বিশেষ

মুভি রিভিউ নয়, কিছু সত্যিকারের অনুভূতির চাপা কান্না…

কিছু সত্যিকারের অনুভূতি এবং শাহরুখ খানের একটি ফ্লপ সিনেমা

স্বদেশ। মাতৃভূমি, মা, বুকের একটা পাশ। স্বদেশ প্রেম ঈমানের অঙ্গ। তাই তো স্বদেশের তরে জীবন বিলিয়ে দিতেও মানুষ দ্বিধাবোধ করে না। মাতৃভূমির প্রতি নাড়ীর একটা টান থাকে, যেটা একদম জন্মগত। দেশে থেকে কেউ এই টানটা উপলব্ধি করতে পারি, কেউ আবার পারি না। বলছি না দেশের মানুষরা দেশকে ভালোবাসে না, বা তাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই। আছে, কম বা বেশী। কিন্তু যখন আপনি আপনার দেশ ছেড়ে প্রবাসে যাবেন, তখন আপনার জন্মভূমির প্রতি যে মনোভাব, স্মৃতিকাতরতা আসে, যতটা ব্যাকুল হয়ে শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হয় ততোটা বোধহয় উপলব্ধি দেশে বসে করা সম্ভব নয়।

জন্মভূমির মাটি, বাতাস, ঘ্রাণ, আলো এমনই কিছু জিনিস, কোটি টাকা দিয়েও যার সাধ পূরণ করা সম্ভব নয়। জন্মভূমির প্রতি টানের মর্মটা বুঝাতে নিজের ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি শেয়ার করছি।

২০১৪-তে আমি প্রথম সিঙ্গাপুরে আসি। আসার কিছুদিন আগে থেকেই কোন কারণ ছাড়া চুপচাপ থাকতাম। নিজেও জানতাম না কেন এরকমটা হত। যেদিন আসবো, সেদিন কুমিল্লা থেকে ঢাকা আসার পথে বার বার বুকের মধ্যে চাপ দিচ্ছিলো। এটা এমন এক ব্যথা যেটা সব সময় অনুভব করা সম্ভব নয়। নাড়ীর টান কাটিয়ে উঠা এত সহজ নয়। না চাইলেও চোখের জল পড়তো। আমার এলাকাটি যখন পার হচ্ছিলাম তখন কলিজাটা মনে হচ্ছে ছিঁড়েই যাচ্ছিলো, রোড-ঘাট সব কিছুর সাথে সকল স্মৃতি মনে করে। ভাবতাম হয়তো জেলে গেলেও ভালো ছিলো, অন্তত দেশে তো থাকতাম! কেন যে বিদেশ যাবার প্লান করলাম তাই নিজেকে নিজে দোষারোপ করতে থাকলাম।

পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, এমনকি যে আমার শত্রু ছিলো তাকে মনে করেও খুব কেঁদেছি মাইক্রোবাসের মধ্যে। ভাবছি আমি কি বিমান অবধি যেতে পারবো নাকি বাড়ি ফিরবো। বুঝেনই তো অলরেডি অনেক টাকা ইনভেষ্ট হয়ে গেছে তাই নিজের ভুল বুঝতে পারলেও আমার সামনে দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা ছিলো না। আমাকে যেতেই হবে অন্তত টাকা উসুলের জন্য। কেউ আমাকে বুঝল না, সবাই বিদায় দিলো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।

গেলাম নতুন দেশ। চারদিকে জাঁকজমকপূর্ণ। আমি ছাড়া গায়ের রং সবারই ফর্সা, সাথে ছোটো কাপড়-চোপড়। আমি লজ্জা পেলেও তাদের জন্য এটা স্বাভাবিক, কারণ এটাই তাদের সংস্কৃতি।

কাজে জয়েন করলাম। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ছে দেশকে, দেশের মানুষকে। সিঙ্গাপুরে শুধু স্টেট ল্যান্ডগুলো ছাড়া বিশ্বাস করুন নদীর তলদেশ পর্যন্ত কংক্রিটের কাষ্টিং করা। আর পার্কের আশপাশ বা মাঝের জায়গাতে কেবল মাটি দেখতে পাওয়া যায়। কোথাও কি মিলে বুকের ব্যথার ঔষুধ? না পাচ্ছি স্বদেশী মানুষ, না পাচ্ছি মায়ের হাতের রান্না, না পাচ্ছি মাটি, বাতাসের ঘ্রাণ, না দেখছি প্রিয়জনকে। দম বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা। প্রতিদিন লাঞ্চ টাইমে ৩০ মিনিটের জন্য যখন শুতাম একটু ঘুমানোর জন্য, পারতাম না বুকের মাঝে সেই চিকন ব্যথার জন্য। লাফ দিয়ে উঠে পড়তাম। আর হাউমাউ করে কাঁদতাম। ভাবতাম পরিবারকে ডেভেলপ করার জন্য এসেছি তাই আমি পারছি না আমার ইচ্ছামত দেশে ফেরত যেতে।

একবছর পর পারমিট রিনিউ হবে না বলে ইচ্ছে করেই দেশে চলে আসি। যেদিন যাই এবং ল্যান্ড করার আগে যখন যানজটপূর্ণ, ঘনবসতির ঢাকাকে হাজারো লাইটের তারার ন্যায় ঝিকিমিকি সহ আকাশ থেকে মেঘের পরে ঝাপসা ঝাপসা দেখতে পাই, কি যে এক অনুভূতি হয়েছিল, আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। সকালে এলাকাতে পৌঁছে ঘুমাইনি, সোজা চলে যাই বন্ধুবান্ধবের কাছে, এলাকার চিপাচাপা, স্কুল-কলেজ সব জায়গায়।

