ফ্লাডলাইট

এবার টেস্ট স্পেশালিষ্ট ব্যাটিং কোচ?

নিল ম্যাকেঞ্জি নিয়ন আলোয় neonaloy

কিছুদিন আগে ক্রিকইনফোর একটা শিরোনামে চোখ আটকে গিয়েছিলো- “টেস্টের জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যাটিং কোচ নিয়োগ দেয়ার কথা ভাবছে বিসিবি।”

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের দুর্বলতা গোপন করার কিছু নাই। গত ১২ মাসে টেস্টে ইনিংস প্রতি গড় রান মাত্র ২০২ আর লাস্ট তিন টেস্টে দুশো রান পার হয়নি একবারও!

এই অবস্থায় বিসিবি শুধুমাত্র টেস্টের জন্য আলাদা ব্যাটিং কোচ নিয়োগ দেওয়ার কথা চিন্তা করছে। এইজন্য এরই ভেতর কোচ খোঁজার কাজ শুরু করেছে বিসিবি। সহায়তা করছেন গ্যারি কার্স্টেন।

কিন্তু আসলে নতুন একজন কোচ নিয়োগ কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?

ক্রিকইনফোর মতে যুক্তিসঙ্গত। কারণ, নিল ম্যাকেঞ্জি শুধুমাত্র সাদা-বলের জন্য কাজ করতে রাজি হয়েছেন ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। বিসিবি অবশ্য বলেছিলো তাকে লাল-বল নিয়েও কাজ করতে, কিন্তু তিনি রাজি হননি।

নিল ম্যাকেঞ্জি অনেক ভালো ব্যাটিং কোচ, দুই দফায় সাউথ আফ্রিকার কোচ হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। তার সামর্থ্য নিয়ে আমার প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিসিবি কেন এমন একজনকে নিয়োগ দিলো যিনি শুধুমাত্র সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে কাজ করতে আগ্রহী?

কেন এমন একজনকে নেয়া হয়নি যিনি সব ফরম্যাট নিয়েই কাজ করবেন?

বর্তমানে ফরম্যাট-স্পেসিফিক ব্যাটিং কোচ একমাত্র ইংল্যান্ডের রয়েছে। ওয়ানডে এবং টি-টুয়েন্টির জন্য গ্রাহাম থর্প, টেস্টের জন্য মার্ক রামপ্রকাশ।

কিন্তু ইংল্যান্ডের বিষয়টা ভিন্ন, তাদের সংক্ষিপ্ত এবং টেস্ট ফরম্যাটের দলে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে, অধিনায়ক থেকে শুরু করে ফরম্যাট-স্পেসিফিক খেলোয়াড় রয়েছে। রয়েছে টেস্ট বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান আবার টি-টুয়েন্টি স্পেশালিষ্ট।

সুতরাং দুইজন ব্যাটিং কোচ দুইভাবে ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করেন, তাদের হাতে স্পেসিফিক ক্রিকেটার রয়েছে ফরম্যাটভেদে।

কিন্তু আমাদের জাতীয় দলে মমিনুল ছাড়া ফরম্যাট-স্পেসিফিক কোন ব্যাটসম্যান নেই। যারাই টেস্ট খেলছেন তারাই অন্য দুই সংক্ষিপ্ত ফরম্যাট খেলে থাকেন। এই যখন অবস্থা তখন একই ব্যাটসম্যানদের নিয়ে দুইজন আলাদা কোচ যখন কাজ করবেন তখন কি কোন কনফ্লিক্ট বা দ্বন্দ্ব হতে পারেনা? পেশাগত বা মানসিক দ্বন্দ্ব? একই ব্যাটসম্যানের উপর দুইজন কোচের প্রভাব কিভাবে পড়ে সেটা দেখার বিষয় হবে।

আমাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় একই ব্যাটসম্যান তুলনামূলক ওয়ানডে ক্রিকেটে ভালো খেলছেন টেস্টের চেয়ে। আমাদের সমস্যা আসলে টেম্পারমেন্টের অভাব, ঘরোয়া ক্রিকেটে চার-দিনের ম্যাচ না খেলার অনভ্যাস, ভালো মানের উইকেট না থাকা ঘরোয়া লীগে ইত্যাদি।

ক্রিকেটারদের এই সাইকোলজিক্যাল সমস্যা দূর করার জন্য কি ফরম্যাট-স্পেসিফিক কোচ দরকার? নাকি ক্রিকেটারদের নিজেদের ইচ্ছা? মানসিক ইচ্ছা? বিষয়টা চিন্তার বটে!

