরলেন ক্রিকেট মাঠে। ততদিনে বয়স আটত্রিশ। ৮ বছরের লম্বা বিরতি দিয়ে ফিরেই উনি খেললেন ১৮৭ রানের এক ইনিংস। যুদ্ধের আগে ওনার এভারেজ ছিল প্রায় ৯৮, পরে ১০৫.৭২!

ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে নামার আগে ওনার এভারেজ ছিল ১০১। মাত্র ৪ রান হলে তা অন্তত ১০০ হয়। এরপরের গল্প জানেনা, এমন মানুষ পাওয়া যাবেনা। ম্যাচ শেষে উনি বলেছিলেন, ‘এভারেজের এই ব্যাপারটি আমার জানা ছিলনা। আমার মনে হয় ইংলিশরাও জানতোনা। জানলে ওরা অবশ্যই আমাকে চারটে রান করতে দিত।’

লোকটা রসিক ছিলেন। তার ছিল অসম্ভব মনে রাখার ক্ষমতা। কবে কোথায় কোন ইনিংস কিভাবে খেলেছেন, সব বলে দিতে পারতেন, শেষ বয়সেও। ক্রিকেট দিয়ে পেট চলতোনা, ক্রীড়াসামগ্রীর এক দোকানে কাজ করেছেন, যেখানে কিনা তারই সাইন করা সুভ্যেনির চড়া দামে বিক্রি হয়। প্রেসে কাজ করেছেন। কলাম লিখেছেন। লিখেছেন বই। সংগীত অসম্ভব টানতো, পারতেন পিয়ানো বাজাতে। এতটাই খ্যাতি ছিল এক সময় বীতশ্রদ্ধ হয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। তার ছেলে নিজের নামের শেষ অংশ বদলে ফেলেছিল কিছুদিনের জন্যে, বাবার খ্যাতির বিড়ম্বনা তাকে এতটাই জাপটে ধরেছিল।

দেশের প্রেসিডেন্ট নিজে তাকে ‘গ্রেটেস্ট লিভিং অস্ট্রেলিয়ান’ উপাধি দেন। রিচি বেনো বলেছিলেন, ‘সে সম্ভবত সর্বকালের সবচে গুরুত্বপূর্ণ অস্ট্রেলিয়ান!’ লক্ষণীয়, এখানে তাকে কিন্তু শুধু শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছেনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের ‘ডিপ্রেশন পিরিয়ডে’ এই লোককে মাঠে দেখতে এক সিরিজে সব মিলিয়ে প্রায় ৯ লাখ লোক মাঠে এসেছিল। উনি ব্যাট হাতে কারিশমায় হাসি ফোটাতে পারতেন মানুষের মুখে।

তার জীবনের গল্প এত ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা অসম্ভব। প্রতিটি পরতে পরতে বিস্ময় জমিয়ে রেখেছিলেন। রান আউট হয়েছেন মাত্র একবার, ছক্কা মেরেছেন মাত্র ৬টি*, কারণ বাতাসে খেললে আউট হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়- অথচ উনি রানই করতেন বাউন্ডারিতে। আনঅফিশিয়াল এক ম্যাচে ২২ বলে সেঞ্চুরিও আছে! এসব টুকিটাকিতে তাই বিস্মিত হইনি। যতগুলো বিশ্বরেকর্ড ঝুলিতে এখনো সেসব নিয়েও লম্বা ফিরিস্তি করা যাবে।

তাকে নিয়ে অসংখ্য প্রশংসাবচনের মধ্যে ইতিহাসে সর্বপ্রথম ৩০০ উইকেট নেওয়া ফ্রেড ট্রুম্যানের কথাগুলি হুবহু তুলে দেওয়ার লোভ সামলানো গেলনা,

”The scene is an Ashes test, England playing Australia. The Australian openers are in the middle, I run upto the wicket and rap the batsman on the pads. Howzat? He’s gone, and the score is zero for one.

The next batsman walks in, I hurtle into the middle and knock his stumps over. Score is zero for two.

Next walks in this FELLOW. I have to do my best, I run into the wicket and hurl the ball. This FELLOW hits it high in the air and it’s a magnificent catch at long on. Score is three hundred and seventy six for three.”

২৭ অগাস্ট গুগলে কিছু খুঁজতে গিয়ে যদি দেখে থাকেন ‘গুগল ডুডলে’ এক লোক স্টাইলিশ ভঙ্গিতে ক্রিকেট শটটি খেলে বলের দিকে তাকিয়ে আছে, তবে বুঝে নিবেন এতক্ষণ তার কথাই হচ্ছিল।

ইনি-ই স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যান!

Most Popular

To Top