দেশে ফেরত এসেছি এখন ৪ বছর চলছে। দিনে দিনে অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যি বলছি আমি দেশে থাকা অবস্থায় দেশপ্রেম কি, দেশের টান কি, মাতৃভূমির মমতা কি- কিছুই বুঝতাম না বা মন থেকে অনুভব করতে পারিনি বিদেশ থেকে আসার পর যতটা পেরেছি, যতটা ভালোবেসেছি দেশকে।

অনেকে হয়তো ভাবছেন সুযোগ পেয়ে শুনিয়ে দিলাম আমার সাতকাহিনী। না পাঠক, আমার রিয়েলাইজেশনের ব্যাপারগুলো আশুতোষ গোয়ারিকরের “স্বদেশ” সিনেমাটিতেও ছিলো। শাহরুখ খান তা সেরকমভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। তার অভিনয় দক্ষতা এতটা উঁচু লেভেলের যা আপনি সচরাচর সবার মাঝে পাবেন না। সে কারণেই তিনি বলিউডের বাদশাহ। তার সাথে নতুন করে আজ আরো একবার আমার দেশকে বলতে পেরেছি মন থেকে ভালোবাসি বাংলাদেশকে।

একমাত্র আমরাই পারি আমাদের দেশকে পরিবর্তন করতে। তার জন্য মন দরকার। সে রকমই কিছু পরিবর্তন স্বদেশ মুভিটিতে শাহরুখ খান করে দেখিয়েছিলেন তার সেই কানপুরের গ্রাম্য এলাকার মানুষের জন্য। ছবিটা ১৪ বছর আগের হলেও বর্তমান প্রজন্মকে তা নতুন করে প্রেজেন্ট করার বা মনের মাঝে দেশপ্রেমের ভাবমূর্তি উদয় করবার জন্য পারফেক্ট একটা কপি।

নাসাতে কাজ করা একজন মানুষ তার খ্যাতি, যশ, অর্জন সব কিছু ছেড়ে চলে আসে কেবল তার গ্রামের অশিক্ষিত ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করতে, গ্রামের সব ধরনের সমস্যা সমাধানে এক হয়ে কাজ করতে এবং সমাজের সবার মধ্যে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ বিবাদের সমাধানে, বুক ভরে দেশের শুদ্ধ বাতাসকে টানতে। যেটা কেবল দেশপ্রেম হলেই সম্ভব। দেশের মানুষকে ভালোবাসলে সম্ভব, দেশের আলো-বাতাস, মাটি-পানির প্রতি টান থাকলেই সম্ভব। সব মিলিয়ে স্বদেশ একজন দেশপ্রেমিকের জন্য বা বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুপ্রাণিত হবার পরিপূর্ণ একটা প্যাকেজ।

স্বদেশ সিনেমাটি এরকম একজন দেশপ্রেমিকের কাহিনীর উপর নির্ভর করে বানানো। ভারতীয় ছবির মধ্যে এটিই ১ম ফিল্ম যেটি আমেরিকার নাসা’র হেডকোয়ার্টারের মধ্যে ছবির শুটিং করতে পারার সুযোগ পায় এবং করেও।

ছবিটি সেরা অভিনেতা, সেরা পরিচালক, সেরা প্লেব্যাক শিল্পী, সেরা চিত্রনাট্য, শ্রেষ্ঠ লিরিক, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সহ সর্বমোট ১৩টি পুরস্কার ও ২৩টি মনোনয়ন অর্জন করে নেয়।

২১০ মিলিয়ন ইন্ডিয়ান রুপি বাজেটের সিনেমাটির টোটাল গ্রোস গিয়ে দাঁড়ায় ৩৪২ মিলিয়ন ইন্ডিয়ান রুপি। দু:খের বিষয় ছবিটি বক্স অফিস ফ্লপ হয়। কিন্তু ইন্ডিয়ার টপ রেটেড সিনেমাগুলোর মাঝে ৩৩তম অবস্থানে নিজের জায়গা করে নেয়।

এক নজরে স্বদেশঃ

Genre: Drama
Director: Ashutosh Gowariker
Music Director: A R Rahman
Cast: Shah Rukh Khan, Gayatre Joshi, Kishori Ballal
Rotten Tomatoes: 83%
IMDb: 8.3/10
Personal: 8.5/10

এডিটরস নোটঃ

আমাদের দেশে কি প্রবাসীদের এই অনুভূতিগুলো নিয়ে কখনো সিনেমা বানানো হয়েছে? অবশ্যই হয়েছে! তৌকীর আহমেদের অজ্ঞাতনামা দেখেছেন কি? কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের ফজলুর রহমান বাবু অভিনীত অজ্ঞাতনামা ছাড়িয়ে গিয়েছে শাহরুখ খানের স্বদেশকেও! সময় করে তবে দেখে ফেলুন অজ্ঞাতনামা!

প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, একটি চলচ্চিত্র এবং কিছু মানুষের ছোট মন-মানসিকতা…
অজ্ঞাতনামা নিয়ন আলোয় neonaloy

Most Popular

To Top