আবার আসি নিল ম্যাকেঞ্জি’র কথায়। বড় অদ্ভুত বিষয়। ধরা যাক একটা সিরিজ শুরু হচ্ছে টেস্ট দিয়ে, ম্যাকেঞ্জি তখন কি ছুটিতে থাকবেন? নাকি দলের সাথে থাকলেও কাজ করবেন সাদা-বল নিয়ে! লাল-বল নিয়ে কাজ তিনি যেহেতু করবেন না! ক্যারিবিয়ান সফরের সময় কিন্তু তিনি টেস্ট সিরিজ শেষ করেই দলের সাথে যোগ দিয়েছিলেন।

স্টিভ রোডস একজন দারুণ পেশাদার কোচ, কৌশলগত দিক থেকে কাউন্টিতে তার মানের কোচ কমই ছিলো। প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা বিবেচনা, নিজেদের স্ট্রাটেজি ইত্যাদি নিয়েই তিনি হয়তো বেশি ব্যস্ত থাকবেন, সত্যি বলতে সব হেড কোচই তা-ই থাকেন। কোন ক্রিকেটারের কোন দূর্বলতা বের হলে হেড কোচ প্রেসক্রিপশন দিয়ে দেন আর সেটা নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করেন ব্যাটিং কোচ/পরামর্শক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এভাবেই চলছে। কাজেই সব সমস্যার সমাধান রোডস একা করবেন বিষয়টা তেমন না, একজন ব্যাটিং কোচ আবশ্যক। বিসিবির উচিৎ ছিলো লং-টার্ম পরিকল্পনা করে একজনকে নিয়োগ দেয়া।

দুইজন ফরম্যাট-স্পেসিফিক কোচ রাখা একদিকে যেমন বাড়তি খরচের বিষয় তেমনি ভালোমানের কোচ পাওয়াও এখন বেশ কঠিন এই লীগ-ভিত্তিক ক্রিকেটের যুগে।

আমাকে ভুল বোঝার দরকার নাই, আমি আবারো বলছি নিল ম্যাকেঞ্জির উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা এবং বিশ্বাস আছে, তার অধীনে আমাদের দল সাদা বলে ব্যাটিং ভালো করবে, ক্যারিবিয়ান সফরে সেটা আমরা দেখেছি। রোডস-ম্যাকেঞ্জি আর আমাদের প্লেয়ারদের ঐকান্তিক চেষ্টায় আমরা ওয়ানডে এবং টি-টুয়েন্টি সিরিজ জিতেছি। আমার একটাই প্রশ্ন কেন এমন একজনকে নিয়োগ দেয়া যে শুধুমাত্র সাদা-বল নিয়ে কাজ করবে?

আবার যদি ইতিবাচক দিক থেকে চিন্তা করি, বিশ্বকাপ একটা টুর্নামেন্ট মাত্র, এরপরেও আমরা টেস্ট খেলবো, ম্যাকেঞ্জির চুক্তি বিশ্বকাপ পর্যন্ত, কিন্তু বিসিবি টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হয়তো করা শুরু করেছে! এইজন্য লং-টার্মের জন্য আলাদা কোচ নিচ্ছে। ধরে নেয়া যায়, হেড কোচ আর অধিনায়কের সাথে আলোচনা করেই এসব হচ্ছে।

তবে সত্যি যদি টেস্ট ক্রিকেটের উন্নতি চায় বিসিবি তাহলে শুধু কোচ নিয়োগ না, আরো গভীরে যেতে হবে। ক্রিকেটারদের চারদিনের ম্যাচ খেলা বাধ্যতামূলক করুক সবার আগে, নাহয় কোনদিন টেম্পারমেন্ট আসবেনা টেস্টের। তারপর উইকেটের মান ভালো করুক, আলুক্ষেত, পাটক্ষেত, এয়ারপোর্টের রানওয়ের মতো ফ্ল্যাট পিচ না করে সবুজ, বাউন্সি উইকেট করুক। লাগলে প্লেয়ারদের জন্য সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দিক, টেস্ট নিয়ে কোন মেন্টাল ব্যারিয়ার (মানসিক বাঁধা) থাকলে সেটা দূর হয়ে যাবে।

ক্রিকেটারদের নিজেদের ইচ্ছাটাও জরুরী, আমাদের ক্রিকেটারদের ভেতর ফরম্যাটের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার কাজটা সবচেয়ে ভালো আর দ্রুত পারেন মুশফিক আর লিটন দাস। মুশফিক অবশ্য টি-টুয়েন্টি ইদানীংকালে আয়ত্ব করেছেন। এছাড়া তামিম সাদা-বলে কিছুটা ধীরতালে ব্যাট করেন, সাকিব সব ফরম্যাটেই প্রায় একই মেন্টালিটি নিয়ে ব্যাট করেন আর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ টেস্ট ক্রিকেটে লাস্টের বেঞ্চের ছাত্র।

তবে বিসিবি যাই করুক দলের যেন ভালো হয়, দুইজন কোচ লাগলে নিয়োগ দিক, তবু যেন টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের বর্তমান দুর্দশা কেটে যায়। প্রায় ১৯ বছর পরেও বিদেশের মাটিতে বিনা লড়াইয়ে লজ্জাজনক পরাজয় আর সহ্য হয়না!

Most Popular

To Top